দ্য স্লীপিং বিউটি

প্রকাশিতঃ ৪:২৪ অপরাহ্ণ, শুক্র, ১০ জুলাই ২০

শাফিনুর রহমান :

ফ্রান্সিস ইয়ারব্রো ছিলেন প্রথম মার্কিন নারী যিনি কোনো বাড়তি অক্সিজেন ছাড়াই এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখেছিলেন। ১৯৯৮ সালের ২২ মে। ফান্সিস আর তার রুশ স্বামী সের্গেই আর্সেন্তিভ কোনো শেরপার সাহায্য ছাড়া, কোনো বাড়তি অক্সিজেন ছাড়া এমন এক দুঃসাহসিক সাফল্য অর্জন করেন।

ফ্রান্সিস এবং সের্গেই দুজনেই ছিলেন শখের পর্বতারোহী। আশির দশকে ফ্রান্সিস পেশায় ছিলেন একাউন্ট্যান্ট। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাবার সাথে কলোরাডোর পাথুরে পর্বতগুলো চষে বেড়িয়েছেন। তারপর যুক্তরাষ্ট্র আর সুইজারল্যান্ডে স্কুল-কলেজ জীবন কাটাবার সময় স্কিইং এর সাথে পরিচয়, সেখান থেকেই তুষার আর বরফে ঢাকা পর্বতের প্রতি তার ভালবাসার জন্ম। অন্যদিকে সের্গেই ছিলেন একজন সোভিয়েত রকেট সায়েন্টিস্ট। কিন্তু পাহাড়-পর্বতে চড়ার প্রচণ্ড নেশা থেকে তার ডাকনাম হয়ে যায় স্নো-লিওপার্ড। ১৯৯০ সালে প্রথম সোভিয়েত পর্বতারোহী হিসেবে তিনি অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই এভারেস্ট জয় করেন। স্নায়ুযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে টুকরো হবার ঠিক আগে সেটি ছিল মার্কিন-চীনা-সোভিয়েত যুগ্ম অভিযান। সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ তাকে মিখাইল গর্বাচেভ ন্যাশনাল ফ্রেন্ডশিপ মেডাল দিয়ে পুরষ্কৃত করেন।

পরের বছর এই হিমালয়েই ফ্রান্সিস আর সের্গেই এর পরিচয় হয়। ফ্রান্সিস তখন লোবুচে, আইল্যান্ড, পোকাল্ডে আর মেরা পর্বত চষে বেড়াচ্ছেন। আর সের্গেই জয় করার চেষ্টা করছেন অন্নপূর্ণার প্রথম চূড়া। নিজের অভিযান শেষ করে ফ্রান্সিস খুম্বু হিমবাহ পাড়ি দিয়ে সোভিয়েত ক্যাম্পে পৌঁছুলেন। সের্গেই এর সাথে ক্যাম্প টু পর্যন্ত উঠলেন। জো ডি স্টেফানোর সাথে ফ্রান্সিসের প্রথম সংসার ভেঙ্গে গিয়েছিল বেশ আগেই, সের্গেইও তার স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন এক মোটর দুর্ঘটনায়। নিজেদের জীবনের গল্পগুলো জানবার ফাঁকে কখন যেন একে অন্যের প্রেমে পড়ে গেলেন।এক বছর বাদে নেপালে সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাশিয়ান কনস্যুলেটে রেজিস্ট্রারের দপ্তরে দুজন আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের প্রেমকে পরিণয়ে রূপ দিলেন। বিয়ের পরেই দুজন উড়াল দিলেন পশ্চিমে। ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এলব্রাস জয় করলেন একসাথে। নামবার পথে নতুন রেকর্ড গড়লেন ফ্রান্সিস—প্রথম মার্কিন নারী হিসেবে এলব্রাসের চূড়া থেকে নিচে নেমে এলেন স্কি করে। সে এক দুঃসাহসী হানিমুন! সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দুই জাতির দুজন মানুষ তাদের এমন রোমাঞ্চকর যাত্রার কারণে পরিচিত হলেন ‘রোমিও এন্ড জুলিয়েট অফ দ্য কোল্ড ওয়্যার’ হিসেবে।

