পরকীয়া (পর্ব-৩)

প্রকাশিতঃ ১২:৫৬ অপরাহ্ণ, শনি, ৩০ নভেম্বর ১৯

ডা. আফতাব হোসেন :

– বাবা, তোমার কাছে বিপি মেশিন আছে?

– নারে বেটা। আমি তো এখন ক্লিনিক্যাল প্রাকটিস করি না। কেন? কার বিপি মাপবি? তোর মায়ের ?

আমি উৎকণ্ঠিত হয়ে জানতে চাইলাম। পঞ্চাশোর্ধ মহিলা। বয়স তার চামড়ায় কামড় বসাতে না পারলেও শরীরে কোথাও না কোথাও ঠিক ঘাপটি মেরে বসে আছে। মাঝে মাঝে জানান দেয়। তখন বিপি লো হয়ে যায়। আমাকে অবাক করে দিয়ে ছেলে বলল,

– না, আমার বিপি মাপব।

শুনে ধক করে ওঠে বুকের ভেতর। মুহূর্তে বাবার মন সন্তানের দুশ্চিন্তায় কেঁপে ওঠে। যদিও জানি, জোয়ান মর্দ ছেলে আমার। সুন্দর ছিপছিপে শরীর। রোগ বালাই নেই বললেই চলে। তবু অস্থির হয়ে ওঠে মন। জানতে চাইলাম,

– কেন বাপ? শরীর খারাপ?

– না।

– তাহলে?

– মাথাটা ঠাঁসা ঠাঁসা লাগছে।

মাথা ঠাঁসা ঠাঁসা লাগা? এমন উপসর্গ তিন যুগের ডাক্তারি জীবন তো দূরের কথা, বাপের জন্মেও শুনিনি। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছুক্ষণ ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইলাম। অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো,

– মানে কী বাজান?

– মাথাটা কনজেস্টেড লাগছে বাবা।

কনজেসশনের বাংলা করেছে ঠাঁসা ঠাঁসা ? আমি হাসব না কাঁদব, বুঝতে পারি না। যার বাবা বাংলায় সাহিত্য রচনা করে মানুষের বাহবা কুড়াচ্ছে, তার বাংলা ভাষার এমন বেহাল অবস্থা? অবশ্য ওকে দোষ দেয়া যায় না। বিদেশে জন্ম, বিদেশেই বড় হওয়া। বাংলা পড়েনি কখনও। তবে ঘরে আমরা কখনই ওর সাথে ইংরেজিতে কথা বলি না। তাই বাধ্য হয়েই ওকে আমাদের সাথে বাংলায় কথা বলতে হয়। যদিও এমন সব স্বরচিত উতপটাং শব্দ সে প্রায়ই ব্যাবহার করে। যেমন দেড়টাকে বলে সাড়ে একটা। তবু তো বাংলা বলে!

হঠাৎ মনে পড়ল, মা দেশে থাকতে বাসায় একটা বিপি মেশিন ছিল। সে নিশ্চয়ই সেটা সাথে করে আমেরিকা নিয়ে যায়নি। অনেক খুঁজে পেতে তাকে পাওয়াও গেল। উত্তরাধিকার সূত্রে ছোট বোন তার কাছেই রেখে দিয়েছিল। দোমড়ানো, মোচড়ানো। তবে কোনো মতে কাজ চালানো গেল। বিপি পারফেক্ট। আর কোনো অসুবিধা নেই। শুনে ছেলে ব্রিটিশ কেতায় বাপকে থ্যাংকইউ দিয়ে চলে গেল। আমারও বুক থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল।

