এ মৃত্যু রহস্যজনক

প্রকাশিতঃ ৪:১৭ অপরাহ্ণ, সোম, ১৫ জুন ২০

হেলাল উদ্দিন, সিনিয়র সাংবাদিক :

যুগান্তরের ক্রাইম চীফ স্নেহের নান্নুর মর্মান্তিক অকাল মৃত্যু আমাকে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছে। গতরাতে ঘুমুতে পারিনি। অনেক প্রশ্ন মনে। ক’দিন আগেও নান্নু আমাকে ফোনে কিছু কথা বলেছে। আগেও বলেছে। কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারছি না। অতি ঘনিষ্ঠ প্রিয় নান্নুর এমন মৃত্যুও মানতে পারছি না। এটা কি আসলেই অপমৃত্যু? তথ্যে যে অনেক গরমিল?

আমি ক্রাইম রিপোর্টার নই। তবে ক্রাইমের সিনিয়র জুনিয়র অনেক সাংবাদিকই আমার ঘনিষ্ঠ। মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু তার ব্যতিক্রম। আমাকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করতো, বড় ভাই মানতো। যেকোন সমস্যা হলেই পরামর্শ নিত। আমার বা আমার কোন ঘনিষ্ঠ জনের কোন দুর্ঘটনা বা পুলিশী সহায়তা মানেই ছিল নান্নুর সহযোগিতা। সম্পর্ক এতই ঘনিষ্ঠ ছিল ঢাকায় কোথাও বেড়াতে গেলে সে অনুযোগ করতো আমাকে নিলেন না? সর্বশেষ তারকা ক্রাইম রিপোর্টার তমাল মেহেদীসহ গাজীপুরের এক রিসোর্টে একরাত ছিলাম। শুনে নান্নুর অনুযোগ আমাকে নিলেন না? এখনই চলে আসছি।

নান্নুর মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক সময়ে ক্রাইম রিপোর্টার, নান্নুর সহকর্মী সিনিয়র সাংবাদিক মিজান মালিক তার পোষ্টে কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। এরপর এই পোষ্টে অধিকাংশরাই এই মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ, অবিশ্বাসসহ নানা মত প্রকাশ করেছেন। কারও কারও মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এদের অধিকাংশই অভিজ্ঞ সাংবাদিক, অনেক সাংবাদিক নেতাও আছেন। সবাই মৃত্যু রহস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যেও গরমিল দেখা দিয়েছে। তার স্ত্রীর আগের বক্তব্যের সাথে অপমৃত্যু মামলার তথ্যের মিল নেই। প্রথম আলো/বিডিনিউজের রিপোর্টে বলা হয়েছে নান্নু গভীর রাতে অফিস থেকে ফেরার পর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে তুমুল ঝগড়ার শব্দ তারা শুনেছেন। এর কিছুক্ষণ পরই অগ্নিকাণ্ড। এটা খুবই অস্বাভাবিক। নান্নু কখন অফিস থেকে ফিরেছেন এবং কতক্ষণ পর অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন এই তথ্যেও রয়েছে বড় গরমিল। আমি মনে করি, যেকোন বিতর্ক এবং সন্দেহ দুর করতে লাশের ময়না তদন্ত করার দরকার ছিল। এখনও করা যায়। যখন এই মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ অবিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে। এছাড়া নান্নুর মৃত্যুকালীন জবানবন্দী নেয়া প্রয়োজন ছিল। হাসপাতালে তার জ্ঞান ছিল। এই উদ্যোগটি কেন নেয়া হয়নি? ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) নেতারা তো এসব বিষয়ে অভিজ্ঞ। তারাও উদ্যোগটি নিতে পারতেন। তবে যতটুকু জানা গেছে, নান্নুকে বারবার জিজ্ঞেস করা হয়েছে আগুন কিভাবে লেগেছে? কিন্তু সে জবাব দেয়নি। চুপ থেকেছে। কেন??

