‘আড়িয়াল খাঁ-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত জনপদের রাজনীতি ও আ. লীগের উত্থান’ পর্ব-৩

প্রকাশিতঃ ১১:২৭ অপরাহ্ণ, শুক্র, ২৪ জুলাই ২০

আবদুল্লাহ আল জিয়াদ মূসা

১.
আমার নানি তখন বেঁচে আছেন। নানির কাছেই প্রায়ই শুনতাম নানা জনাব আলী ভূঁইয়াদের পূর্ব-পুরুষ পোড়াদিয়ার পশ্চিমে অবস্থিত গোবিন্দপুর এলাকা থেকে বিন্নাবাইদে এসে বসতি গেঁড়েছিলেন। পোড়াদিয়া থেকে লক্ষীপুর-বড়চারা পর্যন্ত পুরোটাই একসময় ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় অবস্থিত ছিল। পলি জমে জমে ব্রহ্মপুত্র কালের পরিক্রমায় সরে যায় পূর্বদিকে; ভাওয়াল-টোক থেকে বয়ে আসা আড়িয়াল খাঁ নদী বাঁয়ে ব্রহ্মপুত্রকে রেখে কটিয়াদির আগে চরমান্দালিয়া-বড়চাপা-পোড়াদিয়া হয়ে আবার বেলাব বাজারের আগে ফরিদপুর ব্রীজঘাটের কাছে ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হয়েছে। পশ্চিম তীর থেকে সরে যাওয়া ব্রহ্মপুত্রের পূর্বতীর আর আড়িয়াল খাঁ নদীর পশ্চিম তীর পুরোটাই ছিল খানা-খন্দ আর ‘বাইদে’ ভরপুর। বাইদ মানে জলাভূমি থেকে কিছুটা উঁচু স্থলভূমি। এই বাইদের পাড়ে পাড়ে ছিল ‘ভেন্না’ গাছে ভর্তি; অনুমান করি তা থেকেই ‘বিন্নাবাইদ’র নামকরণ।

নানিজানের আমাদের পূর্বপুরুষদের কথা–অতীত জন্ম ইতিহাসের কথাগুলো স্মৃতিচারণের সময় আম্মাকেও বেশ খুঁশি খুঁশি দেখতাম। এর কারণ হয়ত, উনাদের পূর্ব-পুরুষরা বিন্নাবাইদ গ্রামের গোড়াপত্তন করেছেন, মনে হয় এই গর্ববোধ করতেন। তবে এ কথা ঠিক যে, ব্রহ্মপুত্র নদ আর আড়িয়াল খাঁ নদীর মাঝখানে পড়ে বিন্নাবাইদ ইউনিয়ন একটা দ্বীপের আঁকার নিয়েছে—চারিদিকে জল আর জল। কটিয়াদী বাজারের দক্ষিণতীর অবস্থিত এই ইউনিয়ন মেরাতলী গ্রাম পার হয়ে পূর্বে আওয়ালীকান্দা পর্যন্ত সীমারেখায় দ্বীপাকার এই ভূমিতে আজ থেকে ২/৩’শ বছর আগে আদি বাসিন্দারা অন্য কোথাও না কোথাও থেকে এসে বসতি গেঁড়েছে। বিন্নাবাইদ গ্রামের একেবারে পূর্ব-দিকে চর বাঘবেরের ‘নয় কান্দা‘তেও এমন কয়েকটি পরিবার আছে, যাঁদের পূর্ব-পুরুষ মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে এখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন। দীঘলদীকান্দা গ্রামের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আবেদ ভাইদের যেমন চার পুরুষ আগের কথা পর্যন্তই জানা যায়।

যাইহোক, বিন্নাবাইদে আমার নানার পূর্বপুরুষ টঙ্গীরটেক গোবিন্দপুর থেকে বিন্নাবাইদ এসে বসতি গেড়েছেন—এ কথা নানির মাধ্যমে আমি জেনেছি। আমি নিশ্চিত না, তবে মুরুব্বিদের দেয়া তথ্য মতে, টঙ্গীরটেক গ্রামে বাবুর বাড়ি বলে একটা বাড়ি ছিল তা প্রায় ৬/৭’শ বছর পুরনো–এর কোন স্মৃতি চিহ্ন এখন নেই। তবে বাবুর বাড়ি না থাকলেও এই জনশ্রুতির সাথে আমি একটি অপূর্ব মিল খুঁজে পাই এই এলাকায় অবস্থিত হযরত শাহ্ ইরান (রাঃ) এর মাজারের ব্যাপারে। ইসলামের আবিভার্বের আগে বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের মত আমাদের এলাকাও তখন সনাতন ধর্মের অনুসারী ছিল বেশি। কিংবদন্তী আছে। তিনি সিলেটের হযরত শাহজালাল (রাঃ) এর ৩৬০ আউলিয়া দলের একজন।

