পরকীয়া (পর্ব-২)

প্রকাশিতঃ ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ, মঙ্গল, ২৬ নভেম্বর ১৯

ডা. আফতাব হোসেন:

– আমি কিন্তু বানানো গল্প শুনব না। সত্য কাহিনী বলবা।

ওর কথা শুনে আমি চমকে উঠি। গলায় কী এক গা শিরশির করা মাদকতা। একটু আগের ঝাঁসির রাণীর লড়াকু ভাবটা আর নেই। কণ্ঠে এখন তার দ্রৌপদী ডাক। সে কি আমার বহুগামী হওয়ার সন্দেহটা দূর হয়েছে বলে? নাকি নারী পুরুষের নিষিদ্ধ কাহিনী শুনবে বলে? আমি ঠিক বুঝতে পারি না। আমরা কেউই আমাদের ব্যক্তি জীবনের অত্যন্ত স্পর্শকাতর গোপন বিষয়ে আলোচনা করতে চাই না কিন্তু অন্যেরটা শুনতে, তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করতে ভীষণ উৎসাহ বোধ করি। হয়ত নিজের জীবনের সাথে অন্যেরটা মিলিয়ে দেখার প্রয়াসে !

আমি ভালো করে ওকে দেখি। আগ্রহ নিয়ে অনেকটা ঝুঁকে বসেছে এখন। ঘন পাপড়ির ছায়ায় আকাশের নীলের মতো গভীর দুই চোখ। সে চোখের তারায় এখন জ্বলজ্বল করছে বিশ্বাসী আলো। অবিশ্বাসী মেঘেরা মিলিয়ে গেছে দূরে কোথাও। এই এক অসাধারণ গুন মেয়েটার। খুব সহজেই বিশ্বাস করে ফেলে মুখের কথা। সে কথার আড়ালে, মনের গহীনে চলে যে কুট চালের খেলা, ও তা খুঁজে দেখার চেষ্টাও করে না । না, এটা ওর দুর্বলতা নয়, বরং এক অমোঘ শক্তি। আর এই শক্তির অদৃশ্য শেকল বেঁধে রেখেছে আমায় ওর বিশ্বাসের ছায়ায়।

পেশাগত কারণে ব্যক্তি জীবনে প্রচুর নারীর সান্নিধ্যে আসতে হয়েছে আমাকে। আর লেখালেখি করতে এসে বেড়েছে তা বহুগুণ। কি বাস্তবে, কি ভার্চুয়ালে, চারিদিকে পরকীয়া প্রেমের সিম্ফনি। আমার ভেতরে বহুগামী বীর্যেরা নেচে ওঠে। বিদ্রোহ করতে চায়। বাধা নিষেধের সব দেয়াল ভেঙ্গে দিতে চায়। চিরায়ত পৌরুষ দখল নিতে চায় আরও অনেক নামী বেনামী জমিন। আমার ভেতরের পশু ঢুকে পড়তে চায় অন্যের সাজানো বাগানে। আমারও বহুগামী পুরুষ হতে ইচ্ছে করে। খুব ইচ্ছে করে। আর তখনই মনে হয়, নিষ্পাপ বিশ্বাসী দুই চোখ দেখছে আমায়। সে চোখের তারায় ঝিকিমিকি করে ভরসার কাঞ্চনজঙ্ঘা। বিশ্বাসী সে দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে, ভরসার সে পাহাড় মাড়িয়ে, আমার আর পুরুষ হওয়া হয়ে ওঠে না। আমি আর অবিশ্বাসী হতে পারি না। এ আমার অক্ষমতা। অবিশ্বাসী হওয়ার চেয়ে অক্ষম হওয়া আমার কাছে তখন অনেক বেশি শ্রেয় মনে হয়।

ঈশ্বর কোথায় বসে দেখছেন আমাকে, আমি জানি না। আমার মনে হয় আমিই আমার ঈশ্বর। আমিই দেখি আমার প্রতিটি কাজ। আমিই বুঝি আমার প্রতিটি প্রকাশিত অপ্রকাশিত মনোভাব। আমাকেই প্রতিনিয়ত কৈফিয়ত দিতে হয় আমার নিজের কাছে। আমার কেবলই মনে হয়, দেখা মানুষের কাছেই যদি সৎ থাকতে না পারি, তাহলে অদেখা ঈশ্বরের কাছে সৎ থাকব কেমন করে?

– কই শুরু করো। কী ভাবছ এত ?

