পরকীয়া (পর্ব-১)

প্রকাশিতঃ ৩:০৪ অপরাহ্ণ, সোম, ২৫ নভেম্বর ১৯

 ডা. আফতাব হোসেন:

– তুমি কি খুব ব্যস্ত?

হেমন্তের এই হিমেল সকালে, বউয়ের গলায় চৈত্রের ঝাঁঝ দেখে আমি সতর্ক হয়ে গেলাম। বেশ কিছু দিন তো খুব পাহাড়ে পাহাড়ে ঘোরা হল, মেঘে মেঘে ওড়া হল। যেই ঘরের ছেলে ঘরে এসে থিতু হয়ে বসেছি, অমনি বুলবুল সাহেব (নাকি সাহেবান ?) এলেন। সে শুধু নেচে কুঁদে খেতের ফসলই নষ্ট করেননি, গাছপালা ঘরদোরই ভাঙ্গেননি, সেই সাথে বসিয়ে দিয়ে গেছেন শীতের কামড়। তাই অগ্রহায়ণের শুরুতেই কেমন শীতের আমেজ। সে আমেজ গায়ে মেখে, খোলা জানালার পাশে, ল্যাপটপ খুলে কেবল বসেছি কিছু লিখব বলে, আর তখনই বেজে উঠল বউয়ের কণ্ঠে যুদ্ধের ঘণ্টা। তবে সেটা ঠিক কী কারণে বুঝতে না পেরে, বেক্কলের মতো আক্কেল দাঁতের আধেকটা বের করে বললাম,

– হে হে হে, কী যে বলো ? বেকার মানুষের আবার ব্যস্ততা ?

– কে বলে বেকার? তুমি তো এখন মহা পণ্ডিত মানুষ। কত ব্যস্ততা তোমার। কত রকম বাণী দিচ্ছ। সে বাণী শুনে ভক্তের দল কত বাহবা দিচ্ছে! আমি তো ঘর কা মুরগী, ডাল বরাবর। সে ডাল কি আর এখন তোমার মুখে রুচবে?

বুঝতে পারছি, ঝাঁসির রাণী কথার হুল ফুটিয়ে আমাকে লড়াইয়ে নামতে উস্কানি দিচ্ছেন। নিশ্চিত পরাজয় জেনেও যুদ্ধে নামার মতো বোকা আমি নই। দেড় যুগ ব্রিটেনে থেকেছি। কিছুটা হলেও ব্রিটিশদের কুট কৌশল রপ্ত করেছি। আমি অন্য পথ ধরি,

– কোরবানেত শুমা বেরাম খানম। হরফে শুমা রুয়ে চশম হাস্ত। লুথফান বেফারমায়েন।
(তোমার জন্য জীবন দিয়ে দেব, হে মাননীয়া। তোমার কথা আমার চোখের পাতায়। অনুগ্রহ করে হুকুম করো)

আমার মুখে ফারসি শুনে বউয়ের চোখে সন্দেহে আরও ছোট হয়ে যায়। বিয়ের পর বছর তিনেক ইরানে ছিলাম। কাটিয়েছি আমাদের জীবনে সব চেয়ে রোমান্টিক সময়। সে যেন এক দীর্ঘ অভিসার। আমার জানা মতে ফারসি হল সব চেয়ে বেশি অলঙ্কার সমৃদ্ধ এক রোমান্টিক ভাষা। তাই ইরানে থাকাবস্থায়, ভাষায় এবং রোমান্টিকতায়, আমরা দুজনেই খুব পারদর্শী হয়ে উঠেছিলাম। এখনও ভুলি নাই। বউ বশীকরণের অনেকগুলো বিদ্যার এটিও আমার একটি। ফারসি বলে যেই বউকে সেই সব মধুর দিনগুলির কথা মনে করিয়ে দেই, অমনি তার সব রাগ গলে পানি হয়ে যায়। অবশ্য খুব বিপদে না পড়লে বিদ্যাটা ব্যবহার করি না। কিন্তু আজ বুঝি দেবী তোষামোদে তুষ্ট হবার মুডে নেই। চেয়ারটা টেনে সামনে বসে চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল,

– কাল যা লিখেছ, তা সত্যি ?