শাহ ইরানির মাজার শরিফ

ধারণা করা হয়, এই এলাকায় আগমনের সময় তাঁর বয়স প্রায় ৪০ এর ঊর্ধ্ব ছিল। অন্য একটি ভাষ্য মতে, সিলেট বিজয়ের পর হযরত শাহজালাল (রাঃ) এর নির্দেশে শাহ ইরান লাল মাটির এই অঞ্চলের অত্যাচারী রাজা বিজয় মিশ্র ও অসম রাজার রাজ্যে আগমন করেন। সুদর্শনও সুমিষ্টভাষী এই যুবরাজ সকল কিছু জয় করে বর্তমান স্থানে ‘দরগাহ-ই শরীফ’ স্থাপন করেন। তাঁর মৃত্যুর সঠিক তথ্য আজও পাওয়া যায়নি, তবে তিনি নিঃসন্তান ছিলেন এবং স্থানীয় রাজকুমারীকে বা কোন জমিদার কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন বলে মতান্তর রয়েছে। তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচার আরম্ভ করলে আশেপাশের অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক হাবিবা খাতুনের সাথে আত্মীয়তা সূত্রে এক আলোচনা পর্বে তিনি আমাকে বলেছিলেন, সুটূরিয়ায় রাস্তার পাশের মসজিদ সংলগ্ন স্থান থেকে তিনি যে নিদর্শন পেয়েছিলেন তাতে ‘কসবা’ নদী পারাপারের নদীঘাটের সিলমোহর পেয়েছেন। যাতে প্রমাণ করে যে, সুটুরিয়া সংলগ্ন ‘কসবা’ গ্রামটির পাশে এক সময় ‘কসবা’ নামে নদী ছিল। আড়িয়াল খাঁ হয়ে কসবা নদী দিয়ে শাহ-ই ইরান এই এলাকায় নৌ-পথে এসে থাকতে পারেন।

২.
ছোটবেলা থেকেই বোহেমিয়ানদের মত অজানাকে জানার, অদেখাকে দেখার আমার ছিল অসীম স্পৃহা। সময় ও সুযোগ পেলেই আশেপাশের এলাকায় ঘুরতে বেরিয়ে পড়তাম। আমার কৈশোরে সুনীলের ১০১টা নীল পদ্ম খোঁজার মত প্রায়ই সাইকেলে পুরো এলাকায় দুই-তিনজন সমবয়সী মিলে টহল দিয়ে ফিরতাম।

উয়ারী-বটেশ্বর গ্রাম আমার নানাবাড়ির গ্রাম থেকে বেশি দূরে না হলেও ঘণ অরণ্যে ঘেরা হওয়ায় লোকজনের যাতায়াত সেদিকে তেমন ছিল না। বিন্নাবাইদ অঞ্চল যেহেতু নদীর চরাঞ্চলে অবস্থিত সেহেতু ভৌগোলিকভাবে এখানকার মাটির সাথে উয়ারী-বটেশ্বর এলাকার ভূমি গঠনে বেশ পার্থক্য ছিল বৈকি। আমাদের এলাকার মাটি বেলে দোআঁশ—নরম-কোমল—বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে খালি পায়ে হাঁটা যায়। অন্যদিকে নদীর ওপারের অঞ্চলের মাটি ছিল ক্ষুদ্র পাথর-কাঙ্কর মিশ্রিত লাল রঙের—শক্ত কিন্তু ঝুরঝুরে। ফলে সাইকেলে চলাচল ছিল কম পরিশ্রমে। এই এলাকায় মহিষ এবং গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল সবচেয়ে বেশি।

জাহাঙ্গীর ভাইজান ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক মুহম্মদ হাবিবুল্লাহ পাঠান

যাইহোক, কিশোর বয়সে যখন এলোপাথাড়ি ঘুরতাম তখন দেখতাম উয়ারী-বটেশ্বর গ্রামের মুহম্মদ হানিফ পাঠান এলাকার লোকজনের কাছ থেকে নানা রঙ বেরঙের পুঁতি, পাথর, মুদ্রা সংগ্রহ করে নিজের মাটির তৈরী বাংলো ঘরের সংগ্রহশালায় স্বযতনে রাখছেন। আমার চাচাতো ভাই জাহাঙ্গীর ভাইজানেরও স্কুলজীবন থেকে শখ ছিল পুরনো আমলের মুদ্রা, স্ট্যাম্প, প্রত্নতাত্ত্বিক বিভিন্ন নিদর্শন সংগ্রহ করার প্রতি। জাহাঙ্গীর ভাইজান কোন কোন সময় নিজে আবার কখনওবা বুলবুল ভাইজানকে পাঠিয়ে ওয়ারী-বটেশ্বরের লোকজনদের কাছ থেকে টাকা দিয়ে কিনে প্রত্নসামগ্রী নিজের সংগ্রহে রাখতেন। বর্তমানে তিনি সপরিবারে নিউইয়র্ক প্রবাসী। এ বছর ফেব্রুয়ারীতে (২০২০) জাহাঙ্গীর ভাইজান দেশে বেড়াতে আসলে তিনি উয়ারী-বটেশ্বর থেকে সংগ্রহ করা কিছু পাথর দিয়ে তৈরি মালা এবং প্রত্নসামগ্রী পাঠান বাড়ির ব্যক্তিগত জাদুঘরে সংরক্ষণের জন্য হাবিবুল্লাহ পাঠানের কাছে হস্তান্তর করেন ।