আমি অবাক হয়ে ভাবি, সন্তানের জন্য এত মায়া বুকে ভেতর আসে কোথা থেকে? আমি তো নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ছেলের একটু খুশির জন্য আমি গায়ের গোশত কেটে দিতে পারি। ছেলের একটু হাসির জন্য আমি বুকের রক্ত ঢেলে দিতে পারি। আর পাঁচ জন বাবাও নিশ্চয়ই পারেন। হয়ত আরও বেশী পারেন। তার চেয়েও বেশী পারেন মায়েরা। তাদেরই তো নাড়ি ছেড়া ধন ! অথচ এই মা বাবারা যখন নিজ লালসাকে দমন করতে না পেরে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে, সংসারে অশান্তি ডেকে নিয়ে আসে, আর সন্তানেরা অসহায় চোখে সেই সব মা বাবার অপকর্মের বোবা সাক্ষী হয়ে থাকে। তখন কি তাদের মাতৃত্ব কিংবা পিতৃত্ব বোধ বিবেকের দরজায় একবারও কড়া নাড়ে না? নাকি এমন কিছু ঘটে তাদের জীবনে, পর্দার অন্তরালে, যা তাদের মাতৃত্ব কিংবা পিতৃত্বের মমতাকেও হার মানিয়ে দেয়? আমি জানি না। সত্যি আমি জানি না।

– নাও, এবার শুরু করো তোমার সানিয়ার পরকীয়া কাহিনী।

রাতের সব কাজ শেষ করে স্টাডিতে এসে কখন বসেছে বউ, টের পাইনি। আসলেই সে একটা কুয়োর ব্যাঙ। যতটুকু দেখাই তারে, ততটুকুই দেখতে পারে। তার চেয়ে বেশী দেখতে চায়ও না। দেখতেও পায় না। তাই বুঝতে পারছি না, ঠিক কতটুকু তারে বলা যায়। কত সানিয়ার গল্প আমি জানি। কত সুমনের গল্প আমি জানি। কত গল্প নীরব শ্রোতা হয়ে আমি শুধু শুনেই গিয়েছি। কে ঠিক, কে ভুল, আজও তা বুঝে উঠতে পারিনি। আমার ঠোঁটের কোনে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটে ওঠে। বলি,

সানিয়া তার মতো করে লিখে পাঠিয়েছিল। আমি সানিয়ার জবানীতেই আমার মতো করে বলছি;

মফঃস্বল শহরের এক গরীব বাবার মেয়ে আমি। বড় মেয়ে। আমার পরে আরও দুটি বোন, একটি ভাই। পড়াশুনায় বেশ ভালো। দেখতে শুনতে আরও ভালো। স্বাভাবিকে ভাবেই শহরের বখাটেদের চোখে পড়ে গেলাম। স্কুলে থাকতেই কত জনের কত প্রেম নিবেদন, রাস্তা ঘাটে কত ইভ টিজিং, নানা ঢঙের নানা জ্বালাতন। কোনমতে স্কুল পার করলাম। রেজাল্ট ভালই হল। শহরের কলেজে ভর্তি হলাম। বন্ধু, বান্ধবীদের স্তুতি আস্তে আস্তে আমার মাথাটা বিগড়াতে লাগল। মনের ভেতর শুরু হল নানা রঙের খেলা। সে রঙ আমার চোখে মুখে। আয়নায় নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখি আর নিজের রূপে নিজেই মুগ্ধ হই। শেষ পর্যন্ত আমাদেরই কলেজের এক সিনিয়র ছেলের প্রেমে পড়ে গেলাম। সুমন। সে তখন ডিগ্রী ফাইনাল দেবে। বেশ বড় লোকের ছেলে। তবে নম্র, ভদ্র, মেধাবী। আর দেখতে? একজন অষ্টাদশী কুমারী মেয়ের স্বপ্নের রাজকুমার যেমন হয়। সে’ই প্রথম প্রেম নিবেদন করেছিল। না করব কী? আমার তো মনে হয়েছিল, নারী জনম আমার ধন্য হয়ে গেল।

