ইলিয়ানা রহমানের
ধারাবাহিক গল্প : অন্যরকম কেউ (পর্ব-২)

প্রকাশিতঃ ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ, সোম, ২৭ মে ১৯

(১ম পর্বের পর)

ডাঃ অনুপমের হাতে আঠারো বছর বয়সী অবিবাহিতা মেয়ে মিমির তলপেটের আল্ট্রাসনোগ্রাফের রিপোর্ট।
এই মিমি মেয়েটি তার কলিগ ডাঃ যুথীর পেশেন্ট। ডাঃ অনুপম ভিতরে ভিতরে প্রচন্ড অবাক। আলট্রাস্নোর কাগজটিতে অস্পষ্ট কালচে ধোঁয়ার মত কিছু দেখা যাচ্ছে। ধোঁয়াটা কেমন মানবাকৃতির অবয়বের মত। দুটো ছোট ছোট হাত আর দুটো পা এর অবয়ব পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। কিন্তু মনে হচ্ছে তা রক্ত মাংসের না, বরং ধোঁয়ায় তৈরী।
ডাঃ অনুপম এবং ডাঃ যুথি বেশ অনেকক্ষন ধরে আলট্রাসনোগ্রাফটি দেখলেন। তারা দুজনেই কোনোভাবেই বুঝতে পারছেন না, জরায়ুর ভেতর এমন জিনিস কিভাবে থাকতে পারে। দ্বিতীয় বারের মত মিমিকে আবারো আল্ট্রাসনোর জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হলো।

ডাঃ অনুপম যুথিকে জিজ্ঞাসা করলেন,
” এই মেয়ে কি বলছে? মানে কতদিন আগে সম্পর্ক হয়েছে?”
–” দুসপ্তাহ আগে হয়েছে বলছে। আর তোমাকে তো আগেও বললাম, মিমি বলছে তার সাথে কেউ ঘুমের ভেতর শারীরিক সম্পর্ক করেছে।
আমার তো প্রথম থেকেই কিচ্ছু বিশ্বাস হয়নি। এই বয়সী মেয়েরা আবেগী হয়। প্রথমে ভেবেছিলাম বয়ফ্রেন্ডঘটিত কোনো ব্যাপার। ধামাচাপা দেয়ার জন্য গল্প বানাচ্ছে। কিন্তু এখন তো রীতিমত কোনো ডিসিশনেই আসতে পারছিনা! জরায়ুর ভেতর মানবভ্রুণ ছাড়া অন্য কিছুর অস্তিত্ব চিকিৎসাবিজ্ঞান কল্পনাই করতে পারেনা।”

ডাঃ অনুপম ভ্রু কুঁচকে রইলেন। তার হাতে এখনও আগের রিপোর্টটি। তিনি ডাঃ যুথিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“আচ্ছা যুথি, ধরে নিলাম এটা একটা মানবভ্রুণ। কিন্তু সেখানেও তো একটা প্রশ্ন থেকে যায়। মাত্র দু’সপ্তাহের ভ্রূণে হাত- পা এর অবয়ব আসা অসম্ভব। দু সপ্তাহে কেবল একটা মাংসপিণ্ড এর ছবি আসার কথা। ”

ডাঃ যুথি একটু ভেবে বললেন,
“এটা আমি নিজেও ভেবেছি অনুপম। এমনকি আমি তো চাচ্ছিলামই না যে এখন আল্ট্রাসনো হোক। কেননা ভ্রূণের বয়স অনেক বেশিই কম। চার-পাঁচ মাস বয়সের আগে আল্ট্রাসনো করলে ভ্রূণের ক্ষতি হলেও হতে পারে। একটা পসিবলিটি থেকে যায়।
অথচ দেখ, সেখানে একবার নয়, বরং দুইবার আল্ট্রাসনো
করতে হচ্ছে। কে জানে, আরো কয়বার করাতে হবে!”
–“হুম। দ্বিতীয় রিপোর্টটা আসুক। তারপর আমরা ভেবে দেখব যে নেক্সট স্টেপ কি নেয়া যেতে পারে। মেয়েটার মা কে জানানো উচিৎ বলে মনে হচ্ছে। তুমি কি বলো?”

