অন্ধের দেশে এক আয়না ফেরিওয়ালা

প্রকাশিতঃ ১:০০ অপরাহ্ণ, সোম, ২২ জুন ২০

শাহ্ মো. আরিফুল আবেদ

তখন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে হাতে গোণে মাত্র চার মাস। বেলাবো উপজেলায় প্রথম কোন মন্ত্রী আসেন। তারিখ ১৪ জুলাই, ১৯৭২। কোন মন্ত্রীর আগমন নরসিংদী জেলার মধ্যেও প্রথম হতে পারে এটি। সড়ক পথে যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। উপায়ান্তর না দেখে সি প্লেনে এসে জনসভায় যোগদান করেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার যোগাযোগমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী। নরসিংদী তখন নারায়ণগঞ্জ মহকুমার অধীনে।

হ্যান্ডবিলের তারিখের এক বছর আগে বেলাবতে সংগঠিত সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ বীরযোদ্ধা সুবেদার আবুল বাসারের নেতৃত্বে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করে বেলাব পাইলট হাই স্কুল মাঠে এক ঐতিহাসিক জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল।

সেই জনসভায় প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ১৯৭০ এর নির্বাচনের বিজয়ী এমএনএ এডভোকেট ফজলুর রহমান; সভাপতি, নারায়ণগঞ্জ মহকুমা আওয়ামী লীগ। জাতির পিতা সারাদেশের এমএনএ’দের মধ্যে যে অল্প কয়েকজনকে “আপনি” বলে সম্বোধন করতেন, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম। নারায়ণগঞ্জ মহকুমার প্রভাবশালী আইনজীবী জনাব ফজলুর রহমান ভূইয়া ছিলেন বেশ রাশভারী ও স্বাস্থবান। তাঁর মুখমণ্ডলের তুলনায় গাল দুটি ছিল একটু ফোলা ধরনের। এ নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে উনাকে নমিনেশন দিয়ে হাসতে হাসতে রঙ্গ করে উনার উদ্দেশ্যে তৎকালীন মনোহরদী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব আবেদ আহমেদকে বলেছিলেন–“যাও, নমিনেশন দিয়ে দিলাম। ভূইয়া সাবকে বলিয়ো মুখটা একটু নাড়াতে, মুখের ভেতর পিঠা দিয়ে রাখলে হবে?” সবাই খুশি মনে চলে আসে। কিন্তু কে জানতো, নামে নামে যমে টানে।

তখন পার্লামেন্টারি বোর্ডে যাঁদের নমিনেশন দেয়া হত, তাঁদের নাম ছাপানো হত জাতীয় দৈনিকে। পরের দিন পত্রিকায় ফজলুর রহমান নাম ঠিকই আসে, কিন্তু সামনে “গাজী” যুক্ত হয়ে। নারায়ণগঞ্জ-মনোহরদীর চারদিকে তোলপাড়। ঘটনা কী?

ঘটনা হলো, ঘটনা কিছুই না। নামে নামে জমে টানে না, সামান্য হেরফেরে সংসদ সদস্য পদও হারে।
এমএনএ এবং এমপিএ দুই পদে ছিলেন প্রায় কাছাকাছি নামের দুইজন।

১৯৭০ এর নির্বাচনে এমপিএ ছিলেন গাজী ফজলুর রহমান। তিনি নারায়ণগঞ্জ বা মনোহরদীতে আওয়ামী লীগের তেমন কোন পদে ছিলেন না। ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর গাজী গোলাম মোস্তফার সাথে পরিচয় ও সম্পর্কের সুবাধে আওয়ামী লীগের তৎকালীন ৫১, পুরানা পল্টন কার্যালয়ে যাতায়াতে ছিল।

অন্যদিকে, ১৯৭৩’র নির্বাচনে এডভোকেট ফজলুর রহমানই অপ্রতিদ্বন্দ্বী, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পত্রিকায় যেহেতু চলে আসে গাজী ফজলুর রহমানের নাম এবং পরে তিনিই হন সংসদ সদস্য।

এখন প্রশ্ন হলো, এটা কীভাবে ঘটলো? আসলে, পরে জানা গেছে এই নাম টেম্পারিংয়ের ব্যাপারে গাজী গোলাম মোস্তফা ও এলাকার জনৈক সাংবাদিকের হাত ছিল।

উক্ত ঐতিহাসিক জনসভায় জনাব গাজী ফজলুর রহমান সাহেবও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

আরো উপস্থিত ছিলেন বর্তমান প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি’র পিতা তৎকালীন ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও এমএনএ শহীদ ময়েজ উদ্দিন আহমেদ।

ছিলেন রায়পুরা থানার এমএনএ ও নারায়ণগঞ্জ মহকুমা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আফতাব উদ্দিন ভূইয়া।

ছিলেন নারায়ণগঞ্জ মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনছর আলী।

উপস্থিত ছিলেন মনোহরদী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক সাহাবুদ্দীন। তিনি গাজী ফজলুর রহমান আততায়ীর হাতে মারা গেলে শূন্য আসনে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন ১৯৭৪ সালে। মজার ঘটনা হল, তিনি শপথ না নিয়েই সংসদের ভেতরে চলে গিয়েছিলেন। পরে স্পিকার জানতে পেরে দ্রুত ডেকে নিয়ে উনাকে শপথ বাক্য পাঠ করান।

আরো উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ কর্মী আসরাফ উদ্দীন খন্দকার।

সেই জনসভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন এম. আবেদ আহমেদ, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, মনোহরদী থানা আওয়ামী লীগ ও বেলাবো-মনোহরদী অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধকালীন সর্বাধিনায়ক।

বর্তমানে এম. আবেদ আহমেদ নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

(বাবা দিবসে আব্বার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। মহান সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীর সকল বাবাকে ভাল রাখুন।)

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও সাবেক সহকারী প্রক্টর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

সময় জার্নাল/রায়হান উদ্দিন তন্ময়

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।