করোনা ভাইরাস : শেখ হাসিনার নতুন চ্যালেঞ্জ ও সাফল্য

প্রকাশিতঃ ৪:৪১ অপরাহ্ণ, বুধ, ২ সেপ্টেম্বর ২০

মো. শামছুল আলম

বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে বিপর্যস্ত বিশ্ব। যার প্রভাব এড়াতে পারেনি বাংলাদেশও। গত আট মাস ধরে অদৃশ্য এ শক্তির মোকাবিলার পাশাপাশি ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। এখন চলছে বন্যা। এসব প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে মানুষকে বাঁচাতে বহুমাত্রিক উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কর্মঘণ্টা ভুলে শক্ত হাতে একাই সামলে নিচ্ছেন সবকিছু। বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার। করোনার মধ্যেও থেমে নেই মেগা প্রকল্পগুলোর নির্মাণ কাজ। দেশের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ছে। অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে আমদানি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠায় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু গড় আয় ২ হাজার ৬৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আগের অর্থবছরে যা ছিল ১ হাজার ৯০৯ ডলার। অর্থাৎ দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় এক বছরের ব্যবধানে ১৫৫ ডলার বেড়েছে। করোনা সংকটকালে বাজার পরিস্থিতিও ছিল সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণে। অর্থাৎ করোনা, আম্ফান, বন্যা ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সফলভাবে সংকট মোকাবিলা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিশ্বজুড়ে সাত লাখেরও অধিক মানুষ এরই মধ্যে প্রাণ হারিয়েছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। মৃত্যুর মিছিল এখনো চলছে। ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত ও শক্ত অর্থনীতির দেশও আজ নাগরিকদের জীবন ও অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে দিশেহারা হয়ে এই মড়ক মোকাবিলার পথ খুঁজছে।

জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবমতে, বিশ্বে এখন পর্যন্ত দুই কোটি ৫৩ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। আর মৃত্যু হয়েছে ৮ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি মানুষের।

সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, ১ লাখ ৯৫ হাজার। আর আক্রান্ত হিসাবে শনাক্ত হয়েছে ৭০ লাখেরও বেশি মানুষ। নিউজিল্যান্ডে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

দক্ষিণ কোরিয়া ৫ মাসের মধ্যে নতুন রোগী শনাক্তের সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছে ১৫ আগস্ট। এদিন দেশটিতে নতুন ১৬৬ জন ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। গত ১১ মার্চের পর এটিই দক্ষিণ কোরিয়ায় সর্বোচ্চ আক্রান্তের সংখ্যা।

ব্রাজিলে ৩৩ লাখ ১৭ হাজারের বেশি, ভারতে ২৫ লাখ ৮৯ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে সরকারিভাবে।

রাশিয়ায় ৯ লাখ ২২ হাজার, দক্ষিণ আফ্রিকায় ৫ লাখ ৮৩ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে।

এ ভাইরাস সবচেয়ে দ্রুত গতিতে ছড়িয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে। বিশ্বে এ পর্যন্ত যত কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছে, তার ২৮ শতাংশই এসব দেশের। আর বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৩০ শতাংশও ঘটেছে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে।

করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তা এক বছরে ইনফ্লুয়েঞ্জায় মৃত্যুর সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ঠেকাতে পারছে না করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল। ইতালি, স্পেন, কানাডাসহ গোটা ইউরোপ মরণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে টিকে থাকতে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে করোনা মোকাবিলার লড়াইয়ে শক্ত অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ।

চীনের উহান প্রদেশ থেকে সূত্রপাত ঘটা করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের কাছেও ছিল সম্পূর্ণ নতুন, অচেনা এক অভিজ্ঞতা, এক অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে লড়াই। পরিস্থিতি অনুধাবনে কিছুটা সময় ব্যয়িত হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই যথাসম্ভব প্রস্তুতি নিয়ে করোনা মোকাবিলায় সচেষ্ট হয়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্বের বড় বড় দেশ যখন করোনা মোকাবিলায় মুষড়ে পড়ছে রীতিমতো, বাংলাদেশ সেখানে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে সামগ্রিক করোনা পরিস্থিতি। বিশ্বের বাঘা বাঘা সব দেশের তুলনায় করোনায় আক্রান্তের হার এবং এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশে এখনো অনেক কম। এটা সম্ভব হয়েছে যথাসময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যথার্থ পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে।

