পরকীয়া (পর্ব-৪)

প্রকাশিতঃ ৮:১০ অপরাহ্ণ, বুধ, ৪ ডিসেম্বর ১৯

আফতাব হোসেন :

এই বিল্ডিং এ প্রায় প্রত্যেক ফ্যামিলিতেই দুটো করে গাড়ি আছে। একটি স্বামী ব্যবহার করেন, অন্যটি স্ত্রী ও সন্তানেরা। বাড়ির নীচ তলা পুরোটাই গ্যারেজ। প্রত্যেক ফ্লাটের জন্য দুটো করে পার্কিং। আছে ড্রাইভারদের হোস্টেল। সেখানেই সব ড্রাইভাররা তৈরি হয়ে বসে থাকে। যাতে চাহিবা মাত্র গাড়ি নিয়ে মালিক কিংবা মালকিনের জন্য হাজির হতে পারে। সেক্ষেত্রে ভাবির এভাবে বাড়ির বাইরে যেয়ে গাড়িতে ওঠাটা কেমন খটকা লাগে আমার কাছে। আছে হয়ত কোনো কারণ। আমি হলাম চিলেকোঠার বাসিন্দা। অট্টালিকার মানুষদের নিয়ে মাথা ঘামানো আমার উচিত না। অন্য কেউ হলে হয়ত ঘামাতামও না। কিন্তু এই মানুষটা আমার কাছে অন্য রকম।

দু’বছরের উপরে এই ছাদে সংসার পেতেছি। ছোটখাটো একটা খেলার মাঠের মতো বিশাল ছাদ। সেই ছাদের রেলিং ঘেঁষে টবে টবে সাজানো কত ফুলের গাছ। সেই সব গাছে ফুটে থাকে কত নাম জানা না জানা বাহারি ফুল। সকালে বিকালে মালী এসে পানি দিয়ে যায়। গাছদের সেবা যত্ন করে। রাতে ফুলেরা নেশা ধরানো সব গন্ধ ছড়ায়। সুমন আর আমি কত রাত সেই নেশায় মাতাল হয়েছি। সংসারের ঘানী টানতে টানতে ক্লান্ত সুমনের এখন আর সে নেশায় মাতাল হওয়ার সময় হয় না। অথচ রাতে আমার ঘুম আসে না। মাঝে মাঝে, সুমন ও বাবু ঘুমিয়ে গেলে একাই আমি চুপিসারে বেরিয়ে আসি। আনমনে ছাদে পায়চারী করি। তারাদের সাথে কথা বলি। ফুলদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি। ওদের গন্ধ আমাকে উদাস করে দেয়।

অথচ যাদের পয়সায়, যাদের জন্য বেবিলনের ঝুলন্ত বাগানের মতো ছাদে এই সুন্দর ফুলের বাগান, তাদের সে বাগানে আসার সময় হয় না। প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি এই ফুলের সৌরভে নয়, কৃত্রিম ফরাসি সৌরভে তারা ঢেকে রাখে তাদের শরীরের দুর্গন্ধ! এই শহরের নাম ঢাকা কে রেখেছিল আমি জানি না। কেউ কেউ বলে, সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন বুড়িগঙ্গার তীরে জঙ্গলে ঢাকা দেবী দুর্গার একটি মূর্তি পেয়েছিলেন। পরে সেখানে তিনি একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। নাম রাখেন ঢাকেশ্বরী মন্দির। সেই থেকে এই স্থানের নাম হয়ে যায় ঢাকা। আবার কেউ কেউ বলে, মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এই শহরকে সুবে বাংলার রাজধানী ঘোষণা করলে খুশিতে সুবেদার ইসলাম খাঁ ঢাক বাজানোর নির্দেশ দেন। সেই থেকে লোক মুখে মুখে এই শহরের নাম হয়ে যায় ঢাকা। নাম যেই রাখুক, যেভাবেই আসুক, এই শহরে এসে, এই শহরের মানুষগুলোকে দেখে, সম্পূর্ণ বিপরীত দুই চিত্র আমার চোখে ধরা পড়ে। এই শহরে অনেক মানুষ বাস করে খোলা আকাশে নীচে। ঘুমায় বস্তিতে, পার্কে, ফুটপাতে কিংবা রেল স্টেশনে। তাদের জীবন খোলা আকাশের মতই পরিষ্কার। গোপনীয়তা বলে তেমন কিছু নেই। আর অনেক মানুষ বাস করে আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকায়। আকাশের কাছাকাছি থেকেও তারা আকাশ দেখে না কখনও। তাদের জীবন ঢাকা থাকে ছাদের নীচে, চার দেয়ালের ভেতরে, গাড়ির টিন্টেড গ্লাসের পেছনে। তাদের মুখ ঢাকা থাকে অনেকগুলো মুখোশের আড়ালে। মুখ ঢাকা এই মানুষগুলো তাদের একান্ত চেনা মানুষের কাছেও অনেক সময় অচেনা রয়ে যায়।

