দেশীয় প্রযুক্তিতে ভেন্টিলেটর তৈরি করতে চাই

প্রকাশিতঃ ১:৪১ অপরাহ্ণ, শনি, ১১ এপ্রিল ২০

নাজমুল আক্তার শাহীন, রাজারহাট, কুড়িগ্রাম : দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্পমূল্যে ভেন্টিলেটর তৈরিতে আগ্রহী ইলেকট্রোমেডিক্যাল প্রকৌশলী গণ। বাংলাদেশের সকল সরকারি হাসপাতালের মেডিকেল যন্ত্রপাতি ফ্রীতে সার্ভিসিং ও মেইনটেনেন্স করে দিতে চায় তারা । সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে মোট ভেন্টিলেটরের সংখ্যা ১২৫০, এরমধ্যে বাংলাদেশের সকল সরকারি হাসপাতালে মাত্র ৫০০ আর বেসরকারিতে ৭৫০ টি।

ইলেকট্রোমেডিক্যাল প্রকৌশলী না থাকায় সার্ভিস ও মেইনটেনেন্স এর অভাবে বেশির ভাগ ভেন্টিলেটর মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে দিনের পর দিন। কোন সার্ভিস ফি ছাড়াই , প্রয়োজনীয় এক্সোসরিজ ও কাজের সুযোগ দিলে প্রকৌশলীগণ সেবা দিতে প্রস্তুত।

করোনা ভাইরাসের অনেকটাই একমাত্র অবলম্বন এই ভেন্টিলেটর মেশিন। কোন অনুদান প্রণোদনা নয়, করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে নিজের দক্ষতা যোগ্যতা ও মেধার অ্যাপ্লিকেশন ঘটাতে চায় ডিপ্লোমা ইন ইলেকট্রোমেডিক্যাল প্রকৌশলীগণ । এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক সহযোগিতা প্রার্থনা করছেন ইলেকট্রোমেডিক্যাল প্রকৌশলীগণ।

দেশে ৬১০টি সরকারি হাসপাতালের জন্য মাত্র ১৯ জন চিকিৎসা যন্ত্র প্রকৌশলী কাজ করছেন। তাদের কাজ মেডিকেল যন্ত্রপাতি ইনস্টল সার্ভিস ও মেনটেনেন্স করা। পর্যাপ্ত প্রকৌশলী না থাকায় রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় কর্তৃপক্ষকে। ফলে সময়মতো মেরামত করতে না পারায় নষ্ট হচ্ছে হাসপাতালের অতি প্রয়োজনীয় কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম। এতে সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগ্য সনদধারী থাকার পরও হাসপাতালে পদ ও নিয়োগ না থাকায় বেকার জীবনযাপন করছেন অসংখ্য চিকিৎসা যন্ত্র প্রকৌশলী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন হাসপাতাল সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি হাসপাতালে প্রতিনিয়তই অকেজো হওয়া চিকিৎসা যন্ত্রপাতি মেরামতের দরকার হয়। সে হিসেবে সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে প্রায় পাঁচ হাজার চিকিৎসা প্রকৌশলী বা ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার প্রয়োজন। সেখানে রয়েছে মাত্র ১৯ জন। এর মধ্যে ৯ জন বিএসসি প্রকৌশলী এবং ডিপ্লোমা প্রকৌশলী রয়েছেন ১০ জন। অথচ ডিপ্লোমা ইন ইলেকট্রো মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং (বিএসসি) সম্পন্ন করে বেকার রয়েছেন কয়েক হাজার চিকিৎসা যন্ত্র প্রকৌশলীগণ।

শরীফুল ইসলাম নামে ডিপ্লোমা ইন ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস এক শিক্ষার্থী বলেন, সম্প্রতি সরকার ৪ হাজার ৪৪৩ জন এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ দিয়েছে। এ হিসাবে সারাদেশে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার ডাক্তার ছাড়াও অসংখ্য মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট ও নার্স আছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবার মানদন্ড অনুসারে প্রতি ১০ জন চিকিৎসকের বিপরীতে একজন চিকিৎসা প্রকৌশলী থাকা দরকার।

