‘আড়িয়াল খাঁ-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত জনপদের রাজনীতি ও আ. লীগের উত্থান’ পর্ব-৪

প্রকাশিতঃ ৯:৩৯ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ১৩ আগস্ট ২০

আবদুল্লাহ আল জিয়াদ মূসা 

কৈশোরের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে আমার খালাত বোনের শ্বশুরবাড়ি শিবপুরের ধানুয়া গ্রামের রিকাবদার বাড়ির সাথে। ভোর বেলায় দলবেঁধে হাঁটতে হাঁটতে শিউলী ফুল কুঁড়াতে চলে যেতাম প্রতিবেশী শহীদ আসাদের বাড়ি। শিউলি ঝরে পড়ার মত হৃদয়ে অব্যক্ত বেদনা নিয়ে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক বাংলার স্বপ্ন নিয়ে পুলিশের গুলিতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে ধানুয়া গ্রামে শুয়ে আছে পাকিস্তানি শোষণের হাত থেকে পূর্ব বাংলার মানুষের মুক্তির ঝাণ্ডা উড়িয়ে ছাত্র জনতার মাঝে আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে দেয়ার অন্যতম কারিগর শহীদ আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।

এখানে, ধানুয়া গ্রামে, ঊনসত্তরে গনঅভ্যুত্থানের আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দেয়া সন্তানের কবরের পানে ঝাপসা চোখে স্মৃতির মিনারে কি ছবি আঁকেন তাহের মৌলভী? এমন প্রশ্ন মনের কোণায় উঁকি দিয়ে উনার সৌম্য চেহারার দিকে তাকিয়ে আবার চিন্তাগুলো বুঁদবুঁদের মত হারিয়ে যেত। বলছি, শহীদ আসাদের বাবা মৌলভী আবু তাহের বিএ, বিটি আমাদের জনপদের একজন আলোকিত মানুষের কথা। উনাকে দেখেছি শিক্ষক জীবনে উনার আলোর আভায় গড়ে তোলেছেন অনেক আলোকিত মানুষ। তিনি আমাদের জনপদকে রাজনীতি শিক্ষা সংস্কৃতিতে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রসর ভূমিকা রেখেছেন। তিনি রাজনীতিতে ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের অনুসারী।

বৃটিশ ভারতে ইংরেজদের উপনিবেশী শাসনের শেষ দিকে দ্রুত দৃশ্যপট বদলাতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, বাংলায় অর্থনৈতিক ফসল ধান পাট কম উৎপাদন এবং ১৯৩০ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মহামন্দার ধাক্কা বৃটিশদের শাসনাধীন পুর্ববঙ্গের কৃষকদের জীবনকেও প্রভাবিত করে। কৃষিপণ্য উৎপাদনে মন্দা দেখা দিলে জমিদারদের খাজনা প্রদানে কৃষকদের হিমশিম খেতে হয়। জমিদারদের খাজনা প্রদানের জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে কৃষকদের মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়। আবার ফসল উৎপাদনের জন্য মহাজনদের কাছে দাদনও নিতে হয়। ফলে ঋণে জর্জরিত কৃষকদের মাঝে জমিদারদের প্রতি ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়।

খাজনা দেয়ার অপারগতায় জমিদার-কৃষকদ্বন্দ্ব দেখা দেয়। কোন কোন ক্ষেত্রে জমিদারদের অত্যাচারে কৃষকদের বিক্ষোভ বিদ্রোহ দেখা দেয়। ইংরেজ শাসন ব্যবস্থায় এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে খাজনা নিয়ে জমিদার কৃষকের সকল বিরোধ মিটানোর জন্য বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। এ বিধিমালার আলোকে ১৯৩৬ সালে ঋণ সালিশবোর্ড গঠন করা হয়। শেরে এ বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯৩৭ সালে মূখ্যমন্ত্রী হলে ঋণ সালিশী বোর্ড কার্যকর ভূমিকা পালন করে ও গতিশীল হয়। শহীদ আসাদের বাবা মৌলভী আবু তাহের বিএ, বিটি আমাদের এলাকা থেকে ঋণ সালিশী বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি অত্র এলাকার ঋণে জর্জরিত কৃষকদের জমিদার মহাজনদের অত্যাচার থেকে বাঁচাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করেন।

