উই খাচ্ছে ঢাকার সবচেয়ে পুরোনো লাইব্রেরির ইতিহাস

প্রকাশিতঃ ১২:১৭ অপরাহ্ণ, শনি, ১২ সেপ্টেম্বর ২০

অঞ্জন আচার্য :

যথাযথ পরিচর্যা আর সংরক্ষণের অভাবে ঢাকার সবচেয়ে পুরোনো গ্রন্থাগার ‘জনসন হল লাইব্রেরি’র প্রায় ১২ হাজার দুষ্প্রাপ্য বই খাচ্ছে উইপোকা। পুরোনো মূল্যবান এসব বই শুধু দেখভালের অভাবে নষ্ট হলেও এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই।

১৮৫০ সালে ব্রিটেনে লাইব্রেরি আইন পাসের পর স্থানীয় সরকারগুলো বিভিন্ন জায়গায় গণগ্রন্থাগার তৈরি করতে শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৮২ সালে চালু হয় জনসন হল লাইব্রেরি। কিন্তু ভবনটি পুরোনো ও বসবাসের অনুপযোগী হওয়ায় তিন বছর আগে লাইব্রেরিটি পাশের মইনুদ্দিন চৌধুরী মেমোরিয়াল হলের তিন তলায় স্থানান্তর করা হয়। স্থানান্তরের সময় বইয়ের ১৭টি কাঠের আলমারির মধ্যে মাত্র ২টি আনা হয় নতুন জায়গায়। বাকি ১৫টি আলমারি লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ জনসন হলেই রেখে আসে। লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ বলছে, পুরোনো ভবনে রেখে আসা ১৫টি আলমারিতে প্রায় ১২ হাজার বই রয়েছে। বইগুলোতে অনেক আগেই উইপোকা ধরেছিল। তবে পাঁচ থেকে ছয় হাজার বই এখনো ভালো রয়েছে। ধীরে ধীরে বাকি বইগুলোও উইপোকাদের দখলে চলে যাবে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরোনো হলেও শুধু দেখভালের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বইগুলো। নানা অজুহাতে বন্ধ করে রাখা হয়েছে লাইব্রেরিটি।

ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, ১৮৭৪ সালে ঢাকায় এক সফরে আসেন ব্রিটিশ-ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুক। এই সফরকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তার নামে একটি হল নির্মাণ করা হয়। হলটি নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছিল ৭০ হাজার টাকা। ১৮৭৪ সালের ১৬ জুলাই নবাব খাজা আব্দুল গনির বাসভবন আহসান মঞ্জিলের এক সভায় এই উদ্যোগের সূচনা। ওই সভার রেজল্যুশন থেকে দেখা যায়, সভায় হলের সঙ্গে একটি গণপাঠাগার নির্মাণের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সেখানে উপস্থিত গণ্যমান্যদের মধ্য থেকে এর জন্য অর্থদানের একটি তালিকাও তৈরি করা হয়। সেসময় রাজা রায়বাহাদুর ও দানশীল প্রখ্যাতনামা ধনী ও জমিদারেরা দশ হাজার-পাঁচ হাজার করে চাঁদা দিয়ে হলের নির্মাণ তহবিল গঠন করেন। প্রখ্যাত অভয়চরণ দাস ছিলেন উদ্যোক্তা কমিটির সেক্রেটারি, যিনি ঢাকার আরো বহু লোকহিতকর কাজের সঙ্গেও আমৃত্যু উদ্যোক্তা হিসেবে জড়িত ছিলেন।

১৮৭৯ সালে হল নির্মাণের কাজ শেষ হলেও মহারানি ভিক্টোরিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে ১৮৮০ সালের ২৪ মে ঢাকার কমিশনার নর্থব্রুক হলের দ্বার উদ্ঘাটন করেন। ১৮৮০ সালের ২৫ জুন জুডিশিয়াল বিভাগের সেক্রেটারিকে লেখা কমিশনারের এক চিঠিতে যার প্রমাণ মেলে। ১০০ কনস্টেবলসহকারে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর ফৌজি কায়দায় কমিশনার সাহেবকে অভ্যর্থনা জানান। ১৮৮২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নর্থব্রুক হলের লাগোয়া ভবনে যুক্ত হয় একটি গণপাঠাগার। নামকরণ করা হয়েছে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনসনের নামে। ১৯০৯-—১৯১০ সালে তিনি ঢাকার কমিশনারও ছিলেন। লাইব্রেরির গায়ে অদ্যাবধি ‘JOHNSON HALL’ নামাঙ্কিত রয়েছে। লাল ইটে তৈরি বলে স্থানীয়ভাবে এটি ‘লালকুঠি লাইব্রেরি’ নামেও পরিচিত। যদিও তা ‘নর্থব্রুক হল লাইব্রেরি’ নামেই বেশি খ্যাত ছিল। এই পাঠাগার গড়ে তোলার জন্য প্রাথমিকভাবে যে তহবিল সংগ্রহ করা হয়, তাতে ভাওয়ালের রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ পাঁচ হাজার, ত্রিপুরার মহারাজ এক হাজার, বালিয়াটির জমিদার ব্রজেন্দ্র কুমার রায় এক হাজার, রানি স্বর্ণময়ী সাতশ’, কালীকৃষ্ণ পাঁচশ’ এবং বিশ্বেশরী দেবী পাঁচশ’ টাকা দান করেন।