– আলবৎ সত্যি। আমি নিজ চোখে লবণ নিয়ে রাবণ পুরীতে লঙ্কাকাণ্ড দেখে এসেছি।

– আমি লবণের কথা বলছি না।

কেটে কেটে বলল বউ। বুঝলাম, ভবি ভুলবার নয়। যুদ্ধটা বুঝি আজ আর এড়ানো গেল না ! শুধু বুঝতে পারছি না, এটা কি টি টুয়েন্টি ম্যাচ হবে, নাকি ওয়ান ডে নাকি পুরা পাঁচ দিনের টেস্ট? শুরুতেই আক্রমণাত্মক হব না রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেলব ? প্রথম ওভারটা দেখে শুনে খেলার সিদ্ধান্ত নিলাম।

– তাহলে?

– কাল লিখেছ, সব পুরুষ বহুগামী। তার মানে কি তুমিও… ?

জানতাম, ধনুকের তীর আর মুখের কথা একবার বেরিয়ে গেলে আর ফেরত আনা যায় না। কাল পুরুষ জাতি নিয়ে যে ভয়ঙ্কর স্ট্যাটাস দিয়েছি, তাতে আক্রমণটা পুরুষ বন্ধুদের কাছ থেকেই আশা করেছিলাম। আক্রমণটা যে ঘর থেকে আসবে, তাও এত তাড়াতাড়ি, ভাবতে পারিনি। লড়াই যখন শুরু হয়ে গেছে। সে লড়াইয়ে জিততে হবে। এখন আর পিছু হটার কোনো মানে হয় না। আমিও চোখে চোখ রেখে শান্ত কণ্ঠে বললাম,

– সে দোষ তো আমার নয়।

– তবে কার ?

– বিধাতার কিংবা প্রকৃতির।

– মানে কী? বিধাতা তোমারে বলছে বহুগামী হতে? বউ থাকতেও অন্যের সাথে ফষ্টিনষ্টি করতে?

– না, তা বলেননি।

– তাহলে?

– দেখো, বিধাতা আসলে পুরুষ জাতিকে নিয়ে একটা খেলা খেলছেন। পুরুষকে তিনি বহুগামিতার মানসিকতা দিয়ে তৈরি করেছেন। অথচ প্রায় সব ধর্মেই বিবাহ বহির্ভূত যৌনাচারকে পাপ বলা হয়েছে। এমনকি নারীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাতেও নিষেধ করা হয়েছে।

– আর মেয়েদের ?

– সে তো তুমিই ভালো বলতে পারবে। আচ্ছা বলো তো, রাস্তায় কোনো পুরুষ মানুষকে দেখে তুমি যৌন উত্তেজনা অনুভব করো?

– এ মা, ছি ! ভাবতেও আমার বমি আসছে।

– একজাক্টলী! দ্যাটস দ্যা ডিফরেন্স। একই উত্তর প্রায় সব মেয়েই দেবে। অথচ প্রায় প্রত্যেক পুরুষই নারীর প্রতি প্রথম দর্শনে এক ধরণের যৌনাকর্ষণ অনুভব করে। সেই জন্যই ইসলাম ধর্মে গায়ের মুহররম (যার সাথে বিয়ে বৈধ) নারীর প্রতি একবার চোখ পড়লে দৃষ্টি নামিয়ে নিতে বলা হয়েছে এবং দ্বিতীয়বার না তাকাতে বলা হয়েছে। আর নারীকে বলা হয়েছে তার অঙ্গ ঢেকে রাখতে। নারীর প্রতি তাকালে যদি পুরুষের যৌনাবেগ নাই জাগে, তাহলে সারাদিন চেয়ে থাকলেও তো কোনো অসুবিধা হবার কথা নয়।

– হুম। এভাবে তো ভেবে দেখিনি।

– এবার আসো, তোমাকে কিছু বাস্তব উদাহরণ দেই। টেলিভিশনে, ইন্টারনেটে, ফেসবুকে, পত্রিকায়, পোষ্টারে, যত বিজ্ঞাপন দেখো, তারা পুরুষ না নারী?