করোনা চলাকালে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ১৯টি প্যাকেজে ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এতে বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যেমন প্রণোদনা পেয়েছেন, বাদ যাননি করোনাযোদ্ধা চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরাও। তাদের জন্যও ঘোষণা করা হয় স্বাস্থ্যবীমা বা প্রণোদনা। করোনায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নিয়োগ দেওয়া হয় চিকিৎসক। নিশ্চিত করা হয় চিকিৎসা সুরক্ষাসামগ্রীও। সবকিছু শক্ত হাতে তদারকি করেন তিনি।

স্থবির অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নির্দেশনা আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। করোনা ইস্যুতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ৯৮টি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনার সে প্যাকেজকে প্রায় ১ লাখ কোটিতে উন্নীত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত গঠন করা হয়েছে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। নিজস্ব তহবিল থেকেই এ অর্থের জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সব মিলিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে অর্থনীতিতে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি নতুন ঋণ জোগানোর লক্ষ্য নিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মতৎপরতাকে অত্যন্ত মানবিক হিসেবে দেখছেন দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, যারা তিনবারের বেশি ঋণখেলাপি হয়েছেন, তারা প্রণোদনা তহবিলের ঋণ পাবেন না। তবে আমি মনে করি, তিনবার নয়, বরং দুবারের বেশি ঋণখেলাপি হয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠানকে প্রণোদনা প্রাপ্তির তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, সিএমএসএমই খাতের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করে নীতিমালা প্রকাশ করেছে। এ প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্যও ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাত এবং সিএমএসএমই খাতের ৫০ হাজার কোটি টাকা ঋণের অর্ধেকই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দিয়েছে।

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঋণগ্রহীতাদের বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ ও সুদ পরিশোধের বিষয়ে এ ছাড় দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ঋণের অর্থ পরিশোধ না করলেও কোনো ঋণগ্রহীতাকে খেলাপি করা হবে না। একই সঙ্গে এপ্রিল ও মে মাসের ব্যাংকঋণের সব সুদ স্থগিত থাকবে। এ দুই মাসের সুদকে ব্লকড হিসাবে স্থানান্তর করতে হবে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এ সুদ কোনোভাবেই গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা যাবে না।

দরিদ্র কৃষক ও কৃষির উৎপাদন বাড়াতে ৫ হাজার কোটি টাকা ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এতে বাদ পড়েননি মসজিদের ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসার শিক্ষক, নন-এমপিও শিক্ষক, গার্মেন্ট শ্রমিক, গ্রামপুলিশ, প্রতিবন্ধী, দুস্থ সাংবাদিকরাও। এমনকি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কথাও ভুলে যাননি সরকারপ্রধান। তাদেরও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানের জন্যও বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। গত রমজানের ঈদের আগে প্রতি পরিবারকে ২ হাজার ৫০০ করে ১ হাজার ২৫০ কোটি নগদ টাকা সহায়তা করা হয়েছে। দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয় ভিজিএফ, ভিজিডির পরিমাণ। রেশন কার্ডের আওতায় ১০ টাকা দরে চাল বিক্রি করা হয়। এতে ৫ কোটি মানুষ উপকৃত হয়েছে। শিশুদের জন্যও খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ ক্ষমতাসীন দলের কিছু কিছু জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও কাউকে এক চুল ছাড় দেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শতাধিক জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, করোনাকালে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেবে, কিন্তু শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বের কারণে কোনো সংকট সৃষ্টি হয়নি। বরং উৎপাদন ও খাদ্য মজুদ বেড়েছে।

