আইনের চোখে অনলাইন ব্যবসা

প্রকাশিতঃ ৬:৪৩ অপরাহ্ণ, সোম, ৩১ আগস্ট ২০

জিসান তাসফিক

বর্তমান বিশ্বে বহুল প্রচলিত ব্যবসা হলো অনলাইন ব্যবসা। যার আরেক নাম ই-কমার্স। ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে অনলাইনে কেনা-বেচা হয়। ফেসবুক, ওয়েবসাইট, ইউটিউব, গুগলসহ নানা ধরনের অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে করা হয়ে থাকে। দিনে দিনে অনলাইন ব্যবসা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আগামী ভবিষ্যতে ব্যবসায়িক শিল্পে অনেক জায়গা জুড়ে থাকবে বলে আশা করা যায়।

অনলাইন ব্যবসা প্রাচীনকালের ব্যবসা নয়। ইন্টারনেট আবিষ্কার ও এর ব্যাপকভাবে ব্যবহারের পর অনলাইন ব্যবসার প্রচলন হয়। এখানে বিক্রেতা তার পণ্যের ছবি কিংবা ভিডিওতে বিস্তারিত তথ্যসহ বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করে এবং ক্রেতা তার পছন্দের পণ্য অর্ডার করে হোম ডেলিভারী পেয়ে থাকে। এক্ষেত্রে হোম ডেলিভারী কিংবা নিকটস্থ পিক পয়েন্ট রাখা থাকে। এছাড়াও নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা কিংবা অফার প্রদান করে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো।

অনলাইন ব্যবসা আমাদের দেশে প্রচলিত সাধারণ ব্যবসার মত নয়। অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে অনলাইনের বিভিন্ন মাধ্যমে আছে, তাতে বিক্রেতারা পণ্যের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে এবং সেটা দেখে একজন ক্রেতা কিনে। কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ ব্যবসার ক্ষেত্রে একজন ক্রেতা বাজারে গিয়ে নিজের পছন্দ ও চাহিদা মত পণ্য দেখে দরদাম করে কিনতে পারে। অনলাইনের ব্যবসায় এমন সুযোগ সুবিধা থাকে না যার ফলে ক্রেতারা কেবল বিজ্ঞাপনের উপর বিশ্বাস করেই কিনতে হয়।

এখানে ক্রেতার কাছে পণ্যের মান যাচাইয়ের তেমন সুযোগ নেই। সরল বিশ্বাসী ক্রেতারা প্রতারিত হবার সুযোগ থাকে। তাছাড়া অনেকে প্রিপেইড করে সঠিক সময় পণ্য পান না আবার অনেকে পণ্যই পান না। অনলাইন ব্যবসাতে যেমন ভালো দিক আছে তেমনি মন্দ দিক আছে। এই ভালোমন্দ মিলিয়ে বর্তমানে অনলাইন ব্যবসা দেশে একটি জনপ্রিয় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ছোট পরিসরে অনেক উদ্যোক্তা এসেছে।

বাংলাদেশে যেকোনো ব্যবসা করতে হলে ট্রেড লাইসেন্স করতে হয়। ট্রেডলাইসেন্স ব্যবসায়ী সংক্রান্ত বিষয় বহির্ভুত হয় না। অনলাইন ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত আলাদা নীতিমালা করা হয়নি যেহেতু এটাও একটি ব্যবসা সুতরাং ট্রেড লাইসেন্স করা উচিত। এছাড়া এখানে ব্যবসায়িরা প্রচুর আয় করে থাকেন সুতরাং ব্যবসায়িক সংক্রান্ত আয়করের বিষয় এখানে জড়িত। তবে উক্ত বিষয়গুলি সম্পূর্ণ সরকারের অধীনস্থ বিষয় সুতরাং সরকারি বিধিমালা ও সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে।

ক্রেতাকে অন্য শব্দে ভোক্তা বলা হয়। ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন জারি করা হয়েছে। এই আইনের উদ্দেশ্য কোনো ব্যবসা বাণিজ্যে কোনো ক্রেতা কোনোভাবে প্রতারিত যাতে না হয়, আইনত নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি কিংবা সরবরাহ সহ নানান বিষয়ে আইনত প্রতিকার করা। অনলাইনে যেহেতু একজন ক্রেতা সরল বিশ্বাসে কোনো পণ্য ক্রয় করে সুতরাং সে প্রতারিত হতে পারে এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪১৫ ধারা অনুযায়ী প্রতারণা দণ্ডনীয় অপরাধ এবং ৪১৭ ধারা অনুযায়ী যে প্রতারণা করবে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দন্ডিত করবে।

ভোক্তা অধিকার আইনে ৩৭ ধারা থেকে ৫৬ ধারায় পণ্য বিক্রি ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধিবিধান করা হয়েছে। পণ্যের বিস্তারিত তথ্য ও তথ্যের সাথে পণ্য সামঞ্জস্যতা থাকতে হবে অন্যথায় এটা প্রতারণা হিসেবে গণ্য হবে। সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী মূল্য থাকতে হবে এবং তা প্রদর্শন করতে হবে। ভেজাল পণ্য নিষিদ্ধ এবং কোনো পণ্যে ভেজাল মিশানো যাবে না। অবৈধ পণ্য বাজারজাতকরণ, মিথ্যা বিজ্ঞাপন ও প্রতিশ্রুতি, যথাযথ ও প্রতিশ্রুত ভাবে সেবা প্রদান না করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য বেআইনি প্রথা অবলম্বন করে ব্যবসা করলে তাতেও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কতৃপক্ষের নিকট আবেদন করা যাবে।

উক্ত নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড করলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর আইনী ব্যবস্থা নিবেন এবং আইন অনুযায়ী বিভিন্ন অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে বর্ণিত শাস্তি প্রদান করবেন। সাধারণত ভোক্তার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাংলাদেশের সরকারের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি দ্বারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে থাকেন। এই আইনের খুব মজার একটি বিষয় হল এর ৭৬ ধারা যেখানে অভিযোগকারী ভোক্তাকে মোট জরিমানার ২৫% দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

প্রত্যেকের জীবনের লক্ষ্য ও প্রয়োজন প্রতিষ্ঠিত হওয়া। উদ্যোক্তা হওয়া খুব সহজ বিষয় নয়। একজন উদ্যোক্তা প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত হওয়া মোটেও কাম্য নয়। বর্তমান যুগে অনলাইন ব্যবসা একদিকে যেমন লাভজনক অন্যদিকে আর্কষণীয়। একজন ক্রেতা সরল বিশ্বাসে পছন্দনীয় পণ্য অনলাইন থেকে ক্রয় করে যদি প্রতারণার স্বীকার হয় তবে এটা যেমন ক্রেতার জন্য কষ্টকর তেমন সকল বিক্রেতার জন্য অশনি সংকেত। একজন বিক্রেতার ভুলের দায়ভার সকল বিক্রেতার উপর পড়ে।

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
zeesuntasfiq9314@gmail.com

সময় জার্নাল/

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।