আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘশ্বাস

প্রকাশিতঃ ৮:২৬ অপরাহ্ণ, বুধ, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০

ফখরুল ইসলাম ফাহাদ
শিক্ষাকে বলা হয় একটি জাতির মেরুদণ্ড। সভ্যতার অগ্রগতির জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। শিক্ষাই পারে একজন মানুষকে নিজের প্রতি, সমাজের প্রতি ও দেশের প্রতি দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলতে। আপনি কখনো কাউকে জোর করে বা টাকা দিয়ে নিজের ভিতরের দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম তৈরী করতে পারবেন না। যদিও ক্ষণিকের জন্য আসে তবে তা দীর্ঘসময় থাকবে না। আপনি একটা মানুষকে সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে তার ভিতরে, নিজের প্রতি এবং নিজের দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করতে পারবেন খুব সহজেই। দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই তৈরি হয় দেশপ্রেম।

একটা দেশ গড়ার মূল উপাদান হলো সেই দেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজ। আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণ-তরুণী রয়েছে। যাদেরকে সঠিক পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনার মাধ্যমে দেশের মূল্যবান সম্পদে পরিণত করা যায়। এই তরুণ সম্পদ থাকতে কেন আমরা জ্ঞান বিজ্ঞানে সফল হতে পারবো না? কেন এ দেশের মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে থাকবে? আমরা যদি আমাদের এ বিশাল তরুণ প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে শক্তিতে পরিণত করতে পারি তাহলে কি অন্য দেশের কাছে প্রতিনিয়ত সাহায্য চাওয়া লাগবে? আমরা কি বাঙালি জাতি হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো না? আমরাও কি জাপানের মতো উন্নত দেশ হিসেবে সবার কাছে রোল মডেল হতে পারবো না। উত্তর হলো আমরা পারবো তবে এ জন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণদের শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী করে দিতে হবে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আছে, প্রচুর পরিমাণের শিক্ষার্থী আছে। নেই শুধু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ, গবেষণা করার জন্য কোন আধুনিক ল্যাবরেটরি। যা আছে তা শিক্ষার্থীদের তুলনায় নগন্য। তাহলে এই উচ্চ শিক্ষিত তরুণের দল কোথায় মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করবে? সে কিভাবে রোগের প্রতিষেধক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবে? গবেষণার জন্য যদি ল্যাব না থাকে, বিশ্বিবদ্যালয়ের পরিবেশটা যদি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য অনুপযোগী হয়, তাহলে এই বিশাল সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মেকে কিভাবে কাজে লাগানো যাবে? তারা কিভাবে একটা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে?

দেশের মেধাবী তরুণদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই তাদের ঠিকানা হয় ছারপোকা আর মশার বাসস্থান হলের গণরুমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দেয়ালে লেখা দেখেছি ‌‘গণরুমে পঁচতে থাকা আগামীর স্বপ্নগুলো’ সত্যিই আমাদের তরুণদের স্বপ্নগুলো ছারপোকা আর মশা চুষে নিয়ে যায়। পড়ে থাকে শুধু কংকাল দেহ খানি, যেখানে কোন স্বপ্নের মতো স্বপ্ন থাকে না। থাকে শুধু হা-হুতাশ আর বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস। ১৮-২৫ বছর বয়স একজন শিক্ষার্থীর সোনালী বয়স হিসেবে বিবেচিত। যেখানে এ বয়সে সে নিজেকে প্রকাশ করবে, নিজেকে প্রমাণ করবে, কিছু করে দেখাবে এ পৃথিবীকে। সেখানে এই সোনালী দিনগুলো গণরুমের ছারপোকা, মশার কামড়, ক্যাম্পাসের বড় ভাইদের পা চাটতে চাটতে কবেই যে হারিয়ে যায় সে নিজেই জানে না।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক হিংস্রতা, দলাদলি, মারামারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, মাদকদ্রব্য ছড়াছড়ির এক আঁতুর ঘর। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এসব অরাজকতা দৈনন্দিন জীবনের প্রতিচ্ছবি। তারপরে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনৈতিক উপস্থিতি। তাঁরা কালো-সাদা রাজনৈতিক দল নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। টেলিভিশনে রাজনৈতিক টকশোতে তাদের উপস্থিতি খুবই গরম।