এ লেখার শেষে নান্নুর সাথে আমার শেষ কথোপকথনের কথা বলবো। তার মানসিক অশান্তির কথা বলবো। তবে প্রিয় নান্নুর সাথে আমার সম্পর্ক প্রায় ১৫ বছরের। এরমধ্যে যুগান্তরেই কেটেছে ১২ বছর। ভালই ছিল। যমুনা চেয়ারম্যানেরও বিশ্বস্ত ছিল। কিন্তু এক সময়ে সিনিয়র কয়েকজন প্রভাবশালী কলিগের বিরাগভাজন হয়। এরপর থেকেই নান্নুর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাল্লা ভারী হতে থাকে। দুপুর বিকেল প্রতিটি সভায়ই নান্নুর দোষক্রুটি খোজা। একজন সিনিয়রের কাজই ছিল সকালের মিটিংয়ে নান্নু কি কি রিপোর্ট মিস করেছে তা তুলে ধরে অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা করা। অধিকাংশই অতিরঞ্জিত। ৮/১০ বছর যুগান্তরে কাজের জন্যে প্রশংসিত হলেও এখন নাকি সে পুরোপুরি ব্যার্থ। তাকে বাদ দিয়ে আরেকজন রিপোর্টারকে নিয়োগের কথাও উঠলো। কিন্তু আলোচিত সেই সাংবাদিক প্রত্যাখ্যান করলেন। এরপরও ঘটনা থেমে থাকে নি। নানা অজুহাতে একের পর এক কারণ দর্শানো নোটিশ। জবাব দিতে দিতে ক্লান্ত নান্নু মানসিকভাবে ভেংগে পড়লো। এসব অন্যায় আমার সহ্য হতো না। এসব নিয়ে আমি বিব্রত হতাম। হাসীখুশী প্রানখোলা, সহজসরল নান্নুর বিরুদ্ধে এসব পরিকল্পিত অভিযোগ নিয়ে স্বোচ্চার ছিলাম। এ জন্যে অনেক ধকল সইতে হয়েছে। তারপরও নান্নু শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে আমার কাছেই আসতো। আমি আমার মত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। একসময় নান্নু চাকুরি হারায়। মানসিকভাবে চরম বিধ্বস্ত। একদিন স্ত্রী পল্লবিকে নিয়ে আমার বাসায় আসে। অনেক অভিযোগ। সে ন্যায়বিচার বঞ্চিত। ষড়যন্ত্রের শিকার। কিছু করা যায় কি না। আমি চেষ্টা করলাম। যথারীতি ব্যর্থ হলাম। যাক সে কাহিনী।

একটি ঘটনা না বললেই নয়, আমার জীবনে সবচেয়ে অন্ধকারময় সময় ছিল প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মূখ্য সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের প্রতিহিংসা চরিতার্থের সাড়ে ৪ বছর। এক সময় একাধিক মিথ্যা হয়রানীমূলক মামলা হয়। প্রভাবশালীদের তদবিরে জেলে যেতে হয়। তার আগে বন্ধু সাংবাদিক শাহনেওয়াজ দুলালকে নিয়ে আইন সচিবের সাথে দেখা করি। তিনি প্রকাশ্যে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। এরপর যুগান্তরের সম্পাদক সাইফুল আলম ভাই নিয়ে যান আইনমন্ত্রীর বাসায়। সব শুনে এবং ডকুমেন্টস দেখে মন্ত্রী সাহস দেন, আশাস দেন। বলেন, আমি আপনার পাশে আছি। খুব আশা নিয়ে হাইকোর্টের অন্তবর্তীকালীন জামিন শেষে কোর্টে দাড়াই। জামিন বাতিল হয়।

পুরো সময়টা নান্নু তথন আপন ভাইয়ের মত কোর্টে ছিল। জামিন বাতিল হওয়া মাত্র জেলে তদবির শুরু করে আমার যেন কোন সমস্যা না হয়। আমি কারাগারে পেৌছার আগেই সে মটরসাইকেল চালিয়ে চলে যায় কেরানীগঞ্জ। পরবর্তীতে জেল সুপার নিজে আমাকে জানায়, নান্নু কিভাবে তার কাছে আকুতি করেছে আমার যেন কোন সমস্যা না হয়। ইনশায়াল্লাহ আমি জেলে খুব ভাল ছিলাম। আসলেই ভাল ছিলাম। জেল থেকে বেরোনোর পর এই নান্নুই বুকে জড়িয়ে ধরে কেদেছে। বললো, ভাই কিছুই করতে পারলাম না।