ডাঃ যুথী বুঝতে পারলেন না কি বলবেন। মিমি মেয়েটা এতদূর যখন একাই এসেছে, তখন মনে হচ্ছে বাসায় জানানোতে নিশ্চই সমস্যা আছে। মেয়েটাকে আপাতত সাবালিকা বলা চলে। সাতপাঁচ ভেবে ডাঃ যুথী অনুপমকে বললেন,
“আপাতত থাকুক। আরেকটু দেখি ঘটনা কোনদিকে যাচ্ছে। তারপর ভাববো মিমির বাড়ির লোককে জানাবো কিনা।”

জরুরী ভিত্তিতে দ্বিতীয় আল্ট্রাসনোগ্রাফের রিপোর্টটাও চলে এলো।
প্রথম রিপোর্ট এবং পরের রিপোর্ট পাশাপাশি রাখা হলো। একটু পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। আগের চেয়ে দ্বিতীয়টায় ধোঁয়াটে জিনিসটা আরেকটু কালচে লাগছে।
ডাঃ অনুপম ভ্রু কুঁচকে রিপোর্ট দেখছেন। গাইনোকোলজিস্ট হিসেবে ডাঃ অনুপম বেশ সুপরিচিত। পেশেন্টের কোনো অবস্থাতেই তিনি বিচলিত হোন না। বরং ঠান্ডা মাথায় সমাধান করতে পারেন বলেই তার এতো সুনাম।
এই মুহূর্তে তার নিজের উপর রাগ হচ্ছে। কারণ তিনি কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারছেন না।

ডাঃ যুথী মনে হচ্ছে একটু ভয়ে ভয়েই আছে। এমনিতে যুথী খুবই ধার্মিক মাইন্ডেড মহিলা। তাই না চাইতেও তার মনের ভেতর প্যারানরমাল চিন্তা-ভাবনা চলে আসছে।

ডাঃ অনুপম মিমির সাথে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলেন। মেয়েটার মানসিক অবস্থা তার বোঝা দরকার। ডাঃ অনুপম গাইনোকোলজিস্ট হলেও আগে থেকেই সাইকোলজি বা মনোবিজ্ঞান ছিল তার প্রিয় বিষয়। মানুষের মাইন্ড কন্ট্রোল করে প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে নেয়ার ব্যাপারটা তার আয়ত্বে আছে। মিমিকে বেশ কয়েকটা প্রশ্ন করবেন বলে ঠিক করলেন তিনি। মনে মনে প্রশ্ন গুলো গুছিয়ে নিলেন।
” যুথী, তুমি মিমি মেয়েটাকে আমার চেম্বারে পাঠিয়ে দাও, আমি একটু কথা বলতে চাচ্ছি ওর সাথে।”
ডাঃ যুথী মাথা নাড়লেন। এসিস্টেন্টকে দিয়ে মিমিকে ডাঃ অনুপমের চেম্বারে যাওয়ার কথা বললেন।

ডাঃ অনুপম মেয়েটির পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখছেন। কেমন জড়সড় হয়ে বসে আছে মেয়েটি। চোখের নিচে কালশিটে পড়ে গেছে। গায়ের রঙ টকটকে গৌরবর্ণ। মুখ ফ্যাকাশে। প্রথম দেখায় ” এ কি দেখলাম ” টাইপ সুন্দরী। চোখের নিচের কালি, ফ্যাকাসে মুখ, শুষ্ক ঠোঁট আর চোখেমুখে চিন্তার ছাপ নিয়েও মেয়েটিকে অপূর্ব লাগছে।
ডাঃ অনুপম চোখ নামিয়ে নিলেন। মেয়েটির সাথে সামান্য সহজ হওয়ার চেষ্টা করলেন।

” তোমার নাম মিমি?”
মিমি উপরে নিচে মাথা নাড়ল।
–“কেমন আছ মিমি?”
— “হু”
ডাঃ অনুপম হাসলেন। চমৎকার হাসি। এই ধরণের হাসি অপরপক্ষকে সহজেই বুঝিয়ে দেয়, “ভয় পাওয়ার কিছু নেই”, যা মানুষকে সহজ হতে সাহায্য করে।
মিমির জড়তা কাটলো। সে অনেকটাই সহজ হলো। ভদ্রতাসূচক হাসিও দিলো।

ডাঃ অনুপম বললেন,
” মিমি, তোমার বাসায় কে কে আছেন?”
— “আমার আম্মু, আব্বু আর ছোট ভাই।”
–“বাহিরের কেউ নেই? মানে অন্য কোনো নিকটাত্মীয় থাকেন? বা মাঝে মাঝে বাসায় আসা যাওয়া করেন এমন কেউ আছে?”
মিমি বামে ডানে মাথা নেড়ে জানালো এমন কেউ নেই।

ডাঃ অনুপম বেল বাজিয়ে পিয়নকে ডেকে কফির কথা বললেন। কফি খেতে খেতে এসব আলোচনায় সুবিধা হয়।
ডাঃ অনুপম বললেন,
“এখন আমি তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করবো। তোমার ভয় পাওয়ার দরকার নেই। ইচ্ছে হলে উত্তর দেবে। ইচ্ছে না করলে দেয়ার দরকার নেই। বুঝতে পেরেছ?” — বলেই তিনি আন্তরিকভাবে হাসলেন।
মিমি ইশারায় বুঝালো সে উত্তর দেবে।