একান্ত আলাপচারিতায় মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ পাঠান বলেন, কত স্মৃতি আছে এ প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন সংগ্রহের; তবে উল্লেখযোগ্য ছিল ১৯৩৩ সালের দিকে উয়ারীতে শ্রমিকরা মাটি খননকালে একটি কলসী ভর্তি জমানো কিছু মুদ্রা পান। তখন উনার বাবা হানিফ পাঠান শ্রমিকদের কাছ থেকে ২৫-৩০টি মুদ্রা সংগ্রহ করে রাখেন। এগুলো ছিল বঙ্গভারতের প্রাচীনতম মুদ্রা, পরে গবেষণায় জানা যায়। তৎকালীন সময়ে উনার দেয়া তথ্য মতে, সাপ্তাহিক মোহাম্মদী পত্রিকাতে ‘প্রাচীন মুদ্রা প্রাপ্তি’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়। জনাব হানিফ পাঠান ইন্তেকালের আগে উয়ারী-বটেশ্বরের নিদর্শনসমূহ সম্পর্কে তাঁর পুত্রদের সচেতন করে যান। পরে মুহম্মদ হাবিবুল্লাহ পাঠান বাবার উৎসাহ ও চেতনায় এই এলাকায় প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রী সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ অব্যাহত রাখেন। ১৯৫৫ সালে হাবিবুল্লাহ পাঠান দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পূর্ব-পাকিস্তানে প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন।

তিনি আমাকে সেই একান্ত আলাপচারিতায় বলেছিলেন, ‘একসময় একা একা আমার পক্ষে কাজটি করা দুরূহ হয়ে পড়ে; কৃষকেরা প্রতিদিন কোথাও না কোথাও মাটি খুঁড়ছে, ঘর-গেরস্থালির কাজ করছে এবং কেউ না কেউ কোন না কোন নিদর্শন পাচ্ছে। ফলে আমি স্থানীয় ছেলে-মেয়েদের প্রাচীন প্রত্নসামগ্রী কুঁড়িয়ে দেয়ার বিনিময়ে সামান্য কিছু পঁয়সা দিতে থাকলাম; ওরা আনন্দের সাথে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ করতে থাকলে উয়ারী-বটেশ্বর এলাকার অনাবিষ্কৃত বিভিন্ন প্রত্নসামগ্রী ওদের সহযোগিতায় আমাদের পাঠান বাড়ির ব্যক্তিগত জাদুঘরে সংরক্ষিত হতে থাকে। ২০০০ সালে খনন কাজ আরম্ভ হবার আগেই উদ্ধার হয় দুর্লভ কিছু প্রত্নতত্ত্ব। উনাদের সংগ্রহশালায় দেখেছি, এমনকিছু দূর্লভ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আছে–যা বঙ্গ-ভারতের আর কোথাও নেই।

১৯৩০এর দশক থেকে বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া ও নমুনা সংগ্রহে এবং পত্র পত্রিকায় নিবন্ধ ও সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকদের কাছে উয়ারী বটেশ্বর গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। এমনই প্রেক্ষাপটে, ২০০০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান ‘ঐতিহ্য অন্বেষা’র পক্ষে তৎকালীন প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান বেলাব উপজেলার কৃতি সন্তান ক্যাপ্টেন ইমাম আনোয়ার হোসেনের প্রাথমিক অনুদান দুই লক্ষ টাকায় উয়ারী-বটেশ্বরে আনুষ্ঠানিক খনন কাজ আরম্ভ করেন। সম্ভবত ২০০২ সালে উয়ারি-বটেশ্বরে খনন কাজ চলছে শুনে, সরেজমিন দেখতে যাই। ঐদিন ড. সুফি মোস্তাফিজের সাথে আমার প্রথম দেখা হয়।

তিনি খুবই ব্যস্ত ছিলেন, একই সাথে তিনটি গ্রুপের কাজ তদারকি করছিলেন। একটি গ্রুপে শিক্ষার্থীরা শ্রমিকদের নিয়ে খনন কাজ করছে , অন্য আরেকটি গ্রুপ সদ্য মাটির নিচে একটা সুন্দর সাঁজানো গোছানো বসত ঘরের সন্ধান পেয়েছেন, তার ঝাড় মোছ করছে। তৃতীয় গ্রুপে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত নিদর্শনসমূহের ছবি উন্মুক্ত প্রান্তরে সর্বসাধারণের প্রদর্শনীর জন্য গ্যালারী করে সাঁজাচ্ছেন। তিনটি গ্রুপের কাজই সমানভাবে তদারকি করছেন সুফি সাহেব। উনার সাথে কথা বলে পরিচিত হলাম। উনাকে সাথে নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখলাম খনন এলাকা। উনি বলছিলেন, ‘এ সভ্যতা আড়াই হাজার বছরেরও পুরনো সভ্যতা। এমনও হতে পারে, এ সভ্যতা আরও পুরনো।’ আমিও যেন উনার আলাপের সাথে সাথে চলছিলাম এক স্বপ্নের ঘোরে। এখানে একদিন নগরী ছিল, দুর্গ ছিল। ভাবতেই গাঁ টা ছম ছম করে ওঠে। কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে উঠল এ প্রত্নতত্ত্বের পথ প্রদর্শক মোহাম্মদ হানিফ পাঠান ও উনার ছেলে মুহম্মদ হাবিবুল্লাহ পাঠানের প্রতি।

