ইশিবাশির অদম্য যাত্রা

প্রকাশিতঃ ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ, শনি, ৪ জুলাই ২০

শাফিনুর রহমান :


জুনকো ইশিবাশি-কে আমরা কমবেশি সবাই চিনি। ফুকুশিমা থেকে উঠে আসা এই তরুণী তার ক্ষ্যাপাটে কাজকর্মের জন্য জাপানে মোটামুটি পরিচিত ছিলেন আগে থেকেই; সত্তরের দশকের মাঝামাঝি এসে সমস্ত পৃথিবীই তাকে চিনে নেয়। বিশ্বপরিচিতি পাবার পথে তার দীর্ঘ যাত্রায় আমরা ছোট পরিসরে একটা চক্কর কেটে আসি।

ইশিবাশি তার কৈশোরে শারীরিক গঠনের দিক থেকে বেশ দুর্বল ছিলেন। প্রতিযোগিতামূলক যেকোনো খেলাধুলায় তার সমবয়সী আর সব ছেলেমেয়েদের তুলনায় তাকে বেশ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া লাগত। মাত্র দশ বছর বয়সে স্কুল থেকে একজন শিক্ষকের উদ্যোগে নিজের শহরের মাউন্ট নাসু আরোহণ করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন যে পর্বতারোহণের এই খেলায় পরিশ্রম হলেও প্রতিযোগিতার মানসিক চাপ নেই। সবসময় জিততে হবে —এই মনস্তাত্ত্বিক ভার থেকে মুক্তির কারণেই সম্ভবত পরবর্তী জীবনে পর্বতারোহণ হয়ে ওঠে ইশিবাশির সবচে প্রিয় শখ, নেশা, পেশা। পারিবারিক দারিদ্রের কারণে অবশ্য স্কুলে যাওয়ার সেই দিনগুলোয় আর খুব বেশি শখ পূরণ হয়নি।

হাইস্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ইশিবাশি টোকিও চলে এলেন। শোয়া উইম্যান’স ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি আর মার্কিন সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করলেন। ষাটের দশকে জাপানের রাজধানীতে মফস্বল থেকে উঠে আসা একজন তরুণীর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা খুবই দুর্লভ ব্যাপার ছিল। তার সাথে আর যত মেয়ে ছিল তাদের প্রায় সবাই শহুরে পরিবেশে বেড়ে উঠেছে। ইশিবাশি তার কথার আঞ্চলিক টান নিয়ে খুবই অস্বস্তি বোধ করতেন। সুতরাং বন্ধুবান্ধবের সাথে আড্ডা না দিয়ে দূর-দূরান্তের সব পাহাড় আর পর্বতে চড়ে তার অবসর দিনগুলো কেটে যেত। অল্প কিছুদিনের মাঝেই মাউন্ট ফুজি সহ জাপানের মোটামুটি সব বিখ্যাত পর্বত চষে ফেললেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি শেষ করে যোগ দিলেন শিক্ষকতায়। পাশাপাশি যোগ দিলেন ছোট ছোট বেশ কয়েকটি ক্লাইম্বিং ক্লাবে। সেসব ক্লাবে তিনি বাদে আর সব সদস্য ছিল পুরুষ।

আধুনিক জাপানকে আমরা যা দেখি আজ থেকে অর্ধ শতাব্দী আগে ব্যাপারটা ঠিক তেমন ছিল না। মধ্য কুড়ির একটি মেয়ের পর্বতারোহণকে অনেক পুরুষই খুব সুনজরে দেখলেন না। তাদের ধারণা ছিল ইশিবাশি ক্লাবে যোগ দিয়েছেন মূলত কোনো সুদর্শন আর সুযোগ্য পুরুষকে বিয়ে করবার জন্য। অনেকেই প্রকাশ্যে একজন নারীর সাথে কোনো অভিযানে বের হতে আপত্তি জানাতেন। স্বাভাবিক ভাবেই ইশিবাশি এমন পরিস্থিতিতে বেশ বিব্রত বোধ করতেন।