এই বাড়ির মানুষগুলো ছাদে আসে না তেমন। মাঝে মাঝে কাজের মেয়েরা কাপড় শুকাতে আসে। একই বিল্ডিং এ বাস করেও এ বাড়ির মানুষগুলো তাই আমার কাছেও অচেনা রয়ে যায়। মাস ছয় আগের ঘটনা। প্রচণ্ড গরমে সে রাতে আমার ঘুম আসছিল না। দম বন্ধ করে ছিল প্রকৃতি। সেই গরমেও সুমন আর বাবু ঘুমচ্ছিল অকাতরে। আমি চুপি চুপি বাইরে বেরিয়ে আসি। রাত দশটায় ছাদের বাতি নিভিয়ে দেয়া হয় নীচ থেকে। বোধহয় অমাবস্যা ছিল সে রাতে। চাঁদ ছিল না আকাশে। তবে চাঁদ হীন কালো আকাশে বসে ছিল অযুত তারার মেলা। যেন রাশি রাশি শিউলি ফুল কেউ অযত্নে ছড়িয়ে দিয়েছিল পুরা আকাশ জুড়ে। ঢাকা শহর বুঝি ঘুমায় না কখনও। তখনও হুস হাস করে ছুটে যাচ্ছিল দু একটা গাড়ি হর্ন বাজিয়ে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ল্যাম্প পোস্টগুলো ছড়াচ্ছিল নিয়ন আলো অকাতরে। তারই কিছুটা আলো উঠে এসেছিল ছাদে। বিশাল সে ছাদে তখন এক রহস্যময় আলো আঁধারির খেলা। সেই আলো আধারিতে নিজেকেও নিজের কাছে কেমন অচেনা মনে হয়। মনে মনে ভাবি, এমন জীবনই কি চেয়েছিলাম আমি? বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে।

হঠাৎ যেন কেউ ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। মেয়েলী কণ্ঠ। কে কাঁদল ? আমিই কি? না, বুকের ভেতরে কাঁদলেও কোনো শব্দ তো করিনি ! তবে কে কাঁদল অমন করে এই নির্জন ছাদে? আমি কান খাঁড়া করি। এবার স্পষ্ট শুনতে পাই। কে যেন কাঁদছে ইনিয়ে বিনিয়ে। কে কাঁদে অমন করুণ সুরে? কার বুকে এমন হৃদয়ের তার ছেড়া হাহাকার? কোনো কাজের বুয়া কি? যতদূর শুনেছি, নিরাপত্তার কারণে এই বিল্ডিঙে রাতে কোনো কাজের মানুষের থাকার অনুমতি নেই। হোটেলের মতো ভোর ছটায় চেকইন করে, আর রাত দশটার মধ্যে চেক আউট করতে হয়। তবে কি এই বাড়িরই কোনো অন্তঃপুর বাসিনী? আমি শব্দ লক্ষ্য করে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই। হঠাৎ দেখি, দূরে অন্ধকারে, ছাদের দেয়ালে হেলান দিয়ে, আলুথালু বেশে পা ছড়িয়ে বসে আছে এক নারী মূর্তি। কেঁপে কেঁপে উঠছে তার শরীর। হয়ত কান্নার দমকে ! অশরীরী কেউ ? ভাবতেই ভয়ে ছমছম করে ওঠে শরীর। তবু মোহগ্রস্তের মতো সে মূর্তির দিকে এগিয়ে যাই। আমার পায়ে কোনো স্যান্ডেল ছিল না। তাই আমার আসার শব্দ সে শুনতে পায় না। অস্ফুটে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, কে?

