আলোচনা সমালোচনায় মেগাস্টার হুমায়ূন আহমেদ

প্রকাশিতঃ ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ, শুক্র, ১৩ নভেম্বর ২০

ইমরান মাহফুজ, কবি ও গবেষক

বাংলাদেশের জন্ম ও হুমায়ূন আহমেদের লেখক জীবনের কীর্তি পারস্পরিক আনন্দের। দেখা যায় রাষ্ট্রের অবকাঠামো তৈরী হচ্ছে ভাষা আন্দোলন মুক্তিযোদ্ধের চেতনায়, ইতিহাস ঐতিহ্য নিমার্ণ হচ্ছে; একই সাথে বইপড়ুয়ারা দেশীয় লেখককের দেশী ভাষায় চারপাশকে জানছে সামাজিক পারিবারিক অনুভূতি নিয়ে ভাবনার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে পাঠক নন্দিত লেখক আজ হয়তো নেই কিন্ত রাষ্ট্র আছে থাকবে যেমন আছে তাঁর অগণিত পাঠক ও সৃজন মায়ার সংসার। বহমান থাকবে কাল থেকে কালান্তর বাংলাদেশ ও রাষ্ট্রভাষা যতদিন।

স্বাধীনতার পরপরই হুমায়ুন আহমেদের প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হয়। ভূমিকায় আহমদ শরীফ লিখেছিলেন : নামের মধ্যেই যেন একটি জীবনদৃষ্টি, একটি অভিনব রুচি, চেতনার একটি নতুন আকাশ উঁকি দিচ্ছিল। পড়তে শুরু করলাম ঐ নামের মোহেই। পড়ে অভিভূত হলাম। গল্পে সবিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছি একজন সূদর্শী শিল্পীর, একজন কুশলী স্রষ্টার পাকা হাত। বাঙলা সাহিত্যক্ষেত্রে এক সুনিপুণ শিল্পীর, এক দক্ষ রূপকারের, এক প্রজ্ঞাবান দ্রষ্টার জন্মলগ্ন যেন অনুভব করলাম।

এইভাবে আলোচনায় আসে বইপাড়ায়। সমালোচনাও করছে কেউ কেউ, পাত্তা দেননি কথাকার। তারপর একেএকে বহু উপন্যাস লেখেন, শ’ ছাড়িয়ে যায়। কেবলমাত্র গল্প বলার জাদুকরি শক্তিই তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়। পরিচিতি পান ঢাকা কলকাতায় বাংলা সাহিত্যের সর্বাধিক উপন্যাসের লেখক হিসেবে। বাংলা মুল্লুকে উপন্যাস লিখে তার মতো এতো পাঠকপ্রিয় ও বিত্ত বৈভবের অংশিদার আর কেউ হননি (সম্মানী হিসাব করে প্রকাশকরা অজানা এক তথ্য জানিয়েছিলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের প্রকাশিত এক একটা শব্দের বিক্রয়মূল্য পাঁচ হাজার পাঁচশ টাকা মাত্র’)।

অন্যদিকে জনশ্রুতি আছে পাঠ-বিমুখতার দুর্দিনে পাঠক সৃষ্টিতে অসামান্য ভূমিকা রাখেন তিনি। কলকাতার লেখকদের হটিয়ে বাংলাদেশের বই শেল্ফ সমৃদ্ধ করেছেন। যদিও পাঠকদের সিংহভাগ (নগরকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা নতুন মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত) শিক্ষার্থী যারা সম্ভবত শুধু তার উপন্যাস নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়তেন। কথার পিঠে কথা কথা বর্ণনায় টানটান উত্তেজনা, নাটকীয়তা, বৈচিত্র্যময় ও হাসি রসাত্মক চরিত্র সৃষ্টি এবং গভীর দৃষ্টি হুমায়ূন আহমেদকে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা দেয়। একই সঙ্গে গল্পে সহজাত ভঙ্গিমা সাধারণ মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছিলো তাঁর সৃষ্টি। তবে একটা বয়সের পরে তার উপন্যাসের তেমন অনুরাগী থাকে না বলে শোনা যায়। এসবে ‘নাক-কান’ কোনোটাই তিনি দিতেন না! ব্যক্তিগত জীবনে হুমায়ূন আহমেদ নিজের সততা ও নিজের লেখার ক্ষমতা নিয়ে অহংকারী ছিলেন বলে মোটামুটি আঁচ করেছে বেঁচে থাকতেই। এ অহংকারের যাপন তার সাথে মানানসইও ছিলো।