আমার সমবয়সীদের হ্রদয়ের টান আর দুলাভাই বোনের আদর শিবপুর ধানুয়া গ্রামের রিকাবদার বাড়ি আমাকে গভীরভাবে টানত। স্কুলের এক লম্বা ছুটিতে আমার খালাত ভাই আর আমি প্রায় এক মাস ছিলাম। আমাদের সমবয়সী পুরো বাহিনীর কাজ ছিল দুইবেলা আশে পাশের এলাকা টহল দেয়া। ইতিহাসের অলিগলিতে ঘুরে দেখেছি, চক্রধা ইউনিয়নের আশ্রাফপুরে পুরনো আমলের একটি দৃষ্টি নন্দন একটি মসজিদ আবিষ্কৃত হয়েছে। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে জেনেছি এ মসজিদ ১৫০০ শতাব্দীর সমসাময়িক কালের। দৃষ্টি নন্দন এ মসজিদ নির্মিত হয় ঈসা খাঁর পূর্ব পুরুষ গৌড়ের স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র নসরত শাহের রাজত্বকালে। ১৫০০ শতাব্দীতে নির্মিত এটি একটি অতি সুপ্রাচীন মসজিদ।

এই আশ্রফপুরে আবিস্কৃত হয়েছে খড়গ রাজাদের তৃতীয় পুরুষ সপ্তম শতাব্দীর মহারাজা দেব খড়গের তাম্রলিপি এবং অষ্টধাতুর নির্মিত বৌদ্ধ নিবেদন স্ত্তপ যা শিবপুরের অতীত ঐতিহ্য বহন করে।

আমাদের স্কুল কলেজ জীবনের ‘বিন্নাবাইদ রয়েল স্পোর্টিং ক্লাব’ স্কুল কলেজ জীবনে আমাদের ফুটবল টীমের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল শিবপুরের জয়নগর ইউনিয়নের আগানগর-কামরাব ফুটবল টীম। বিশেষ করে গোতাশিয়া ও পোড়াদিয়া স্কুল মাঠে ফুটবল ফাইনাল টুর্নামেন্টে তাদের সাথে দেখা হওয়া ছিল অবধারিত। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে ফুটবলার হিসেবে তাদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। কোন টুর্নামেন্টে আমাদের প্রয়োজনে অথবা তাদের প্রয়োজনে আমরা একে অপরের টীমে খেলতাম। সে সূত্রে উভয় টীমের খেলোয়াড়দের প্রায়ই যাওয়া আসা হত। সেখানকার মানুষজনের কাছে জানতে পারি কামরাব ধুপিরটেক গ্রামে একটি পদ্ম মন্দির আছে যা ২৫০০ হাজার বছর আগের বৌদ্ধদের পদ্ম মন্দির নামে খ্যাত। পরবর্তী সময়ে প্রত্নতাত্ত্বিকদের অভিমত অনুযায়ী জানা যায়, আবিষ্কৃত এই বৌদ্ধ পদ্ম মন্দিরটির স্থাপত্যিক বৈশিষ্টে ও রাজাদেব খড়গের স্বাক্ষ অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায় এ বৌদ্ম পদ্ম মন্দির ৭ম শতকের।

কথিত আছে অত্র অঞ্চলে, খড়গ রাজাদের শাসন আমল ছিল ৬০০-৭০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। খড়গ রাজাদের ৫জন রাজা ছিলেন। তাদের মধ্যে : (১) রাজা খড়োগাদ্যাম, (২) মহারাজা জাতখড়গ, (৩) মহারাজা দেব খড়গ এ তিন রাজা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।

