নবীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য ‘সত্যজিৎ রায়’ প্রেরণা

প্রকাশিতঃ ১১:৩৪ অপরাহ্ণ, শনি, ২ মে ২০

আব্দুল মাজেদ চৌধুরী শাহরিয়ার

একবার, দু’বার তিনবার প্রযোজক হারান সত্যজিৎ রায়, শেষমেশ নিজের স্ত্রীর গয়না বন্ধক রাখেন তবুও পুরোপুরি ছবি করা সম্ভব ছিলো না।

বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের স্ত্রীকে তবুও লেখকের প্রাপ্য সম্মানী দিয়ে অনুমতি নিয়ে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রীর সহায়তায় অনুদান নিয়ে ছবি শেষ করলেন সত্যজিৎ রায়।

প্রথম ছবি দিয়ে জাত চিনিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। পরিচয় করিয়ে দেয় আমাদের গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থার করুণ দৃশ্য। মমতা লালিত্য আর বাস্তবিক জীবনের সে দৃশ্য!

বলছিলাম সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবির কথা। স্ত্রীর সাথে আলাপে উনি প্রথম ছবি করার পরেও ছবি নির্মাণকে পেশা হিসেবে নেবেন কি না সিদ্ধান্ত নেননি। উনি পর্যবেক্ষণ করছিলেন পথের পাঁচালীর কেমন ফিডব্যাক তিনি পাচ্ছেন সেটা। ব্রিটিশ যে বিজ্ঞাপনী সংস্থায় উনি কাজ করতেন ভাল বেতন পেতেন। উনার পরিবার ও সংসারের সামনে এমন প্রতিষ্ঠিত চাকরি ছেড়ে ছবি নির্মাণকে পেশা হিসেবে নেবেন এটা একটা চ্যালেঞ্জও ছিলো। প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও উনি বলেছেন, আমি চলচ্চিত্র নির্মাতা।

জীবনের প্রথম ছবি শিল্পমানসম্পন্ন করতে উনি কোনোভাবে আপস বা সমঝোতা করেননি। প্রচলিত সব গড়ে উঠা ধারণার বাইরে প্রথম ছবিতেই এমন সাহসী ছিলেন সেটা আমাদের নবীন চলচ্চিত্র কর্মী ও নির্মাতাদের জন্য অনুকরণীয়। অথচ উনার প্রথম ছবি যদি ব্যর্থ হতো উনি আর পরবর্তীতে ছবিই করতেন না। আর সেখানে দিলেন চূড়ান্ত পরীক্ষা। সবচেয়ে বড় কথা যেটা উনি যে নব্য বাস্তববাদ তথা নিউরিয়ালিজম ধারার ডি সিকার বাইসাইকেল থিফ ছবি দেখে ছবি বানানোর ইচ্ছে দৃঢ় করেছিলেন। উনার প্রথম ছবিতে ছিলো সে নিউরিয়ালিজমের প্রভাব। অপেশাদার নির্মাতা নিয়ে কৃত্রিম মেকাপ বর্জন করে ও স্টুডিওর বাইরে বাস্তব জীবনের মানুষদের জীবনযাপন কেমন হয় তা দেখাতে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।

উনি লিখলেন, “পথের পাঁচালির বাজেট ছিলো মাত্র সত্তর হাজার টাকা কিন্তু এই যে সামান্য অংকের বাজেট এটা দেখেও মামুলি অনেক প্রযোজকের মনে হয়েছিলো যে বড্ড বেশি ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।

‘আপনাদের ছবিতে না আছে স্টার, না আছে গান, তা হলে এত খরচা হবে কেন? এমনকি মারপিটের দৃশ্যও নেই! অংকটাকে আর-একটু নামিয়ে আনতে পারেন না।’

প্রযোজকদের চাওয়াকে আমরা প্রাধান্য দিয়ে অর্থ হাতছাড়া হবার ভয়ে আমরা যে সময়ে আপস করে চলছি নিজের শিল্পসত্তাকে বিকিয়ে দিয়ে; সেখানে সত্যজিৎ রায় এক কদম পিছিয়ে যাননি। আজকের সময়ে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক এই কথাই আমি বলবো।

সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে নন্দিত অনেক নির্মাতার প্রশংসার কথা আমরা জানি এবং শুনেছি। আমি এই সময়ের এক নির্মাতার কথা বলবো, যিনি সত্যজিৎ রায় এবং বর্তমানে কোটি রুপি আয় করা বক্স অফিস কাঁপানো বলিউড ছবির মাঝে বিস্তর ফাঁরাক দেখেছেন; ইরানের গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা মাজিদ মাজিদির কথা অবতারণা করবো, ” ভারত ও ভারতীয় সিনেমার সঙ্গে আমার পরিচয় সত্যজিৎ রায়ের মাধ্যমে। তার জীবনঘনিষ্ঠ ছবি আমাকে অনেক প্রভাবিত করেছে। কিন্তু তাঁর এই ধারা আমি বলিউডের অন্য কোনো ছবিতে দেখতে পাইনি। সম্প্রতি আমি বেশকিছু বলিউড মুভি দেখেছি। এরমধ্যে একটিও আমার ভাল লাগেনি।’

পথের পাঁচালী যখন মুক্তি পাচ্ছে তখন সত্যজিৎ রায়ের বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। আজ আমাদের কিছু করে দেখানোর যে তাড়াহুড়ো নিজেকে জাহির করার প্রবণতা প্রবলতর। প্রজ্ঞা আর জ্ঞানের ভিত তৈরি হলে, বিশ্ব সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্পকলার পাঠ গভীরভাবে গ্রহণ করার সময় ও ধৈর্য থাকলে যে কোনো সময়ে বাজিমাত করা যায়, তাঁর উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই মানুষটি । শুভ জন্মদিন সুকুমারের সুপুত্র প্রিয় সত্যজিৎ রায়।

লেখক : সংবাদকর্মী ও শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