অঙ্কুরেই বিনাশ স্বপ্ন, ঘুচল না দুঃখ

প্রকাশিতঃ ৭:৫৪ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ১৫ অক্টোবর ২০

জুনাইদ আল হাবিব

যে মাঠে ফসল ফলিয়ে সন্তানের মুখে চাঁদের হাসি ফোঁটাতেন বাবা, সে মাঠে এখনো রয়ে গেছে জলোচ্ছ্বাসের ক্ষত। দু’মাস আগে প্রথম যে জলোচ্ছ্বাস হয়েছিলো, তাতে ঘরে উঠবে এমন ফসলও নষ্ট হয়ে যায়। হতাশ হন, তবুও স্বপ্ন বুননে সরে যাননি। আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। ট্র্যাক্টর দিয়ে জমি চাষাবাদ করে বীজতলা হতে ধানের চারা লাগিয়েছেন বিগত দিনের দুঃখ গোছানোর আশায়। কিন্তু, দিনশেষে যে দুঃখটা আরো বেড়ে যাবে, সেটা ভাবনায় ছিল না কখনো।

গত দু’মাসে তিনবার জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল। নদী তীর রক্ষাবাঁধ নেই। নদী ভাঙছে, জোয়ার হলেই বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি তাণ্ডব চালায় ফসলের ক্ষেতে। সবশেষ নতুন ধানের যে চারা রোপণ করেছেন, সেটাও জলোচ্ছ্বাসের কবলে বিনষ্ট হয়েছে। ধানের চারা উঠে না দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই জোয়ারের পানি সব দুমড়েমুচড়ে একাকার করে ফেলে। এ যেন অঙ্কুরেই স্বপ্ন বিনাশ।

এমন নির্মম গল্পের ক্ষত নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের মেঘনাতীরের কৃষক আবদুল আলী(৪৫), আবুল বাসার(৩৪), আবদুল হাদি(৫৬), আবু ছায়েদের(৩০) মত শত শত কৃষক। যে ধান নিজেদের ঘরের চালের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বেচাকেনা হতো, এখন সেটা দূরে থাক। ঘরের গোলাতেও যে চাল মজুদ নেই। পাশের বাড়ি, পাশের ঘরে কেউ কেউ চাল হাওলাত করতে যান। না পেয়ে আবার অনেকেই হতাশ হন। খেয়ে না খেয়েই দিন যায়। ইচ্ছে করে যে বাজার হতে এক মণ চাল কিনে আনবেন, যেন সাধ্যটাও পুরিয়ে গেছে। চালের বাজারেও যেন আগুন। মণ প্রতি ২-৩ হাজার টাকা। অথচ এক মণ ধান এ কৃষরাই বিক্রি করতেন ৫’শ কিংবা ৬’শ টাকায়! সে ধান হয়তো চাল করতে খরচ যেত ১’শ টাকা। অথচ এখন তাদের ধানের চাল তারাই কিনে খেতে হচ্ছে, দ্বিগুন দামে।

নদীতে হঠাৎ যে ৭ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হয়েছিলো, এ অঞ্চলে এ ক্ষতির পরিমাণটা কয়েক কোটি। ক্ষেতের ফসল গেল, পুকুরের মাছ গেল, শখের হাস-মুরগি গেল, চলার রাস্তাটুকুও ভেঙে তছনছ। এর মাঝেই বেঁচে আছেন স্বপ্নাহত নদীপাড়ের শত শত কৃষক।

কৃষক আবদুল হাদি(৫৬) বলেন, আমাদের কপালে কী আছে একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। গেল সয়াবিন মৌসুমেও বৃষ্টির কারণে সয়াবিন নষ্ট হইলো, তারপরে এবার পর পর তিন জোয়ারে সব নিয়া গেছে। আমরা যে কিভাবে চলমু, বলার মত না। আউশ ধান ঘরেই উঠাতে পারি নাই। আমন ধানের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক দূর থেকে চারা আনলাম, রোপণ করলাম, এখন আবার জোয়ারে সব ধুয়ে নিছে। চারাগুলো একটু শক্ত হতে পারলো না। আমি এসব কারণে কমপক্ষে এক থেকে দেড় লাখ টাকার মতো ক্ষতির মুখে পড়েছি। কিন্তু, সে তুলনায় আমাদের পাশে কেউ নাই।