গত বছর (২০১৯ সালের ৯ মে) ডিপ্লোমা ইন ইলেকট্রো মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম জাতীয় সম্মেলন তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী প্রত্যেক সরকারি হাসপাতালে অন্তত একজন ডিপ্লোমা ইন ইলেকট্রো মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগদানের ঘোষণা দিলেও আজোবধি তার বাস্তবায়ন হয়নি। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, একটি এনজিওগ্রাম মেশিনের দাম ৫ থেকে ৬ কোটি ও সিটি স্ক্যানের মূল্য ৭ কোটি টাকার মতো।

এসব মেশিন নষ্ট হওয়ার পর সচল করতে ৭ দিন থেকে ১ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। আবার মেশিনের গুরুত্ব অনুযায়ী, বাজেট বরাদ্দ, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও প্রয়োজনে বাইরে থেকে টুলস ইমপোর্ট করতে হয়। আর মেরামতের জন্য প্রকৌশলীর সংকট তো রয়েছেই।

বেসরকারি মেডিকেল প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের কাজের সুযোগ থাকলেও, সরকারিভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া একেবারেই বন্ধ। জানা গেছে, হাতেগোনা কয়েকটি হাসপাতালে দু’য়েকজন জনবল থাকলেও সেখানে ওয়ার্কশপ ও মেরামতের জনবল ও নেই কোন উপকরণ ।

ফলে সামান্য কারণে যন্ত্রপাতি অকেজো হলেও মেরামত বাবদ বেসরকারি সরবরাহকারী কোম্পানি কয়েক লাখ টাকার ভাউচার ধরিয়ে দেন। অথচ স্বাস্থ্যসেবা মানদন্ড অনুযায়ী প্রতি ৫০ বেডের রোগীর চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সার্ভিসিং ও মেইনটেনেন্স জন্য এমএসসি/বিএসসি পর্যায়ের ৩ জন ও সহকারী ডিপ্লোমা ইন ইলেকট্রোমেডিক্যাল প্রকৌশলী ৭ জনসহ অন্তত দশজনের দক্ষ জনবল টিম থাকার কথা।

এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হেলথ বুলেটিন-২০১৮ তথ্যমতে দেশে ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ, ৩৯টি স্নাতকোত্তর চিকিৎসা ইনস্টিটিউট, ৪টি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া ১১ থেকে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ৪২৪টি উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স ১৮ হাজার ৯৯৩টি শয্যা ও জেলা পর্যায়ের ৫৯টি হাসপাতালে ৯ হাজার ৬০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। যাদের মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ রোগীকে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

এসব রোগীকে সেবা দিতে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে পুরানো যন্ত্রপাতি ছাড়াও ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশের সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ১৫টি এমআরআই মেশিন, ২০টি সিটি স্ক্যান মেশিন, ৯০টি অটো অ্যানালাইজার মেশিন, ৪৩টি ইকো কালার ডপলার মেশিন, ১৭টি বঙ্কোস্কপি মেশিন, ৫টি ব্রাকিথেরাপি, মেশিন, ৪টি কোবাল্ট মেশিন, ১২টি আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন ও ৯৮টি এক্সরে মেশিনসহ মোট ৪১৯টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে।

অন্যদিকে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি মেরামতের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আওতাধীন ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইন্টেনেন্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (নিমিও অ্যান্ড টিসি)। তবে নিমিও কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ১৯৮৫ সালে নিমিও প্রতিষ্ঠার পর ৯৫টি পদ তৈরি করা হয়। এর মধ্যে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার (স্নাতক) ১৩ জন ও ডিপ্লোমা ইলেকট্রোমেডিক্যাল প্রকৌশলী ২২ জন।

