করোনা:স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে সচেতনতার বিকল্প নেই

প্রকাশিতঃ ১:৩৮ অপরাহ্ণ, বুধ, ১৫ এপ্রিল ২০

শফিকুল ইসলাম খোকন : ফাঁকা রাস্তা, মাঠ-ঘাট,গোটা বিশ্ব নিস্তব্দ্ধ, নিরবতা; নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার অবিরাম প্রচেষ্টা। আবহাওয়ার কোন পুর্বাভাস নেই, নেই ঝড়,জলোচ্ছ্বাস বা বৃষ্টি। অদেখা-অজানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার গোটা বিশ্ব। সারিসারি লাশের সংখ্যা, বাবার লাশের পাশে আসছেনা সন্তান, স্বামীর লাশের পাশে দেখা মিলছেনা স্ত্রীর, স্ত্রীর লাশের পাশে স্বামীর দুরত্ব, ভাই ভাইকেও চিনছেনা যার নাম করোনা! চিকিৎসা নেই, জানাজা নেই, কোথাও কোথাও মাটি চাপা দেয়া হচ্ছে নিথর দেহগুলো। গোটা বিশ্ব যেন অভিশপ্ত,অস্থির। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের তাণ্ডবে কাঁপছে গোটা বিশ্ব। করোনার করুণ ছোবলে বাংলাদেশর অবস্থাও করুণ দশা।

বৈশ্বিক চরম এ বিপর্যয়ে অধিকাংশ মানুষ রুদ্ধ, অবরুদ্ধ, ভীতসন্ত্রস্ত। এখন সময় সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থণা আর রয়েছে সচেতনতা। যারা মুসলিম তাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ সৃষ্টিকর্তার সকল আদেশ-নিষেধ মান্য করে চলা, অতি মুনাফা অর্জন, ঘূষ-দুর্নীতি,অনৈতিক কর্মকান্ড থেকে মুক্তি চাওয়া, আর হিন্দুসহ অন্য ধর্মাবলম্বীরা তাদের স্রষ্টার কাছে ক্ষমা চাওয়া। তবে এসব কিছুর মুলেই রয়েছে সচেতনতা, আত্মশুদ্ধি এবং নিজেকে একজন ক্লিন ইমেজের মানুষ হওয়া। একমাত্র সচেতনতাই পারে আপনাকে অনৈতিক কর্মকান্ড থেকে মুক্তি দিতে, সৃষ্টিকর্তার সকল হুকুম পালনের মাধ্যমে মানসিকতা তৈরী করতে আর করোনার মতো ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে করোনার সাথে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সম্পর্কটা কি? হ্যাঁ এমন প্রশ্নটা পাঠকের মনে আসাটাই স্বাভাবিক। কারণ করোনা হলো বৈশ্বিক চরম এক ভাইরাস আর স্থানীয় সরকার মানেই স্থানীয়তাকেই স্থানীয় সরকার বুঝায়, তাহলে করোনার সাথে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সম্পর্ক কি? এর জবাব খুবই সহজ। আগেই বলেছি সচেতনতা করোনার থেকে মুক্তির কয়েক ধাপের মধ্যে প্রথম ধাপ। আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে সচেতন নই। যদি বলি চীনের উহান প্রদেশে এই করোনার উৎপত্তিস্থল। উহান তো কোন না কোন স্থানীয় ইউনিটের নাম। সেখানেতো মানুষের বসবাস। একটি এলাকা বা গ্রাম নিয়ে একটি ওয়ার্ড গঠিত হয়, কয়েকটি ওয়ার্ড নিয়ে একটি ইউনিয়ন গঠিত হয়। এইসব এলাকায় মানুষের বসবাস, তাকেই স্থানীয়তা বলে। আর ওইসব স্থানীয় পর্যায় কোন না কোন জনপ্রতিনিধি থাকে। ওইসব জনপ্রতিনিধিই হলো জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয় এবং জনগেণের কাছের। একটি গণতান্ত্রিক দেশের জনগণের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান হল স্থানীয় সরকার। এর প্রধান কাজ জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন ছাড়াও এলাকার শান্তিশৃংখলা সমুন্নত রাখা এবং সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা। সেজন্য গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা পরস্পরের পরিপূরক।

প্রাচীনকাল থেকেই দেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা একটি ঐতিহ্য বহন করে আসছে। প্রাচীন ভারতে একসময় গ্রামীণ শাসন ব্যবস্থার মূলভিত্তি ছিল নির্বাচিত বা মনোনীত ব্যক্তি নিয়ে গঠিত গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠান; পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। স্থানীয় সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণের সবচেয়ে কাছের সরকার না হবে ততক্ষণ একে স্বশাসিত বলা যাবে না এবং তাকে কেন্দ্রীয় সরকারের লেজুড়ভিত্তিক সরকার হিসেবে থাকতে হবে। স্থানীয় মানুষের সেবা ও উন্নয়নের জন্য দেশের প্রতিটি স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিটে গণতন্ত্রের ভিত হিসেবে যে স্বাবলম্বি ও স্বশাসিত সরকার ব্যবস্থা থাকে তাকেই গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বলে। নিয়ম অনুযায়ী স্বশাসিত স্থানীয় সরকার নিজস্ব আয় দ্বারা প্রথমে শতভাগ সিস্টেম কস্ট তথা দাপ্তরিক খরচ, নির্বাচিত প্রতিনিধি ও অনির্বাচিত কর্মকর্তা-কর্মীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ বিল, টেলিফোন বিল, ইন্টারনেট বিল, আপ্যায়ন ব্যয় ইত্যাদি নির্বাহ করবে এবং একই সঙ্গে নিজস্ব উদ্বৃত্ত আয়ে ও প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা নিয়ে নিজস্ব এলাকায় সেবামূলক, উন্নয়নমূলক, মাদক, সন্ত্রাসমুক্তসহ সচেতনতামুলক কর্মকান্ড পরিচালনা করবে।