– অধিকাংশই নারী।

– শুধু অধিকাংশই নয়, কিছু সেলিব্রেটি পুরুষ ছাড়া প্রায় সবাই নারী। সেই নারীদেরও কিন্তু তাদের প্রকৃত চেহারায় উপস্থাপন করা হয় না। সাজিয়ে গুঁজিয়ে, স্বল্প বসনা করে, যৌনাকর্ষক ভাবে উপস্থাপন করা হয়। খরচ করা হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। কেন? পুরুষ কাস্টোমারকে আকৃষ্ট করার জন্য। অথচ মেয়েদের আকৃষ্ট করার জন্য পুরুষের উরু, পেট কিংবা বুক দেখিয়ে কোনো বিজ্ঞাপন ছাপা হয় না ( দু একটি ব্যতিক্রম ছাড়া)।

– হুম, এটা খেয়াল করেছি।

– তবে যেটা খেয়াল করোনি, সেটা হল, রাস্তা ঘাটে, অফিসে মার্কেটে, ক্লাসে ক্যাম্পাসে, মেয়েদের দেখে কিংবা সিনেমায় টেলিভিশনে, ইন্টারনেটে ইউটিউবে, পত্রিকায় পোস্টারে মেয়েদের ছবি দেখে, এমনকি কল্পনায় কোনো প্রিয় সেলিব্রেটির মুখ স্মরণ করে একজন পুরুষ দিনে একাধিক বার যৌনোত্তেজনা অনুভব করে। অথচ কোনো নারী এভাবে অন্য পুরুষ দেখে, এমনকি নিজ পুরুষ দেখেও তেমন উত্তেজনা অনুভব করে না।

– বলো কী ?

– শুধু তাই নয়। আচ্ছা, তুমি যদি রাস্তায় বিশ পঁচিশ বছরের একটি খুব সুন্দর, হ্যান্ডসাম ছেলেকে দেখো, তোমার কী মনে হয়?

একটু থমকে যায় বউ। বুঝতে পারছে না, যে যুদ্ধ সে মুহূর্তে জয় করে ফেলবে ভেবেছিল, সে যুদ্ধ এখন কোন দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে। একটু চিন্তা করে বলল,

– আমার ছেলের কথা মনে হয়।

আমি ভালো করে বউয়ের মুখটা দেখি। এই মুহূর্তে হাসি হাসি। চোখ দুটো বন্ধ। ছেলে তার কাছে ফিরে এসেছে। জেট ল্যাগ কাটেনি বলে এখনও ঘুমিয়ে আছে। দশটা এগারোটার দিকে উঠবে। তারপরই শুরু হবে মায়ের কর্মযজ্ঞ। এক মাসের মধ্যে কত রকম খাবার ছেলেকে খাওয়ানো যায়, তার প্রতিযোগিতা। আমার একটা ছোট্ট লেখায় সে আজ বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। যে পুরুষের মধ্যে রয়েছে তার শ্রদ্ধেয় পিতা, স্নেহের ভাই, প্রিয় স্বামী, আদরের ছেলে। সেই পুরুষ জাতি নিয়ে এমন মন্তব্য হয়ত তার বিশ্বাসের ভিতটা পুরোই নাড়িয়ে দিয়েছে। তার মত আরও অনেক মেয়েই হয়ত এমন ভাবছে। অনেক মেয়েই পুরুষের ব্যাপারে ভুল ধারণা পোষণ করে। আজ আমাকে সে ধারণা বদলে দিতে হবে। আমি সময় নিয়ে এগুনোর সিদ্ধান্ত নিই। হেসে জিজ্ঞেস করি,

– কেন? তাকে বিয়ে করতে ইচ্ছে করে না ? কিংবা অন্তত এটা মনে হয় না, আহা, আমার স্বামীটিও যদি এমন জোয়ান মর্দ হত?