পরবর্তী দুই জন যথাক্রমে (৪) রাজা রাজভ্রট্ট ও (৫) রাজা বলভ্রট্ট এই দুই রাজা ছিলেন শৈব হিন্দু। শৈব হিন্দুদের দেবতা শিব। রাজার ধর্মঅর্চনায় এই এলাকা শিবপূজার কেন্দ্রবিন্দু ছিল বলে এ এলাকার নাম হয়েছে শিবপুর।

এছাড়া সম্প্রতি যোশর ইউনিয়নের টঙ্গিরটেক নামক স্থানে প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রচুর নিদর্শন আবিস্কারের পর্যায়ে খনন কাজ চলছে। জানখারটেক এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক প্রাচীন নিদর্শন আবিস্কারের পর্যায়ে রয়েছে। জয়মঙ্গল পাহাড়ী গ্রামে আবিস্কৃত হয়েছে গুপ্তযুগের স্বর্ণমুদ্রা। প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা নদী হাড়িদোয়ার পশ্চিম তীরে অবস্থিত কুমারটেক এলাকার প্রায় ১০/১২ হাত মাটির নিচ থেকে প্রাচীন মৃৎপাত্র, ভগ্নটুকরা এবং মাটির তৈরি ছোট ছোট গোলা পাওয়া গেছে। কথিত আছে, এগুলো খ্রিস্টপূর্ব হাজার হাজার অব্দের সময়কালের মৃৎপাত্র এবং শিকারীদের ব্যবহার উপযোগী গোলা।

ইতিহাস ঐতিহ্যে অগ্রসর শিবপুর অঞ্চলে মহারাজা দেব খড়গের শাসনামলের যে সকল প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে তার সকলই সপ্তম শতকের। পরবর্তী খড়গ রাজা রাজভ্রট্র ও বলভ্রট্র শিব পূজারি ছিলেন এবং তা খুব সম্ভবত ইতিহাসের মাৎস্যন্যায়ের যোগের সময়। ইতিহাসে ‘ মাৎস্যন্যায় ‘ যুগের ৭০০ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১০৫০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত দালিলিক কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। যার ফলে আমাদের জনপদের ও কোন দালিলিক বা কোন স্মৃতি চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়না।

পরবর্তী গৌড় বঙ্গের স্বাধীন সুলতানি শাসনামলের স্মৃতি চিহ্ন এ জনপদে বিদ্যমান। মোঘলদের শাসনামলে রাজস্ব আদায়ের বিধিব্যবস্থা থাকলেও মূলত বাংলার এ ভাটি অঞ্চলে বার ভূঁইয়াদের অধীনেই ছিল। এ জনপদে মোঘলদের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা খুব কার্যকর ছিল না। রাজধানী সোনারগাঁ এবং কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি দুর্গ থেকে ঈসা খাঁর শাসনাধীন আমাদের জনপদে ইংরেজ শাসনের শেষদিকে জমিদারদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর অবস্থাপন্ন কৃষকদের জাগরণে এ জনপদের মানুষের নতুন মেরুকরণ হতে থাকে। দেশপ্রেমিক জনতা ইংরেজদের হাত থেকে জন্মভূমিকে মুক্ত করার জন্য রাজনীতি শিক্ষা দীক্ষায় এগিয়ে আসে। সারা ভারতবর্ষের চিত্র থেকে বাংলার চিত্র ছিল অনেক অগ্রসর। প্রশাসনিক কিংবা শাসনতান্ত্রিক আন্দোলনে নয় সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে বৃটিশদের হাত থেকে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য স্বদেশী আন্দোলন তরুণ যুবকদের মাঝে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ঢাকা কেন্দ্রিক অনুশীলন দল ও যুগান্তর দলের নেতা কর্মীদের গোপন কর্মকাণ্ডের চারণভুমিতে পরিণত হয় পাহাড়ি অঞ্চল। বিপ্লবী সতিশ পাকড়াশিসহ অনেক নেতা-কর্মী নতুন নিযুক্ত বিপ্লবীদের প্রশিক্ষণের জন্য দুর্গম অঞ্চল বেছে নেয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেসের আত্মপ্রকাশে গান্ধিবাদী রাজনীতির সাথেও অনেক যুবক সম্পৃক্ত হয়।