সের্গেই-এর কাজ ছিল সোভিয়েত স্পাই স্যাটেলাইট নিয়ে। সুতরাং ফ্রান্সিসকে বিয়ে করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাবার আগে রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের অনুমতি যোগাড় করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল তাকে। পরের বছরের গ্রীষ্মে দুজন যুক্তরাষ্ট্রে চলে এলেন। ফ্রান্সিস আর সের্গেই-এর ইচ্ছা ছিল মাউন্টেইন-গাইডিং এর ব্যবসা করার। নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নামও ঠিক করেছিলেন—Trek around the world।কিন্তু নানা কারণে আর তা হয়ে উঠে নি। সের্গেই এক স্থানীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাঠের কাজ শুরু করলেন, নিজেদের জন্যেও বাড়ি তৈরি করলেন, ফ্রান্সিস ফিরে এলেন সেই ঘর সাজাবার কাজে। আর সময় সময় দুজন মিলেই বিশ্বজুড়ে ট্রেক করে বেড়ালেন। আলাস্কা গেলেন, জয় করলেন উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বত ডেনালি। বছর বছর রাশিয়ায় গিয়ে বিভিন্ন চূড়ায় চড়তে লাগলেন। পামির মালভূমির পূর্ব কোণের দুর্গম এলাকায় প্রায় ছয় হাজার মিটার উচ্চতার এক পর্বতে দুজন প্রথমবারের মতন পা রাখলেন, সে পর্বতের নামও রাখলেন তারাই—মাউন্ট গুডউইল।

গুডউইল পর্বত থেকেই সম্ভবত ফ্রান্সিসের সাধ হল সের্গেই এর মতন অক্সিজেন ছাড়াই পৃথিবীর শীর্ষে চড়ার। এমন স্বপ্নকে গুডউইলই বলা চলে। তিব্বত থেকে এভারেস্টের উত্তর দিকের ঢাল বেয়ে উঠবেন তারা। বছর দুয়েক প্রস্তুতি নিয়ে দুজনেই ফিরে এলেন এভারেস্টের উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রথম গন্তব্যে— নেপালের কাঠমান্ডু। ১৯৯৮ সালের সেই অভিযান শুরুর ঠিক আগের দিন কলোরাডো থেকে মধ্যরাতে এগার বছরের পল ডি স্টেফানো মায়ের কাছে ফোন করল; দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেছে তার। ভয়াবহ তুষারঝড়, চারপাশে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া সাদা, এর মাঝে দুজন মানুষ আটকে আছেন, কোন ভাবেই তা থেকে পরিত্রাণ মিলছে না। ফ্রান্সিস বুঝতে পারলেন ছেলের ভয়। কিন্তু তখন আর ফিরে যাবার উপায় নেই। ছোট্ট পলকে নরম সুরে নানান আদুরে কথায় বুঝিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। বেস ক্যাম্পে পৌঁছে আরও একবার ছেলেকে আশ্বস্ত করার জন্যনিজের যাত্রাপথের মানচিত্র এঁকে তাতে চিরকুট লিখলেন— “Hi Paul! We’re at Base Camp. Miss you and love you. XXX Mom.”

আরও মাসখানেক বাদে, ২২ মে, ১৯৯৮ সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় প্রথম মার্কিন নারী পর্বতারোহী হিসেবে ফ্রান্সিস আর্সেন্তিভ পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতে পা রাখেন। সের্গেই তার ক্যামেরায় সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ঝকঝকে ছবি স্মৃতির ক্যানভাসে তুলে রাখেন।

নথিপত্র অবশ্য ভিন্ন কথা বলবে। ফ্রান্সিস ইয়ারব্রো ডি স্টেফানো আর্সেন্তিভের এই অর্জনের আঠারো বছর পর ২০১৬ সালে মেলিসা আর্নট ষষ্ঠবারের মতন এভারেস্টে আরোহণ করবেন। সেবারে তিনি অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই চূড়ায় পা রাখবেন। অক্সিজেন ছাড়া এভারেস্ট জয় করাপ্রথম মার্কিন নারী হিসেবে রেকর্ড বইয়ে মেলিসা আর্নটের নাম লিখা থাকবে। আপাতঃদৃষ্টিতে কাগজে-কলমের ছোট্ট এই ভুল যেন আরেকবার মনে করিয়ে দেয়—কেবল চূড়ায় উঠলেই সাগরমাতাকে জয় করা যায় না। কিন্তু ফ্রান্সিসকে ভুলে যাওয়া কেন?