– ছি ছি ! তুমি এসব কী বলছ? তোমার মুখে কি কিছুই আটকায় না? একটা ছেলের বয়সী ছেলেকে নিয়ে এমন ভাবনা ভাবলে যে আমার জাহান্নামেও জায়গা হবে না।

– অথচ দেখো, একজন পুরুষ কিন্তু ষাট সত্তর বয়সেও বিয়ে করতে চাইলে তার মেয়ে কিংবা নাতীর বয়সী একটি মেয়েকে খোঁজে।

– ওই পুরুষগুলো তো লুচ্চার এক শেষ ! তুমিও কি বুড়ো বয়সে নাতীর বয়সী এক ছুকরিকে বিয়ে করবে নাকি?

– আমার কথায় পরে আসি। আসলে আমি বোঝাতে চাইছি, পুরুষের মস্তিষ্কটা এ ভাবেই প্রোগ্রাম করা। যে বয়সের একটি ছেলেকে দেখে তোমার বয়সী একজন মহিলার মাতৃত্ব জেগে ওঠে, স্নেহ মমতা জেগে ওঠে, সেই বয়সী একটি মেয়েকে দেখে তোমার বয়সী কিংবা আরও বয়স্ক একজন পুরুষের আবার বিয়ে করার শখ জেগে উঠতে পারে।

বউটিকে এবার বেশ বিভ্রান্ত দেখায়। দু চোখে রাজ্যের অবিশ্বাস নিয়ে বলে,

– যাহ, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তুমি বানিয়ে বানিয়ে মনগড়া কথা বলছ। আমাকে খেপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছ।

– বানিয়েও বলছি না, খেপানোর চেষ্টাও করছি না। আচ্ছা, আর একটা উদাহরণ দিই। তোমার চক্ষু চড়ক গাছ হয়ে যাবে। স্ট্রিপ ক্লাবের নাম শুনেছ?

– নাহ।

– স্ট্রিপ ক্লাবে নারীকে বিবস্ত্র করে উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশে হয়ত নেই। তবে পৃথিবী বহু দেশে হাজার হাজার স্ট্রিপ ক্লাব আছে। সেই সব ক্লাবের আয় কত জানো ?

– আমি কী করে জানব? আমি কি স্ট্রিপ ক্লাব চালাই নাকি ?

– ২০০৫ সালে শুধু মাত্র নারীর শরীর দেখার জন্য পুরুষেরা স্ট্রিপ ক্লাব গুলোয় খরচ করেছে ৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা কিনা সেই বছরের বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চাইতেও বেশি ! মজার ব্যাপার হল, সেই সব পুরুষের অধিকাংশই বিবাহিত এবং মধ্য বয়সী ! অথচ মহিলারা পুরুষের শরীর দেখার জন্য তখন এক পয়সাও খরচ করত না!

– তাহলে পুরুষ জাতটা তো আসলেই খুবই খারাপ। বদের বদ।

– খারাপ ভালো তো আপেক্ষিক ব্যাপার। লোহা কিংবা চুম্বক, যার যেমন বৈশিষ্ট্য। প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য কাউকে খারাপ কিংবা ভালো বলা কি ঠিক?

– তার মানে কি তুমি বলতে চাইছ, পুরুষের এই বৈশিষ্ট্য আছে বলে তাকে বহুগামিতা কিংবা যথেচ্ছ যৌনাচারের লাইসেন্স দিতে হবে?

– না, আমি তা বলছি না।

– তাহলে কি বলতে চাইছ সব দোষ বিধাতার, আর তোমরা সব ধোয়া তুলসী পাতা?

– না, আমি তাও বলছি না। এতক্ষণ যা বললাম, তা বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত। পুরুষ মানুষ এবং অন্যান্য হাইয়ার স্পেসিস পুরুষ প্রাণীর (পশু শ্রেণীর) প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য।

– তাহলে কি এই দাঁড়াল না, প্রত্যেক পুরুষের ভেতর একটা পশু বাস করে আর আমি এতদিন একজন পশুর সাথে সংসার করছি ?

