কবিগুরু-বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা এবং অধ্যাপক পারভেজের সুষম সমাজ

প্রকাশিতঃ ১২:০২ পূর্বাহ্ণ, সোম, ২ ডিসেম্বর ১৯

জুলফিকুর মুর্তজা জুলফি

বিশ্বকবির সোনার বাংলাকে প্রকৃত সোনার বাংলা করে গড়ে তোলার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন, তা তিনি বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। ফলে স্বাধীনতার ফসল আজও সব মানুষের ঘরে পৌঁছেনি। আজও গৃহহীন, কর্মহীন কোটি মানুষ। দারিদ্র আজও জনগণের সঙ্গী। স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া কি সম্ভব!

অর্থনীতির অধ্যাপক পারভেজ যিনি নিজেকে অর্থনীতির ছাত্র বলতেই ভালোবাসেন- তিনি অত্যন্ত সহজ-সরলভাবে সোনার বাংলা তথা সুষম সমাজ গড়ার পথ বাতলে দিয়েছেন। সমাজতত্ব ও অর্থনীতির জটিল বিষয়কে তিনি প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন তাঁর ‘‘সুষম সমাজ বিনির্মাণ” নামক গ্রন্থে। এজন্য পাঠককে সমাজবিজ্ঞান বা অর্থনীতির ছাত্র হবার প্রয়োজন পড়েনা।

‘‘সুষম সমাজ বিনির্মাণ” নামক গবেষণামূলক গ্রন্থে তিনি দেশের সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্রমুক্ত, অবক্ষয়মুক্ত, কর্মমূখর সমৃদ্ধ এক সমাজ কাঠামোর চিত্র উপস্থাপন করেছেন। যে সমাজে দারিদ্র, বেকারত্ব ও অবক্ষয় ঠাই পাবে না।

তাঁর গ্রন্থের মূখবন্ধ পাঠে জানা যায় যে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি স্বচ্ছ, তাই কথার মার-প্যাচে না গিয়ে খুব সাদাসিধাভাবে যে সমাজব্যবস্থার ফর্মূলা দিয়েছেন, তা শুধু বাংলাদেশ নয় বরং বিশ্বের অনেক দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিশারী হতে পারে। পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের পথ না মাড়িয়ে কিভাবে একটি বিকল্প সমাজ ব্যবস্থা গড়া যায়, তারই বয়ান এই ‘‘সুষম সমাজ বিনির্মাণ’ নামক গবেষণামূলক গ্রন্থ।

তিনি তাঁর ‘উপলব্ধি’তে বয়ান করেছেন যে রাজনৈতিক স্বাধীনতার অর্ধশতক পার হলেও আজও জন-মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। আজও দেশের গরিষ্ঠ মানুষ শোষণ-বঞ্চনায় জর্জর। দেশের কোটি কোটি মানুষ চরম দারিদ্রতায় জীবন যাপন করে। এই দারিদ্র দূর করা না গেলে সত্যিকারের কোন টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন। অথচ তিনি ধনী এক বণিক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেও মাটি ও মানুষের এতা কাছাকাছি এলেন কি করে, তা বিস্ময় সৃষ্টি করে!

“অবাক পৃথিবী” পরিচ্ছদে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে শোষণ শুধু রাষ্ট্রের ভিতরেই নয়, বিশ্বজুড়ে তা বিদ্যমান। বিশ্বের ৭৫% সম্পদ দখল করে আছে মাত্র ১৫টি রাষ্ট্র! সামন্ত যুগেও যেমন, বর্তমান পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাতেও তেমন- সম্পদ ক্ষমাতাবান ও শক্তিশালীদের হাতে কুক্ষিগত হয়।

অধ্যাপক পারভেজের দিক-দর্শন এখানেই। তিনি বলছেন, কেন্দ্রিভূত অর্থ-সম্পদকে অলসভাবে না রেখে তা বিকেন্দ্রিভূত করতে হবে। সমাজের প্রতিটি অংশে অর্থ সঞ্চালিত করা গেলে সমাজ সচল হবে এবং মানুষের দারিদ্র-মুক্তি সম্ভব হবে। তিনি উদাহরন দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, বৈষম্য থাকলে টেকসই উন্নয়ন কোন মতেই সম্ভব হবেনা।

“স্ফুলিঙ্গের উন্নয়ন বনাম টেকসেই উন্নয়ন” পরিচ্ছদে তিনি উদাহরনসহ দেখিয়েছেন অর্থ থাকলেই হবেনা। বরং অর্থের যথার্থ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনৈতিক সফলতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা আসবেনা।

অধ্যাপক পারভেজের মতে সমাজকে সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল করতে হলে বেকারত্ব দূর করতে হবে, মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে করতে হবে। তবেই টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও অবক্ষয়মুক্ত সমাজ তথা ‘‘সুষম সমাজ বিনির্মাণ” সম্ভব হবে।