প্রফেসর ড. সুফি মোস্তাফিজ বলছিলেন, ‘উয়ারী-বটেশ্বর ছিল একটি সমৃদ্ধ, সুপরিকল্পিত, প্রাচীন বাণিজ্য নগরী। গ্রীক ভূগোলবিদ টলেমী তাঁর বই ‘জিওগ্রাফিয়াতে’ হয়ত এই নগরীর কথাই উল্লেখ করেছিলেন। ‘ড. সুফি মোস্তাফিজকে জিজ্ঞেস করলাম, এ সভ্যতা যে আড়াই হাজার বছরের পুরনো তা কীভাবে নিরূপণ করা হবে বা নিশ্চিত হওয়া যাবে? উনি বললেন, আমেরিকা, নিউজিল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসে প্রত্নতত্ত্বের উন্নত ল্যাবরেটরি আছে। সেসব ল্যাবরেটরিতে কার্বন-১৪ পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা জানতে পারব ও নিশ্চিত হতে পারব এ সভ্যতা কত পুরনো। উনি আরও বললেন, ইতিমধ্যে ২০০০ সালে আবিষ্কৃত কিছু প্রত্ননিদর্শন ঐসব ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। এর মাধ্যমে জেনেছিলাম, উয়ারী-বতেশ্বরের বসতি খ্রীষ্টের জন্মেরও ৪৫০ থেকে ৬০০ বছর আগের।

প্রত্নতত্ত্ব গবেষকদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দে গঙ্গা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল দিয়ে যেন গরায়ন প্রক্রিয়া হয়েছিল, উয়ারী-বটেশ্বর সে প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠা একটি শহর। প্রাচীন যে দুর্গনগরীটি আবিষ্কৃত হয়েছে, এর প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে অসম রাজার গড় ব্যবহৃত হত। অসম রাজার কিছু মিথ আজও মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়।

উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলের অসম রাজার রাজত্বের অনেক শতাব্দী পর; মধ্যযুগে এদেশে ইসলাম আসার আগে আরেকজন রাজার কথা জানা যায়। পোড়াদিয়ার চন্ডিপাড়ায় চন্ডী রাজার বসতি ছিল বলে এলাকায় জনশ্রুতি আছে। কথিত আছে, ব্রাহ্মণের গাঁওয়ে ব্রাহ্মণদের বসতি, কৃষ্ণপুরে কৃষ্ণের অনুসারীগন বসতি ছিল। বলা হয়ে থাকে আর্যদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে অনার্যরা বিতাড়িতহয়ে বেলাব-মনোহরদীর এই অঞ্চলে এসে আশ্রয় নেয়। ফলে, আড়িয়াল খাঁ নদ বিধৌত অঞ্চলের প্রাচীন সংস্কৃতি গড়ে ওঠে মূলত রাম, শ্রীকৃষ্ণ, বৈদিক ধর্মভিত্তিক এবং বর্ণ প্রথার অনুসারে। যার কিছু নমুনা আমরা পাটুলীর কুমারপাড়া, কুমারপাড়া ইত্যাদি শ্রেণী-পেশার মানুষের মাধ্যমে পৃথক পৃথক গ্রাম গড়ে ওঠতে দেখি। তাছাড়া এই এলাকায় হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের ভিন্নতা অনুযায়ী কৃষ্ণপুর, ব্রাহ্মণের গাঁ ইত্যাদি নামের গ্রাম সেই অনেক কাল আগে থেকে হয়ত এসেছে।

যায়হোক, পরবর্তীতে শাহ ইরান (রাঃ) এর মাধ্যমে এখানে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটে। অনেক পরে বার ভূঁইয়া এবং ব্রিটিশ আমলে জৈনপুরের কেরামত আলী ও হাজী শরিয়ত উল্লাহর মাধ্যমে এই এলাকায় মুসলিম পুর্ণ জাগরণের সংস্কৃতি চালু হয়।

আমাদের বয়সীদের স্পষ্ট মনে থাকার কথা, চন্ডিপাড়া রাস্তায় চলাফেরায় পাথরের ছোট কাঙ্করের জন্য খালি পায়ে হাঁটতে অসুবিধা হত। পায়ের তলায় হঠাৎ হঠাৎ কাঙ্কর লেগে ব্যথা পাওয়া যেত। আমাদের শৈশব কৈশোরে স্যান্ডেল বা জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটার প্রচলণ ছিল না। কোন কাজে চন্ডিপাড়া গেলে খালি পায়ে খুব সাবধানে হাঁটতে হত। পোড়াদিয়া সংলগ্ন লাল মাটির অন্য এলাকায় চন্ডিপাড়ার মত এত কাঙ্কর দেখা যায় না। এতে আমার বদ্ধমূল ধারণা হয়, চণ্ডীপাড়ায় প্রাচীন কোন নগরী বা দুর্গ নগরী বা রাজমহল অতীতে হয়তো ছিল—যা আজ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। চন্ডিপাড়ায় চণ্ডীরাজার কথা ইতিহাসে বিভিন্নভাবে আসলেও এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। আজ পর্যন্ত চণ্ডীরাজার ইতিহাস নিয়ে ব্যাপকভাবে কোন গবেষণা হয়নি বলেই মনে হয়।