শুনে ধড়ফড় করে নিজেকে গুটিয়ে নেয় ছায়া মূর্তি। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায়। এতক্ষণ সে দেয়ালের পাশে অন্ধকারে ছিল। তাই তার মুখ আমি ভালো করে দেখতে পাইনি। উঠে দাঁড়াতেই বাইরের আলো এসে পড়ে তার মুখে। আমি চমকে তাকিয়ে দেখি খুব সম্ভ্রান্ত চেহারার অসম্ভব রূপবতী এক মহিলা। আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বয়সটা বোঝা দায়। ঘুমের কাপড় পরনে। পাতলা ফিনফিনে। বুকে ওড়না নেই। সে বুক থেকে ঠিকরে বেরিয়ে পড়ছে যৌবন। মেয়ে হয়েও আমি চোখ ফেরাতে পারি না। সে’ই প্রথম নিজেকে সামলে নেয়। হতচকিত কণ্ঠে জানতে চায়,

– তুমি কে?

– আমি সানিয়া ম্যাডাম।

– তুমি কি কোনো ফ্লাটে কাজ করো?

– না ম্যাডাম।

– তাহলে ম্যাডাম ম্যাডাম করছ কেন? কারো বাসায় বেড়াতে এসেছ?

– না। আমরা ঐ চিলেকোঠায় ভাড়া থাকি ।

– ওহ, সরি। আপনাকে তুমি বলে ফেললাম।

– না না, ঠিক আছে। আমি তো আপনার থেকে বেশ ছোট। আমাকে তুমি করেই বলবেন।

– এত রাতে ছাদে কী করছ?

– গরমে ঘুম আসছিল না।

– ও হ্যাঁ, খুব গরম পড়েছে আজ। আমারও ঘুম আসছিল না গরমে। তাই ছাদে চলে এসেছি। তুমি থাকো। আমি যাই।

আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ঘুরে হাঁটা শুরু করলেন সিঁড়ির দিকে। তবে দ্রুত পায়ে নয়। মৃদু লয়ে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার হেঁটে যাওয়া দেখি। কী এক অপূর্ব ছন্দ তার হাঁটায়। মৃদু বাতাসে যেভাবে দুলে দুলে ওঠে লতা, তেমনি দুলে দুলে উঠছে তার শরীর। কারও হাঁটাও এত ছন্দময় হয়? একেই কি মন্দাকিনী ছন্দে হাঁটা বলে? আমি জানি না।

বেশ কিছুক্ষণ হয় চলে গেছেন একই বাড়িতে থাকা, অথচ নাম না জানা, অচেনা সেই নিশীথিনী। আমি তখনও একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। যতটা মিষ্টি চেহারা, তার চেয়েও অনেক বেশি মিষ্টি কণ্ঠ তার। এমন ভঙ্গিতে কথা বলেন, যেন কত দিনের চেনা আমি। কত আপন। কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা ক্ষণিকের দেখায়ও অনেক দিনের চেনা হয়ে যায়।

