চার পকেট ওয়ালা শার্ট ও আবেদ ভাই

প্রকাশিতঃ ৫:৩২ অপরাহ্ণ, মঙ্গল, ২৩ জুন ২০

আবদুল্লাহ আল জিয়াদ মূসা

আমার একাত্তরের স্মৃতি আছে ছবি নেই। কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের সাবেক ভিপি, সাবেক মনোহরদী থানা এবং বর্তমান বেলাব থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক জনাব এম আবেদ আহমেদ মুক্তিযুদ্ধে আমাদের আঞ্চলিক প্রধান এবং প্রবাসী সরকারের নিয়োগকৃত মনোহরদী থানা প্রশাসক। স্বাভাবিক ভাবেই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা আবেদ ভাইয়ের মুক্তিযুদ্ধকালীন কাজেরই অংশ।

আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি।
প্রায় প্রতিদিন আম্মার জন্য বাজার করা বা কোন না কোন কাজে বড়দের সাথে গুদারা পাড় হয়ে পোড়াদিয়া বাজারে আসতে হত। আমাদের বিশেষ করে আমি হক খলিফা নানার ( আবদুল হক খলিফা, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, পাটুলি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ) দর্জি দোকানে বসে থাকতাম। এমনই বসে আছি একদিন দুই তিনজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা নানার দোকানে এসে কুশলাদি বিনিময় করে বললেন ” উনি ” আসতেছেন। হক খলিফা নানা প্রতিউত্তরে বললেন “অসুবিধা ” নাই। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আবেদ ভাই আসলেন। ছাই রঙের চার পকেট ওয়ালা শার্ট একই কালারের ট্রাউজার। আবেদ ভাইকে দেখে মনে হল ছাইচাপা আগুন নিয়ে বিচরণ করছেন মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করতে। সবার সাথে কুশলাদি বিনিময় করে হক খলিফা নানাকে নিয়ে পিছনের রুমে চলে গেলেন। ইতোমধ্যে আবেদ ভাই আসার খবরে হক খলিফা নানার দোকানে ও বাইরে মানুষজন জড়ো হয়ে গিয়েছে যুদ্ধের খবরাখবর জানতে। আবেদ ভাই নানার সাথে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে উপস্থিত মানুষজনকে মুক্তিযুদ্ধের সময় সকলের করণীয় কি সে দিকনির্দেশনা দিয়ে দ্রুত চলে গেলেন।

#বলে রাখি, উনি বলতে-আবেদ ভাইয়ের কোড নেম। আর নানার, অসুবিধা নাই কোড হলো ক্লিয়ার। উনি আসতে পারেন।

#হক খলিফা নানার কাছ থেকে জানলাম পঁচিশে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন যা ওয়ারল্যাসে এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকে লিখিত আকারে পাঠানো হয় আঞ্চলিক কমান্ড প্রধান হিসেবে তা আবেদ ভাই বেলাব বাজারে বসে পান এবং ঘোষণা করেন ‘আজ থেকে বেলাব স্বাধীন ‘।

যাইহোক, এরই মাঝে বাজারে যারা কাজে আসেন তাদের ঘরে ফিরার পালা। আমার বড় ভাই ও আসলেন একসাথে বাড়ি যাওয়ার জন্য। উনাকে আমি বললাম ‘আমি চার পকেট ওয়ালা শার্ট বানাতে চাই ‘। ছোট চেকের ফ্লানেল কাপড় পছন্দ করে দিলে নানা মাপজোখ নিলেন। চা খাওয়া শেষে বড় ভাই বললেন এবার চল যাই। আমি যেতে গড়িমসি করছি আর বলছি শার্ট বানিয়ে নিয়ে তবেই যাব। হক খলিফা নানা ও বড় ভাই দুজনেই বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকলেন। নানা সম্পর্ক যেহেতু নানা একটু নরম সুরেই বললেন ‘ নানা ভাই, আমি গোসল করব নামাজ পড়ব দুপুরের ভাত খাব তারপর বাড়ি থেকে এসে তোমার শার্ট বানিয়ে দিব।