হয়ত ভাবছেন, সিনেমার নায়িকা, আপনাকে এক সিনেমার গল্প বলছে। বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, মাঝে মাঝে বাস্তব জীবনের গল্প সিনেমাকেও হার মানিয়ে দেয়। ছোট শহর, ছোট কলেজ। আমাদের প্রেম কাহিনী মুখে মুখে রটে যেতে সময় নিলো না। সিনেমার মতই সুমনের প্রভাবশালী বিত্তবান বাবা ভিলেনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। তাঁকে আমি দোষও দিতে পারি না। কোন বাবাই বা তার এমন রাজপুত্রের মতো ছেলের জন্য চাল চুলা হীন বাবার মেয়েকে বউ হিসেবে মেনে নেয়? আমাদের পরিবারের উপর নেমে এলো নানা রকম জোর, জুলুম, হয়রানি। নেমে এলো সুমনের উপরও। এই অবস্থায়ই সুমন পরীক্ষা দিল। কিন্তু পরীক্ষা তেমন ভালো হল না। আশানুরূপ রেজাল্টও হল না। যখন দেখলাম, আমার জন্যই সুমনের জীবনটা নষ্ট হতে চলেছে, একদিন তাকে বললাম, আমাকে ভুলে যেতে। বলল, অসম্ভব। আমাকে ছাড়া বাঁচবে না সে। সবারই কি এমন মনে হয়? মুখে না বললেও আমারও সেই একই অবস্থা। সুমন ছাড়া কিছুই দেখি না, কিছুই বুঝি না। সুমন ছাড়া এই জীবনে বাঁচার কোনো মানে হয় না। শেষে একদিন দিন, মা বাবা, ভাই বোন, সবাইকে ভুলে, সুমনের হাত ধরে পালালাম। উঠলাম ঢাকায় ওর এক বন্ধুর বাসায়। বন্ধুরা মিলে কাজী ডেকে আমাদের বিয়ে পড়িয়ে দিল।

শুরু হল এক নতুন জীবন। আমরা পাঁচ তলা এক ফ্লাট বাড়ির ছাদে চিলেকোঠায় ঠাই নিলাম। মনে হত একটা পাখির বাসা। সেই পাখির বাসাতেই মনের মানুষের সাথে স্বপ্নের ঘর বাঁধলাম। এত সুখ, এত শান্তি, এত আনন্দ, আমার সে ছোট্ট ঘরে ঠাই হত না। তাই সবাই ঘুমিয়ে গেলে, আমরা পুরো ছাদটাকেই আমাদের ঘর বানিয়ে নিতাম। আকাশ তার বিশাল বুক দিয়ে আমাদের ঢেকে রাখত। তারারা সারা রাত পিদিম জ্বালিয়ে রাখত। চাঁদ দুহাতে তার জোছনা ঢেলে দিত। সেই জোছনায় ভিজে ভিজে, সেই তারা ভরা রাতগুলোতে, সুমন আমাকে আদরে সোহাগে ভরিয়ে দিত এক আদিম উল্লাসে। দিনগুলি আমাদের প্রজাপতির ডানায় ভর করে কী ভাবে উড়ে উড়ে যেত, টেরই পেতাম না।

এভাবেই মাস তিনেক কাটল। এই তিন মাসে কেউ আমাদের খোজ পায়নি। আমরাও কারও খোঁজ করিনি। এক সময় সুমনের জমানো টাকায় টান পড়ল। ওর কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ। আমরা স্বপ্নের দুনিয়া থেকে বাস্তবের কঠিন পৃথিবীতে নেমে এলাম। যেখানে টাকা ছাড়া বাঁচা যায় না। শুধু আদরে পেট ভরে না। সুমন প্রতিদিন সকালে কাজের খোঁজে বের হত, আর ফিরত সন্ধ্যা পার করে। সারাদিন আমি সেই চিলে কোঠায় ওর পথ চেয়ে বসে থাকতাম। রাতে ওর ক্লান্ত মুখটা দেখে মায়ায় বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠত। ধনীর দুলালের এই কষ্ট আমি সইতে পারতাম না। যার বাবার এত ধন সম্পত্তি, এত ব্যবসা বাণিজ্য, সে কিনা একটা চাকরির জন্য সারা দিন ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে? পর্দার নায়িকারা হয়ত বলত না, কিন্তু আমি বললাম। অনেকটা স্বার্থপরের মতই একদিন বললাম,