নিয়মতি ক্লাস না করিয়ে যখন একটা দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের গুরুজন রাজনীতি নিয়ে পড়ে থাকেন, সেখানে মেধাবীদের কি অবস্থা হবে বুঝতেই পারছেন। যদিও সব শিক্ষক এক রকম নয়। তবে গুটিকয়েক ভালো শিক্ষকও রয়েছে, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্যেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো টিকে আছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোন বিশেষ দিবসে বা এমনিতে কোন অনুষ্ঠানে ডিজে পার্টির খুব কদর। দেশী-বিদেশী সঙ্গীত শিল্পীরা, সিনেমার নায়ক-নায়িকারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠগুলো কাঁপায়। অথচ খুব কমই দেখা যায় একজন বিখ্যাত লেখক, গবেষক, বিজ্ঞানী বা কোন আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিদদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এনে তরুণদের কিছু ভালো দিক নির্দেশনামূলক বক্তৃতার সভা-সেমিনার আয়োজন করতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোর যদি এমন অবস্থা থাকে তাহলে একজন তরুণ এই প্রতিষ্ঠান থেকে কি পাবে? আর তার দেশকে কি দিবে? তাহলে একটা দেশ কিভাবে দাঁড়াবে? শিক্ষাই যদি একটা দেশের মেরুদণ্ড হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় হলো মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করে নির্মাণ করার জায়গা। অথচ আমাদের মেরুদণ্ড ঠিক রাখার জায়গাটিতে রক্তচোষার বসবাস। যে রক্তচোষা দিন রাত রক্ত চুষে একটা দেশকে, একটা জাতিকে নিস্তেজ করে দিচ্ছে।

আমি একবার প্রাণিবিজ্ঞান বিষয়ে পড়ুয়া এক ভাইয়ের কাছে থেকে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি প্রাণী নিয়ে গবেষণা করে ল্যাবরেটরিতে কতো সময় ব্যয় করেন। ঐ ভাইয়ের ভাষ্য মতে, এ দেশে প্রাণী নিয়ে গবেষণা করে কি হবে? এর চেয়ে একটা সরকারি চাকরি অনেক দামি, আর গবেষণার ল্যাব বলতে নামেই আছে, কাজে নয়। এ কথা দ্বারা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সমাজের দিকটা হয়তো তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন। এ জন্যেই আজকাল লাইব্রেরিতে রকমারি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই খুব কমই পড়া হয়। লাইব্রেরী বলতে আমরা বিভিন্ন বইয়ের সমাহার বুঝে থাকি। যেমন শিল্প-সাহিত্য, বিজ্ঞান, গল্প, কবিতা, বিভিন্ন ভ্রমণ কাহিনী, উপন্যাস বইয়ের সমাহার বুঝে থাকি। কিন্তু বর্তমানে দেশের বড় বড় পাবলিক লাইব্রেরিতে এসব বইয়ে পোকায় ধরেছে! কেননা এসব বই এখন খুব কমই পড়া হয়। এসব বইয়ের জায়গাতে স্থান পেয়েছে বিসিএস, ব্যাংক, সরকারি চাকরীর বিভিন্ন বই। তরুণরা এখন চাকরির বই নিয়ে লাইব্রেরিতে পড়তে যায়। পদার্থ বিজ্ঞানের যে শিক্ষার্থীর এখন বিভিন্ন তরল পদার্থ নিয়ে ল্যাবরেটরিতে দিন রাত গবেষণায় মজে থাকার কথা, সেই শিক্ষার্থী বিসিএস বা একটা সরকারি চাকরির জন্য দিন রাত বড় বড় বই দিব্যি মুখস্থ করছে। মানবিক, বিজ্ঞান, বানিজ্য ও অন্যান্য সকল শাখার প্রতিটি শিক্ষার্থীদের একটাই উদ্দেশ্য সরকারি চাকরি পাওয়া। একবার ভাবুন তো, যে দেশের সকল শ্রেণির তরুণ-তরণীরা সরকারী চাকরির পিছনেই ছুটে সে দেশ কিভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যাবে? গবেষণা ব্যতীত জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতি করা অসম্ভব। এভাবেই আমাদের দেশটা পিছিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানের উদ্ভাবন ও আবিস্কারের দৌঁড়ে আমরা হেরে যাচ্ছি, হেরে যাচ্ছে একটা জাতির স্বপ্ন, যে জাতি উন্নত হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