তাই বলা যায়, স্থানীয় সরকার স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া মানেই গোটা দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া, এবং স্থানীয় সেবা ও উন্নয়ন মানেই সমগ্র দেশের সমষ্টিগত সেবা ও উন্নয়ন সেবা নিশ্চিত হওয়া। ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে প্রথমে স্থানীয় শাসন থেকে জাতীয় শাসন এসেছে। তারপর তারা জাতীয় রাষ্ট্রকে সাম্রাজ্যে বিস্তার করাতে সক্ষম হয়। এদেশেও পূর্বে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রজাতন্ত্র ছিল। এদেশের সীমান্তগুলো ইউরোপিয়ান দেশগুলোর মতো দূর্গম না হওয়ায় বিদেশীরা বারবার আক্রমণ করে দেশটিকে দখলে নিয়েছে। ফলে আমাদের দেশীয় শাসকরা নিজেদের রক্ষা করার কাজে ব্যস্ত থাকায় ‘স্থানীয় শাসন’ কোনো কাঠামো লাভ করতে সক্ষম হয়নি। বর্তমানে অনেকেই স্থানীয় শাসনকে কার্যকর করার কথা বলছেন। কিন্তু স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করার জন্য সময় ও দেশোপযোগী একটি নির্দিষ্ট ডিজাইন নিয়ে কেউ কথা বলছেন না। ফলে সর্বস্তরে গণতন্ত্রায়নের পক্ষে বাস্তবতা তৈরী হচ্ছে না। আর এসব ডিজাইনের কথা বলছেন সিডিএলজি নামে গবেষনা প্রতিষ্ঠান।

সরকার কর্তৃক ব্যপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। গণমাধ্যমেও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সচেতন করা হচ্ছে। করোনা থেকে মুক্তির জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ সচেতনতার জন্য সরকারিভাবে নির্দেশনা রয়েছে। এমনকি দুরুত্ব বজায় রাখতে প্রবাসিদের বাড়িতে লাল নিশান টানানো হয়েছে। তারপরেও কেন সচেতন হচ্ছিনা? এটি আমাদের মানসিকতার অভাব বা সচেতনার অভাব। একটি বাস্তব উদাহরণ দিতে চাইÐ বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আকন মো. সহিদ কয়েকদিন আগে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তার এলাকায় কয়েক প্রবাসির বাড়িতে লাল নিশান টানিয়েছেন এবং গ্রামের অনেক মানুষকে সচেতনতামুক কার্যক্রমের মাধ্যমে করোনা থেকে মুক্তির বিভিন্ন উপায় তুলে ধরেন। স্থানীয় সরকারই হচ্ছে স্থানীয়দের কাছের সরকার বা ইউনিট। স্থানীয় সরকার যেমন প্রবাসিদের খুজে খুজে বের করতে পারে তেমনি প্রতি ঘরে ঘরে করোনা প্রতিরোধে সচেতনতাও করতে পারে।

সহজভাবে বুঝা যায়, দুরবর্তি সরকার তথা কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনা স্থানীয়তে এসে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, যেটি স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকে বাস্তবায়ন সম্ভব এবং স্থানীয় পর্যায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও খুব কাছ থেকে সেবার কাজে পাওয়া যায়। করোনার মতো মহামারি বা বিভিন্ন রোগশোক যুগযুগ ধরে আসছে পৃথিবী যতদিন থাকবে এসব আসতেই পারে। যদিও করোনা আমাদের মাঝে এই প্রথম। তাই যে রোগ হাতে পারে সেই ব্যপারে আমরা আগেই সতেচন হওয়া উচিত।

স্থানীয় অধিবাসীরা ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন কিংবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের যে কোনো একটিতে বসবাস করে। স্বভাবতই করোনার মতো ভাইরাস রোধে বা এ থেকে মুক্তির জন্য সচেতনতা কার্যক্রমে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের ভূমিকা বা তদারকি থাকলে শুধু মানব পাচার প্রতিরোধ, স্থানীয় পর্যায় অপরাধ প্রতিরোধসহ করোনার মতো মহামারি থেকে স্থানীয়দের সচেতনতামুলক কার্যক্রমে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তথা স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন) ছাড়া দেশ যেমন গণতান্ত্রিক পন্থায় পরিপূর্ণভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়, তেমনি স্থানীয় সরকার ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার চাকাবিহীন গাড়ির মতো। তাই স্থানীয় সরকারের ইউনিটগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, এ স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে বিকেন্দ্রি করণ তথা ক্ষমতায়ন করতে হবে। ব্যক্তি থেকে শুরু করে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ, ঐক্যবদ্ধভাবেই আমাদের সচেতন হতে হবে। তার মুখ্য ভুমিকা পালন করতে পারে স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় সরকার যেহেতু জনগণের কাছের সরকার এ কারণে স্থানীয় পর্যায় সচেতনতামুলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমের বিকল্প নেই। প্রতিরোধের আগে সচেতন হতে হবে, করোনার মতো ভাইরাসের আক্রান্তের পুর্বেই সচেতন হলে হয়তো মুক্তি মিলতে পারে।

লেখক :সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক। ইমেইল: msi.khokonp@gmail.com, ফোন : ০১৭২১৩৩০০৯৪

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