ডায়াবেটিস নিয়ে রোজা : জানলে, মানলে, অনেক সোজা

প্রকাশিতঃ ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ, শনি, ২৫ এপ্রিল ২০

ডা. এজাজ বারী চৌধুরী (ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড, লালমাটিয়া):

চিকিৎসার দিক থেকে “ডায়াবেটিস” হলো বৈচিত্র্যতম রোগ, যার চিকিৎসা বারবার পরিবর্তন বা adjust করা লাগে৷ আবার একই ঔষধ বা ইনসুলিনের ডোজ একেক জনের উপর একেক রকম ফলাফল প্রদর্শন করে৷ ডায়াবেটিসের নিয়ন্ত্রন শুধু ঔষধ বা ইনসুলিনের উপর পুরোপুরি নির্ভর করেনা, আরো অনেক কিছুই এর সাথে জড়িত৷ সুতরাং আমার এই লেখাটা হয়তো সার্বজনীন হবেনা৷

তবুও লিখছি – এই চরম দুর্যোগে মানুষের কিছুটা হলেও উপকার করার মানসিকতায়৷

॥ ১॥ রোজায় কোন ঔষধ কখন খাবেন?

# ডায়াবেটিসের যেসব ঔষধ নাস্তার আগে খেতে হয়, সেগুলো ইফতারের শুরুতে খেয়ে ইফতার শুরু করবেন৷ এক্ষেত্রে স্বাভাবিক সময়ের মতো ১০ – ৩০ মিনিট অপেক্ষা করা যাবেনা৷

# ইনসুলিন নিয়েই ইফতার খেতে বসতে হবে৷ এক্ষেত্রেও নরমাল ইনসুলিন গুলোর ক্ষেত্রে যে ২০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়, সেটা করা যাবেনা৷ আর আধুনিক ইনসুলিনগুলোতে তো অপেক্ষা করাই লাগেনা, সাথে সাথেই খাওয়া যায়৷

# সেহরীতে ডায়াবেটিসের ঔষধ এবং ইনসুলিনের waiting period ঠিকই বজায় রাখবেন৷ নরমাল ইনসুলিনগুলো সেহরীর ২০ মিনিট আগে এবং আধুনিক ইনসুলিনগুলো সেহরী খাবার ৫ মিনিট আগে নিবেন৷

# থাইরয়েডের ঔষধ – Thyrox/Thyrin/Thyronor ইত্যাদি সেহরীর অন্তত আধা ঘন্টা আগে খাবেন৷

# প্রেশারের ঔষধ – সকালের গুলো সেহরীতে এবং রাতের গুলো ইফতারে খাবেন৷ তবে আপনার প্রেশার যদি ঔষধ খেয়ে খুব স্বাভাবিক থাকে (১১০/৭০) তবে সেহরীতে ঔষধের ডোজ একটু কমানো লাগতে পারে৷ কারণ, ১৪ ঘন্টার বেশী আপনি পানি খেতে পারবেন না৷ ফলে ঔষধের ডোজ না কমালে, আপনার প্রেশার কমে যেতে পারে৷

# কোলেষ্টেরল এবং হার্টের ঔষধ – কোলেষ্টেরলের ঔষধ (Atova/Rosuva/Tiginor/Rocovas ইত্যাদি) রাতে খাবার আগে এবং প্রচলিত হার্টের ঔষধ (রোগীদের ভাষায়) যেমনঃ Clopid/Ecosprin/Pladex ইত্যাদি রাতের খাবারের পর খাবেন৷

# প্রষ্টেটের ঔষধ – যেমন Uromax/Maxrin/Prostacin ইত্যাদি আগের সময়েই (রাতে) খাবেন৷

# ভিটামিন – একবেলা থাকলে রাতের খাবারের পর খাবেন৷ দুইবেলা থাকলে, সেহরী আর ইফতারের পর খাবেন৷

# গ্যাসের বড়ি – সেহরীর ১৫-২০ মিনিট আগে খাবেন৷ ইফতারে এই অপেক্ষাটা কিন্তু করা যাবেনা৷ গ্যাসের বড়ি খেলেও সাথে সাথেই ইফতার শুরু করবেন৷

॥ ২॥ ডায়াবেটিস কখন মাপবেন?

# বিকেল তিনটা থেকে চারটার মধ্যে একবার মাপবেন৷ এই সময়ের সুগারের মাত্রা দেখে, আপনার সেহরীর ঔষধ এবং ইনসুলিনের ডোজ adjust করতে হবে৷

# আরেকবার মাপবেন, ইফতারের দুই ঘন্টা পর৷ এই সময়ের সুগারের মাত্রা দেখে, আপনার ইফতারে ডায়াবেটিসের ঔষধ এবং ইনসুলিন adjust করতে হবে৷

# আঙ্গুল থেকে রক্ত নিয়ে, গ্লুকোমিটারে সুগার মাপলে, রোজার কোন ক্ষতি হবেনা৷

॥ ৩॥ কখন রোজা ভেঙে ফেলবেন?