এভারেস্টের চূড়ায় চড়বার চেয়ে নেমে আসাটা কঠিন, সাফল্যের সিংহভাগ সেখানেই নির্ভর করে। নির্ধারিত সময়ের মাঝে চূড়া থেকে ফিরতি যাত্রা শুরু না করলে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা কমে আসে প্রতি মুহূর্তে। এভারেস্টের পথে আট হাজার মিটার উচ্চতার পর থেকে ডেথ জোন শুরু হয়। প্রত্যেক পর্বতারোহী সেখানে যত কম সম্ভব সময় কাটানোর চেষ্টা করেন। অথচ ফ্রান্সিস আর সের্গেই মে মাসের ১৯ তারিখে ৮২০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প সিক্সে উঠে আসার পর নানা দুর্যোগে সেখানেই দুই রাত কাটাতে বাধ্য হন। প্রথম রাতে প্রায় সাড়ে আট হাজার মিটার উচ্চতা পর্যন্ত গিয়ে নিজেদের হেডল্যাম্প হারিয়ে নেমে আসতে হয়। দ্বিতীয় রাতেও আবহাওয়ার বৈরিতায় বেশি দূর যাওয়া হয়ে উঠে নি। তৃতীয় রাতে শেষবারের মত নিজেদের সামিট ক্লাইম্ব শুরু করেন। স্বাভাবিকভাবেই বেশ অস্বাভাবিক রকমেরএক ক্লান্তি এসে তাদের উপর ভর করেছিল। আর যেহেতু অক্সিজেন ছাড়া চলছিলেন, তাদের গতি ছিল ধীর। ফলে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখতে তাদের বেশ দেরি হয়ে যায়। এভারেস্ট থেকে বেঁচে ফেরার অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে বেলা দুটোর মধ্যে নিচে নামতে শুরু করা, যেন রাতের আঁধার নেমে আসার আগেই ক্যাম্পে ফিরে আসা যায়। উজবেকিস্তানের পর্বতারোহী রুস্তম রাদগাপভ যখন বিকেল পৌনে ছয়টা নাগাদ চূড়া থেকে নেমে আসছিলেন তখনো ফ্রান্সিস আর সের্গেই সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে প্রায় একশ মিটার নিচে। রাদগাপভ তাদের সাথে প্রায় পঞ্চাশ মিটারের মতন উপরের দিকে ফিরে যান, পুরোটা সময় তাদেরকে বুঝান ঝুঁকির কথা, চেষ্টা করেন ফিরিয়ে নেবার জন্য। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের এত কাছে এসে ফিরে যেতে রাজি হন নি ফ্রান্সিস বা সের্গেই কেউই। রাদগাপভ ফিরে গিয়েছিলেন। স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল, তবে পূর্ণতা পায় নি। আর্সেন্তিভদের ফিরতি যাত্রা শুরু করতে করতে রাত নেমে আসে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় অন্ধকারে দুজন বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।

সারারাত পথ চলে সের্গেই সকালে ক্যাম্পে নেমে এসে দেখলেন তার প্রিয়তমা তখনো এসে পৌঁছায় নি। ২৩ মের সেই সকালেফ্রান্সিসকে প্রথম দেখতে পায় উপরে উঠতে থাকা আরেকটি উজবেক দল। এভারেস্টের উত্তর দিকের পথে ফার্স্ট স্টেপের নিচেতারা তাকে অবচেতন অবস্থায় খুঁজে পান। নিজেদের অভিযান বিসর্জন দিয়ে দুজন অভিযাত্রী তাকে রক্ষার চেষ্টা করেন। খানিক বাদে দক্ষিণ আফ্রিকার আরও কয়েকজন এলে সবাই মিলে ধরে তাকে প্রায় শখানেক মিটার নিচে নামিয়েও নিয়ে আসেন। কিন্তু ফ্রান্সিস তার ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিজে নড়াচড়া করতে পারছিলেন না। উজবেক অভিযাত্রীরা তাইখুব একটা সুবিধা না করতে পেরে অক্সিজেনের বোতল আর মাস্ক দিয়ে ফিরে যান। রেডিও বার্তায় ক্যাম্পে খবর পৌঁছে যায় সের্গেই-এর কাছে। সব অবসাদ ভুলে অক্সিজেন, গরম চা আর মেডিসিন নিয়ে আবার উপরে ছুটলেন তিনি। ফ্রান্সিস যেখানে পড়ে ছিলেন তার খুব কাছেই সের্গেই এর দড়ি আর আইস-এক্স পাওয়া যায়, কিন্তু তাকে আর দেখা যায় নি।

