পরকীয়া (পর্ব–৮)

প্রকাশিতঃ ৫:২০ অপরাহ্ণ, শনি, ১৮ জানুয়ারি ২০

ডা. আফতাব হোসেন :

রাত্রি গভীর থেকে গভীর হয়। ধীরে ধীরে থেমে আসে রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ, কোলাহল। আমার চোখে কোনো ঘুম নেই। আজও অন্য দিকে ফিরে শুয়ে আছি। কেন জানিনা, আজ আমার জন্য বিছানায় আলাদা কম্বল রাখা হয়েছে। কে রাখল? তবে কি কৌশিক খেয়াল করেছে, কাল রাতে তার সাথে লেপ শেয়ার করিনি? কাউকে কি বলে রেখেছিল, আলাদা কম্বল রেখে দিতে? লোকটার তাহলে আমার সুবিধা অসুবিধার দিকে খেয়াল আছে?

সেই থেকে একটা কথাও বলিনি কেউ। আজ নাক ডাকছে না কৌশিক। স্থির হয়ে শুয়ে আছে। ঘুমন্ত মানুষ অনেকক্ষণ স্থির হয়ে থাকতে পারে না। ঘুমের ঘোরেও নড়ে চড়ে ওঠে। তার মানে ঘুমায়নি সে। ক্ষুধার্ত মানুষ ঘুমাতে পারে না। হোক সে পেটের কিংবা শরীরের। ঘরের ভেতর কবরের নীরবতা। শুধু দেয়ালের গায়ে টিকটিক করে এগিয়ে চলে সময়।

আমি থমকে দাঁড়িয়ে আছি জীবনের এমন এক বাঁকে, যেখান থেকে একটা পথ চলে গেছে এক নিশ্চিন্ত জীবনের দিকে, যেখানে আছে নিরাপত্তা, আছে ঐশ্বর্য। কিন্তু সে জীবন আমাকে টানছে না। আমার কেবলই মনে হয়, সে জীবনে নাই ভালোবাসার ছোঁয়া, নাই গানের সুর, নাই কবিতার মায়া। আর একটা পথে ধূ ধূ কুয়াশা। সে পথে, অনেকটা দূরে, আবছা দাঁড়িয়ে কায়সার। সে পথে আছে অনিশ্চয়তা, আছে পথ হারাবার ভয়। তবু সে পথই হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমায়। বলছে এসো, আমার কাছে এসো, ভালোবাসার ঐশ্বর্যে ভরিয়ে দেব তোমায়। সে পথের ডাক আমি এড়াতে পারি না। মানুষের মন এমন কেন? যে পথ আমি ছেড়ে এসেছিলাম স্বেচ্ছায়, সে পথই কেন ডাকছে আমায়? বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে ওঠে। অস্থির লাগে। উঠে পায়চারী করি। পানি খাই। অধীর আগ্রহে সকালের অপেক্ষা করি। প্রতীক্ষার প্রহরগুলো কেন এত দীর্ঘ মনে হয় ? কাল স্নিগ্ধা ফোন না করলে আমিই যাব ওর কাছে। খুঁজে বের করব কায়সারকে। তেমনই পাশ ফিরে শুয়ে আছে কৌশিক। নিথর। ও কি বুঝতে পারছে, ওর সাফ কবলা করা জমি বেদখল হয়ে যেতে পারে কাল সকালেই ?

লোকটার জন্য মনটা কেমন করে ওঠে। এ কী মায়া নাকি করুণা, আমি বুঝতে পারি না। ওর তো কোনো দোষ নেই। ও যা চায়, একজন স্ত্রীর কাছে স্বামী তা চাইতেই পারে। হোক তা কিছুটা রুচিহীন, সরাসরি। কিন্তু লোকটাকে যদি আমি ভালোবাসতেই না পারি, শরীর দেব কেমন করে ? মনে মনে বলি, আমাকে ক্ষমা করো কৌশিক। একজনকে মনের ভেতর রেখে আর একজনকে শরীর দিতে পারব না কিছুতেই। তুমি আমার চাইতেও আর একজন সুন্দরী মেয়েকে পাবে। কিন্তু আমি যে আর একজন কায়সার পাব না। অপরাধ বোধের একটা পাথর পিঠে নিয়ে শম্বুক গতিতে এগিয়ে চলে রাতের প্রহর।