# খুব অসুস্থ বোধ করলে

# বেলা তিনটা-চারটার সময় সুগারের মাত্রা ৩.৫ এর কম পেলে৷

# সেহরী করতে না পারলে৷

॥ ৪॥ রোজায় খাওয়া দাওয়ার নিয়মঃ

# সেহরীর শেষ সময়ের কাছাকাছি সময়ে খাবেন, বেশী আগে না৷

# দৈনিক মোট ক্যালরীর পরিমান একই থাকবে৷ অর্থাৎ এখন ১৬০০ ক্যালরীর খাবার খেলে, রোজাতেও একই রাখবেন৷

# ইফতার থেকে সেহরী পর্যন্ত প্রচুর পানি এবং তরল খাবেন৷ যেমনঃ ডাবের পানি, শরবৎ (কম চিনিযুক্ত বা চিনিবিহীন), দুধ, টক দইয়ের লাচ্ছি, ডাল ইত্যাদি৷

# ইফতারে ভাজাপোড়া এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার কম খাবেন৷

# সেহরী এবং ইফতারে আঁশযুক্ত খাবার বেশী খাবেন৷ যেমনঃ ভাত, রুটি, সব্জি, ডাল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, দই, ফলমূল, সালাদ ইত্যাদি৷

॥ ৫॥ রোজা রেখে ব্যায়াম করার নিয়ম কি?

# ইফতারের পর বা তারাবীহ নামাজের পর বা রাতের খাবারের পর ব্যায়াম করবেন বা হাঁটবেন – দিনের অন্য কোন সময় নয়৷

# পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং ২০ রাকাত তারাবীহ নামাজ যারা পড়বেন, তাদের আর অতিরিক্ত কোন ব্যায়াম বা হাঁটার দরকার নেই৷

॥ ৬॥ রোজা রেখেও কোন কোন ঔষধ ব্যবহার করতে পারবেন?

# চোখ ও কানের ড্রপ৷
# চামড়ায় লাগানোর ক্রীম৷
# সাপোজিটরী
# অক্সিজেন
# ইনজেকশন (তবে শিরাপথে দেয়া পুষ্টির ইনজেকশন নয়)
# জিহবার নীচে দেবার ট্যাবলেট বা স্প্রে (হার্টের ব্যথা উঠলে)৷

॥ ৭॥ রোজা রাখা কাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং নিরুৎসাহিত করা হয়?

# যাদের ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত (সুগার ১৫ এর বেশী থাকে)
# গুরুতর কিডনী সমস্যা থাকলে
# চোখের রেটিনায় গুরুতর সমস্যা থাকলে
# নিউরোপ্যাথি বা নার্ভে সমস্যা থাকলে
# যারা হাইপো হলে বা সুগার কমে গেলেও বুঝতে পারেননা৷
# যাদের হার্টে গুরুতর সমস্যা
# গর্ভবতী
# ক্যান্সারের রোগী
# যাদের তীব্র পেপটিক আলসার
# গুরুতর এজমা রোগী
# লিভারে সমস্যা থাকলে
# গুরুতর মানসিক সমস্যা থাকলে৷

॥ ৮॥ রোজায় ডায়াবেটিসের ঔষধের ডোজ কি হবে?

যাদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে নেই, তারা প্রথমে ডাক্তারের পরামর্শে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রন করে, তারপর সেই ঔষধ বা ইনসুলিনের মাত্রা থেকে এই নিয়মে রোজার ডোজ ঠিক করবেন৷ যাদের ডায়াবেটিস এখন নিয়ন্ত্রনে আছে অর্থাৎ খালি পেটে সুগার ৫ – ৬.৫ এবং তিন বেলাতেই খাবার দুঘন্টা পরের সুগার ৮ -১০ এর মধ্যে আছে তাদের রোজার সময় ঔষধ খাবার বা ইনসুলিন নেবার নিয়ম হলো:

# রাতে ডায়াবেটিসের যে ঔষধ এবং ইনসুলিন নিচ্ছেন, সেগুলো অর্ধেক ডোজে সেহরীর সময় নিবেন৷ আর ইফতারের সময় নিবেন সকালের ঔষধ বা ইনসুলিন – সকালের সমান ডোজেই৷

এককথায় মনে রাখবেন – ডায়াবেটিসের ঔষধ এবং ইনসুলিন রাতের গুলো অর্ধেক হয়ে সেহরীতে যাবে আর সকালের গুলো পূর্ণ ডোজেই ইফতারে চলে আসবে৷ এটা হলো simple ফর্মূলা৷

# অর্থাৎ কেউ যদি রাতে ২০ ইউনিট Mix (30/70 বা 50/50) বা খাবার আগের (Actrapid/Novo Rapid/Maxulin-R/Humalog ইত্যাদি) ইনসুলিন এখন নেন, তিনি সেহরীতে ১০ ইউনিট নিবেন৷ একই ভাবে কেউ যদি Gliclazide (Dimerol/Comprid/Glizid ইত্যাদি) রাতে ১টা খান, তিনি সেহরীতে অর্ধেক খাবেন৷