পরের দিন, ২৪ মে,  আবার ব্রিটেনের ইয়ান উডঅল, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাথি ও’ডাউড আর তাদের দল উপরে উঠবার সময় ফ্রান্সিসকে দেখতে পান। নিজেদের ট্র্যাক থেকে বেশ খানিকটা দূরে —বেগুনী রঙের জ্যাকেটে মোড়া ক্ষুদ্র একটি দেহ এলোমেলো পড়ে ছিল। মৃতদেহ ভেবে পাশ কাটিয়ে চলে যাবার সময় ক্যাথি তাকে সামান্য একটু নড়তে দেখেন। ফ্রান্সিসের দেহে প্রাণ থাকলেও নিজেকে বাঁচানোর আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট ছিল না, না শারীরিকভাবে, না মানসিকভাবে। হাইপোথার্মিয়া তার মাঝে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল, হাতের গ্লাভস ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, ভারি জ্যাকেটের স্লিভ থেকে নিজের হাত বের করে অবচেতনভাবে পড়ে ছিলেন বরফের মাঝে। ফ্রস্টবাইটের কারণে ইতোমধ্যে তার মুখ আর হাত ভীষণভাবে আক্রান্ত হয়ে ছিল। ক্যাথি তাদের ট্র্যাক ছেড়ে তার কাছে গেলে শুধু একটাই আকুতি ভেসে এলো, “Don’t leave me here to die!” তারা তাদের নিজেদের অভিযান বাদ দিয়ে ফ্রান্সিসকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। উজবেক একটা দলও তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু ফ্রান্সিসের অবশ দেহ তাদের সমর্থন করে নি। তারা বাধ্য হয়েছিলেন তাকে ওখানে রেখেই নেমে আসতে। ফেরার আগে তারা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে প্রয়োজনীয় সাহায্য নিয়ে তারা আবার ফিরে আসবেন। ফ্রান্সিস সম্ভবত বুঝতে পারেন নি, তিনি ভেবেছিলেন তারা তাকে ইচ্ছে করে ফেলে চলে যাচ্ছে। তার চেতনা ছিল, কিন্তু অবচেতন প্রলাপ বকার মত বারবার একই কথা বলছিলেন —তার আমেরিকান পরিচয়, সাহায্যের আবেদন, তাকে একা ফেলে না যাওয়ার জন্য আকুতি। তার উচ্চারণ করা শেষ বাক্য “Why are you doing this to me!” আজও তাড়িয়ে বেড়ায় ক্যাথিকে। পরের দিন আরেকটা উজবেক দল নেমে এসে জানায় ফ্রান্সিসের মৃত্যু সংবাদ। দিনটি ছিল ২৪ মে, ১৯৯৮, বিশ্বের প্রথমনারী হিসেবে অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়া পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়ের রেকর্ড তৈরি করার পর ইতোমধ্যে আরও দুদিন পার হয়েছে।

এক বছর পর, ১৯৯৯ সালে, অনেকটা নিচে, জর্জ ম্যালরি আর এন্ড্রু আরভাইনের খোঁজে যাওয়া অভিযাত্রী দলসের্গেই-এর জমে থাকা দেহ খুঁজে পায়। ধারণা করা হয় আলগা হয়ে থাকা বরফ চূর্ণের উপর দিয়ে চলার সময় তিনি নিচে পড়ে যান। কেউ জানে না তিনি তার স্ত্রীর কাছে পৌঁছুতে পেরেছিলেন কি না, ভালোবাসার স্পর্শে পরস্পরকে খানিক উষ্ণতা আর ভরসা দিতে পেরেছিলেন কি না। তা জানবার কোনো উপায় আর নেই। তবে এভাবে ভাবতে ভাল লাগে যে সের্গেই ফ্রান্সিসের কাছে এসেছিলেন। তাকে ভালবাসার আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে ভরসা দিয়েছিলেন। নিজ হাতে গরম চা মুখে তুলে দিয়ে চাঙ্গা করার চেষ্টা করেছিলেন। অক্সিজেন আর ওষুধ দিয়ে প্রেয়সীকে শান্ত করে রেখে তারপর সাহায্য নিয়ে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আবার নিচে নেমে আসতে শুরু করেছিলেন। প্রিয় মানুষটি ফিরে এসে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে —এই বিশ্বাস ফ্রান্সিসকে সেই চরম বৈরি পরিবেশেও বাঁচিয়ে রেখেছিল প্রায় দুদিন।