ভাগ্যের পরিহাসের কারণেই সম্ভবত একবার দুর্গম মাউন্ট তানিগাওয়ায় চড়বার সময় তিনি আরেক পর্বতারোহী মাসানোবুর প্রেমে পড়লেন। মাসানোবুর পড়াশোনা খুব বেশিদূর ছিল না বলে এই সম্পর্কে মায়ের আপত্তি ছিল। তা সত্ত্বেও সাতাশ বছর বয়সে ইশিবাশি গাঁটছড়া বাঁধলেন মাসানোবু তাবেই-এর সাথেই; তার নাম হয়ে গেল জুনকো তাবেই।

১৯৬৯ এ এসে তিনি গড়ে তুললেন ‘জোসি তোজান কোরাবু’ —শুধুমাত্র নারীদের জন্য মাউন্টেইনিয়ারিং ক্লাব। ক্লাবের নীতিটা ছিল দীর্ঘদিন পুরুষদের ক্লাবে তিনি যে বৈরি মানসিকতার সম্মুখীন হয়েছেন তার প্রতি এক চরম চপেটাঘাত —Let’s go on an overseas expedition by ourselves. অবশ্য কাজটা বলার চেয়ে করা কঠিন ছিল। জাপানের নারীদের জন্য তখনও ওভাবে কাজের পরিবেশ গড়ে ওঠে নি। ইশিবাশি নিজে হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। আরও অন্যান্য নানা পেশার কর্মজীবী নারীদের নিয়ে গড়ে তোলা এই ব্যতিক্রম ক্লাবটির কপালে স্পন্সরশিপের চেয়ে সমালোচনাটাই জুটত বেশি। সুতরাং হিমালয়ে যাবার দীর্ঘকালের সুপ্ত বাসনাকে সত্য করার জন্য ইশিবাশিকে শিক্ষকতার পাশাপাশি আরও কিছু কাজ শুরু করতে হল। তিনি মাসিক Journal of the Physical Society of Japanএর জন্য সম্পাদকীয়ের কলাম লিখতে শুরু করলেন। পাশাপাশি বাচ্চাদেরকে পিয়ানো আর ইংরেজি শিখিয়ে কিছু বাড়তি রোজগার হচ্ছিল। এছাড়াও তখনকার সময়ে কোনো ক্লাবের পক্ষ থেকে হিমালয়ে যাবার জন্য আগে ক্লাবটিকে জাপান মাউন্টেইনিয়ারিং এসোসিয়েশন -এর সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলকছিল। ইশিবাশির ক্লাবের আবেদন প্রথম দফায় অজানা কোনো কারণে ফিরিয়ে দেয়া হল। এদিক থেকেও বেশ কাঠখড় পোড়ান চলছিল।

অবশেষে, এক বছর বাদে, ১৯৭০ এর মাঝামাঝিতে ইশিবাশি তার দল নিয়ে নেপাল গেলেন, উদ্দেশ্য ছিল অন্নপূর্ণার তৃতীয় চূড়াটায় পা রাখা। সেটি ছিল বিশ্বের প্রথম নারী দল, শেরপা বাদে আর সব সদস্যই ছিলেন নারী। সম্পূর্ণ নতুন একটা পথ ধরে মে মাসের ১৯ তারিখ যে দুজন নারী অভিযাত্রী অন্নপূর্ণার তৃতীয় চূড়ায় পা রেখেছিলেন তাদের একজন ছিলেন ইশিবাশি। অপরজন ছিলেন হিরোকো হিরাকাওয়া, তাদের সাথে ছিলেন দুজন শেরপা। আবহাওয়া ছিল খুবই প্রতিকূল। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় তাদের সাথে থাকা ক্যামেরার ফিল্ম ফেটে যাবার কারণে বহুকালের লালিত স্বপ্ন পূরণের কোনো স্মৃতি ইশিবাশি তার সাথে করে নিয়ে আসতে পারেন নি। অন্নপূর্ণার সেই অভিযান ইশিবাশিকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল। জাপানের কৃষ্টি মোতাবেক নীরবতার শক্তিকে ছাপিয়ে পর্বতারোহণের জন্য যে সামষ্টিক সাহায্যটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা তিনি সেই প্রতিকূলতাকে জয় করবার সময়ে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছিলেন।