এবার আবেগে ধরে আসে বউয়ের গলা। ছলছল করছে দুই চোখ। থিরথির করে কাঁপছে পাতলা দুই ঠোঁট । ভাবলাম, অনেক হয়েছে। এবার ঘুরিয়ে দেই যুদ্ধের মোড়। হেসে বলি,

– না, তুমি একজন পশুর সাথে ঘর করছ না। বরং এমন একজনের সাথে ঘর করছ, যাকে ভালোবাসার জন্য, সততার জন্য, নোবেল প্রাইজ দেয়া যেতে পারে।

– আহারে! তুমি তো আবার ধর্ম পুত্র যুধিষ্ঠির ! নিজের দোষ কখনো দেখো না।

– দেখো, কারো ভেতর পশুর একটা বৈশিষ্ট্য থাকলেই তাকে পশু বলা যায় না যতক্ষণ না সে পাশবিক আচরণ করে। বিধাতা অতটা অবিবেচক নন যে শুধু পশুর মত যৌনাবেগ দিয়েই পুরুষ মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তার সাথে আরও অনেক গুণাবলীও দিয়েছেন। যেমন, সততা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, সামাজিক মূল্যবোধ , প্রেম, ভালোবাসা, আর আত্মসংযম, যা পশুদের নেই। তবে সব চেয়ে বড় যে গুনটি বিধাতা মানুষকে দিয়েছেন, সে হল প্রবল ইচ্ছাশক্তি। এই ইচ্ছা শক্তিবলে মানুষ অজেয়কে জয় করতে পারে। নিজ যৌনাবেগকে সংযত করতে পারে। পশু থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারে। আর যারা তা পারে না, তাদের সাথে আমি পশুর কোনো পার্থক্য দেখি না।

– তুমি অতো শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করো না। তুমি আজ আমার চোখ খুলে দিয়েছ। ঠিকই বলেছ, সব পুরুষই ভেতরে ভেতরে একজন পশু। শুধু সুযোগের অপেক্ষা। সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। দেখছ না, তোমাদের হাত থেকে শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না।

এবার বিদ্রোহের সুর বউয়ের কণ্ঠে। তার এই ক্ষোভের যথেষ্ট কারণও আছে। ইদানীং যে হারে শিশু, কিশোরী, যুবতী, গৃহবধূ নির্বিশেষে যৌন হয়রানীর শিকার হচ্ছে,, তাতে নিজেকে মাঝে মাঝে পুরুষ বলে পরিচয় দিতে ঘেন্না হয়। আমি নরম গলায় বলি,

– তোমার কথায় যুক্তি আছে। তবে গুটিকয় পুরুষ নামের পশুর জন্য সব পুরুষ মানুষকে বোধহয় দায়ী করা ঠিক নয়। বরং পুরুষরা যে কতটা সংযম ও ধৈর্যের পরিচয় দেয়, এবার তার উদাহরণ দিচ্ছি। দেখো, প্রাকৃতিক কারণেই সব মেয়ে তথাকথিত সুন্দরী বা যৌনাকর্ষক নয়। সেই সব মেয়েদের নিয়েও কিন্তু অধিকাংশ পুরুষ সারাটি জীবন কাটিয়ে দেয়। সুযোগ থাকা স্বত্বেও অন্য নারীর দ্বারস্থ হয় না।

– সে আর এমন কী? কত মেয়েরাও তো বেটে, মোটা, পোটকা মাছ নিয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। অন্য হ্যান্ডসাম পুরুষের দ্বারস্থ হয় না।

খোঁচাটা একেবারে মোক্ষম জায়গায় মারে বউ। তবে আমি ধরা না দিয়ে বলতে থাকি,

– অনেক পুরুষ অকালে স্ত্রীকে হারিয়ে শুধুমাত্র সন্তানদের দিকে তাকিয়ে কিংবা পরলোকগত স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার কারণে সারাটা জীবন একা কাটিয়ে দেয়। আবার বিয়ে করে না।

