অবাধ প্রযুক্তি ও আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ

প্রকাশিতঃ ১:২৮ অপরাহ্ণ, সোম, ২ ডিসেম্বর ১৯

ফখরুল ইসলাম ফাহাদ
তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে সর্বত্র বিজ্ঞানের ছড়াছড়ি। দৈনন্দিন কাজে কম্পিউটার, মোবাইল, ফেসবুক, ইমেইল, টুইটার, ম্যাসেঞ্জার, ইয়াহু, গুগুল এসব ছাড়া আমরা কল্পনাই করতে পারি না। তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে এসব সাইট ব্যবহার করে যেমন আমরা অনেক সুযোগ সুবিধা পাই তেমনি মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়। আমরা সচেতনতার অভাবে নিজেদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঢেলে দিচ্ছি যা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না।

আমাদের দেশে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারে কোন বিধিনিষেধ না থাকার ফলে শিশু, কিশোররা অবাধে মোবাইল ও কম্পিটার গেমস খেলছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, কিশোর বয়সের নেট ব্যবহারকারীরা পর্নো সাইট অথবা ভিডিও গেমসই বেশী আসক্ত। যা তাদের জন্য হুমকি ছাড়া আর কিছুই না।

বর্তমানে জুনিয়র স্কুলে পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরাও স্কুলের ক্লাসে গিয়ে অবাধে মোবাইল ব্যবহার করছে। ক্লাস সিক্সে পড়ুয়া ছেলে যখন ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায় তখন আশ্চর্য হওয়ার কিছুই থাকে না।

এ কথা বলছি এ জন্য যে আমাদের দেশের কিছু অভিভাবক ভাবে তার সন্তান ক্লাস নাইনে পড়ে সে যদি ফেসবুকে সময় কাটায় তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু আমরা কি জানি? যারা ফেসবুক, টুইটার, গুগল আবিস্কার করেছে, তাদের সন্তানদের নির্দিষ্ট বয়সের আগে কতটুকু তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করতে দেয়া হয়!

মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধনকুবের বিল গেটস। তার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি মাইক্রোসফট সারা পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত এবং সারা পৃথিবীর কম্পিটার জগত শাসন করছে।

আমরা কি জানি, বিল গেটসের সন্তানেরা দিনে ৪৫ মিনিটের অধিক সময় কম্পিউটার চালানোর সুযোগ পেতো না। শুধু তাই নয় সন্তানের বয়স ১৫ হওয়ার আগে স্মার্টফোন তো দূরের কথা মোবাইল ফোন কিনে দেননি বাবা বিল গেটস।

সাপ্তাহিক মিরর পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিল গেটস বলেছিলেন, ‘ নির্দিষ্ট বয়সের পরে আমি আমার সন্তানদেরকে একটি নিয়ম বেঁধে দেই, এর বাহিরে তারা মোবাইল, কম্পিউটার, ভিডিও গেমস কিছুই পায় না।’ বিল গেটস তার সন্তানদের জন্য নেট ব্যবহারের জন্য সঠিক নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন।

টুইটারের সাবেক চেয়ারম্যান ইভান উইলিয়ামস তার দুই শিশুর জন্য আইপ্যাডের বদলে অনেকগুলো বই কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু আজকাল আমরা শিশুদেরকে ভিডিও গেমস দিয়ে আনন্দে রাখার চেষ্টা করি। যেখানে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ নিজেও তার শিশুকে বইয়ের মাধ্যমে বিনোদন দিয়ে থাকেন। সেখানে আমরা মার্ক জাকারবার্গ এর তৈরী শিশুদের জন্য ম্যাসেঞ্জার গেমস খেলাই।

একবার চিন্তা করে দেখেছেন, যারা এসব প্রযুক্তির নির্মাতা তারা প্রযুক্তি ব্যবহারে কতো সাবধানতা বজায় রাখে আর আমাদের বাচ্চাদের কতোটুকু সাবধানতা আমরা বজায় রাখি?

দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার একটি আইন করছে যে, যাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে তাদের মধ্যরাত থেকে ভোর সকাল ৬টা পর্যন্ত মোবাইল গেমস খেলা নিষিদ্ধ। অস্ট্রেলিয়াতে ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে স্কুল শিক্ষার্থীদের ফোন নিয়ে যেতে পারে না। এতে তারা ক্লাসে ফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকে৷ বিরতির সময় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে থাকতে পারছে। ২০১৮ সালে ফ্রান্সে স্কুলে মোবাইল ফোন আনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ক্লাসে ল্যাপটপ দিয়ে নোট করার চেয়ে হাতে লিখে নোট করা বেশী মনে থাকে। লিখলে যে কোন বিষয় মানুষের মস্তিষ্কে বেশী সময় থাকে।

বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে স্কুল পড়ুয়া শিশু, কিশোররা অবাধে প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তাদের পড়ালেখার ব্যাঘাত ঘটছে। তারা অনেক রাত জেগে ভিডিও গেমস খেলার ফলে ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারেনা। এ কারণে ক্লাসে উদাসীনতা কাজ করে। প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের কল্যাণ নিহিত থাকলেও শিশু-কিশোরদের এ ব্যাপারে নিয়মকানুন বেঁধে দেয়া প্রয়োজন। সঠিক বয়সের আগে মোবাইল ফোন না দিয়ে বই কিনে দেয়া যেতে পারে। তাতে সে জগৎ এবং জীবন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা লাভ করতে পারবে। মা-বাবাকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে যাতে তাদের সন্তান সঠিক শিক্ষা অর্জন করে।

সর্বোপরি বলবো, শিশুদের অবাধ প্রযুক্তি ব্যবহার থেকে রক্ষা করতে সরকারকে যুগোপযোগী আইন প্রনয়ণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ।

আরও পড়ুন
৩ বছরেও কমিটি পায়নি ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ
পরিবহন সংকটে ঢাকা কলেজ
বেহাল অবস্থায় পতিত ঢাকা কলেজের শহীদ মিনার

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