সুমনের কাছে শুনেছি, এই বাড়িতে যারা থাকে, তারা সবাই ভীষণ বড়লোক। এই ভদ্রমহিলাও নিশ্চয়ই তেমনই এক ভীষণ ঐশ্বর্যশালী বড়লোকের স্ত্রী। তবে সব চেয়ে বড় ঐশ্বর্য তার রূপ। আমি অবাক হয়ে ভাবি, এমন রূপবতী, ঐশ্বর্যশালিনী নারীর মনে কী এমন দুঃখ যে তাকে রাতের আঁধারে আকাশে কাছে এসে কাঁদতে হয়? আর কেনই বা সে কান্না তিনি সবার কাছে গোপন করতে চান? আমি যতদূর জানি, এই বাড়ির প্রতিটি ফ্লাট শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। সেন্ট্রাল এসি। অথচ গরমে ঘুম আসছিল না বলে মিথ্যা বললেন ! তবু মহিলাকে আমার ভীষণ ভালো লেগে যায়। রাতের আলো আধারিতে যাকে এত সুন্দর দেখায়, দিনের উজ্জ্বল আলোয় না জানি তার রূপ কতটা মোহনীয় হবে ! জানতে মনটা উদগ্রীব হয়ে ওঠে। কিন্তু কোন ফ্লাটে থাকেন, কী তাঁর নাম, কিছুই জানি না আমি। সে রাতে আমার আর ঘুম আসে না। সারা রাত ঘুরে ফিরে তার মিষ্টি মুখটাই শুধু মনে পড়ে।

কেন জানি না, এর পর প্রতি রাতে আমি কান খাঁড়া করে থাকি, যদি শোনা যায় তার কান্নার ধ্বনি। প্রতি রাতে আমি জেগে থাকি। মাঝে মাঝে ছাদে যেয়ে আতিপাতি খুঁজি। কিন্তু সে আর আসে না। মাস খানেক পরের ঘটনা। সে রাতেও ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশে বসেছিল তারাদের মেলা। তবে গরম ছিল না তেমন। ছাদের উপরে ঘর। খোলা জানালা দিয়ে আসছিল মৃদুমন্দ হাওয়া। সে হাওয়ায় বুঝি তন্দ্রা এসে ভর করেছিল চোখে। হঠাৎ একটা মিষ্টি কণ্ঠে সে তন্দ্রা কেটে যায়। না, কান্না নয়। কেউ একজন গুনগুন করে গান গাইছে। মিষ্টি অথচ খুব করুণ সে সুর। আমি কান খাঁড়া করি। তবে কি ফিরে এলো সেই রহস্যময় নিশীথিনী? সে কি দেখে দেখে অমাবস্যা রাতেই ফিরে আসে? আমার খুব বাইরে যেতে মন চায়। আর তখনই মনে পড়ে, সুমন বলেছিল, এই সমাজের মানুষদের প্রাইভেসীতে কেউ নাক গলাক, পছন্দ করে না। তাহলে কি বাইরে যাওয়া ঠিক হবে? সেদিন তিনি আমাকে দেখেই চলে গিয়েছিলেন। আজও যদি চলে যান? আমি নিজেকে বিছানার সাথে বেঁধে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু নারীর মনে কৌতূহল বড় তীব্র হয়। তাকে বশ মানানো দায়। তার উপরে জানালা গলে, বাতাসে কেঁপে কেঁপে ভেসে আসছিল পাগল করা সেই সুর। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো কখন দরজা খুলে বেরিয়ে আসি জানতে পারি না। বাইরে আসতেই গানের কথাগুলো স্পষ্ট হয় আমার কাছে। ছাদে হেঁটে হেঁটে ছায়ামূর্তি গাইছেন, “ কারে দেখাব মনের দুঃখ গো, আমি বুক চিড়িয়া, অন্তরে তুষেরই আগুন জ্বলে রইয়া রইয়া…”

বুকের ভেতর সত্যি সত্যি তুষের আগুন না জ্বললে কেউ এত দরদ দিয়ে গান গাইতে পারে না। এ গান বহুবার শুনেছি আমি। এমন করে কাউকে গাইতে শুনিনি। আমি স্থির দাঁড়িয়ে থেকে তার গান শুনতে থাকি। যিনি গাইছেন, তার কাছেও বুঝি পৃথিবীর আর কিছুর কোনো অস্তিত্ব নেই। গাইতে গাইতে সে আমার দিকেই হেঁটে আসছিলেন। অথচ আমি যে সামনেই দাঁড়িয়ে, যেন ভ্রুক্ষেপ নেই তার। হঠাৎ গান থামিয়ে বলে ওঠেন,

– কেমন আছ সানিয়া ?