তবে ১৩ জনের মধ্যে ৪টি পদ শূন্য রয়েছে যার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন। আর ২২ জন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর মধ্যে আছেন ১০ জন। সবমিলে ৯৫টি পদের মধ্যে বিএসসি ও ডিপ্লোমা প্রকৌশলী আছেন ১৯ জন। আর নিমিওতে মোট জনবল আছেন ৫৫ জন, যা চাহিদার তুলনায় এই সংখ্যা খুবই নগণ্য।

হাসপাতালের জনবল সংকটে বিভাগীয় পর্যায়ে একটি করে নিমিউ এর ইঞ্জিনিয়ারিং সেল গঠন, ঢাকা শহরে ৫টা জোনাল অফিস খোলা ও সারাদেশে ৫৩৮ জন জনবল নিয়োগের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সবশেষে নিমিউ অ্যান্ড টিসির চিফ টেকনিক্যাল ম্যানেজার মো. আমিনুর রহমান বিষয়টা স্বীকার করে বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া রোগ নির্ণয় সম্ভব হয় না বলে স্বাস্থ্যসেবার জন্য চিকিৎসা যন্ত্রপাতি খুব জরুরি।

তবে সংকট কমাতে দুই বছর আগেই ২৮১টি নতুন পদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এখন জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জনবল সংকট কমাতে সবমিলে ৫৩৮টি পদ সৃষ্টির কাজ চলছে, যা আগামী সচিব কমিটির মিটিংয়ে অনুমোদনের জন্য তুলে ধরা হবে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যসচিব ৪০ জন বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও ২০২ ইলেক্ট্রো মেডিকেল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছে। যেটিও আগামী এক বছরের মধ্যে হয়ে যাবে। তখন জোনাল অফিস বিভাগীয় অফিস চালু হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

প্রকৌশলী সংকটের বিষয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রকৌশলী বেলাল আহমেদ বলেন, হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে দুইটি প্রকৌশলী পদ তৈরি করা হয়েছিল। তবে জব ডিসক্রিপশন বা পদের যোগ্যতা কী হবে তা উলেস্নখ্য না থাকায় আজোবধি কোনো নিয়োগ হয়নি। আবার ওয়ার্কশপ ও টুলস না থাকায় জনবল থাকলেও কাজ করা সম্ভব হয় না।

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইলেকট্রো মেডিকেল টেকনিশিয়ান মো. খলিলুর রহমান বলেন, তিনি মূলত হাসপাতালের বৈদ্যুতিক সমস্যার কাজ করেন। তার সঙ্গে মাত্র একজন ইন্সট্রুমেন্ট কেয়ারটেকার বা আইসিটির টেকনেশিয়ান রয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজে নিয়োজিত মেশিন সরবরাহ কোম্পানির টেকনিশিয়ান বলেন, সামান্য ত্রুটিজনিত কারণে বছরের পর বছর অচল থাকছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের ভারী যন্ত্রপাতি। আর যন্ত্রপাতি ত্রুটিমুক্ত রাখার জন্য প্রকৌশলী না থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন দরিদ্র রোগীরা।

১৩ বছর আগে দেশের ৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ইলেকট্রো মেডিকেল বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও পদ সৃষ্টি হয়নি। এছাড়া ১৫টি টারশিয়ারি ও ১৭টি বিশেষায়িত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩২টি চিকিৎসাকেন্দ্র আছে। সেখানে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার তিনশত জন ও ডিপ্লোমা ইন ইলেকট্রোমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার একহাজার জন, এছাড়াও টেকনিশয়ান ও হেলপারসহ পনেরশো জনবল দরকার।

লেখক : বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার

সান হেলথ কেয়ার ফাউন্ডেশন। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ (হসপিটাল)

যোগাযোগ: 01738376151 ইমেইল- nazmulaktershahin@gmail.com

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