বউয়ের কথায় ধ্যান ভাঙ্গে আমার। ওর কণ্ঠে কৌতুহুলি শালিকেরা ডানা ঝাপটায়। ওকে কেমন করে বোঝাই, এতক্ষণ আমি আমার ঈশ্বরের কাছে কৈফিয়ত দিচ্ছিলাম। হেসে বলি,

– তা তো শুরু করব। কিন্তু তার আগে বলো, তোমার প্রশ্নের উত্তর জানতে চাও না?

– কোন প্রশ্নের?

– ওই যে জানতে চেয়েছিলে, আমিও বহুগামী কিনা?

– উত্তর আমি পেয়ে গেছি।

– কী ভাবে?

– তুমিই তো বললে, কারো ভেতর পশুর একটা গুন থাকলেই তাকে পশু বলা যায় না যতক্ষণ না সে পাশবিক আচরণ করে।

– তোমার জানতে ইচ্ছে করে না, মনে মনে আমিও বহুগামী কিনা? আমার মনেও অন্য নারীর আনাগোনা আছে কিনা?

– না, আমি অন্তর্যামী হতে চাই না।

– মানে? এর মধ্যে অন্তর্যামী হওয়া আসল কোথা থেকে?

আমি অবাক কণ্ঠে জানতে চাই। বেশ কিছুক্ষণ জবাব দেয় না বউ। স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে আমার দিকে। ভুলি-ভালি মেয়েটার চোখ দুটো বড় তীক্ষ্ণ দেখায়। যেন পড়ে নিতে চাইছে আমার বুকের খাতার প্রতিটি পাতা। ভয়ে আমি শিউরে উঠি। ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে চোখের দৃষ্টি। ঠোঁটের কার্নিশে এসে বসে এক ফালি মিঠেকড়া রোদ। আনমনে মাথা নেড়ে বলে,

– নাহ, পড়তে পারলাম না।

– কী?

– তোমার মন।

– মানুষ কি পড়তে পারে মানুষের মন?

– সেটাই তো বোঝাতে চাইছি। দেখো, আমি তোমার মতো লেখক নই। তোমার মতো গুছিয়ে কথাও বলতে পারি না। তবে এইটুকু বলতে পারি, তোমার মনে কী চলছে, তা তুমি আর তোমার অন্তর্যামী ছাড়া কেউ জানে না। তুমি তো ততোটুকুই বলবে, যতটুকু তুমি বলতে চাও। তার কতটুকু সত্য আর কতটুকু মিথ্যা, বুঝতে হলে তো আমাকে অন্তর্যামী হতে হয়। তা যেহেতু সম্ভব নয়, সেহেতু জানতে চাওয়ারও কোনো মানে হয় না। তার চেয়ে এই ভালো, আমি তোমার উপর বিশ্বাস রাখলাম। যেদিন এই বিশ্বাস ভেঙে যাবে, সেদিনই সব শেষ হয়ে যাবে।

বোকাসোকা মেয়েটার এমন জীবন বোধ দেখে আমি কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে রইলাম। তবে অন্তর্যামী না হয়েও বুঝতে পারলাম, ওর প্রতিটি কথা সত্যি। ও কখনও আমার উপর স্পাইং করে না। আমি কী করি, কোথায় যাই, কার সাথে কথা বলি, কার সাথে চ্যাটিং করি, তা নিয়ে আমার পিছনে গোয়েন্দাগিরি করে না। এক অদ্ভুত বিশ্বাস ও আস্থা তার নিজের উপর। তারও বেশী বিশ্বাস ও আস্থা আমার উপর। এমন মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করি কেমন করে ?

– কী হয়েছে তোমার আজ বলো তো? বারবার কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছ !

ওকে কেমন করে বলি, ভাগ্যিস তুমি আমার মন পড়তে পারো না। পারলে হয়ত আমার উপর তোমার এই বিশ্বাস, এই আস্থা থাকত না। শুধু তুমি কেন? মানুষ মানুষের মনের খবর জানতে পারলে এই পৃথিবীটা কবেই ধ্বংস হয়ে যেত ! হেসে বলি,

– সারা জীবন তো আমার উপর ছড়ি ঘুরিয়েই গেলে। বকাঝকা করেই গেলে। এত সুন্দর করে কথা বলতে শিখলে কখন ?