বীজতলা নষ্ট হলে কষ্টের কথা তুলে ধরে কৃষক আনোয়ার উল্লাহ (৬০) বলছিলেন, দ্যাখেন, জালা ক্ষেত বেক্কান নষ্ট অই গেছে। কিছুতো আর রইলো না। এখনো পানির নিচে জালা বিছনা। এই আশপাশে কোন কৃষকের ক্ষেত বাদ নাই, সব শ্যাষ অই গেছে। এবার আমরা ধান রুইকতে পারমু না।

কৃষক আবদুল আলী আর কৃষক আবুল বাসারের ক্ষেতটা একদমই পাশাপাশি। দু’জনের ক্ষেতে চোখ দিলে বিবর্ণ রূপ। দু’জনের স্বপ্ন যেন এক সঙ্গেই শেষ হয়ে গেল। দু’জনই বললেন, বেড়িবাঁধ নাই। জোয়ার অইলেই ক্ষেতে পানি চলি আইয়ে। বন-জঙ্গলাতে ধানগুলো যা একটু রোপণ করলাম, সব নষ্ট হয়ে গেছে।

জলোচ্ছ্বাসের সময় এবং পরে জলোচ্ছ্বাস কবলিত এ জনপদে যাওয়া হয়েছে। কমলনগরের চর মার্টিন, চর কালকিনি, চর লরেন্স, চর ফলকন এলাকার জলোচ্ছ্বাসের তাণ্ডব নিজ চোখেই প্রত্যক্ষ করেছি। পরবর্তী সময়ে ওই সব এলাকাতে গিয়ে দেখা মেলে এমন চিত্র। এভাবে স্বপ্নের ফসল বার বার জোয়ারের পানিতে ডুববে আর নষ্ট হবে, কোনভাবেই ভাবতে পারেননি কৃষকরা। নদীতীর থেকে ৩-৪কিলোমিটার এলাকাতে জোয়ারের পানি মানুষের ফসল নষ্ট করেছে। সে অনুয়ায়ী কৃষকের এমন অপূরণীয় ক্ষতির কিছুটা পূরণেও এগিয়ে আসেনি কৃষি অধিদফতর।

কৃষক জয়নাল আবেদীন (হাজারী)(৬০) বলেন, কয়েক কানি জমির গিরস্থি নষ্ট অই গ্যাছে। লাখ লাখ টাকার ক্ষতি আমাদের। কে দিবে আমাদের এ ক্ষতিপূরণ? আমরা কার কাছে এ ক্ষতিপূরণ চাইব?

চর মার্টিনের ৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম পারভেজ বলেন, আমার এলাকাটি জোয়ারের পানিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে একটা। নদী একদম কাছেতো। যে বেড়িবাঁধগুলো ছিল, সেগুলো ভেঙে গেছে। রাস্তা-ঘাট, পুল-কালভার্ট সব এমনভাবে ভেঙে গেছে যে, যেটা কখনো চিন্তাও করতে পারিনি। এখানের শতকরা ৯৫ভাগ মানুষই কম-বেশ কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিটি পরিবারই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারো চলার মতো শক্তি নাই। ধার-কর্জও এখন আর মেলে না। কে কাকে ধার-উধার দিবে? সবারইতো টান। করোনার কারণে এ ক্ষতিটা অনেক বেশি।

কমলনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বাপ্পি বলেন, কমলনগরে জলোচ্ছ্বাসে যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা অপূরনীয় ক্ষতি। আমাদের রাস্তা-ঘাট, পুল-কালভার্ট, ব্রিজগুলো যেভাবে ভেঙে গেছে, এটাকে ভয়াবহ একটা বিপর্যয় বলা চলে। আমরা মানুষের চলাচলের জন্য বিশেষ করে যেখানে জনগুরুত্বপূর্ণ, ব্যবসা-বাণিজ্যিক এলাকা, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে স্টিল ব্রিজের মত স্থাপনা নির্মাণ করে মানুষের চলাচল স্বাভাবিকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেছি। আমাদের কৃষকদের এবার যে ক্ষতি হয়েছে, চিন্তাও করতে পারিনি। মূলত, নদীতে বেড়িবাঁধ নেই, স্লুইসগেট নেই। নদীভাঙে, আমাদের এলাকাকেও নানাভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এসব সমস্যার একমাত্র সমাধান বেড়িবাঁধ।

আরও পড়ুন : ছোট বেলায় কবুতর পালার সেই শখটা খুব চেপে ধরছিল

সময় জার্নাল/শাহ্ আলম

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।