কৈশোরে পারিবারিক ও সেঝো তাইফুর ভাইয়ের রাজনৈতিক সুত্রতায় এবং তৎপরবর্তীকালে আমার শ্বশুর ডা. সামসুজ্জামান ভূঁইয়ার (দুদু ডাক্তার) সুবাদে শিবপুরের তোফাজ্জল কাকার (মো. তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার , শিবপুর) সাথে আমার শখ্যতা দীর্ঘদিনের। উনার সাথে রাজনৈতিক কথোপকথনে অতীত বর্তমান সামাজিক রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি।

উনার কাছ থেকে যা জেনেছি, স্বদেশী আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন ধানুয়া গ্রামের খান সাহেব ওয়াজেদ আলী খান। ওয়াজেদ আলী খান ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। উনি পরে জেলা বোর্ডের সদস্য হয়েছিলেন। এছাড়া কুমরাদি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবদুল আজিজ এমএলএ ছিলেন ১৮৩৬ সাল থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত। জয়মঙ্গলের শ্রীযুক্ত ফণীভূষণ চক্রবর্তী কলকাতা হাইকোর্টে ভারতবর্ষের প্রথম বাঙালী বিচারপতি ছিলেন। খড়িয়া গ্রামের কলিমউদ্দিন আহমেদ মুসলিম রাজনীতির সাথে জড়িত থেকে পাকিস্থান আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হন। পরে তিনি এমএনএ হয়েছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, শহীদ আসাদের মাতা মতিজাহান খাদিজা খাতুন বৃটিশ ভারতের যে কয়জন মুসলমান শিক্ষিত নারী ছিলেন তন্মধ্যে তিনি অন্যতম। তিনি ‘ইসলামিক এডুকেশন ট্রাষ্ট’ গঠন করে ১৯৩২ সালে নারায়ণগঞ্জে আইইটি গার্লস স্কুল স্থাপন করেন এবং তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। বৃটিশ ভারত মুসলিম লীগ রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন কারারচরের সুলতান উদ্দিন আহমেদ পরে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হয়েছিলেন। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্থান ‘ আন্দোলনে মুসলিম লীগ রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন সিদ্দিকুর রহমান খাঁ, মুসলেহউদ্দিন খাঁ, রফিক খন্দকার ও ইদ্রিস আলী মাস্টার, আফসারউদ্দিন ভূঁইয়া, সামসুজ্জামান ভূঁইয়া (দুদু ডাক্তার) ফজলুল হক মাস্টার (ফটিক মাস্টার) প্রমুখ। আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা হলে শিবপুরের রাজনীতিতে ইদ্রিস আলী মাস্টার (ন্যাপ নেতা এমপি কামাল হায়দারের বাবা), ফজলুল হক মাস্টারের (সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফটিক মাস্টার) হাত ধরে আওয়ামী লীগ রাজনীতি বিকশিত হয়।