অধ্যাপক পারভেজ ‘‘সুষম সমাজ বিনির্মাণ” এ সমাজ ও অর্থনীতির নতুন এক দর্শন উপস্থাপন করেছেন। তিনি পুঁজিবাদের শোষণ ও সমাজতন্ত্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণের বাহিরে গিয়ে জীবনমূখী এক অর্থ-ব্যবস্থার কথা বলছেন। আর তা হচ্ছে, রাষ্ট্রের হাতে ও ব্যাংক-বীমার হাতে পুঞ্জিভূত অর্থকে বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে সাধারণ সব মানুষের মাঝে প্রবাহিত করা। সমাজের সর্বস্তরে অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত হলে সার্বিক উন্নয়ন আপনা-আপনিই সম্ভব হবে এবং সামজিক অবক্ষয় দূর হয়ে যে সুষম সমাজ তৈরী হবে, তাকেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাঙলা বলা যেতে পারে।

অর্থনীতিবিদের দেখা যায়, সব সময় সরকারের মুখোমুখী দাঁড়াতে। এক্ষেত্রে অধ্যাপক পারভেজ বিকল্প পথে হেঁটেছেন। অর্থনীতিবিদরা উন্নয়নের পথ বাতলে দেন। সরকার তা গ্রহণ করতেও পারে, আবার নাও পারে। তবে গ্রহণযোগ্য ফর্মূলা বাস্তবায়ন করতে পারে একমাত্র সরকারই। তাই অধ্যাপক পারভেজ হয়তো ঐপথে হাঁটছেন। তিনি নীতি নির্ধারক ও বাস্তবায়কদের মনের অন্দর-মহলে তার সুষম সমাজ বিনির্মাণের চেতনাকে ‘পুশ’ করতে চান। কারণ তার দিক-দর্শন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার চেতনার সমার্থক। তাই তাঁর লক্ষ সহজেই সাফল্যমণ্ডিত করা সম্ভব হবে, তা বলা যায়।

‘‘সুষম সমাজ বিনির্মাণ” গ্রন্থে তিনি ‘সুষম সমাজের ধারণা দিয়েছেন এবং তা বাস্তবায়নে ২৭ দফার প্রস্তাবনা দিয়েছেন। তাতে তিনি প্রথমেই রেখেছেন বেকারত্ব দুরীকরণের কথা। বেকারত্ব যে অর্থনৈতিক মুক্তির পথে বড় অন্তরায় তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আর বেকারত্ব দূর হলে ঐ ব্যক্তি ও তার পরিবার মৌলিক চাহিদা পুরণের তাড়ণা থেকে মুক্তি পায়।

তিনি দ্বিতীয় দফায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেছেন তা হচ্ছে, মাথাপিছু গড় আয় নিয়ে আমরা বাগাড়ম্বর করে থাকি। কিন্তু তিনি বলছেন, যদি ঐ পরিমান অর্থ যদি প্রতিটি মানুষের কাছে পৌছানো যায়, তবে, সমাজ থেকে দারিদ্র নির্বাসনে যাবে।

আর উপরোক্ত দুই দফা বাস্তবায়িত হলে মানুষের মৌলিক চাহিদা বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসার আভাব কিভাবে দূর হবে তা তিনি বিভিন্ন দফায় দেখিয়েছেন। এতে করে নারী-নির্যাতন, খুন-ধর্ষণের মতো সামাজিক অবক্ষয়ের অসবসানেরও পথ তিনি দেখিয়েছেন।

অষ্টম দফা প্রস্তাবনায় তিনি সুষম বাজেটের বিষয় এনেছেন। দশম দফায় বাজেট ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে গরিব-বান্ধব করতে পরামর্শ দিয়েছেন। যা দেশের বর্তমান অর্থব্যবস্থা থেকে উত্তরণে বিশেষ ভাবে জরুরি।

বিভিন্ন দফায় তিনি সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সহজে ঋণ প্রাপ্তি, নারীদের মাঝে সহজে ঋণ বিতরণ এবং ঋণের সুদের হার কমানোর উপরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ অর্থের অভাব ও উচ্চ সুদের হার উন্নয়নের পথের বড় অন্তরায়।

নতুন উদ্যোক্ত তৈরী, ট্রেড-ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা ও গুণগতমান সমৃদ্ধ উচ্চশিক্ষার প্রতিও গুরুত্ব দিয়ে তিনি বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিয়েছেন তার এই গ্রন্থে। সামাজিক অবক্ষয় বিশেষ করে মাদক বিস্তার রোধী দিক-নির্দশনাও তার বিভিন্ন দফার এসেছে সমীচীন ভাবেই।

রাষ্ট্রের সেবাখাতের শৃঙ্খলা, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও গণমূখী করাসহ প্রায় সব বিষয়েই তিনি প্রস্তাবনা পেশ করেছেন। যা এই স্বল্প পারিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাই সবাইকে আহ্বান জানাবো এই গ্রন্থটি পাঠ করার জন্য।

অলঙ্কৃত সুদৃশ্য কভারে মোড়া, মেশিন-মোল্ডিং-এ বাঁধাই করা ১৫৪ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি একটি তথ্য ও তত্ত্ব-বহুল গ্রন্থ। যা সবার পাঠ করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

গ্রন্থে কিছু দুর্লভ চিত্র, ডাটা ও তথ্যপুঞ্জি ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর দুটি মূল্যবান ভাষণ সংযোজন করা হয়েছে। যা গ্রন্থটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বঙ্গবন্ধু গবেষণা কেন্দ্র ও ন্যাশনাল বুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ বইটি যৌথভাবে প্রকাশ করেছে।’

আমি গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করি।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