৩.
পূর্বেই উল্লেখ করেছি, আড়িয়াল খাঁ বিধৌত বেলাব-মনোহরদী অঞ্চলে সেই প্রাচীনকাল থেকে অনেক সম্ভ্রান্ত হিন্দু ধর্মের পরিবারে বসবাস ছিল এবং এখনও আছে। তন্মধ্যে, ভাবলা গ্রামের বাবুদের বাড়ির ইতিহাস আমাদের জনপদে মানুষের মুখে মুখে ফিরত। বাবুদের পূর্ব-পুরুষ দূর্গাচরণ চক্রবর্তী ১৮৪০/১৮৫০ সালের দিকে ভাওয়াল রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর নিকট থেকে বিশাল তালুকদারি কিনে নিয়েছিলেন। গাজীপুরের কাপাসিয়ায়, মনোহরদীতে, বেলাব উপজেলাতে ও অষ্টগ্রাম পর্যন্ত সমগ্র অঞ্চল জুড়ে ভাবলার বাবুদের এস্টেটের জমি ছিল। উনার ছোট ছেলে অন্নদা চরণ পাটুলি ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ভাবলার বাবুদের বাড়ি নিয়ে অনেক মিথ প্রচলিত আছে। যেমন: বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বৃটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনকারীরা তাঁদের অর্থ যোগানের জন্য বাবুর বাড়ি থেকে সোনা গয়না লুট করে নিয়ে যায়। ১৯৫০ সালের পরে বাবুদের বাড়িতে বেশ কয়েকবার ডাকাতি হয়। বাবুদের বাড়ির জৌলুশ-আভিজাত্যের কথা এক সময় মানুষের মুখে মুখে ফিরত, আমরা ছোটবেলায় অনেক শুনেছি।

৪.
আমার নানীর বাড়ির সামনেই ছিল চৌচালা ফ্যাশনেবল কাচারিঘর। এ কাচারিতে খাজনা নেয়া হত। আমার নানা “বলধা জমিদারের” কাছ থেকে তালুকদারি কিনে নিয়েছিলেন। আম্মার পূর্বপুরুষ ছিলেন ভুলন ভূঁইয়া; উনার ছেলে আমার নানা জনাব আলী ভূঁইয়া। উনাদের রায়ত ছিল চর ছায়েট, লতিফপুর। “বলধা জমিদারের” নামের স্মৃতি এখনও আছে, যেমন: ভাওয়ালের চর-জামালপুর খেয়াঘাটের নাম “বলধা” গুদারা ঘাট।

তখনকার সময়ে এই অঞ্চলে আরও কয়েকজন জমিদার ছিলেন; এঁদের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলেন: হাতিরদিয়া বিলাগীর সাদত আলী মিয়া, খিদিরপুরের মান্টু বাবু ,সাগরদীর কুন্জমনি। এছাড়া ঢাকার নবাব পরিবারের কাচারি ছিল সৈয়দের গাঁও আনোয়ার আলী মিয়ার বাড়িতে, নোয়াদিয়া ভুসাই মাহমুদের বাড়িতে। তন্মধ্যে হাতিরদিয়া বিলাগীর সাদত আলী মিয়ার ভাতিজা রাজিউদ্দীন মিয়ার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানরা তাদের ন্যায্য হিস্যার জন্য ইংরেজদের সাথে দেন দরবার করার জন্য একটি রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গের আন্দোলনকে ঘিরে ১৯০৬ সালে ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা ত্বরান্বিত হয় । মুসলিম রেনেসাঁ আন্দোলন , জমিদার ,তালুকদার ও অবস্থাপন্ন মুসলিম পরিবারে অধিকাংশ সদস্যরা নবগঠিত মুসলিম লীগে যোগদান করে। ফলে ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন পাশ হওয়ার পর ১৯৩৭ সালের বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ অভূতপূর্ব সাফল্য পায়। তখন মুখ্যমন্ত্রী শেরে-বাংলা এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগদান করলে মুসলিম লীগ জনপ্রিয় রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়; আর এর উপর ভিত্তি করে শেরে-বাংলা ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব পেশ করেন। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৬ সালে আবুল হাশেম-হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাংগঠনিক দক্ষতায় মুসলিম লীগ আবার বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৯৪৬ সালের সেই নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ আসনে আমাদের এলাকার সন্তান হাতিরদিয়ার রাজিউদ্দিন মিয়া এমএলএ নির্বাচিত হন।