– ভুইলা যাও ক্যান মিয়া? আমিও প্রিন্সিপ্যালের মাইয়া।

– ভুলতে আর দিলা কই? বিয়ার আগে তোমার বাপে বকা দিত, আর এখন তুমি দেও। আমার জন্মই হইছে তোমাগো বাপ বেটির বকা খাওনের লাইগা।

বলে আমি শব্দ করে হেসে উঠি। যেন খুব একটা হাসির জোক বলে ফেলেছি। অথচ সে হাসিতে যোগ দেয় না বউ। হঠাৎ কেমন গম্ভীর হয়ে যায়। আমি কি ভুল কিছু বলে ফেললাম? শ্বশুর সাহেব গত হয়েছেন আঠেরো বছর। তাঁর কথা মনে করিয়ে দিয়ে কি কষ্ট দিয়ে ফেললাম? আমাকে অবাক করে দিয়ে খুব শান্ত কণ্ঠে বলে,

– বাবার কাছে আর শিখতে পারলাম কই? সেই কিশোরী বয়সেই তো ঘরে নিয়ে এলে। নিয়ে ঘুরে বেড়ালে এক দেশ থেকে অন্য দেশে। বাবার কাছে দুদিন মন ভরে থাকতেও পারিনি। বাবা বুঝি সে কষ্টেই অসময়ে চলে গেলেন। আমার যা কিছু শিক্ষা, সে তো তোমার কাছেই। আমার আজও মনে আছে, বিয়ের পরপর একদিন বলেছিলে, আমার উপর বিশ্বাস রেখো। ভালোবাসা, সম্পর্ক, সংসার সব বিশ্বাসের উপরেই টিকে থাকে। সেই থেকে তোমার উপর বিশ্বাস রেখে এসেছি। দোয়া করো, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যেন এই বিশ্বাস টিকে থাকে।

হঠাৎ পরিবেশটা কেমন গুমোট হয়ে যায়। মেয়েটা পরকীয়া প্রেমের গল্প শুনতে চেয়েছিল। অথচ নিজেদের কথা টেনে এনে ওর মনটাই খারাপ করে দিলাম। হাত বাড়িয়ে টেবিলের উপর রাখা ওর হাতটা স্পর্শ করি। সে স্পর্শে থাকে, বিশ্বাস, থাকে ভরসা, থাকে ভালোবাসা। মুখে কিছু বলি না। সব কথা বলার প্রয়োজন হয় না।

বেশ কিছুক্ষণ নীরবে কেটে যায়। বিষণ্ণতার মেঘ বউটার চোখে মুখে। মনটা কেমন করে ওঠে। পরিবেশটা হালকা করা দরকার। নইলে যে কোনো সময় নামবে বৃষ্টি। বরং গল্প বলা শুরু করি। বলি,

– তুমি সত্যি কাহিনী শুনতে চেয়েছিলে না? এসো, আজ তোমাকে এক সানিয়ার পরকীয়া প্রেমের গল্প বলি।

লেখালেখির দ্বিতীয় বছরের কথা। একদিন একটা মেয়ে মেসেজ পাঠাল, “ ভাইয়া, আমি সানিয়া”। এমন ভাবে লিখল, যেন সে ভারতের টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা। নাম বললেই চিনে যাব। অথচ তোমার, আমার চৌদ্দ গুষ্টিতেও মির্জা বংশের কেউ নাই। একটু কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। জানতে চাইলাম,

– কোন সানিয়া?

– চিনতে পারলেন না?

আচানক কাণ্ড? আমার কি জগতের তাবৎ সানিয়াকে চেনার কথা? একটু রাগও হল। জানতে চাইলাম,

– পরিচয় না দিলে চিনব কেমন করে?

– আপনি সিনেমা নাটক দেখেন না? আমি নায়িকা সানিয়া।

এতক্ষণে বুঝতে পারি। রূপালী পর্দার মানুষ। কত তার ফ্যান ফলোয়ার। আমার মতো এক ছাদনাতলার লেখক তারে চিনল না? একটু অহমে তো লাগবেই। লিখলাম,

– কিছু মনে করো না। বুড়ো মানুষ। বিদেশে কাজ করে খাই। সিনেমা নাটক দেখার সময় কোথায় পাই?

– আপনার একটু সময় দেবেন ?

যাহ বাবা ! আমি কি সময়ের মুদি দোকানদার ? যে কেউ এসে বলবে, এক পোয়া সময় দেন তো ! এবার রীতিমত বিরক্ত আমি। কেটে কেটে লিখলাম,

– দেখো নায়িকা সানিয়া, ভীষণ ব্যস্ত থাকি। রোগ টোগের ব্যাপার হলে বলব, রুগী না দেখে অনলাইনে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়।

– না, রোগ নয়। ব্যক্তিগত বিষয়। আপনার লেখার একান্ত ভক্ত আমি। ভেবেছিলাম, আপনি হয়ত আমাকে কিছু পরামর্শ দিতে পারবেন। বুঝতে পারিনি আপনি এভাবে বিরক্ত হবেন। আমি দুঃখিত !

