দেশে কতজন ডাক্তার প্রয়োজন?

প্রকাশিতঃ ৫:০৪ অপরাহ্ণ, শুক্র, ১৩ ডিসেম্বর ১৯

অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন :

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ মেডিক্যাল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল থেকে নিবন্ধনকৃত আনুমানিক সত্তর হাজার এমবিবিএস পাশ করা ডাক্তার সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে কর্মরত। তারমধ্যে ক্যাডার-নন ক্যাডার মিলিয়ে প্রায় ত্রিশ হাজার ডাক্তার সরকারী পর্যায়ে কাজ করছেন। বর্তমানে শতাধিক মেডিক্যাল কলেজ থেকে প্রতিবছর প্রায় দশ হাজার ছাত্র-ছাত্রী ডাক্তার হয়ে বের হচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যে কোন দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য একজন ডাক্তার থাকা উচিত। জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশসহ ৪৪% দেশে এখনো জনসংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাক্তারের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ২৫০০ জন মানুষের জন্য একজন ডাক্তার রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে এই মুহূর্তে আমাদের কমপক্ষে দেড় লাখ ডাক্তার থাকা দরকার ছিল।

আমাদের দেশে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে চাকুরি বলতে এখনো সরকারী চাকুরিই বুঝি। পাশ করার পর অধিকাংশ ডাক্তারের স্বপ্ন থাকে বিসিএস পাশ করে সরকারী চাকুরিতে যোগ দেবার। কিন্ত প্রয়োজনের তুলনায় পদ স্বল্পতার কারণে অধিকাংশ ডাক্তারেরই এই স্বপ্ন আজকাল অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। সরকারী ডাক্তারের চেয়ে দেশে এখন বেসরকারী ডাক্তারের সংখ্যা বেশী। ভবিষ্যতে বেসরকারী খাতে ডাক্তারের সংখ্যা দিনদিন আরো বাড়বে। জনগণের স্বাস্থ্য সেবায় এই বিশাল বেসরকারী চিকিৎসকদের কিভাবে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে নীতি নির্ধারকদের এখনি ভাবতে হবে। বর্তমানে বেসরকারী স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক ধরণের হযবরল অবস্থা বিরাজমান। দু:খজনক হলেও সত্য যে, ঢাকা শহরে একজন নবীন বেসরকারী ডাক্তারের চেয়ে একজন রিক্সাওয়ালার মাসিক আয় তুলনামূলকভাবে বেশী। আমি জানি না, এই দু:সহ বাস্তবতা আমাদের নীতিনির্ধারক কিংবা পেশাজীবী নেতাদের আদৌ ব্যথিত করে কি না! বাংলাদেশে একজন গার্মেন্টস কর্মীর ন্যূনতম বেতন নির্ধারিত থাকলেও একজন নবীন ডাক্তারের ক্ষেত্রে তা নাই। দালাল পরিবেষ্টিত ক্লিনিক ব্যবসায়, মুনাফার লোভে মালিকরাও যে যার মত পারছে নবীন ডাক্তারদের পারিশ্রমিক প্রদানের বেলায় ঠকাচ্ছে। এসব অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দেখবার যেন কেউ নাই।

উন্নত বিশ্বে রেফারেল সিস্টেম চালু আছে। ইমার্জেন্সি বা জরুরী অবস্থা ব্যতীত যে কোন অসুখের জন্য রোগীকে প্রথমে একজন সাধারণ এমবিবিএস পাশ করা বা সমমানের কোন ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। এই ডাক্তারদের সাধারণত জেনারেল প্রাক্টিশনার বা ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান বলা হয়। এরা প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর যদি মনে করেন রোগীর উন্নতমানের চিকিৎসা লাগবে, তাহলেই কেবল তারা রোগীকে প্রয়োজনীয় বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠান বা রেফার করেন। আমাদের দেশের মত সামান্য সর্দি-কাশি বা ঠাণ্ডা জ্বর হলেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে সরাসরি চলে যাবার সুযোগ সেখানে নাই। এর ফলে জেনারেল প্রাক্টিশনাররা যেমন সাধারণ রোগীদের দেখার সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররাও অপ্রয়োজনীয় রোগী দেখে সময় নষ্ট না করে জটিল রোগীদের অধিক মনোযোগ সহকারে দেখতে পারবেন। এর ফলে ডাক্তারদের ভবিষ্যত ক্যারিয়ার গড়ার ব্যাপ্তিও বাড়বে। এখন যেমন ডাক্তারদের মধ্যে এফসিপিএস, এমডি, এমএসসহ বিভিন্ন ধরণের স্নাতকোত্তর ডিগ্রী করার জন্য এক প্রকার অসুস্থ উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে, সেটিও তখন অনেকাংশে হ্রাস পাবে। গুরুত্ব বাড়বে এমবিবিএস ডিগ্রীরও। বর্তমানের মত তখন আর এমবিবিএস ডিগ্রীকে গুরুত্বহীন মনে করার অবকাশ কমে যাবে। এমবিবিএস পাশ করার পরে সবাইকেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিতে হবে এমন কোন কথা নাই।