শুনে আমার বিস্ময়ের সীমা থাকে না। না, আমার নাম মনে রেখেছেন, সে জন্য নয়। এমন ভাবে বললেন, যেন তিনি জানতেন, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর গান শুনছি। চুরি করে গান শুনতে যেয়ে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যাই। বলি,

– এত দরদ দিয়ে গাইছিলেন যে আমি আর ঘরে থাকতে পারলাম না।

– ওহ স্যরি। তোমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলাম।

– না না, আমি জেগেই ছিলাম।

– তুমিও কি আমার মতো নিশাচর প্রাণী ?

– তা বলতে পারেন। তবে আমি প্রতি রাতেই জেগে থাকি, আর আপনি সম্ভবত মাসে একবার।

– কী করে বুঝলে?

– গত এক মাসে আপনি একবারও ছাদে আসেননি।

– তুমি কি ছাদের পাহারাদার?

আমি আবার ধরা পড়ে যাই। আসলেই তো গত একটা মাস প্রতি রাতে আমি ছাদে পাহারা বসিয়ে রেখেছি। প্রতীক্ষায় থেকেছি, কখন তিনি আসেন। আমতা আমতা করে বলি,

– না, মানে, খুব দেরিতে ঘুমাই আমি। আপনি আসলে আমি টের পেতাম। আমার বোধহয় ও ভাবে বলা উচিত হয়নি।

– দূর বোকা মেয়ে। আমি দুষ্টুমি করছিলাম। তুমি তো ছাদেই থাকো। তাই পুরো ছাদটাই তোমার ঘর। আর আমাকে ছাদে আসতে হলে ঘর ছেড়ে আসতে হয়। আমাদের দেশের মেয়েরা চাইলেই তো আর ঘর ছাড়তে পারে না।

কথাগুলো বলতে বলতে কেমন উদাস হয়ে যান। আমার মনটা কেমন করে ওঠে। আহা! এত সুন্দর করে যিনি কথা বলেন, এত আবেগ দিয়ে যিনি গান করেন, এত সহজে যিনি একজন অপরিচিতকেও আপন করে নেন, এমন সুন্দর একজন মানুষের মনেও বিধাতা কেন এত কষ্ট দেন? যা তাঁর রাতের ঘুম কেড়ে নেয়? কোন সে ব্যথা যা তাঁর বুক নোনা জলে ভিজিয়ে দেয়? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু স্বল্প পরিচিত একজন মানুষের কাছে এ সব কথা শোনা যায় না। প্রসঙ্গ বদলাতে আমি বলি,

– আপনার গানের গলা কিন্তু ভীষণ সুন্দর। আপনি কি প্রফেশনালি গান করেন?

– সব কথা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনবে? তোমার ঘুম না পেলে চলো, ও দিকটায় বসি।

নেকি ঔর পুঁছ পুঁছ ? আমি সানন্দে রাজি হয়ে যাই। ছাদের উপর বিভিন্ন জায়গায় সান বাঁধানো বসার বেদি। আমরা তার একটাতে গিয়ে বসি। এখানটায় বেশ আলো। আমি সে আলোয় ভালো করে এই রহস্যময় নারীকে দেখি। ভাসা ভাসা দুই চোখ। না, আজ কান্না নেই সে চোখে। তবে জমা হয়ে আছে বিষাদের মেঘ। পরনে স্বাভাবিক ঘরে পরার কাপড় । বড় এক ওড়না দিয়ে ঢেকে রেখেছেন বুক। তাহলে কি উনি জানতেন, এই গভীর রাতে আবার আমার সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে? উনি কি পড়তে পেরেছিলেন আমার সে রাতের বিস্ময় নাকি ঈর্ষা ভরা দৃষ্টি? তাই কি সামলে রেখেছেন নিজের অমূল্য সম্পদ? এক নারীর সৌন্দর্যে অন্য নারী ঈর্ষান্বিত হয় না, এমন নারী বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে আমার খুব ভালো লাগে তাঁর এই শালীনতা বোধ। ইদানীং অনেক মেয়েকেই দেখি অশালীন কাপড় চোপড় করে নিজের সম্পদ আধ খোলা করে রাখে। ওরা বুঝতে পারে না, আধ খোলা খাবার যেমন পোকা মাকড়, মশা মাছিই আকৃষ্ট করে বেশি, ভোজন রসিকদের নয়। তেমনই আধ খোলা নারীর শরীরে লোভী লোলুপ দৃষ্টি পড়ে বেশী, ভালোবাসা কিংবা সম্মানের দৃষ্টি নয়।