– চলো বাড়ি ফিরে যাই। আমরা তো বিয়ে করেই ফেলেছি। তোমার পরিবার নিশ্চয়ই এখন আমাদের মেনে নেবেন।

– তা হয়ত নেবেন। কিন্তু তাতে তোমাকে ছোট করা হবে। তোমাকে তাদের সম্মানের সাথেই মেনে নিতে হবে। আর তার জন্য তাদেরই তোমার কাছে আসতে হবে। তুমি চিন্তা করো না। তোমার জন্য আমি সব করতে পারি, কিন্তু তোমাকে ছোট করতে পারব না।

সেদিন সুমনের কথা শুনে মনে হয়েছিল, আমার চাইতে ভাগ্যবতী, সুখী মানুষ এই পৃথিবীতে আর নাই। আমি সুমনকে আদরে আদরে পাগল করে দিলাম।

সুমন ছিল ভীষণ আত্মবিশ্বাসী আর একগুঁয়ে। একবার সিদ্ধান্ত নিলে সেখান থেকে তাকে আর সরানো যেত না। সে তার বাবার কাছে ফিরেও গেল না, যোগাযোগও করল না। চাকরি না পেলেও সে ঠিক কয়েকটা টিউশনি জুটিয়ে নিলো। ঢাকা শহরে প্রাইভেট পড়িয়ে ভালই পয়সা পাওয়া যায়। আমাদের দুজনের পাখির সংসার। বেশ চলে যাচ্ছিল।

কথায় বলে না, আমরা ভাবি এক, হয় আর এক। আমরা সাবধানই ছিলাম। তবু সেই সাবধানতার ফাঁকে, কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে সুমন আমার ভেতরে তার বীজ বপন করে দিল। আমি কন্সিভ করে ফেললাম। অভাবের সংসার। ভালো ঘর নেই, ভালো আয় নেই, নিজেদেরই চলে না, একজন নতুন মানুষকে লালন পালন করব কী করে? দুশ্চিন্তায় আমার ঘুম হারাম হয়ে গেল। অথচ সুমনের সে কী আনন্দ! একদিন আমি বললাম,

– এখনও আমাদের বাচ্চা নেয়ার সময় আসেনি। চলো, এবরশন করে ফেলি।

শুনে সুমনের সে কী রাগ। তার একটাই কথা, এ আমাদের ভালোবাসার প্রথম ফসল। সে এ পৃথিবীতে আসবেই। আমি সুমনকে চিনি। একবার না বললে আর হ্যাঁ করানো যাবে না। আমিও মেনে নিলাম, কোন মেয়েরই বা ইচ্ছে করে না মা হতে ? সুমনের আমার প্রতি যত্ন আরও বেড়ে গেল। সেটা কতটুকু আমার জন্য, আর কতটুকু তার অনাগত সন্তানের জন্য, বুঝতে পারিনি।

এর মধ্যে আর একটি ঘটনা ঘটল। সুমন তার এবং আমার মা বাবাকে আমাদের সন্তানের খবর জানিয়ে দিল। আমি জানতে চাইলাম,

– এ তুমি কী করলে?

– দেখো, কারও অনুগ্রহ আমি চাই না। তাই এতদিন জানাইনি। কিন্তু আমাদের সন্তান, দুই পরিবারেরই প্রথম সন্তান। আমি তাকে মুরুব্বীদের দোয়া থেকে বঞ্চিত করতে চাই না। তারা আসুক, আমাদের সন্তানকে আশীর্বাদ করে যাক।