দেশে রেফারেল পদ্ধতি চালু করতে হলে নীতি নির্ধারনী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি এমবিবিএস ডিগ্রীর মান নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে দেশে সরকারী-বেসরকারী মিলিয়ে যে শতাধিক মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে, সবগুলোর শিক্ষার মান সমান কিংবা কাছাকাছি নয়। অনেক মেডিক্যাল কলেজ তো করা হল, এখন এগুলোর শিক্ষার মান নিশ্চিত করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। এমবিবিএস ডিগ্রীধারী ডাক্তারকে কেন্দ্র করেই যেহেতু রেফারেল সিস্টেমের চিকিৎসা সেবা প্রদান আবর্তিত হয়, সেহেতু এমবিবিএস পাশ করা ডাক্তারকে দক্ষ হিসেবেই গড়ে তুলতে হবে। ডাক্তারের চিকিৎসা সংক্রান্ত সকল কর্মকাণ্ডকেই নিয়মিত তদারকির মধ্যে রাখতে হবে। নিয়মিত তাদের প্রেসক্রিপশন অডিট করতে হবে যাতে ডাক্তারের পক্ষে কোন রকমের ম্যাল প্রাক্টিস করার অবকাশ না থাকে। নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে যদি রেফারেল সিস্টেমের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে তা বাস্তবায়নে পৃথিবীর বহু দেশ থেকেই সহায়তা পাওয়া যাবে। নতুন করে খুব বেশী কিছু আবিষ্কার করতে হবে না।

স্বাস্থ্যখাতে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার সংকট থাকলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয় স্বাস্থ্য সেবা প্রত্যাশী জনগণ। যদিও বাংলাদেশের প্রচলিত মিথ অনুযায়ী, স্বাস্থ্যখাত মানে শুধু ডাক্তার। জনগণের আচরণ দেখে মনে হয়, ডাক্তারের কাছে কোন মতে হাজির হতে পারলেই হল, ডাক্তার যে কোন রোগীকেই চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ্য করতে পারবেন। এমন কী মুমূর্ষ অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসা প্রদান সত্বেও যদি রোগীর মৃত্যু হয়, তাও ডাক্তারের দোষ। ইদানীং আবার চালু হয়েছে ‘ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’র মত ডাক্তারদের বিরূদ্ধে ঢালাও অভিযোগ। পরিস্থিতি জটিল করতে গোঁদের উপর বিষফোঁড়ার মত আরো যোগ হয়েছে গ্রামে-গঞ্জে-মফস্বলে হাতুড়ে ডাক্তার এবং নানা রকমের ডিগ্রীধারী ভূয়া ডাক্তার। এদের ভুল চিকিৎসার খপ্পড়ে পড়ে অসংখ্য রোগীর জীবন বিপন্ন হয়, রোগকে জটিলতর করে এইসব রোগীরা যখন প্রকৃত ডাক্তারের কাছে আসে, ততক্ষণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনেক দেরী হয়ে যায়। ডাক্তারের তখন চিকিৎসা করার তেমন কোন সুযোগ থাকে না। এই বাস্তবতার পাশাপাশি, প্রয়োজনীয় বাজেট, চিকিৎসা ও ঔষধ সামগ্রী এবং অনুকূল পরিবেশ না থাকলে ডাক্তারদের পক্ষেও সর্বোচ্চ চিকিৎসা প্রদান যে কষ্টসাধ্য – এই বোধটা এখনো সাধারণ জনগণের ভেতরে সেভাবে গড়ে ওঠেনি। বরং স্বাস্থ্যখাতের যে কোন সীমাবদ্ধতার জন্য অভিযোগের আঙ্গুল ডাক্তারের দিকেই উত্তোলিত হয়। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ও তা সঠিক ভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা, চিকিৎসা ও ঔষধ সামগ্রী সরবরাহ এবং জনবল নিয়োগসহ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা তো প্রধানত সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, ঢালাওভাবে ডাক্তারদের নয়। এই সত্য কেন আমরা এড়িয়ে যেতে চাই?

আমার ধারণা, ২০৪১ সালে দেশে প্রতি এক হাজার জন মানুষের জন্য ন্যূনতম একজন ডাক্তার থাকবে। তবে শুধু পর্যাপ্ত সংখ্যক ডাক্তার থাকলেই হবে না, সেই সাথে আনুপাতিক হারে নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারীদেরও সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে নিয়োগ দিতে হবে। আমাদের দেশে বর্তমানে ডাক্তারের চেয়ে নার্সদের সংখ্যা কম। অথচ এর উল্টো হবার কথা ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিজন ডাক্তারের জন্য তিনজন নার্স থাকা আবশ্যক। চিকিৎসার মত নার্সিংও যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পেশা, সেটাকেও আমাদের অনুধাবন করতে হবে। চিকিৎসা সেবাকে যদি একটি দলগত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যায়, সে ক্ষেত্রে একজন চিকিৎসক হবেন দলনেতা আর সে দলের সদস্য হবেন নার্স, প্যারামেডিক্স, টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে ওয়ার্ড বয়, সুইপার পর্যন্ত। রোগীর সুচিকিৎসার স্বার্থে সেবা প্রদানকারী এই দলের মধ্যে চমৎকার সমন্বয় গড়ে ওঠা জরুরী।

বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের এই বিস্ময় যাত্রা যদি কাঙ্খিত গতিতে অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হবে। উন্নত দেশ হতে হলে দেশের স্বাস্থ্যখাতেরও টেকসই উন্নয়ন হতে হবে। স্বাস্থ্যখাতের যথাযথ উন্নয়ন ছাড়া উন্নত দেশের কাতারে বাংলাদেশের নাম লেখানোর প্রচেষ্টা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।

অধ্যাপক ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন- কবি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি এন্ড রাইটস।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