জাপান ফিরে এসেই জোসি তোজান ক্লাবের পক্ষ থেকে তিনি আবেদন করলেন এভারেস্ট অভিযানের জন্য। প্রথম নারী হিসেবে পৃথিবীর তৃতীয় মেরুতে পা রাখবেন তেমন পরিকল্পনা ইশিবাশির ছিল না। মজার ব্যাপার হল, আট হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতার আরো বেশ কয়েকটি শৃঙ্গ যাচাই করে সব দিক বিবেচনায় এটিকেই তাদের সবচে বেশি নিরাপদ মনে হয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে নানা দিক থেকে আপত্তি আসতে শুরু করল —কেবল নারীদের নিয়ে গড়ে তোলা কোনো দলের পক্ষে এভারেস্ট জয় করা সম্ভব না, ইত্যাদি। পত্র-পত্রিকায় বেশ ঠাট্টা করা হচ্ছিল দলটির সদস্যদের উদ্দেশ্য করে। তখনকার সময়ে এভারেস্টে উঠবার অনুমতি অত সহজে মিলত না। নেপাল সরকার প্রতি বছর প্রতিটি ট্র্যাকে কেবল একটি দলের জন্যই পারমিট ইস্যু করত। নানা রকম জটিলতায় পারমিট পেতে দেরি হতে শুরু করল। সত্তরের শেষের দিকে এসে যে আবেদন করা হয়েছিল তা হাতে এসে পৌঁছুল পঁচাত্তরের শুরুর দিকে; প্রায় পাঁচ বছর পর। একদিক দিয়ে শাপে বর হয়েই এলো এই বিলম্ব। প্রায় চৌদ্দশ দিন ধরে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিকল্পনা তৈরি করা হল। ফান্ডিং এর সঙ্কট ছিল সেই শুরু থেকেই। এরই মাঝে ইশিবাশির কোল জুড়ে এল ফুটফুটে এক কন্যাসন্তান —নোরিকো তাবেই। আবার ১৯৭৩ সালে আরব বিশ্বের তেল অবরোধের জন্য অর্থনীতিও কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ায় অন্নপূর্ণার সাফল্যের কারণে যতটা স্পন্সরশিপ পাওয়ার আশা ছিল তাও মাঠে মারা গেল। এসব কিছু সত্ত্বেও হন্যে হয়ে অর্থায়নের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরলেন ইশিবাশি। অথচ তাকে শুনতে হল খুব নির্মম কিছু কথা —নারীদের কাজ হলো ঘরে থাকা, সন্তান লালন পালন করা; পাহাড়ে পর্বতে ঘুরে বেড়ান নয়।

অতএব, আবারও আগের মতন একাই পথ চলতে শুরু করলেন ইশিবাশি। ‘জাপানিজ উইম্যান’স এভারেস্ট এক্সপেডিশন’ব্যানারে ক্লাবের যে পনের জন নারী নিয়ে দল গঠন করা হয়েছিল তারা প্রত্যেকে নিজেদের পেশাগত গণ্ডির বাইরে গিয়ে বাড়তি রোজগার শুরু করলেন। ইশিবাশির পিয়ানোর ক্লাস চলছিল। অন্যরাও যার যার সাধ্যমতন চেষ্টা করছিলেন। খরচ বাঁচাবার জন্য পুরনো গাড়ির সীটের চামড়া আর কাপড় ব্যবহার করে পানিরোধক ব্যাগ আর গ্লাভস তৈরি করা হল, প্যান্টের কাপড় এল পুরনো পর্দা মাপমতন কেটে নিয়ে। চীন থেকে হাঁসের পালক কিনে এনে নিজেরাই স্লীপিং ব্যাগ তৈরি করলেন। স্কুলের বাচ্চারা তাদের শিক্ষকদের সাহায্য করলেন টিফিনের সময় বেঁচে যাওয়া জ্যাম আর জেলির প্যাকেট যোগান দিয়ে। একজন সদস্যের বাবা তাদের বংশানুক্রমে চলে আসা চালের কল বিক্রি করে দিলেন শুধু মেয়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য। একেবারে শেষ মুহূর্তে ইয়োমিয়ুরি শিমবান পত্রিকা আর নিপ্পন টেলিভিশন তাদের অভিযানে অর্থায়ন করতে রাজি হল। তা সত্ত্বেও দলের প্রত্যেক সদস্যকে এই অভিযানে নিজেদের গাঁট থেকেই প্রায় পনের লক্ষ ইয়েন খরচ করতে হয়। সে আমলে একজন সাধারণ কর্মজীবী নারীর জন্য অর্থের অঙ্কটা নিতান্ত কম নয়।