দুটি ভিন্ন তারিখে দুই পরিবারই এলেন। অনিচ্ছা স্বত্বেও আমাকে সুমনের পরিবার মেনে নিলেন। খুব করে সুমনকে ফিরে যেতেও বললেন। বললেন, বাবার ব্যবসা সামলাতে। কিন্তু সুমনের একরোখা জবাব, সে তার নিজের পায়েই দাঁড়াতে চায়। নিজের উপার্জনে সন্তানকে মানুষ করতে চায়। কোনো অনুনয়, বিনয়ে কাজ হল না। তারাও হয়ত তাদের ছেলেকে চেনে। তাই আর বেশী ঘাঁটাল না। কিন্তু তাদের আচরণ দিয়ে এটাও বুঝিয়ে দিতে ভুল করলেন না যে, সুমনের এই কষ্টের জন্য, এই দুর্দিনের জন্য আমিই দায়ী। আমার মা বাবাও এলেন। সুমন তাঁদেরও যত্নের কোনো ত্রুটি করল না।

সুমন আরও কয়েকটা টিউশনি জোগাড় করে নিলো। সকাল বেলা বেরিয়ে যায়, আর ফেরে অনেক রাতে। সারাদিন কী কী করে তেমন কিছুই বলে না। শুধু বলে, বন্ধুদের সাথে একটা ব্যবসার চেষ্টা করছে। বেশী কিছু বলতে পারে না। ক্লান্ত শরীরে নিমেষেই ঘুমিয়ে পড়ে। অথচ সারাদিন কত কথা হয় আমার সন্তানের সাথে, কতবার সে আমাকে তার অস্তিত্বের জানান দেয়, সেই সব বলব বলে জমা করে রাখি, কিন্তু বলা হয় না। সারা রাত আমি ভারি শরীরে নির্ঘুম বসে থাকি। বসে বসে সুমনকে দেখি। মায়ায় বুকটা কেমন করে ওঠে। নিজের পেটে হাত বুলিয়ে বলি, দেখ, তোর জন্য তোর বাপটা কত কষ্ট করছে। একদিন তুই বড় হয়ে তোর বাবার এই কষ্ট ভুলিয়ে দিবি। আর তখনই মনে হয়, আমার জন্যও তো আমার মা বাবা এমনই কষ্ট করেছে। অথচ আজ আমি আমার জীবন নিয়ে আছি। তাদের কোনো কাজেই তো আসতে পারছি না। আমার ভেতর কেমন ভাঙচুর হতে থাকে। মনে মনে ভাবি, বাবুটা একটু বড় হলে আমিও একটা কাজ করব। গরীব মা বাবার একটু হলেও উপকারে আসব।

মাঝে মাঝে শেষ রাতে সুমন জেগে ওঠে। ওর শরীরে তখন এক আসুরিক উন্মাদনা ভর করে। আমি ভয়ে শিউরে উঠি। আমার নাজুক শরীর ওর সে উন্মাদনা সইতে পারবে না। ওকে বুঝিয়ে বলি। বাবুর ক্ষতির কথা বলে ওকে শান্ত করি। বাধ্য শিশুর মতো ও বুঝ মানে। পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে। আমার তখন খুব কষ্ট হয়। খুব কষ্ট। আমারও যে খুব আদর করতে ইচ্ছে করে ! আদর পেতে ইচ্ছে করে ! মানুষের শরীর এমন কেন?

সব মেয়েরাই এমন সময়টাতে নিজের মায়ের কাছে থাকতে চায়। আমিও একদিন বলেছিলাম। কিছুদিন নাহয় মায়ের কাছে থেকে আসি। শুনে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে থেকে সুমন বলল,

– দেখো, তোমার কষ্ট আমি বুঝতে পারছি। তোমার জন্যই আমি আমার মা বাবাকে ছেড়েছি। এখন যদি তুমি তোমার মা