ঘটনা বাড়াতে চাই না। নান্নুর মৃত্যুর প্রসংগে আসি। কিছু কথা বলা আমার কর্তব্য। চোখের সামনে একমাত্র সন্তান পিয়াসের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর নান্নু পুরোপুরি ভেংগে পড়ে। মানসিকভাবে চরম বিধ্বস্ত। একদিন বাসায় ডাকলাম। হাউমাউ করে কান্না। সাহস দিলাম। মনোবল বাড়ালাম। নতুনভাবে শুরু করতে পরামর্শ দিলাম। তখন নান্নু তার পারিবারিক মানসিক অশান্তির কথাও বলে। তার পরিবার ছিল স্ত্রী শাসিত। তাদের দাম্পত্য জীবন ভাল যাচ্ছিল না। মতের পার্থক্য বেশি। নানা সন্দেহ। একান্ত কথাগুলো অব দ্য রেকর্ড। নান্নু শুধু মনের আবেগ প্রকাশ করেছে। পরামর্শ চেয়েছে। সেসব আমি প্রকাশ করতে পারি না।

তবে নান্নুর মৃত্যুর পর থেকেই মনটা কেমন যেন খচখচ করছে। নিজেকে মানাতে পারছি না। বিবেক কেমন ধিক্কার দিচ্ছে। নান্নুর সাথে আমার সর্বশেষ হোয়াটসআপে কথা হয় প্রায় ২ সপ্তাহ আগে। বললো বাসায় আসবে। আমি বললাম, জরুরি না হলে আসার দরকার নেই। আমি পুরোপুরি ঘরবন্দী। তুমিও সতর্ক থেকো। বললো ভাই মনটা ভাল নেই। বললাম, কি হয়েছে। আবার অফিসে কোন সমস্যা? বললো, না অফিসে কোন সমস্যা নেই। আগের মত কেউ ডিসটার্ব করছে না। সহযোগিতা করছে। তবে মানসিক অশান্তিতে আছি। এরআগে একদিন ফোনে পরামর্শ চায়। তার সব সম্পদ এতিমখানায় দান বা ছেলের নামে কিছু একটা করে সব কিছু বিলিয়ে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। বলে এসব রেখে লাভ কি? আমার কিছুর দরকার নেই। এক পর্যায়ে এ নিয়ে পারিবারিক বাধার কথাও জানায়। সব মিলিয়ে আমার দৃঢ় বিশ্বাস এ মৃত্যুর পেছনে রহস্য আছে।

একই ঘরে একই ভাবে ছেলের পর বাবার মৃত্যু হতে পারে না। তার স্ত্রীর আগের কথা এবং পরের কথায় অনেক গড়মিল। প্রতিবেশিদের বক্তব্য গভীর রাতে ঝগড়া। অপমৃত্যু মামলায় বাসায় ফেরা এবং অগ্নিকাণ্ডের সময়ের পার্থক্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে ঘটনাস্থল।

প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী মামলায় বলা হয়েছে, শোবার কক্ষের বৈদ্যুতিক সুইচ চালু করতে গিয়ে বিস্ফোরন হয়। অথচ একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী তার স্ত্রী ঘটনার পরপরই আমার কাছে ফোনে জানান (যা আমার পোষ্টে বর্ণনা আছে), “গতরাতে দৈনিক যুগান্তরে অফিস শেষে ফিরে খেয়ে নামাজ পড়ে। এরপর ঘুমোনোর আগে নান্নু গিয়েছিল সেই অভিশপ্ত বারান্দায় যেখানে তার সন্তান পুড়ে কংকাল হয়। ঠিক তখনই ঘটে দূর্ঘটনা। ছেলের সেই ঘরেই আবার আগুন ধরে যায়। তার স্ত্রী জানান, নান্নু দেৌড়ে বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার ছেড়ে দেয়। পেছনে তখন আগুন ঝলছিল। বাথরুমে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। কিছুটা সুস্থ্য হলে ঘরের আগুন নেবানোর চেষ্টা করে”।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।