আমি নাছোড়বান্দা চারপকেটওয়ালা শার্ট বানিয়ে নিয়ে যাব। এরই মধ্যে মুরাদ মামা ( হক খলিফা নানার ছেলে) উপস্থিত। নানা ও বড় ভাই দুজনেই মুখ চাওয়া চাওয়ি করে মুরাদ মামাকে দায়িত্ব দিয়ে চলে গেলেন। সেদিন আমি আবেদ ভাইয়ের শার্টের মত শার্ট বানিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ি ফিরলাম।

সেই কিশোর বয়সে নাটক-সিনেমার কোন নায়কের নয়, মন কেড়ে নিয়েছিল রণাঙ্গনের একজন গেরিলা কমান্ডার এবং তাঁর পরিধানের চার পকেটওয়ালা শার্ট।

#স্মর্তব্য যে, এর অব্যবহিত কয়েকদিন পরই–একদিন মধ্য দুপুরে হঠাৎ গুলির শব্দ আমরা ছিলাম বাজারের উত্তর দিকে। শুনলাম কে যেন চিৎকার করে বলছে ‘ পাকিস্তানি আইছে পালাও। আমরা বিন্নাবাইদ এলাকার যারা ছিলাম ভোঁ দৌড়। ততক্ষণে গুদারা নৌকায় উঠে গেছি। বেশ কয়েক জন দৌড়ায়ে পানিতে পরলেন। গুদারা (খেয়ানৌকা) ধরতে না পেরে সাঁতরাতে লাগলেন। কে একজন মুরুব্বি বললেন নৌকা আস্তে চালা। পুরা নদী ওরা সাঁতড়ায়া পার হতে পারবে না। মূল নদীতে আাসার আগেই সাতড়িয়ে আসার সকলেই নৌকার ছইর গলুই ধরলে সকলে মিলে টেনে তুললেন। নদী পার হতে হতেই আমরা দেখলাম হক খলিফা নানার দোকান ঘর পুড়ছে।

পরে জেনেছি, এই হক খলিফা নানার ঘরেই আবেদ ভাই স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা বানিয়েছিলেন। বেলাব-মনোহরদীকে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করে ২৭ শে মার্চ সেই পতাকা মনোহরদী থানায় আবেদ ভাই তৎকালীন এমপিএ গাজী ফজলুর রহমানকে দিয়ে উড়িয়েছিলেন। আওয়ামীলীগের অনেক নেতাকর্মী সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিল।

আবেদ ভাই কিংবদন্তি। আমাদের আদর্শ। দীর্ঘ বায়ান্ন বছরের স্মৃতিতে মনে পড়ে না উনি কারও অনিষ্ট করেছেন। নির্লোভ নিরহংকার নেতা। মনোহরদী, বেলাব তদুপরি এতদঅন্চলে আওয়ামী রাজনীতির গোড়াপত্তন করেছেন আবেদ ভাই।

একদিকে মুসলিম লীগ অধ্যুষিত অঞ্চল অন্যদিকে ন্যাপ ( মোজাফফর), ন্যাপ ( ভাসানী) এলাকাতেই নিজেদের অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তাছাড়া প্রবাসী সরকারের নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মুজিব বাহিনীর ( বিএলএফ) টুকটাক দ্বন্দ্ব মাঝে মাঝেই কলহে রুপ নিত। এমন সকল বৈরী পরিবেশ সামাল দিয়ে আবেদ ভাই সত্যিকারের সেনানায়কের প্রজ্ঞা নিয়ে পুরো একাত্তর মুক্তিযুদ্ধের ফোর্সকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।

ত্যাগ করেছেন চাইতে আসেননি।

সর্বোপরি একাত্তরে মনোহরদী থানার মুক্তিযুদ্ধের প্রশাসক হিসেবে যেকোন সুযোগ সুবিধা নিতে পারতেন। কোন দিন নেননি।

মুক্তিযোদ্ধা,মুক্তিযুদ্ধ আপনার নামের সাথে সংপৃক্ত থাকবে দেশ যতদিন থাকবে। আবেদ ভাইয়ের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

বীর মুক্তিযোদ্ধারা জাতির সূর্যসন্তান–তাঁদের জানাই লাল সালাম।

আবদুল্লাহ আল জিয়াদ মূসা
লেখক ও সমাজসেবক।

সময় জার্নাল/

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।