–” আচ্ছা মিমি, তোমার বাবা বেশি সুন্দর, নাকি মা?”
এমন প্রশ্ন বোধহয় মিমি আশা করেনি। সে কিছুটা অবাক হলো। তারপর বলল,
” আমার বাবা মা দুজনেই সুন্দর। কিন্তু কেন? ”

ডাঃ অনুপম মিষ্টি করে হেসে বললেন,
“এজন্যই তুমি এতো বেশি সুন্দর। এবার বোঝা গেল।”
মিমি বেশ লজ্জা পেল। ফরসা কান লাল হয়ে গেছে।
অনুপম সেটা খেয়াল করলেন।
কফি চলে এসেছে। মিমির সামনে কফি রাখা হলে মিমি হাত বাড়িয়ে কফিটা নেয়। এক্ষেত্রে ডাঃ অনুপমের সাধাসাধি করতে হলোনা।

” কফি খুব পছন্দ নাকি মিমি?”
মিমি সামান্য বিব্রত হল। পরক্ষনে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
” রাত জাগলে প্রায়ই কফি খেতাম। অভ্যাস কিংবা আসক্তি টাইপ হয়ে গেছে।”
–” আচ্ছা আচ্ছা বুঝলাম। তা মিমি, তুমি তো বেশ সুন্দরী। বয়ফ্রেন্ড আছে নিশ্চই?”
মিমি মলিনভাবে হেসে জবাব দিল,
” না স্যার, আমার কোনো এফেয়ার নেই।”

ডাঃ অনুপম এবার সামান্য ঝুঁকে মিমিকে ভারী গলায় প্রশ্ন করলেন,
” কোনোদিনও কি কারো সাথেই ছিলোনা?”
মিমি তড়িৎবেগে ডাঃ অনুপমের দিকে তাকালো। বেশ অনেকটা কফি ছলকে মিমির ড্রেসে পড়ল।
মিমি ন্যানোসেকেন্ডে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
” না, আমার সাথে কোনো মানুষের কোনো এফেয়ার ছিলোনা। ”

মিমির নিজেকে দ্রুত সামলে নেয়া ডাঃ অনুপমের চোখ এড়ালোনা। তিনি আপন মনেই হাসলেন। তারপর মিমিকে বললেন,
“তুমি আমার সাথে আর কথা বলতে চাচ্ছোনা। ঠিক আছে, সমস্যা নেই। আপাতত তুমি ডাঃ যুথীর কাছে যাও।”
মিমি ভ্রু কুঁচকে ফেললো। তারপর বললো,
” কে বললো আমি কথা বলতে চাচ্ছিনা! আমি তো আপনার সব জবাব দিচ্ছিই!”

ডাঃ অনুপম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মিমিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
” আমি চাইলে তোমার এই প্রশ্নের জবাব না দিলেও পারতাম। কিন্তু আমি দেব। যাতে তুমি আমার সম্পর্কে কিছুটা হলেও বুঝতে পারো।”
একটু থেমে তিনি আবার বললেন,
” তুমি চেয়ারে বসে আছ আমার দিকে মুখ করে। কিন্তু তোমার পা দুটো ডানদিকে বেশ খানিকটা আগানো। আর ডান দিকে রয়েছে দরজা। তোমার পা এর ভঙ্গী বলে দিচ্ছে যে তুমি উঠতে চাচ্ছো।”
মিমি মনে মনে চমৎকৃত হলো। ডাঃ অনুপমকে সাথে সাথেই তার মনে ধরে গেলো। লোকটার সেন্স অসাধারণ। মিমি একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো। তারপর চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলো।

মিমি বের হওয়ার সাথে সাথে মিমির একটা কথা ডাঃ অনুপমের মনে খচখচ করে উঠল। তার কপালে চিন্তার রেখা দেখা দিলো।

তিনি একটা মেডিকেল টেস্ট লিখে ডাঃ যুথীর চেম্বারে পাঠিয়ে দিলেন। মিমির কারো সাথে কোনোদিন কোনোরকম শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে কিনা, সেটা এই টেস্টের মাধ্যমে জানা যাবে।
ডাঃ অনুপম চেয়ারে বসবেন ঠিক সেই সময় বাইরে থেকে কারো আর্তচিৎকার ভেসে আসলো। তিনি হনহন করে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলেন।

চলবে >>>>

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