অবশেষে ১৯৭৫ এর বসন্তে আকাঙ্ক্ষিত যাত্রা শুরু হয়। দলের নেত্রী ছিলেন একচল্লিশ বছর বয়সী নারী ইকো হিসানো। তার ডেপুটি ইশিবাশির বয়স তখন প্রায় ছত্রিশ। পনের জনের দলে এই দুজন তখন মা। ইশিবাশি তার তিন বছর বয়সী আদরের নোরিকোকে মাসানোবুর কোলে রেখে এসেছেন পৃথিবীর চূড়ায় উঠবেন বলে। তাদের জন্য যে শেরপার দল বরাদ্দ করা হল তারা নানা কারণেই অনভিজ্ঞ।

জুনকো ইশিবাশি আর তার দল এভারেস্টে উঠবার জন্যে বেছে নিয়েছিলেন দক্ষিণ দিকের চেনা পথ, যে পথে বাইশ বছর আগে হিলারি আর তেনজিং প্রথম আরোহণ করেছিলেন। মে মাসের ৪ তারিখ মধ্যরাতে দুই নাম্বার ক্যাম্পে অবস্থানের সময় প্রায় ৬৩০০ মিটার উচ্চতায় অসম সাহসী এই দল এক বিপজ্জনক ধ্বসের সম্মুখীন হলেন। ইশিবাশি সহ পাঁচজন যে তাঁবুতে ঘুমাচ্ছিলেন সেটি বরফ আর তুষারের নিচে চাপা পড়ে গেল। বাকি চারজনের নিচে চাপা পড়ে জ্ঞান হারাবার আগে ইশিবাশির চিন্তা ছিল একটিই —পত্রিকায় তাদের সাফল্যের পরিবর্তে দুর্ঘটনার খবর ছাপানো হবে! সৌভাগ্যক্রমে শেরপারা সময়মত তাদের উদ্ধার করতে পারেন। কেউ মারা না গেলেও ইশিবাশি সহ সাতজন অভিযাত্রী আর ছয়জন শেরপা আহত হন, অভিযান প্রায় তিনদিনের জন্য থমকে যায়। বেসক্যাম্প থেকে ইকো হিসানো তাদের ফিরে যাবার পরামর্শ দিলেও ইশিবাশির জেদের কাছে হার মানতে বাধ্য হন।

প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল জুনকো ইশিবাশি এবং ইয়ুরিকো ওয়াতানাবে —এই দুজন আং শেরিং শেরপাকে নিয়ে এভারেস্ট সামিট করবেন।কিন্তু সামিটের ঠিক আগের দিনে ছয় নাম্বার ক্যাম্পে পৌঁছে দেখা গেল অর্ধেক শেরপাই উচ্চতার কারণে অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে। তিন জনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন তারা নিয়েই আসেন নি। যতগুলো অক্সিজেন সিলিন্ডার আছে তা দিয়ে কোনো রকমে দুজন উপরে যেতে পারবে। ইশিবাশি আর ওয়াতানাবের মাঝে কে যাবে তা নিয়ে দ্বিধা দেখা গেল। দুজনই অপরজনের জন্য ছাড় দিতে রাজি। শেষতক নিচ থেকে ইকো হিসানো ইশিবাশিকেই নির্বাচন করলেন।

চূড়ায় পৌঁছাবার একটু আগে ইশিবাশি লক্ষ্য করলেন নেপাল আর চীনের সীমান্ত রেখা বরাবর একেবারে ছুরির ফলার মতন সরু বরফে ঢাকা পথ পার হতে হবে। একটু এদিক সেদিক হলেই হয় পাঁচ হাজার মিটার নিচে চীন সীমান্তের দিকে অথবা প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মিটার নিচে নেপাল সীমান্তের দিকে চলে যাবেন। চট করে তার মাথায় রাগ চড়ে গেল। এত এত অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ আর্টিকেল পড়েছেন পূর্বের অভিযাত্রীদের, অথচ কারোর বর্ণনায়ই এই বিপদজনক অংশের কথা উঠে আসে নি। আকস্মিক এই অজানা ঝুঁকির জন্য তিনি একদমই প্রস্তুত ছিলেন না। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে সেই অংশটুকু পার হবার ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলোকে জীবনের সবচে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পা টিপে টিপে কোনোরকম সেই অংশ পার হলেন তিনি।