করোনাযুদ্ধে জেতার লক্ষ্যে শুরু থেকেই এই লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। করোনা মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থবাণিজ্য বিষয়ক সাময়িকী ফোর্বসে। কানাডিয়ান লেখক অভিভাহ ভিটেনবার্গ-কক্স ফোর্বসের ওই নিবন্ধে নারী নেতৃত্বাধীন আটটি দেশের করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপের ওপর আলোকপাত করেছেন।

অর্থনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ষোলো কোটি দশ লাখের মতো মানুষের দেশ বাংলাদেশ সমস্যা-সংকটের সঙ্গে অপরিচিত নয়। তিনি এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সাড়া দিয়েছেন, যাকে ‘প্রশংসনীয়’ বলেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামও। করোনা মোকাবিলায় শেখ হাসিনা সরকারের এই স্বীকৃতিপ্রাপ্তি নিঃসন্দেহে আরো বেশি উদ্যমী হতে প্রেরণা জোগাবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার অসীম প্রজ্ঞা ও দূরদর্শী চিন্তাচেতনার আলোকে শুরুতেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, কোভিড-১৯ মোকাবিলার এই লড়াই সহজ কোনো কাজ নয়। করোনার আঘাত মোকাবিলায় একই সঙ্গে জীবন বাঁচানো এবং নিজের খাওয়া-পরার যুদ্ধ করতে হবে দেশের মানুষকে।

ষোলো কোটির অধিক জনগোষ্ঠীর ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশে যে কোনো সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া স্বাভাবিকভাবেই কঠিন। সরকারের জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল যে কোনো মূল্যে সংক্রমণ হারকে যথাসম্ভব নিম্নহারে বেঁধে রাখা। মার্চের শুরুর দিকে প্রথম করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পরপরই সংক্রমণের বিস্তার রোধে দেশের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

একই সঙ্গে জরুরি নয় এমন ব্যবসা-বাণিজ্য অনলাইনে পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত পরিসরে চালু রেখে সরকারি সব অফিস-আদালতের জন্য ঘোষণা করেছেন সাধারণ ছুটি। ২৬ মার্চ হতে অফিস-আদালতে সাধারণ ছুটি বলবৎ করেছেন। জরুরি সেবা কার্যক্রম ছাড়া সবকিছু বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার সময়োচিত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে এখনো বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণ ঘটেনি এবং পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পরপরই দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) ‘কন্ট্রোল রুম’ খুলে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রস্তুতি শুরু করা হয়। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও খোলা হয় ‘কন্ট্রোল রুম’।

জানুয়ারি থেকেই দেশের সব বিমান বন্দর, সমুদ্র বন্দর এবং স্থল বন্দরে বিদেশ প্রত্যাগতদের থার্মাল স্ক্যানার ও ইনফ্রারেড থার্মোমিটারের মাধ্যমে স্ক্রিনিং করা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় কমিটি এবং বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও কমিটি গঠিত হয়েছে। হটলাইনে দেওয়া হচ্ছে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ সংক্রান্ত তথ্য ও চিকিৎসাসেবা।

সংগ্রহ করা হয়েছে পর্যাপ্ত পিপিই এবং টেস্টিং কিটস। রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজনে দুই হাজার চিকিৎসক এবং পাঁচ হাজার চুয়ান্নজন সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশব্যাপী ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে কোভিড-১৯ রোগের পরীক্ষা এবং চিকিৎসা চলছে সুষ্ঠুভাবে।

একদিকে করোনা নিয়ন্ত্রণ, নিরাময় এবং অন্যদিকে চলছে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার দ্বিমুখী লড়াই। দোকানপাট-ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল মানুষ এবং নিম্ন আয়ের মানুষ যেন খাদ্য সংকটে না পড়ে সেজন্যে সরকার চালু করেছে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম। শিল্প-উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস কর্মী, পরিবহন শ্রমিক, দিনমজুর, কৃষি শ্রমিক ও রিকশা চালকসহ সবাই যেন তাদের স্ব স্ব ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারে, সেজন্য সরকার খাতভিত্তিক প্রণোদনা প্যাকেজ এবং আর্থিক সহায়তা প্রকল্প চালু করেছে।