বাবার কাছে যেয়ে থাকো, তবে আমার মা বাবাকে ছোট করা হবে। এটা বোধহয় ঠিক হবে না।
ওর কথায় যুক্তি আছে। নিজেকে কেমন স্বার্থপর মনে হয়। মনে মনে বলি, বেশ, তবে তাই হোক। তুমি যদি আমার জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে পারো, তবে আমি কান পারব না ? আমি সেই চিলেকোঠাতেই থেকে গেলাম। কষ্টের সময়ের কি পাখা ভেঙ্গে যায়? নইলে অন্য সময়ের মতো উড়ে উড়ে যায় না কেন? তবু সব কষ্টের রাতই এক সময় ভোর হয়, আসে নতুন সূর্য। আমাদের কষ্টের দিনও এক সময় শেষ হয়। আমার কোল আলো করে আসে নতুন অতিথি। ছেলে। সুমন আমার নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখে সানি। আমাদের আঁধার জীবনে একমাত্র খুশির সূর্য। সানিকে দেখতে তার দাদা দাদী আসেন। নানা নানী আসেন। তবে এবারও ভিন্ন ভিন্ন তারিখে। হয়ত সুমনই এমন ব্যবস্থা করেছে। কারণ দুই পরিবারে এখনও সমঝোতা হয়নি। আমাদেরও আর আমাদের সেই প্রিয় মফঃস্বল শহরে ফেরা হয় না।

সানি আসাতে আমাদের খরচ আরও বেড়ে যায়। এমনিতেই সানি হওয়ার সময় সুমনের অনেক ধার কর্জ হয়ে পড়েছিল। আমি বুঝতে পারি, সুমন পেরে উঠছে না। জীবন যুদ্ধে ও বুঝি হেরে যাচ্ছে। মুখ চোখ ভেঙ্গে যাচ্ছে। কিন্তু ওকে আমি হেরে যেতে দেখতে পারি না। আবার ওর আত্মসম্মানে আঘাত লাগে, এমন কিছুও করতে পারি না। নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। লক্ষ্য করি, সুমন কেমন দিন দিন বদলে যাচ্ছে। ও ফিরতে ফিরতে সানি ঘুমিয়ে পড়ে। আমি ওর জন্য তৈরি হয়ে থাকি। পাশে দাঁড়িয়ে ওকে খেতে দেই। দু’চোখ ভরে ওর খাওয়া দেখি। ভাবি খাওয়ার পর আমরা আগের মত আমাদের সেই আকাশের নীচের ঘরটায় যাব। যেখানে লক্ষ তারার জোনাক জ্বলে। কিন্তু খেয়েই ও শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাক ডাকতে শুরু করে। বুঝতে পারি, ভীষণ ক্লান্ত ও। অবসাদগ্রস্ত। ওকে দোষ দিতে পারি না। কিন্তু আমার যে ঘুম আসে না। শরীরের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা অনুভব করি। বাবুটাকে মাঝখানে রেখে আমি অন্য পাশে শুয়ে থাকি। শুয়ে শুয়ে ছোট্ট জানালা দিয়ে এক খণ্ড আকাশ দেখি। সে আকাশে এখনও কত তারা মটি মিটি জ্বলে। মাঝে মাঝে সে আকাশে চাঁদ এসে উঁকি দেয়। তার জোছনা জানালা গলে এসে পড়ে আমার গায়। আকাশ আমাকে ডাকে, আমার ঘরে আয়। তারারা আমাকে ডাকে, আমাদের সাথে খেলবি আয়। চাঁদ আমাকে ডাকে, আয়, আমার জোছনায় মাখবি গায়।। আমার আর একা একা আকাশের ঘরে যাওয়া হয় না, তারাদের সাথে খেলা হয় না, জোছনা গায়ে মাখা হয় না।

হয়ত ভাবছে, কী পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটছি? এ আর এমন কী? এমন ঘটনা তো কতই ঘটছে। কিন্তু এর পর এমন এক ঘটনা ঘটল, যা আমার পুরো জীবনটাই বদলে দিল। যে ঘটনা বলতেই আপনাকে লিখতে বসা।