এখানে দ্রষ্টব্য যে, উপমহাদেশের প্রথম বাঙালি মুসলিম মহিলা এমবিবিএস চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজী ছিলেন এমএলএ রাজিউদ্দীন মিয়ার সহধর্মিনী। তিনি প্রথম মহিলা চিকিৎসক হিসাবে “ভাইসরয়” পদক পেয়েছিলেন। দীর্ঘকাল মানবতার সেবায় নিঃস্বার্থ মানবসেবা ও কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ ডা. জোহরা কাজীকে ১৯৬৪ সালে তমঘা-ই-পাকিস্তান, ২০০২ সালে বেগম রোকেয়া পদক এবং ২০০৮ সালেএকুশে পদক প্রদান করা হয়।

ডা. জোহরা কাজী সাথে আমার কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি ছিলেন আমার সেঝ ভাবী মিসেস হেলেন জোহরা তাইফুর এর আপন চাচী; সেই সূত্রে সেঝ ভাবীর সাথে ঢাকায় উনার বাসায় যাবার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমরা যে ড্রইংরুমে বসতাম, উনি বলতেন, এই ড্রয়িংরুমেই পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথম সাংস্কৃতিক বৈঠক হয়। সাংস্কৃতিক আলাপ-আলোচনার পর ভাষার বিষয়টিও আলোচনা হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে উনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন ।

৫.
এডভোকেট ফজলুর রহমান ভূঁইয়া (১৯৭০ এ মনোহরদীর আওয়ামী লীগের এমএনএ) ছিলেন ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগঠন তমুদ্দিন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ‘তমুদ্দিন মজলিস’ নামটি সম্ভবত উনার দেয়া। ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্নে তরুণ ছাত্রনেতা এডভোকেট ফজলুর রহমান ভূঁইয়া মনোহরদী, চালাকচর, হাতিরদিয়াসহ নরসিংদীতে ব্যাপক সফর করেন। তিনি সমমনালোকদের ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত করেন।

ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে ১৯৪৮ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য নরসিংদীতে সাংগঠনিক সফরে আসেন এবং নরসিংদীর মোসলেহ উদ্দিন ভূঁইয়া মিছিল মিটিং ও সভা সমাবেশ আয়োজন করেন বলে জানা যায়।

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার পথিকৃত মোহাম্মদ হানিফ পাঠান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৫১ সালে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের ‘উর্দুর পক্ষে পঞ্চাশ পয়েন্ট’ পুস্তিকার প্রতিবাদে তিনি‘বায়ান্নর পান্ডুলিপির বাংলা বনাম উর্দু রাষ্ট্রভাষার বিতর্ক’ নামে একটি বই লেখেন।

৬.
পঞ্চাশের দশকে আমাদের এলাকায় প্রগতিশীল রাজনীতিক ছিলেন আবদুর রহমান মাস্টার (বিপ্লবী রহমানমাস্টার)। উনার সতীর্থ আরো কয়েকজন ছিলেন যাঁরা মনোহরদী-রায়পুরা অঞ্চলে প্রগতিশীল রাজনীতির প্রভাব বিস্তারে বেশ ভূমিকা রেখেছিলেন। যেমন: মনোহরদীর হাররদিয়ার সিরাজুল হক বা কৃষক নেতা সিরাজ ভাই, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ। সিরাজ ভাই ছিলেন আমার সেঝ তাইফুর ভাইয়ের খুব অন্তরঙ্গ বন্ধুস্থানীয়; সেই সুবাদে তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন।

সিরাজ ভাইদের বাড়ি বিপ্লবী রহমান মাস্টার তৎকালীন অলি-আহাদপন্থী যুবলীগ গঠন এবং ভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক কাজের কেন্দ্র স্বরূপ ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে, চালাকচর-পিরপুরের ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ মাস্টারের বাড়ি ছিল উনার সাংগঠনিক কাজ করার আরেকটি কেন্দ্র। বিপ্লবী রহমান মাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা ইস্তফা দিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে আসলে সাংগঠনিক কাজে তিনি শুধুমাত্র রায়পুরা উত্তরাঞ্চলে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। পোড়াদিয়া স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় তিনি মনোহরদী থানার পাটুলি পোড়াদিয়া অঞ্চলে ও পশ্চিম -উত্তরাঞ্চলে যুবলীগ ও ভাষা আন্দোলনকে সংগঠিত করেন। রহমান মাস্টারের সতীর্থ ফয়েজ মাস্টারের হাত ধরে মনোহরদীর উত্তরাঞ্চলে সংগঠনের কাজ গতি পায়।