– সে তো মেয়েদের বেলায় আরও প্রযোজ্য।

– কিন্তু মেয়েদের তো প্রাকৃতিক ভাবেই যৌন চাহিদা পুরুষের চেয়ে অনেক কম। তাই মেয়েদের জন্য সংযত থাকা, ধৈর্য ধারণ করা পুরুষের চেয়ে অনেক সহজ। তবে বিধবা মেয়েরাও আবার বিয়ে করে, যতটা না যৌন কারণে, তার চেয়ে অনেক বেশি আশ্রয়স্থলের প্রয়োজনে। যদিও মেয়েরা ইদানীং স্বাবলম্বী হচ্ছে, তবুও পুরুষ প্রবর্তিত এবং পুরুষ শাসিত আমাদের সমাজে এখনো অধিকাংশ মেয়েরা পুরুষের কাছেই আশ্রয় খোঁজে। স্কুল কলেজে, অফিসে, আদালতে, রাস্তায়, মার্কেটে, সব জায়গায় এখন মেয়েরা ছেলেদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে, পড়ছে, কাজ করছে। সব পুরুষ যদি তাদের ভেতরের পশুটিকে বাইরে বের হতে দিত, তাহলে বাইরের এই পৃথিবী মেয়েদের জন্য আর বাসোপযোগী থাকত না। এ তো বাঘের সামনে অনেকগুলো মায়া হরীণ, অথচ তাকে থাকতে হচ্ছে ঘাস খেয়ে, কিংবা অনাহারে, অনেকটা তেমন হয়ে গেল ! এখন ভেবে দেখো, তোমার কথা অনুযায়ী সব পুরুষের ভেতর পশু প্রবৃত্তি থাকা স্বত্বেও, তারা সংযম সাধন করেছে বলেই অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং পুরুষের উপর নির্ভরশীল নারীরা এই পৃথিবীতে এখনও সম্মানের সাথে, নিরাপদে বাস করছে।

– তাহলে এই যে ইদানীং পুরুষগুলো অহরহ পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়ছে, তার ব্যাপারে তুমি কী বলবে?

– আর একটি জটিল প্রশ্ন করে বসলে! প্রথমত, প্রেম তো প্রেমই, তাকে আমি স্বকীয়া কিংবা পরকীয়া বলতে নারাজ। আর পরকীয়া প্রেম বলতে যদি তুমি একজন বিবাহিত পুরুষের সাথে একজন বিবাহিতা কিংবা অবিবাহিতা নারীর, অথবা একজন বিবাহিতা নারীর সাথে একজন বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত পুরুষের দৈহিক সম্পর্ক বুঝিয়ে থাকো, সে ক্ষেত্রে কিন্তু নারী পুরুষ দুজনেই সমান ভাবে দায়ী।

– কী বলতে চাইছ তুমি? মেয়েরা খারাপ? কত ভালো মেয়ের স্বামীকে দেখা যায় পরকীয়া প্রেম করতে।

– রেগে যাচ্ছ কেন? আমরা তো ততটুকুই জানি যা পত্রিকার পাতায় আসে কিংবা লোক মুখে শোনা যায়। পর্দার আড়ালে, চার দেয়ালের ভেতরে, ঠিক কী ঘটেছিল, তার কতটুকুই বা আমরা জানি ?

– তার মানে পত্রিকায় যা আসে সব মিথ্যা, আর তুমি যেটা ভাবো, সেটাই সত্য?

– আরে বোকা মেয়ে, আমি কি তা বলেছি? এসো, তোমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। তার আগে আমার কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দাও। এই পৃথিবীতে তোমার সবচেয়ে প্রিয়জন কে?

– আমার ছেলে।

– একজাক্টলী। এবার বলো, বিয়ের পর তোমার সবচেয়ে মধুর স্বপ্ন কী ছিল?

– মা হব।

– গুড। এবার শোনো, তোমার সেই ভালো মেয়েদের গল্প বলি।

চলবে…

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