– কী দেখছ অমন করে?

কী হয়েছে আমার আজ? বারবার ধরা পড়ে যাচ্ছি ! বিব্রত কণ্ঠে বলি,

– আপনি খুব সুন্দর।

– তুমিও খুব সুন্দর।

বলে মিষ্টি করে হাসেন। তাঁর পর কিছুক্ষণ চেয়ে থাকেন আকাশে দিকে। যেন খুঁজছেন কাউকে তারাদের মাঝে। অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তাঁর বুক চিড়ে। উদাস কণ্ঠে বলেন,

– খুব সুন্দর হওয়াটাও বুঝি একটা অভিশাপ। বিধাতা যাদের খুব যত্ন নিয়ে তৈরি করেন, তাদের জীবন কাহিনীটা বোধহয় তেমন যত্ন করে লেখেন না। বাদ দাও আমার কথা। তোমার কথা বলো।

এতক্ষণে আমি নিশ্চিত হয়ে যাই, অসম্ভব রূপবতী এই রমণীর বুকের গহীনে আছে গভীর কোনো ক্ষত, যা তিনি কাউকে দেখাতে চান না। তবে যখন আর সইতে পারেন না, তখন হয়ত রাতের আঁধারে আকাশের কাছে আসেন। খুলে দেন বুকের সব বন্ধ দরজা, জানালা। কষ্টগুলো পাখি হয়ে উড়ে যেতে দেন আকাশের পানে। তারাদের কাছে। আমার কোনো অকারণ কৌতূহলে তাঁর সে ক্ষত তাজা হয়ে উঠুক, রক্তাক্ত হোক বুকের জমিন, চাই না আমি। যদি কোনদিন তাঁর আস্থা ভাজন হতে পারি, নিজে থেকেই বলবেন তিনি। আমি ম্লান হেসে বলি,

– কী জানতে চান?

– নিশ্চয়ই প্রেম করে বিয়ে করেছ?

– কী করে বুঝলেন?

– বোঝা যায়। দেখার মতো চোখ থাকলে দেখাও যায়। ভালোবাসার প্রাপ্তি মানুষের চোখে মুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তি এনে দেয়। একজন নারীর জীবনকে পূর্ণতা এনে দেয়।

বাহ, কী সুন্দর গুছিয়ে কথা বলেন। আমি যতই দেখছি তাকে, ততই মুগ্ধ হচ্ছি। এর পর তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনলেন সব। যেভাবে একজন মা তাঁর মেয়ের কাছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শোনেন শশুড় বাড়ির খবর। আমি অবাক হয়ে ভাবি, বিধাতা একই নারীর ভেতর কত রূপ দিয়েছেন। কত অল্প সময়ের মধ্যে আমার চেয়ে মাত্র বছর দশেকের বড় এক নারী অবলীলায় আমার মা হয়ে গেলেন। আমিও কিছু লুকাই না। সব বলি তাঁকে। শুনে হেসে বললেন,

– তুমি খুব ভাগ্যবতী মেয়ে। যাকে ভালবেসেছ, যাকে মনে প্রাণে চেয়েছ, তার কাছেই আছ। তোমাকে তো আর সারাক্ষণ ভালোবাসার, ভালো থাকার অভিনয় করতে হয় না ! তোমার তো কোনো অপূর্ণতা থাকার কথা নয়। তবু কেন এমন দুঃখী দুঃখী দেখাচ্ছে?