এবার নিজের আচরণের জন্য লজ্জা লাগে আমার। মানুষের জীবনে এমন কিছু বিষয় থাকে, এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা একান্ত আপন কাউকেও বলা যায় না। খৃষ্টান ধর্মে পর্দার আড়ালে বসে পাদ্রীর কাছে কনফেস করার একটা নিয়ম আছে। যেখানে পাদ্রী সাহেব সব শুনে পক্ষপাতহীন ভাবে পরামর্শ দেন। ইসলামে এমন কোনো নিয়ম নেই। মুসলমানদের সরাসরি খোদার কাছে কনফেস করতে হয়। কিন্তু খোদা তো সঙ্গে সঙ্গে কোনো সমাধান দেন না। মোল্লাদের কাছে গেলে হয়ত সরাসরি কাফের ফতোয়া দিয়ে দেবে। অদেখা মেয়েটার জন্য মনটা কেমন করে ওঠে। আহা, হয়ত একান্ত গোপন কোনো কষ্ট মেয়েটার বুকের ভেতর। আমাকে বলে হালকা হতে চাইছে। লিখলাম,

– সরি, আমার ওভাবে লেখা উচিত হয়নি। তোমাকে কতটুকু পরামর্শ দিতে পারব জানিনা, তবে তোমার কথা শেয়ার করতে চাইলে, বিস্তারিত লিখে জানাতে পারো। আমি সময় সুযোগ করে পড়ে মতামত জানাব।

– বাহ, এই না হলে পুরুষ মানুষ ! একটা মেয়ে তার কষ্টের কথা বলল, অমনি তুমি গলে গেলে ?

এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল বউ। এবার কথার হুল ফোটাল। তবে সে হুল কৌতুকের, তিরস্কারের নাকি ঈর্ষার, ঠিক বোঝা গেল না। বললাম,

– কত মেয়েই তো সশরীরে আমার কাছে এসেছে। তাদের শরীরের কষ্টের কথা বলেছে। সেই শরীর খুলে দিয়েছে পরীক্ষা করার জন্য। তাতে যদি অসুবিধা না হয়, তাহলে একটা বায়বীয় মেয়ে যদি তার মনের কষ্টের কথা বলতে চায়, তাতে অসুবিধা কোথায় ? তুমিই তো পরকীয়া প্রেমের সত্যি কাহিনী শুনতে চেয়েছিলে। অবশ্য এখন তোমার শুনতে ভালো না লাগলে বাদ দিই।

কী আশ্চর্য ? তোমার সাথে কত মেয়েরা কত রকম হেঁয়ালি করতে পারে, আর ঘরের বউ হয়ে আমি একটু দুষ্টুমিও করতে পারব না? বলো বলো, কিচ্ছু বাদ দিও না। এতদিন তো কুয়োর ব্যাঙ হয়েই রইলাম, এবার নাহয় তোমার চোখ দিয়েই বাইরের পৃথিবীটাকে দেখি।

অবাক হয়ে দেখি, মেঘ কেটে গিয়ে চোখের কোনে উঁকি দিচ্ছে কৌতহূলী রোদ। বড় অদ্ভুত সৃষ্টি এই নারী বিধাতার ! কত সহজেই রঙ বদলায়! আমি বলি,

– তার আগে একবার পিছন ফিরে দেখো।

পিছন ফিরে দেখে ঘুম ঘুম চোখে ছেলে দরজায় দাঁড়িয়ে । মায়ের ধারা পেয়েছে। মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে, এখনও স্কুলের ছেলেদের মত মনে হয়। ছেলেকে দেখেই হড়বড় করে বলে ওঠে,

– কখন উঠছিস বাপ ? আমাকে ডাকিসনি কেন ? আহা, খিদায় মুখটা শুকিয়ে গেছে। চল চল, তোকে খেতে দেই।

বলে ছেলেকে নিয়ে হুড়মুড় করে ডাইনিং এর দিকে চলে গেল। কী প্রবল প্রভাব মাতৃত্বের ! মুহূর্তে নিষিদ্ধ কাহিনী শোনার নেশা কাটিয়ে দিল ! আমি বসে বসে ওদের চলে যাওয়া দেখি আর মনে মনে ভাবি, তবে কী এমন নেশা পরকীয়ায়, যা মাতৃত্বের নেশাকেও কাটিয়ে দেয় ?

চলবে…।

আরো পড়ুন : পরকীয়া (পর্ব-১)

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