খ.
একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও উত্তরকালে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের অন্তর্ধানের পরে জনপ্রিয় ধারার উপন্যাসের খরা থাকে। আগে পরে পুরোদমে চলে ভারতীয় ঔপন্যাসিকদের দাপট। ঠিক সময়ে বিস্ময়করভাবে নক্ষত্রের আগমন তাছাড়া ‘প্রতিভা যাকে স্পর্শ করে তাকেই সজীব করে’ কথাটা শিবনাথ শাস্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে বলেছিলেন। হুমায়ুন আহমেদের সাহিত্য নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে কথাটা মনে পড়লো। তাঁর একাডেমিক পড়াশোনা বিজ্ঞানে, সাহিত্য চর্চা করে রাজত্য করেছেন বাংলায়। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় দারুনভাবে পদচারণার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। গল্প, উপন্যাস, সাইন্স ফিকশন, চলচ্চিত্র, নাটক, গান, আত্মজৈবনীসহ সব বিভাগে। মনে পড়ে একবার কালের কন্ঠের বিশেষ সংখ্যায় কবিতাও পড়ছিলাম! সর্বোপরি এক অবিশ্বাস্য রকমের জীবনের আনন্দ সাহিত্যে ঘটিয়েছিলেন। মানুষের যাপিত জীবনের বিচিত্র ব্যবহার, শ্রেণী চরিত্র, বিষণ্ণ তার বেড়াজাল, সঙ্কট সম্ভাবনা লেখাকে করেছে বৈচিত্র্যময়। সেই সাথে ইতিহাসের দাসত্ব না করে ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মরণীয় ঘটনার উপকরণ নিয়ে নিমার্ণ করেছিলেন ‘বাদশা নামদার’ ও ‘দেয়াল’র মতো অসামান্য উপন্যাস।

‘‘যেমন আমার নিজের সবচেয়ে প্রিয় গল্প হলো ‘সংসার’। বিশ্বসাহিত্যে ইঁদুর নিয়ে দুটি শক্তিশালী গল্প লেখা হয়েছে একটি সোমেন চন্দ লিখেছেন, অন্যটি হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদের এই গল্পে মুসলমান সমাজের প্রতি হাস্যরসের ভেতর দিয়ে যে বক্রোক্তি সেটার সঙ্গে শুধু আবুল মনসুর আহমদের গল্প তুল্য। সোমেন দ্বারা হুমায়ূন প্রভাবিত ছিলেন আমরা জানি। কিন্তু সোমেন ইঁদুরকে দেখিয়েছেন বুর্জোয়াদের প্রতীক হিসেবে, এখানে হুমায়ূন উল্টো ইঁদুরকে সমাজের যারা প্রভু তাদের হাতের খেলনা হিসেবে দেখিয়েছেন।

একইভাবে ‘চোর’ গল্পটিও আর সাধারণ গল্প হয়ে থাকেনি। একটি চোর ধরা পড়েছে। গ্রাম্য সালিসে রায় হয়েছে তার চোখ তুলে নওয়া হবে। তা-ও আবার খেজুরের কাঁটা দিয়ে। গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছে চোখ উপড়ে নেওয়ার দৃশ্যটি দেখবে বলে। মতি ভাবে, এত এত মানুষের মধ্যে নিশ্চয় কেউ দয়া দেখিয়ে বাধা দেবে। কিন্তু দেখা যায় উল্টো চিত্রশিক্ষিত, অশিক্ষিত, নারী-পুরুষ সবাই অপেক্ষা করছে চোখ তোলার দৃশ্যটি দেখবে বলে।’’ (মোজাফ্ফর হোসেন : কালের কন্ঠ)।

গ.
পাঠ বিশ্লেষণে দেখা যায় হুমায়ুন আহমেদের প্রায় সব উপন্যাসে নায়ক-নায়িকা মনো-জটিলতার শিকার। সে কারণে তাদের আচার আচরণও অস্বাভাবিক ভবঘুরে। এই চিত্র কী বাংলাদেশের মতো অদম্য সাহস আর সংগ্রামের সাথে মানানসই? প্রায় চরিত্রকে দেখা যায় নির্লিপ্ত, নিরাসক্ত, আবেগহীন চরিত্র। যা শুধু বইতে মানায়, বাস্তবে না। সে তুলনায় রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র মনে হয় না। কখনো অনেক বেশি জীবন্ত, কখনো অনেক বেশী মানবিক যা চলমান সমাজে অধরা! গল্পে উপন্যাসে নানামাত্রিক দ্বন্দ্ব ও বিন্যাস নিয়ে বিকশিত বিষয়ে হুমায়ূন আহমেদ নিজেও অবশ্য সন্দিহান ছিলেন একসময় তার উপন্যাসগুলো প্রকৃত অর্থেই উপন্যাস কিনা! যাক সে আলোচনা অন্যদিন।

হুমায়ূনের লেখা প্রসঙ্গে সমালোচকদের সব সময়েই স্পষ্ট কথা ছিলো সমাজ সচেতনতা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং লেখকের সামাজিক দায়বদ্ধতার দৃষ্টি নিয়ে। সাথে যুক্ত হয় তিনি সমাজ সচেতন লেখক ননÑ এমন অভিযোগ। মধ্যবিত্তের ভাষা নিয়ে ভাবলেও কিন্তু মধ্যবিত্তের সংগ্রাম হাহাকার সাহিত্যে আরও প্রতিফলিত হতে পারতো বলে আমিও মনে করি। অধিকাংশ সৃষ্ট চরিত্রের মধ্যে সংগ্রাম মুখরতা খুব একটা নেই, নেই জীবন নিয়ে চ্যালেঞ্জ। অদম্য সাহসে স্বপ্নকে জয় করার নেই প্রত্যায়। হয়তো একা একা অনেক ভাবে নয়তো রাস্তায় ভবঘুরে। প্রেমের ক্ষেত্রেও খুব মার্জিনে। আবেগ সংযত রেখে চলন বলন যা প্রেম দুনিয়ায় বেমানান!

হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ‘ফাউন্টেনপেন’ আত্মজীবনীমূলক রচনায় জবাব দিয়ে গেছেন : বদরুদ্দিন ওমর একবার সমকাল পত্রিকার সেকেন্ড এডিটরিয়াল লিখেন। উনি বলেছেন আপনার লেখায় শিক্ষামূলক কিছু নেই।এটা তো উনি ঠিকই বলেছেন। আমি পাঠ্যবই লিখি না। আমার বই শিক্ষামূলক হবে কেন? জীবনে একটাই পাঠ্যবই লিখেছিলাম ‘কোয়ান্টাম রসায়ন’। সম্ভবত উনার চোখ এড়িয়ে গেছে।এখন শিক্ষা বিষয়ে বলি। অতি বিচিত্র কারণে বাংলাদেশের মানুষ সবকিছুতেই শিক্ষা খোঁজে। গল্প-উপন্যাসে শিক্ষা, নাটক-সিনেমায় শিক্ষা। একসময় ঈদের প্রচারিত হাসির নাটকের শুরুতে আমি লিখে দিতাম, ‘এই নাটকে শিক্ষামূলক কিছু নেই।

এমনি রসিক মানুষ ছিলেন হুমায়ূন। কোনো সঙ্কটেই তার আক্ষেপও ছিলো না। কারণ তিনি মূলত সারাজীবনই মধ্যবিত্তের কথক হিসেবে লিখে গেছেন একের পর এক, কিন্তু রাষ্ট্র, সমাজ এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যক্তি মানবের যে সম্পর্কে সেটাকে মোটামুটি এড়িয়েই গেছেন। আগেই বলেছিলাম লেখার নিয়ে তার একটা অহংকারী কিংবা স্বাতন্ত্র্যভাবনায় সারাজীবন আপন আলোয় কাটিয়ে দিয়েছেন!

প্রাসঙ্গিক কিছু পাঠকের সাথে কথা বলি কী ভাবনায় তারা কেন হুমায়ুন পড়েন? অধিকাংশ পাঠকের মত প্রায় এমন ১. মনো চিত্তের প্রশান্তির জন্য পড়ি ২. পড়তে বসলে নেশা হয়ে যায়, আঠা যেমন আটকে রাখে তেমন। ৩. নিজেকে দেখি বর্ণনায় সুতরাং একবার পাঠ শুরু করলে পাঠ শেষ না করেই ওঠা যায় না। ৪. গল্পে কথক বা চরিত্রে নিজেকে মনে হয়, এতে অসাধারন অনুভূতি ভালো লাড়ে। ৫. জানা বোঝা মনের আকাঙ্ক্ষা মোটামুটি মিটে যায় মজার গল্পে গল্পে।

অন্যদিকে এই বিষয়ে তাঁর সমসাময়িক লেখক ও সমালোচকদেরও ছিলো ভিন্ন দৃষ্টি। সমালোচনার জায়গাটিকে দুটি আঙ্গিকে দেখা যায়, এক পক্ষের সমালোচকেরা হুমায়ূন আহমেদকে লেখালেখির জগতের কিংবদন্তী কিংবা দেবতা হিসেবে দেখে। দ্বিতীয়পক্ষ লেখাকে সস্তা, অপাঠ্য এবং কোন ক্ষেত্রে ‘অপন্যাস’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। তবে ঠিকঠাক তাঁর সাহিত্যের বিশ্লেষণ এখন অব্ধি হয়নি বলে অনেকের দাবী। আশা করা যায় আগামী দিনে তার সাহিত্যকর্মের যথাযথ নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হবে। মুক্তিযোদ্ধের চেতনা জাগরণে হুমায়ূনের ভূমিকাও।

উল্লেখ্য বাংলাসাহিত্যে বিশ শতকে শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় লেখাকে জীবিকা করার প্রথম উদাহরণ। একুশ শতকে তাঁর দোসর হয়ে আসেন হুমায়ূন আহমেদ; হয়েছেন সফল! রাজকীয় জীবন ও কীর্তিতে অর্থাৎ সব অর্থেই তিনি ছিলেন বাংলাদেশের একমাত্র মেগাস্টার! তাই কখনো নন্দিত, কখনো নিন্দিত। কখনো তিরস্কৃত, কখনো পুরস্কৃত। আবার কখনো মামলা, কারা নির্যাতনের ভয় দেখালেও হুমায়ূন আহমেদ স্বাধীনতার সমান বয়সী খ্যাতি নিয়ে লেখকের ‘জীবন’ সময়ের পরম্পরায় যাপন করেছেন জীবনানন্দে।

লেখক : কবি ও গবেষক; সভাপতি, জেনারেশন ফর বাংলাদেশ।

সময় জার্নাল/আরইউ/ইএইচ

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।