ঢাকায় ৩ লাখের বেশি পথশিশু মাদকাসক্ত

প্রকাশিতঃ ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ, মঙ্গল, ১৭ ডিসেম্বর ১৯

নিউজ ডেস্ক: নেশার মরণ খেলায় রাজধানী ঢাকায় মাদকাসক্ত পথশিশুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। জুতার গাম বা আঠা সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায় বেশির ভাগ সময় নগরীর পথ-ঘাটে বসবাসকারী ছিন্নমূল শিশুরা এ নেশায় ডুবে থাকে। বছরজুড়ে মাদকবিরোধী অভিযানকালে আঠা দিয়ে বিশেষ কায়দায় তৈরি ‘ড্যান্ডি’র নেশায় মত্ত ভাসমান শিশুদের অহরহ চোখে পড়ে। এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে তিন লাখের বেশি মাদকাসক্ত পথশিশু রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকের নেশা এসব শিশুর জীবনীশক্তি ধ্বংস করে দিচ্ছে। বর্তমানে এসব শিশুরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

মহাখালী ফ্লাইওভারে শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে ড্যান্ডির নেশায় মত্ত চার শিশু-কিশোরকে দেখা যায়। তাদের একজন সোহাগ (১২) নিজের বাড়ির ঠিকানাও ভুলে গেছে!

সোহাগ জানায়, বাবা-মায়ের সঙ্গে সে তেজগাঁও রেলওয়ে বস্তিতে থাকত। রিকশাচালক বাবার মৃত্যুর পর তার মা আরেকজনকে বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছে। দুই বছর ধরে পথই তার ঠিকানা। সারা দিন ভাঙারি কুড়িয়ে যা আয় করে তা বিক্রি করে সে ড্যান্ডির নেশা করে।

সোহাগ জানায়, এগুলো খাইলে কেউ মারলেও গায়ে লাগে না! আরেক কিশোর বলে, ‘কী করব, বাপ-নাই, মা নাই, ঘর-বাড়ি নাই। যা আয় করি তা এ নেশার পেছনে ওড়াই। এ জীবন রাখার চেয়ে আস্তে আস্তে মরে যাওয়া ভালো।

শুধু এ দু’জনই নয়, শহরের বিভিন্ন স্থানে এমন অসংখ্য পথশিশুকে নেশায় মত্ত থাকতে দেখা যায়। রাজধানীর সদরঘাট, কমলাপুর, গুলিস্তান, সচিবালয়সংলগ্ন ফুটপাত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকা, রমনা পার্ক, পলাশী মোড়, দোয়েল চত্বর, চানখাঁরপুল, শহীদ মিনার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বর, ফার্মগেট, তেজগাঁও রেলস্টেশন, যাত্রাবাড়ী, গাবতলী, বিমানবন্দর এলাকা, মিরপুর স্টেডিয়ামের আশপাশ, বস্তি বিভিন্ন ফুটওভার ব্রিজের ওপর ও নিচে, বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় সবচেয়ে বেশি মাদকাসক্ত পথশিশুর দেখা যায়। তাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প ঘুরেফিরে একই রকম। নেশার টাকা জোগাড় করতে অনেকে চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে। পথশিশুর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধপ্রবণতাও বাড়ছে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুসারে, পথশিশুদের ৮৫ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট ও ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে। ঢাকা শহরে কমপক্ষে ২২৯টি স্পটে ৯ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা মাদক সেবন করে। ভাসমান শিশু-কিশোররা সাধারণত গাঁজা, ড্যান্ডি, পলিথিনের মধ্যে গামবেল্ডিং দিয়ে এবং পেট্রোল শুঁকে নেশা করে। ভাঙারি টোকানো বা কাগজ কুড়ানোর মধ্যেও পলিথিনের প্যাকেটে মুখ ঢুকিয়ে তারা ড্যান্ডি সেবন করে। ড্যান্ডি সেবন সরাসরি মাদক আইনে না পড়ায় আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারছে না আইনশৃঙখলা বাহিনী।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এমএমএ সালাহউদ্দীন কাউসার বলেন, ড্যান্ডির নেশায় কিডনি ও লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে সেবনে ক্যান্সারও হতে পারে। এছাড়া মস্তিষ্কে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। নাকের ভেতরে ঘা হয়। এ ধরনের মাদকে শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়। তিনি বলেন, শিশুরা ড্যান্ডি সেবন করায় এর ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

কেন্দ্রীয় মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালট্যান্ট ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন বলেন, শুধু ড্যান্ডি নয়, সব ধরনের নেশা শিশুসহ বড়দের জন্য ক্ষতিকর। এ ধরনের মাদকাসক্ত শিশুদের লিভার, ফুসফুসসহ দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নষ্ট হয়ে যায়। ধীরে ধীরে শিশুর মেধাশক্তি কমে যায়। একপর্যায়ে মৃত্যুর মুখে পড়ে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক খুরশিদ আলম বলেন, জুতার আঠা নিষিদ্ধ নয়। এ কারণে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। অনেক ভাসমান শিশু-কিশোর এ নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, একমাত্র সচেতনতাই পারে মাদকাসক্তকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