খুব সুনাম ছিল পাঠাগারটির সংগ্রহের। প্রথমে এক হাজার বই নিয়ে ১৮৮৭ সালে পাঠাগারটি খোলা হয়। ১৮৮৮ সালে এই লাইব্রেরির জন্য ৬০০ টাকার বই আনানো হয় বিলাত থেকে। নবাবসহ সেকালে ঢাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার শ্রেণি যাদের পুস্তকাদি ও আর্থিক দানের পরিপ্রেক্ষিতে এই গ্রন্থাগারের সূচনা, তাঁদের নামাঙ্কিত কিছু আলমারি ও বইয়ের পাতায় তাঁদের সিলমোহর আজও গ্রন্থাগারটিতে বিদ্যমান রয়েছে।

এখানে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক বই সাজানো নেই। রানি ভিক্টোরিয়ার চিঠি থেকে শুরু করে এই লাইব্রেরিতে আছে বিলাতের ইতিহাস, সিপাহি বিপ্লব, প্রতাপশালী ব্রিটিশ শাসকদের জীবনী, ভারতবর্ষের সীমানা নির্ধারণ কমিটির প্রতিবেদন ও ইংরেজি সাহিত্যের নানা বই, যার বেশির ভাগ ইংরেজি ভাষায় এবং দুষ্প্রাপ্য। শ দুয়েক বাংলা বইও আছে। সেগুলোও শত বছরের পুরনো। একেকটি গ্রন্থ একেকটি ঐতিহাসিক সত্যকে ধারণ করে আছে। একসময় গবেষণা ও রেফারেন্স পুস্তক কলকাতা, আগরতলা এমনকি পাটনার খোদাবক্স লাইব্রেরিতে পাওয়া না গেলেও সেটা নর্থব্রুক হল লাইব্রেরিতে পাওয়া যেত। শুরুতে এই লাইব্রেরিতে ২২-২৩ হাজার বই থাকলেও বর্তমানে বইয়ের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। ৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় নষ্ট হয়ে যায় পাঠাগারের অনেক বই। পরবর্তী সময়ে শত শত মূল্যবান বই, জার্নাল, পত্রিকা উইয়ের পেটে যায়। অনেক বই নষ্ট গেছে ছাদের ফাটল দিয়ে পানি পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় দালানটিকে ব্যবহারের অনুপযোগী ঘোষণা করে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে।

জনসন হল লাইব্রেরির পুরোনো ভবনে গিয়ে দেখা যায়, উঁচু দালানটির জায়গায় জায়গায় ফাটল ধরেছে। কোথাও কোথাও ফাটল বেশ গভীর। তার পাশে অবস্থিত ২০ বছর আগের ঢাকা ওয়াসা। অন্যপাশে রয়েছে একটি হোটেল। হোটেলের পানিগুলোও লাইব্রেরির ভেতর দিয়ে নিয়ে বাইরে ফেলা হয়। ২০ বছর আগে তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন এই ভবনটির পাশে ওয়াসার একটি পাম্প বসায়। একটি জেনারেটর বসানো হয় সাত বছর আগে। এই জেনারেটর চালু করা হলে ভবনটি কেঁপে ওঠে। ফলে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সকলের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়া হয়।

জনসন হল লাইব্রেরির সহকারী গ্রন্থাগারিক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “দুইশ বছরের পুরনো বই সব। হাত দিয়ে ধরলে এখন ঝুরঝুর করে পড়ে যায়। সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমরা বলতে বলতে ক্লান্ত। তবে আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পুরোনো ভবন থেকে সরিয়ে কমিউনিটি সেন্টারের তৃতীয় তলায় স্থান দেয়া হয়েছে। তবে আলমারিগুলোর মধ্যে ১৫টি আগের ভবনে রয়ে গেছে।”
গত ৩১ বছর তিনি এই গ্রন্থাগারের সঙ্গে যুক্ত। এই সময়ে কোনো বই কাউকে দেননি। নতুন করে কোনো বই কেনাও হয়নি। গ্রন্থাগারের উন্নয়নের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই বলে তিনি শুনেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গ্রন্থাগারের উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের মন নেই। এ থেকে লাভের সুযোগ নেই বলে কেউ-ই এর উন্নয়নের আগ্রহ দেখায় না। প্রশাসক এসেছেন, কাউন্সিলর ঘুরে দেখে গেছেন, মেয়রও এসেছিলেন। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি নেই।

তথ্যসূত্র : ১. দৈনিক কালের কণ্ঠ; ২. বাংলাদেশ টাইমস; ৩. স্থাপত্য : বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা-২, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি; ৪. ঢাকা : স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী : মুনতাসীর মামুন; ৫. কালের স্মৃতিচিহ্ন ঢাকা : নর্থব্রুক হল লালকুঠি : রণদীপম বসু।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।