দশ টাকায় চাল পেতে নতুন পঞ্চাশ লাখ রেশন কার্ডসহ মোট এক কোটি রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে এক কোটি পরিবারের পাঁচ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। চলতি মে মাস থেকে পঞ্চাশ লাখ পরিবারকে বিশ কেজি করে চাল দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। ২৬ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত আটষট্টি কোটি টাকার নগদ অর্থ সহায়তা এবং এক লাখ চব্বিশ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে নিম্ন আয় ও কর্মহীন মানুষদের মাঝে।

অন্যদিকে, শিশু খাদ্য সহায়ক হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বারো কোটি পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকা। করোনায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পঞ্চাশ লাখ পরিবার যারা অন্য কোনো সরকারি সহায়তা পায় না, তাদের মে মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিবার প্রতি দুই হাজার পাঁচশত টাকা এককালীন নগদ অর্থ দেওয়া হবে।

দেশব্যাপী এ পর্যন্ত চার কোটি সাত লাখ চল্লিশ হাজার মানুষকে ত্রাণ দিয়েছে সরকার। আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী মানুষের সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচলা নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার। করোনাকে শক্তহাতে মোকাবিলা করতে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

করোনাপরবর্তী সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খাতওয়ারি প্রায় এক লাখ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন; যা জিডিপির তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ। দেশের শিল্পরাজস্ব আয়ে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালনকারী তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের শতভাগ বেতন নিশ্চিত করতে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন তিনি।

একই সঙ্গে কৃষি সংরক্ষণ ও কৃষকের জন্যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছেন তিনি। সব অনাবাদি জমি চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসতে তিনি কৃষকদের আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ খাদ্যসংকট মোকাবিলায় নিজস্ব খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিকল্প নেই। আগামী বাজেটে তিনি নয় হাজার কোটি টাকা কৃষি ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আসছে বোরো মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ একুশ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাছাড়া সহজ শর্তে, জামানত ছাড়াই নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক ও প্রান্তিক/ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ কর্মসূচি নিয়েছে সরকার।

সারাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোতে আট কোটি একত্রিশ লাখ পঁচিশ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী করোনা ভাইরাস দুর্যোগে সব ধরনের ঋণের সুদ আদায় দুই মাস বন্ধ রাখবে ব্যাংকগুলো।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ফ্রন্ট লাইন ফাইটার বা সম্মুখ সারির যোদ্ধা চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনী ও বিজিবি সদস্য এবং প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের অন্য কর্মচারীদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রত্যক্ষভাবে করোনা আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ পুরস্কার ও প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন তিনি।

এজন্য একশত কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে যদি কেউ আক্রান্ত হন, তাহলে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে চিকিৎসা ছাড়াও পদমর্যাদা অনুযায়ী প্রত্যেকের জন্য থাকছে পাঁচ থেকে দশ লাখ টাকার এককালীন নগদ আর্থিক সহায়তা এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে এর পরিমাণ পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পাবে। এ ক্ষেত্রে বরাদ্দ রাখা হয়েছে সাত শত পঞ্চাশ কোটি টাকা।

সামগ্রিক বৈশ্বিক চিত্র বিবেচনায় এ কথা স্পষ্ট যে, করোনা পরিস্থিতির দ্রুত উপশমের কোনো পথ নেই। আগামী আরো বেশ কিছুদিন করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করেই টিকে থাকতে হবে বিশ্বকে। এ সময় পরিস্থিতি যতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, ততই মঙ্গল। শেখ হাসিনার সরকার করোনা সংকট নিরসন ও নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

সারাদেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, তদারকি ও ভাইরাস প্রতিরোধে চলমান কর্মসূচি-কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে বিভাগওয়ারি প্রতিটি জেলার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স চালিয়ে যাচ্ছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রান্তিক পর্যায়ের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন, দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।

তবে অদৃশ্য এই শত্রুকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়। সব পক্ষের সার্বিক সহযোগিতা এবং সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও পালনের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ।

লেখক : সহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।