তারপর, দ্বিতীয় ক্যাম্পে ধ্বসের বিপর্যয় নেমে আসার ঠিক বারোদিন বাদে, ১৬ মে, ১৯৭৫,মধ্যদুপুরে জুনকো ইশিবাশি বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখলেন। তার আগে মাত্র ৩৫ জন মানুষ এই দুর্লভ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতে পা রেখে তার প্রথম চিন্তা ছিল বেশ মজার; তার ভাষায়, “Oh! I don’t have to climb anymore.”এ যাত্রায় আর ক্যামেরা বিশ্বাসঘাতকতা করে নি। ইশিবাশি এবং আং শেরিং শেরপা দুজনেরই স্মৃতিময় ছবি পাওয়া যায়।

বিশ্বের জন্য এ ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়। অবিশ্বাস্য এবং অভাবনীয় এই সাফল্য প্রাথমিকভাবে অতটাও সাড়া ফেলতে পারে নি। পরদিন, ১৭ মে, ১৯৭৫ নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার প্রথম পাতার নিচের দিকে এক কোণায় ছোট্ট করে প্রতিবেদন ছাপানো হয় —”A Woman Reaches Top of Mt. Everest”

এভারেস্ট থেকে ফিরে আসবার পর অবশ্য পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সেই গল্পটা আমরা সবাই জানি। যে নারীদল কখনোই এভারেস্টে উঠতে পারবে না বলে তিরস্কার করা হয়েছিল, তারাই রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠলেন। চার ফিট নয় ইঞ্চি উচ্চতার ছোটোখাটো গড়ণের যে মেয়েটিকে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়েছে নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য, পরবর্তী দুই মাস ঘরে ফেরার আগে তাকে নানা সম্মাননা গ্রহণের জন্য সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। বিশ্ব জুড়ে তরুণী ইশিবাশি তখন এক নামে পরিচিত —জুনকোতাবেই।

ইশিবাশির যাত্রা অবশ্য সেখানেই থেমে যায় নি। পরবর্তী সতের বছরে তিনি সাত মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়াগুলোয় পদচিহ্ন এঁকেছেন। ১৯৯২ সালে প্রথম নারী হিসেবে সেভেন সামিট জয় করেন। তার ইচ্ছে ছিল বিশ্বের সব দেশের সর্বোচ্চ বিন্দুগুলোয় পা রাখবেন। তা অবশ্য হয়ে উঠে নি। ছিয়াত্তরটি দেশ জয় করেছেন তিনি। ২০১২ এর ডিসেম্বরের ২৮ তারিখে কেওক্রাডং এর চূড়ায় আরোহণ করে গিয়েছেন। পরিবেশ রক্ষার জন্য অবদান রাখার উদ্দেশ্যে ষাটোর্ধ্ব বয়সেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরেছেন, স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন পরিবেশ বিজ্ঞানে। হিমালয় জুড়ে পর্বতারোহীদের ফেলে আসা আবর্জনা পরিষ্কারের পদক্ষেপ নিয়েছেন। কেবল নারীদের নিয়ে গঠন করা চুয়াল্লিশটি দলকে অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বই লিখেছেন একের পর এক সাতটি। ২০১৬ সালে ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যুর মাত্রপাঁচ মাস আগেও তিনি ফুকুশিমা নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টে দুর্ঘটনা কবলিত একদল তরুণ-তরুণীকে নিয়ে মাউন্ট ফুজির চূড়ায় উঠেছেন। তার সম্মানে প্লুটোর একটি পর্বতমালার নাম রাখা হয়েছে তাবেই মন্টেস।