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিক্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পরেই কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসেন। জিন্নাহ বলেন ‘ উর্দু এবং একমাত্র উর্দু ই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ‘। আইন পরিষদে ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত কঠোর ভাষায় এর প্রতিবাদ করেন এবং কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহর মুখের উপর ছাত্ররা ” না ” না ” ধ্বনিতে প্রতিবাদমুখর হয়। মাতৃভাষা বাংলার দাবীতে সারাদেশের মত শিবপুর ও প্রতিবাদ মিছিল হয়। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে শিবপুরের নবী রিকাবদার, ইদ্রিস মাস্টার , আবদুর রহমান মাস্টার ( বিপ্লবী রহমান মাস্টার তখন যশোর হাইস্কুলের শিক্ষক) সামসুল হক মোল্লা ( প্রধান শিক্ষক, লাখপুর হাই স্কুল) ফজলুল হক মাস্টার ( ফটিক মাস্টার) প্রমুখের নেতৃত্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে ভাষা আন্দোলনের সংগঠিত করতে থাকেন। বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের দাবীতে ছাত্ররা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিলে ফুঁসে উঠে শিবপুর। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাজার প্রতিবাদ মিছিল হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারী সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয় ২৫ ফেব্রুয়ারী সর্বাত্মক ধর্মঘট। কিন্তু নুরুল আমিন সরকারের কড়া নজরদারির কারণে ঢাকা শহরের কোথাও থেকে হরতাল সংক্রান্ত লিফলেট ব্যানার করতে না পারায় যুবলীগ যুগ্ন সম্পাদক মোঃ সুলতান ও কাজী আজিজুর রহমান নরসিংদী থেকে রায়পুরা থানা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান মাস্টারের সহযোগিতায় লিফলেট ব্যানার ছাপিয়ে নেন।

এছাড়া সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার ঐতিহাসিক সমাবেশ ও মিছিলে অংশগ্রহণ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (প্রাক্তন জগন্নাথ কলেজ) ছাত্র মো. নবিউল হক রিকাব্দার।

আবদুল গাফফার চৌধুরীর গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ এখন আমরা শুনি আলতাফ মাহমুদের সুরে। কিন্তু এ গানটি একুশে পদকপ্রাপ্ত শিবপুরের কৃতি সন্তান তৎকালীন ঢাকা কলেজের ভিপি মোহাম্মদ মাশির হোসেনের উদ্যোগে প্রথম গণসঙ্গীত শিল্পী আবদুল লতিফের সুরে ও কণ্ঠে প্রথম গাওয়া হয়েছিল। ফলে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন।

ঢাকায় অধ্যয়নরত শিবপুরের ছাত্রনেতাদের প্রভাবে এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ইদ্রিস খাঁ, মরজাল হাই স্কুলের শিক্ষক আবদূর রহমান মাস্টার (বিপ্লবী রহমান মাস্টার), লাখপুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক সামসুল হক মোল্লার সাংগঠনিক তৎপরতায় অত্র এলাকায় ভাষা আন্দোলনের আগুন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২৬ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি শিমুলিয়া বাজারে হরতাল পালিত হয় এবং ২৯ ফেব্রুয়ারি শিমুলিয়ায় বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৮ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি শিবপুর হাইস্কুলের ছাত্ররা ধর্মঘট পালন করে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও ছাত্রবন্দিদের মুক্তির দাবিতে শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত মিছিল শিবপুর প্রকম্পিত করে বিকাল নাগাদ এসে জমা হয় ধানুয়া ঈদগাহ মাঠে। বিশাল এ জনসভায় সভাপতিত্ব করেন মৌলভী মোহাম্মদ আলী। এ ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্কুল কলেজের ছাত্রদের মাঝে রাজনৈতিক চেতনা বোধের জন্ম দেয়। তৈরি হয় নতুন রাজনৈতিক প্রজন্ম। উঠে আসে , ভাসানী ন্যাপের আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, আওয়ামী লীগের রবিউল আলম খান কিরন, মজনু মৃধা, তাজুল ইসলাম খান ঝিনুক, আবদুল মান্নান খাঁন, হারুন অর রশিদ খানসহ অনেক তরুণ নেতৃত্ব, যারা স্থানীয় এবং জাতীয়ভাবে রাজনীতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন।

পঞ্চম পর্বে পুরাতন ব্রম্মপুত্র ও আড়িয়াল খাঁ নদীর মিলন স্থানে দেওয়ানী আমলের অন্যতম নদী বন্দর বেলাব বাজারের আঞ্চলিক হাব হয়ে উঠার ইতিহাস বিধৃত হবে। (চলবে)

লেখক : সমাজসেবক

সময় জার্নাল/রায়হান তন্ময়

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।