একটি বিষয় খুব গভীর লক্ষণীয়, বিপ্লবী রহমান মাস্টার যেন পরশ পাথর, রহমান মাস্টারের কর্ম পরিধি বুঝতে হলে সমকালীন রাজনীতিও বুঝতে হবে, ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হলে কোন বিভক্তি ছিল না। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল ছাত্ররা ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্থান ছাত্র ইউনিয়ন গঠন করে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত কোন বিভক্তি ছিল না। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী মুসলিমলীগের কাগমারী সন্মেলনে স্যান্টো – সিয়াটো চুক্তির প্রশ্নে মাওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দ্বিমতে আওয়ামী মুসলিম লীগ বিভক্ত হলে ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে মাওলানা ভাসানী ন্যাপ গঠন করেন। ন্যাপেও তখন বিভক্তি ছিল না। একই বছর ডিসেম্বরে মাওলানা ভাসানী কৃষক সমিতি গঠন করেন। কৃষক সমিতিতেও তখন বিভক্তি ছিল না। কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যারা জড়িত ছিলেন সকলেই কৃষক সমিতি, ন্যাপ ও যুবলীগের ব্যানারে কাজ করত। রহমান মাস্টার শুধু রায়পুরা অঞ্চলের নেতা ছিলেন না। মনোহরদীর যারা পরবর্তীতে ভাসানী গ্রুপ করত তাদেরও নেতা ছিলেন রহমান মাস্টার। রায়পুরা উত্তরাঞ্চলে যারা রহমান মাস্টারের সতীর্থ ও অনুগামী ছিলেন শুধু তাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছেন তিনি। উনার মৃত্যাবধি ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ছাত্র ইউনিয়ন, যুবলীগ,ন্যাপ ও কৃষক সমিতিতে কোন বিভক্তি ছিল না। ফলে মনোহরদীতেও উনার ভাবশিষ্যদের আমরা দেখতে পাই। তিনি যেখানেই গেছেন উনার সতীর্থ এবং অনুগামীরা পেশা এবং কর্মে উনার পথকেই বেছে নিয়েছেন। চালাকচরে ফয়েজ মাস্টার, হাররদিয়ার সিরাজ মাস্টার, মুগা পোড়াদিয়ার শহীদুল্লাহ মাস্টার ( শহীদুল্লাহ ভূঁইয়া প্রধান শিক্ষক) এবং পরবর্তীতে আবদুর রশিদ তারা মাস্টার প্রমুখ।

বলতে গেলে সাবেক মনোহরদী থানার বৃহৎ অঞ্চলে জমিদার জোতদার তালুকদার পরিবারের বলতে গেলে হাত গোনা কয়েকজন বাদ দিয়ে বলতে গেলে প্রায় সকলেই মুসলিম লীগ রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সাথে মুসলিম শব্দটি থাকায় অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার ছাত্র সমাজ তারা অলি আহাদ-হক-তোয়াহার যুবলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন এবং প্রগতিশীল চিন্তার লোক জন ন্যাপ ও কৃষক সমিতিতে জড়িত ছিলেন।

হাতিরদিয়া সৈয়দপুর গ্রামের আমার দুলাভাই. হাবিবুর রহমান বলেন, উনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র তখন ; বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি বলেছেন ২৩ ফেব্রুয়ারী হাতিরদিয়া সাদত আলী ইংরেজি স্কুলে হরতাল পালিত হয়। ২৮ শে ফেব্রুয়ারী আমার আরেক দুলাভাই হাররদিয়া গ্রামের ডা.মোজাফফর হোসেনের সভাপতিত্বে হাতিরদিয়া বাজারে ৫২’র ভাষা শহীদদের স্মরণে বিশাল সমাবেশ হয়। মনোহরদীতে হাররদিয়ার সিরাজুল হক, পিরপুরের জহিরুল হক, ফয়েজ আহমেদ; বীর আহম্মদপুর গ্রামের আবদুল জব্বার প্রমুখ ছিলেন যুবলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী।

‘৫২এর ভাষা আন্দোলনসহ পরবর্তী আওয়ামী মুসলিম লীগের ফজলুর রহমান ভূঁইয়া সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়া তরুণ নেতৃত্বে ছিল মো. আবদুলমজিদ ( এডভোকেট, মাননীয় শিল্পমন্ত্রী মহোদয়ের পিতা ), মো. শহিদুল্লাহ ভূঁইয়া (এডভোকেট, এমপি ), মো. কমরউদ্দিন সরকার , আব্দুস শহিদ (প্রিন্সিপ্যাল), অধ্যাপক হাবিবা খাতুন, রিয়াজুদ্দিন মোল্লা, আশরাফ হোসেন খান প্রমূখ।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিক্তিতে পাকিস্থান নামক রাষ্ট্রের জন্ম হলে এর বড় অংশীদার পূর্ব বঙ্গের অংশের জনগনের আশা ভঙ্গ হতে সময় লাগলো না। প্রথম ধাক্কাই আসলো রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্নে। যদিও রাষ্ট্রভাষা কি হবে এনিয়ে ১৯৩৭সালে মুসলিম লীগের সন্মেলনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দু হবে রাষ্ট্রভাষা এপ্রস্তাব তুললে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এর তীব্র প্রতিবাদ করেন।

এদিকে পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৭ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় আসেন৷ ২১ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘোষণা দেন “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা”। উপস্থিত ছাত্র জনতা এর প্রতিবাদ জানায়। এরপর ২৪ মার্চ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে একই ঘোষণা দিলে ছাত্ররা তার উক্তির চরম প্রতিবাদ জানায়।