খুব কঠিন প্রশ্ন করে ফেললেন রহস্যময়ী। এর কী জবাব দেব আমি? আসলেই ইদানীং বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কেন এই শূন্যতা, আমি নিজেও জানি না। কেন জানি আমার খুব কান্না পায়। আমি মাথা নিচু করে বসে থাকি। তিনিই আবার বলেন,

– দেখো, তোমাকে আজ আমি কিছু কথা বলি, মন দিয়ে শোনো। ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। সে তখন বাইরের দুনিয়ার বাস্তবতাকে দেখতে পায় না। ভালোবাসা মানুষকে বড় স্বার্থপরও করে দেয়। সে তখন নিজের পাওনাটুকু করায় গণ্ডায় আদায় করে নিতে চায়। নিজের চাহিদার এতটুকু কমতি হলে আর মেনে নিতে পারে না। অথচ ভেবে দেখে না, অন্য পক্ষেরও তেমন কিছু চাওয়া পাওয়া আছে। আছে সীমাবদ্ধতা। আছে অপারগতা। ভালো, মন্দ, সব কিছুকে মেনে নিয়ে ভালোবাসতে পারার নামই তো প্রেম।

বলে থামেন। কী কঠিন সত্যগুলো অবলীলায় বলে গেলেন তিনি। আসলেই তো আমরা শুধু আমাদের কথাই ভাবি। নিজেকে অন্যের জায়গায় বসিয়ে ভেবে দেখার চেষ্টা করি না কখনও। এই যে ইদানীং সুমন আমাকে সময় দিতে পারে না, আগের মত রাতে কাছে আসতে পারে না, ওর সেই পাগলামিটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এই জন্যই হয়ত আমার ভেতরে এক ধরণের অতৃপ্তি তৈরি হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে শূন্যতা। কিন্তু কখনও ভেবে দেখিনি, এই না পারার জন্য সুমনের মনেও হয়ত হাহাকার আছে, আছে না পাওয়ার কষ্ট। নাহ, এই রহস্যময়ী নারী আজ আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। সুমনের প্রতি আমার আরও যত্নশীল হতে হবে। আমার মনের কথা যেন শুনতে পেলেন তিনি, বললেন,

– হ্যাঁ, তোমার জন্য, শুধু তোমার জন্যই সুমন নিজের পরিবার ছেড়েছে। বাইরের পৃথিবীর সাথে একাই যুদ্ধ করে যাচ্ছে। তোমার ভালোবাসা তাঁকে সে যুদ্ধ জয়ে প্রেরণা দেবে, সাহস জোগাবে। যাও, ছাদে পাহারা না দিয়ে সুমনের কাছে ফিরে যাও। এই গভীর রাতে উঠে সে তোমাকে পাশে না দেখলে ভাববে, হয়ত কোনো পরকীয়া প্রেমের অভিসারে বেরিয়েছ !

বলে অদ্ভুত ভাবে হাসেন রহস্যময়ী। হাসতেই থাকেন দুলে দুলে। তাঁর এই অদ্ভুত হাসির অর্থ আমি বুঝতে পারি না। আমাকে আর কিছু বুঝতে না দিয়েই “ আমি যাই, ভোর হয়ে এলো” বলে চলে গেলেন। এভাবে হঠাৎ করে এখনই চলে যাবেন, ভাবতে পারিনি। আমি কিছু বলার আগেই তাঁর ছায়া মূর্তি সিঁড়ির অন্ধকারে হারিয়ে গেল। আজও আমার তাঁর নাম জানা হল না। জানা হল না কোন ফ্লাটে থাকেন। এ যেন এক অশরীরী কেউ, অন্ধকারে এসেছিলেন, অন্ধকারেই মিলিয়ে গেলেন। আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

চলবে…

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