আমাদের বাসাটা ছিল ধানমণ্ডিতে, লেকের পাশেই। পশ এলাকা। এক এক ফ্লোরে চারটা করে ফ্লাট। বেশ বড়সড়। ঢাকা শহরে এসে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি। কি চাকরি, কি ব্যবসা, পুরুষ মানুষগুলোর ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায়। এই বিল্ডিঙের কোনো মহিলাই চাকরি করেন না। তারা বিকেল হলে হয় শপিঙে বেরিয়ে যান, নয়ত এক এক ফ্লোরে আড্ডা জমান। মাঝে মাঝে ছাদেও উঠে আসেন। আমাকে সবাই বেশ পছন্দ করেন। তবে আমার শরীর নিয়ে কিংবা নারী পুরুষের একান্ত বিষয়গুলি নিয়ে আলাপ করতে বেশি পছন্দ করেন। সে সব কথা শুনলে আমার কেমন অস্বস্তি হয়। কখনও কখনও গায়েও হাত দেন। আমার শরীর শিরশির করে ওঠে। কিছু বলতেও পারি না। তাদের বদান্যতায় এই ছাদে আছি। নইলে কোন বস্তিতে ঠাই হত কে জানে।

এক বিকেলে আমি ছাদে অলস পায়চারি করছি। বাবুটা ঘুমিয়ে। এমন সময় এক ভাবি এলেন। সাথে তার পাঁচ বছরের মেয়ে। এসে বললেন,

– সানিয়া, আমার একটা উপকার করবে ভাই?

আমি তার দিকে তাকাই। ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বয়স। একটু মোটা ধাঁচের। তবে মিষ্টি চেহারা। আজ দারুণ করে সেজেছেন। আমি আবার তার কী উপকারে আসতে পারব? তবে বললাম,

– নিশ্চয়ই ভাবি। বলে কী করতে হবে?

– তেমন কিছু না। আমার বেবিটাকে একটু ঘণ্টা দুইয়ের জন্য কাছে রাখবে? আমার এক আত্মীয়কে হাসপাতালে দেখতে যাব। বাচ্চাদের হাসপাতালে নেয়া ঠিক না। কত রকম রোগ জীবাণু ! তাছাড়া ওর হোম ওয়ার্কটাও একটু দেখিয়ে দিও।

বলে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসেন ভাবি। আমি অবাক হয়ে যাই। হাসপাতালে কেউ এত সেজে গুজে যায়? হয়ত যায় এই ঢাকা শহরের মানুষ। মেয়েটিও খুব মিষ্টি দেখতে। পিঠে স্কুল ব্যাগ ঝোলানো। কেন জানিনা, বাচ্চারা আমাকে খুব পছন্দ করে। এই মেয়েটিও তার ব্যতিক্রম নয়। বললাম,

– ঠিক আছে ভাবি। আপনি ভাববেন না। আমি ওকে দেখে রাখব।

– একটু দেরি হলে চিন্তা করো না। ঢাকা শহরের যা ট্রাফিক!

বলে আবার সেই ভঙ্গিতে হাসলেন। ঢাকা শহরের ট্রাফিক যে কত ঘটনা, দুর্ঘটনার জন্ম দেয়, কত অজুহাতে মানুষের জীবন বদলে দেয়, তা ক্রমান্বয়ে জেনেছি। বললাম,

– চিন্তা করব না ভাবি। আপনি নিশ্চিন্তে যান।

ভাবি চলে গেলেন। এর মধ্যে বাবু উঠে গেল। উঠেই তারস্বরে চিৎকার শুরু করল। ঘুম ভাঙ্গলে ও এমন করে। তখন ওকে নিয়ে ছাদে পায়চারি করতে হয়। আমি বাবু ও মেয়েটাকে নিয়ে ছাদে পায়চারি করছি। এমন সময় নীচে চোখ গেল। দেখি ভাবি হেঁটেই বাড়ি থেকে বের হলেন। বের হয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়িতে উঠলেন। ভাবির গাড়ি তো নীচে পার্কিং এ থাকার কথা !

চলবে…।

 

আরো পড়ুন :

পরকীয়া (পর্ব-২) 

পরকীয়া (পর্ব-১)

 

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