তাই বলা যায়, বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত একটা প্রস্ততি পর্ব ১৯৫১ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব বাংলায় সংগঠিত একটি সাংস্কৃতিকও রাজনৈতিক আন্দোলন। পূর্ব বাংলার মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলা ভাষাকে ঘিরে সৃষ্ট এ আন্দোলনের মাধ্যমে তদানীন্তন পাকিস্তান অধিরাজ্যে পূর্ব বাংলায় অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণদাবীর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এ আন্দোলন চূড়ান্তরূপ ধারণ করে। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে এপার বাংলার মানুষেরা মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। ভাষা আন্দোলন সার্বিক রুপ পরিগ্রহ করলে সচেতন ছাত্রজনতা ঐক্যবদ্ধভাবে এই আন্দোলনে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সচেতন শ্রেনীর জন্ম দেয়। যার বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখি একটি নতুন সংবিধান ওনির্বাচনের দাবিতে পূর্ব-বাংলার মানুষের ঐক্যবদ্ধ হতে।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনের ঢেউ সাবেক মনোহরদী থানাকেও প্লাবিত করেছিল; এর মূলে ছিলেন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য রাজিউদ্দীন মিয়া ও অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজী। তাঁদের সমসায়িককালে একঝাঁক তরুণ নেতৃত্ব দেখা যায় এই এলাকায়। তাঁরা চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে তরুণ নেতা এবং পরবর্তী দশকগুলোতে দেখা যাবে রাজনীতির ময়দানে বিভিন্নভাবে ভূমিকা রাখছেন। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হলেন, গোতাশিয়ার এডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, বিন্নাবাইদের এডভোকেট মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ ভুঁইয়া, তারাকান্দির এডভোকেট ফজলুর রহমান ভূঁইয়া, পীরপুরের এডভোকেট কাজীজহুরুল হক, চালাকচরের ফয়েজ আহমেদ মাস্টার, বীর আহম্মদপুরের প্রিন্সিপাল আবদুস শহীদ, রামপুরের মো. কমরউদ্দিন সরকার, সৈদের গাঁয়ের রিয়াজ উদ্দিন মোল্লা, ডাক্তার হাবিবুর রহমান প্রমুখ।

৭.
রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের ঢামাঢোলের মধ্যে ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সরকার সংবিধান প্রণয়নের জন্য ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে আইন সভার সাধারন নির্বাচন ঘোষণা করে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পূর্ব-বাংলার মানুষ যুক্তফ্রন্টের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়। বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে যুক্তফ্রন্টের হয়ে কাজ করে। মনোহরদী-শিবপুর-রায়পুরা থেকে যুক্তফ্রন্টের মনোনয়ন পায় তরুণ নেতা মনোহরদী বিন্নাবাইদের এডভোকেট মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ ভূঁইয়া। যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ এর নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর চৌধুরী খালিকুজ্জামান মন্ত্রীসভা গঠনের জন্য শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে আহ্বান জানান। পাকিস্তান সরকার এ মন্ত্রী সভায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগেকে অন্তর্ভুক্ত না করলে একটা সংকট তৈরি হয়। এ মন্ত্রীসভা ভেঙে আতাউররহমান খানের নেতৃত্বে ১৯৫৬ সালে আবার মন্ত্রীসভা গঠন করেন। তখনকার তরুণ ছাত্রনেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুররহমান সেই মন্ত্রীসভায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। পশ্চিম পাকিস্তানীদের কারণে এই মন্ত্রীসভায়ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি।

পূর্ব-বাংলার রাজনীতিতে কাগমারি সম্মেলন একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। টাঙ্গাইল জেলার কাগমারিতে ১৯৫৭ সালের ৬-১০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন ও সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি কাউন্সিল অধিবেশনে মূল আলোচ্যসূচী ছিল পূর্ব-পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন এবং জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু সিয়াটো ও সেন্টোর সামরিক চুক্তিরপ্রতিআওয়ামী লীগ নেতা ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করলে সম্মেলনে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রণ্ট নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোর একুশ দফা প্রতিশ্রুতির অন্যতম ছিল জোট নিরপেক্ষ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। সোহরাওয়ার্দীর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বক্তব্য আওয়ামী লীগের বামপন্থি নেতৃবৃন্দ সমর্থনকরেননি। এঁদের পুরোধা ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি (সম্মেলনেরও সভাপতি) মওলানাআবদুল হামিদ খান ভাসানী। আওয়ামী লীগের আইনসভার সদস্য ও নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে কাউন্সিল অধিবেশনে মওলানা ভাসানী সোহরাওয়ার্দীর অনুসৃত সামরিক জোটের সমালোচনা করেন। ওই ভাষণে মওলানা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। সোহরাওয়ার্দী সামরিক জোটের পক্ষে যুক্তিপ্রদর্শন করেন। তিনি পাকিস্তান স্বাক্ষরিত সামরিক চুক্তি এবং কেন্দ্র কর্তৃক পূর্ব-পাকিস্তানে আরোপিত অর্থনৈতিক নীতিমালার পক্ষেও রায় দেন।

পূর্ব-বাংলার রাজনীতির বিভাজন মূলত এখান থেকেই শুরু হয়। যার প্রভাব আমাদের আড়িয়াল খাঁ-ব্রহ্মপুত্র নদ বিধৌত জনপদকেও প্রভাবিত করে। (চলবে)

লেখক : সমাজসেবক

সময় জার্নাল/রায়হান তন্ময়

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।