ফ্রান্সিসকে বাঁচাতে গিয়ে সেবছরের যাত্রা বাতিল করতে হয় ক্যাথির। পরের বছর ১৯৯৯ সালেই তিনি আবার ফিরে যান এভারেস্টে। তিনি বিশ্বের প্রথম নারী যিনি উত্তর এবং দক্ষিণ দুদিক থেকেই এভারেস্ট জয় করেছিলেন। ক্যাথি ও’ডাউড সে ঘটনার প্রায় দু’বছর পর ২০০০ সালেদ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় ফ্রান্সিসকে চরম পরিণতির জন্য ফেলে আসতে বাধ্য হবার সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। বড় মর্মস্পর্শী সেই গল্প।

২০০৯ সালে বিবিসি রেডিওর ‘দ্য চয়েস’ প্রোগ্রামেও জানিয়েছেন তার সেই যাত্রার কথা। স্বপ্নের চূড়া থেকে কয়েকশ মিটার দূরে থেকে একজন মানুষকে বাঁচাতে যাওয়া আর এই দুইয়ের মাঝে প্রাধান্য ঠিক করার কঠিন সিদ্ধান্তের মানবীয় সঙ্কটের কথা আছে সেই বিবৃতিতে। ফ্রান্সিসকে এমন প্রতিকূলতার মাঝে ফেলে আসার পর ক্যাথি মানসিকভাবে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করেছিলেন নিজের ভেতর, পর্বতারোহণের প্রতি তার সহজাত আকর্ষণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তার নিজের ভাষায়, “I climb because I enjoy it. I climb for the pleasure of the activity, of the surroundings. There was no pleasure left. I wanted to be down, to be off the mountain, to have both feet on flat ground.”

ফ্রান্সিসের দেহটা এভারেস্টের উত্তর দিকের ট্র্যাক থেকে স্পষ্ট দেখা যেতো। সটান শুয়ে থাকা সুন্দর চেহারার এক তরুণী, যার বয়স আর কখনোই বাড়বে না। মনে হত যেন ক্লান্ত কোনো এক আরোহী একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছে যাত্রার বিরতির মধ্যে। তার নাম দেয়া হয়েছিল দ্য স্লীপিং বিউটি। পরবর্তী নয় বছর উত্তর দিক থেকে এভারেস্ট আরোহণকারীদের পথ প্রদর্শক হয়েছিল এই স্লীপিং বিউটি। ২০০৭ সালের ২৩ মে তাঁর দেহকে আরেকটু নিচে নামিয়ে এনে সৎকারের কাজ করেন ইয়ান উডঅল। ঠিক নয় বছর আগে ফ্রান্সিসকে বাঁচাতে না পারার মনঃকষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করার জন্য তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিব্বতের দিকে উত্তর দিকের ঢালে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে সমাহিত করা হয় তার দেহ। মার্কিন পতাকার লাল সাদা রেখা আর তারার নিচে ঘুমিয়ে আছেন ফ্রান্সিস। তার দেহের পাশে গুঁজে দেয়া আছে আদরের সন্তান পল ডি স্টেফানো এর হাতে লিখা চিঠি।

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০।

তথ্যসূত্রঃ

Brown, J. (2007, May 2). Woman who died on Everest buried three years later. The New Zealand Herald. Retrieved from https://www.nzherald.co.nz/world/news/article.cfm?c_id=2&objectid=10437328
Dimuro, G. (2018, April 24). The Finals Hours Of Francys Arsentiev – Mount Everest’s “Sleeping Beauty”. Retrieved from all that’s interesting: https://allthatsinteresting.com/francys-arsentiev
EverestNews.com. (2007). Before David Sharp there was Fran… Everest News. Retrieved from http://www.everestnews.com/stories2007/fran05012007.htm#top
HARRIS, P. (2007, April 30). Everest climber returns to mountain to bury woman he was forced to abandon 9 years ago. Daily Mail. Retrieved from https://www.dailymail.co.uk/news/article-451798/Everest-climber-returns-mountain-bury-woman-forced-abandon-9-years-ago.html
O’Dowd, C. (2000). Don’t leave me here to die. In C. O’Dowd, Just for the Love of It. Free To Decide Publishing. Retrieved from https://www.theguardian.com/theguardian/2000/feb/15/features11.g2?fbclid=IwAR3lHImSQwzDOzxOWh280fX4R7PMymUI-5eQM7oivq9iblBIaITHScAAIjU
Tweedie, N. (2007, May 6). Peace at last for Sleeping Beauty. The Age. Retrieved from https://www.theage.com.au/world/peace-at-last-for-sleeping-beauty-20070506-ge4tpo.html

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।