# যাদের তিনবেলা ইনসুলিন নিতে হয়, তারা দুপুরের ইনসুলিনটা অর্ধেক করে রাতে খাবারের আগে নিতে পারেন৷ এবারের রোজা সাড়ে চৌদ্দ ঘন্টা থেকে পনের ঘন্টা হবে৷ অর্থাৎ বাকী নয় থেকে সাড়ে নয় ঘন্টায় যাদের তিনবার ইনসুলিন নিতে হবে, তাদের জন্য এই বাড়তি সতর্কতা৷ এছাড়া অধিকাংশ মানুষই ইফতার বেশী খেয়ে, রাতের খাবারটা কম খান৷ এটাও এই ডোজ কমাতে বলার আরেকটা কারণ৷ তবে এই ডোজটার সঠিক পরিমান নির্ধারণ করতে পারবেন আপনার ডাক্তার, যিনি আপনার শরীর, জীবনধারন, অভ্যেস, খাবার মেন্যু ইত্যাদি সম্পর্কে ভালো অবগত৷

# যারা কেবল একবেলা (রাতে) Basal Insulin নিচ্ছেন যেমনঃ Lantus/Abasaglar/Tresiba/Levemir ইত্যাদি তারা একই ডোজ রাতের একই সময়ে নিতে পারেন৷

তবে যাদেরকে এর সাথে অন্য ইনসুলিন বা ঔষধ (Amaryl/Secrin/Diamicron MR/Comprid/Dimerol/Glizid/Consucon ইত্যাদি) ব্যবহার করতে হচ্ছে, তারা Lantus/Abasaglar/Tresiba ইত্যাদির ডোজ অন্তত ২০% কমাবেন৷ অর্থাৎ আগে ২০ ইউনিট নিয়ে থাকলে, রোজায় ১৬ ইউনিট করে নেবেন৷

# যারা তিনবেলা Metformin 500 mg (Metfo/Comet/Oramet/Nobesit/Informet ইত্যাদি) খাচ্ছেন, তারা সেহরীতে ১টি এবং ইফতারে ২টি ট্যাবলেট খাবেন, রাতের খাবারের পর খাবার দরকার নেই৷ যারা দুইবেলা Metformin 500 XR বা SR বা LA এর খাচ্ছেন, তারাও সেহরী ও ইফতারে ১টি করে খেতে পারেন তবে XR এর পরিবর্তে plain Metformin খেতে পারেন৷ যেমনঃ Comet XR এর পরিবর্তে Comet.

# যারা Sitagil M / Glipita M / Lijenta M / Galvus Met ইত্যাদি combination (Sitagliptin/Vildagliptin/Linagliptin + Metformin) খাচ্ছেন, তাদেরও ডোজ একই রাখলে সমস্যা নেই৷ তবে যাদের দুই বেলাতেই 50/1000 বা 50/850 চলছে তারা সেহরীর জন্য ৩০টা 50/500 কিনে নেবেন৷ অর্থাৎ সেহরীতে চলবে 50/500 কিন্তু ইফতারে 50/1000 বা 50/850 চলবে৷

# যারা সকালে Glimepiride (Amaryl/Secrin/Diaryl/Losucon) খাচ্ছেন, তারা একই ডোজে ট্যাবলেটটি ইফতারের শুরুতে খাবেন৷

# যারা তিনবেলা খাবার আগে Nomopil বা Premil বা Gluretor খাচ্ছেন, তারা ইফতারে পূর্ণ ডোজ এবং রাতের খাবার ও সেহরীর আগে অর্ধেক ডোজে খেতে পারেন৷

# যারা Piodar 15 বা Lit 15 খাচ্ছেন তাদের ডোজ কমানোর দরকার নেই৷ এটা রাতের খাবারের আগে খেতে পারেন৷

# যারা Jardiance/Empa খাচ্ছেন, তারা তাদের ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন – রোজার ডোজ সম্পর্কে জানার জন্য৷ এটা খেলে ইফতারে খাবেন৷

॥ ৯॥ শেষের শুরুঃ

আপনার চিকিৎসকের পরামর্শই আপনার জন্য সেরা, যিনি আপনার ডায়াবেটিসকে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছেন এবং যিনি শুধু ঔষধের বাইরেও আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন – আপনার পেশা, Lifestyle, অভ্যেস, বদভ্যেস, মানসিক চাপ, খাবার মেন্যু ইত্যাদি৷

লেখাটা পড়ার পরও হয়তো অনেক প্রশ্ন রয়ে যাবে আপনার মনে৷ আমি উত্তর দেবার চেষ্টা করবো, সবার সব প্রশ্নের৷

সবার জন্য রইলো পবিত্র রমজানের শুভকামনা৷ আল্লাহ আপনাদের সবাইকে সুস্হ রাখুন এবং বরকতময় রোজা সুন্দরভাবে পালনের তৌফিক দান করুন৷

Ejaj Bari Choudhury.
ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ৷
সিটি হাসপাতাল, লালমাটিয়া৷ ঢাকা

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