চিরকাল বিনয়ী ইশিবাশি অবশ্য এত খ্যাতি কখনোই চান নি। প্রচণ্ড আত্মসম্মানের অধিকারী এই মানুষটি এভারেস্টের পর আর কখনোই কোনো অভিযানে কোনো স্পন্সরশিপ গ্রহণ করেন নি। অথচ ততদিনে পাশার দান উল্টে গিয়েছে; পরিস্থিতি তার অনুকূলেই ছিল, শত শত ব্র্যান্ড মুখিয়ে থাকত তার অভিযানের জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি পয়সা ঢালতে। কিন্তু সত্তরের দশকের শুরুর দিকের কঠিন দিনগুলোর কথা তিনি কখনোই ভুলতে পারেন নি। তাই নিজের সঞ্চয় পর্যাপ্ত হলেই কেবল পরের অভিযানে বের হয়েছেন। সে জন্যে বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়িয়ে বক্তব্য দিয়েছেন, পর্বতারোহীদের গাইড হিসেবে কাজ করেছেন, পিয়ানো আর ইংরেজির পাঠ তো ছিলই। সময় সময় বন্ধুদের দেয়া উপহার, খাবার আর সরঞ্জামাদি ব্যবহার করেছেন। পরিশ্রম হয়েছে, স্বপ্ন পূরণে দেরি হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে হয়তো পূরণও হয় নি, কিন্তু কোনোকালেই তিনি আর স্পন্সরের জন্য ছুটেন নি।

পর্বতারোহণে তার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল নারীদের জন্য এই স্বপ্ন পূরণটা সহজ করার উদ্দেশ্যে। একজন নারী যেন কোনোভাবেই একজন পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম প্রতিপন্ন না হন। তিনি সবসময়েই চেয়ে এসেছেন তাকে যেন পৃথিবী মনে রাখে এভারেস্ট জয়ী ৩৮তম মানুষ হিসেবে, নারী বা পুরুষের আলাদা হিসেবে নয়। জীবনের শেষ সাক্ষাতকারে তিনি তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন খুব সরল ভাবেই —”I just simply climbed a mountain—but the environment around me changed so much, just because I was the first woman. I did not intend to be the first woman on Everest.”

তারুণ্যের স্বপ্ন যাদের মাঝে লালিত, তাদের জন্য জুনকো ইশিবাশি তাবেই নিজের জীবন থেকে নেয়া পরামর্শ দিয়েছেন একটিই —”Do not give up. Keep on your quest.”

১৭ এপ্রিল, ২০২০।

তথ্যসূত্রঃ

Douglas, E. (2016, November 10). Junko Tabei obituary. The Guardian. Retrieved from https://www.theguardian.com/world/2016/nov/10/junko-tabei-obituary
Fawehinmi, Y. (2019, November 28). Moment in Time – May 16, 1975: Junko Tabei first woman to reach Mount Everest summit. The Telegraph. Retrieved from https://www.telegraph.co.uk/womens-sport/2019/11/28/moment-time-may-16-1975-junko-tabei-first-woman-reach-mount/amp/?fbclid=IwAR1LVl_68E8mMKFnCgVNu7vEaA-YPxxVGyyy1t4XFDlI_2FlF8velWKvVLY
Frenette, B. (2017, October 20). A Final Interview With Junko Tabei. Outside. Retrieved from https://www.outsideonline.com/2252936/junko-tabei-anniversary
Junko Tabei – Wikipedia. (n.d.). Retrieved from Wikipedia: https://en.wikipedia.org/wiki/Junko_Tabei
JWEE 1975: WOMEN’S QUEST FOR EVEREST. (n.d.). Retrieved from Japanese Women’s Everest Expedition 1975: http://www.jwee1975.com/about_jwee/
OTAKE, T. (2012, May 27). Junko Tabei : The first woman atop the world. The Japan Times. Retrieved from https://www.japantimes.co.jp/life/2012/05/27/people/junko-tabei-the-first-woman-atop-the-world/?fbclid=IwAR3CBmIJdGCkG0ONjE-xX6nqp-ezoxCcwTUrjx4nssDKLi6sssorTyqwHt4#.Xp5lw8gzZPa
Tabei, J. (2017). Honouring High Places: The Mountain Life of Junko Tabei. Rocky Mountain Books Ltd.
The New York Times Archive. (1975, May 17). A Woman Reaches Top of Mt. Everest. The New York Times. Retrieved from https://www.nytimes.com/1975/05/17/archives/a-woman-reaches-top-of-mt-everest-woman-scales-mount-everest.html?fbclid=IwAR3CBmIJdGCkG0ONjE-xX6nqp-ezoxCcwTUrjx4nssDKLi6sssorTyqwHt4

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।