কায়সারের হাত ধরে ছুটছি আমি। বন বাদাড় পেরিয়ে, পথ প্রান্তর ছাড়িয়ে। আমার গায়ে নব বঁধুর সাজ। পরনে কারুকাজ করা শাড়ি। খুব ভারি মনে হয়। আমার শরীর যেন সে ভার আর সইতে পারে না। ছুটতে ছুটতে বড় ক্লান্ত আমি। দূরে মানুষের কোলাহল শোনা যায়। কায়সার তাড়া দেয়। আমি আর চলতে পারি না। এক সময় লুটিয়ে পড়ি পথের ধুলায়। কায়সার বসে পড়ে আমার মাথাটা সযত্নে তার কোলে তুলে নেয়। ঝুঁকে, খুব কাছে এসে আমার মুখটা দেখার চেষ্টা করে। উজ্জ্বল দু’টি চোখে তার উদ্বেগ আর ভালোবাসায় মাখামাখি। আহা! এত সুখ, এত শান্তি ভালোবাসায় ? আমার চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে। কায়সারের কোলে মাথা রেখে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ি।

কায়সার আমার কাঁধ ধরে ঝাঁকি দেয়। যেন অনেক দূর হতে বলে,
– ওঠো, এখন ঘুমের সময় নয়। এ ভাবে ঘুমাতে হয় না। প্লিজ ওঠো।
আমি অনেক কষ্টে চোখ খুলি। কেমন ঝাপসা দেখায় সব। ঝাপসা দেখায় আমার মুখের উপর ঝুঁকে থাকা কায়সারের মুখ। অবাক হয়ে দেখি, কায়সারের মুখটা ধীরে ধীরে কৌশিকের ছোট বোন নিরার মুখ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে আমার কাছে পরিষ্কার সব হয়। কালও কায়সারের কথা ভাবতে ভাবতে শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। দিনের আলোয় আসতে পারেনি যে, স্বপ্নে আবার এসেছিল সে। আমার সব কিছু কেমন এলোমেলো লাগে। আমি ফ্যালফ্যাল করে নিরার মুখের দিকে চেয়ে থাকি। দেখি সে মুখে ঠোঁট টেপা দুষ্টুমির হাসি। চোখ নাচিয়ে জানতে চায়,
– ভাইয়া বুঝি তোমাকে সারা রাত ঘুমাতে দেয় না ? তোমরা পারও বটে ! এদিকে মা তোমাকে ডাকছে। নাস্তার টেবিলে সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। গোসল করে শিগগিরি নীচে আসো।
শুনে আমার দু’কান লজ্জায় লাল হয়ে যায়। ছোটখাটো এই মেয়েটিকে ভীষণ পছন্দ আমার। সারাক্ষণ ঠোঁট টিপে হাসে। মুহূর্তে মানুষকে আপন করে নিতে পারে। ওকে কেমন করে বলি, ওর ভাইয়ার আদরে নয়, অন্য কারো আদরের স্বপ্নে নির্ঘুম কেটেছিল আমার রাত। মেয়েটির কাছে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়, দ্বিচারিণী মনে হয়। ওর চোখে আমি চোখ রাখতে পারি না। কী এক অপরাধ বোধে বুকটা আমার ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়। এ দ্বিধার ভার আমি আর সইতে পারছি না। আমি দ্রুত ওয়াশ রুমে চলে যাই। কী অদ্ভুত জীবন আমার। যেখানে নতুন বউ সকালে প্রয়োজনের গোসল করতে লজ্জা পায়, সেখানে লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে এই শীতের সকালে আমাকে বিনা প্রয়োজনে গোসল করে নিতে হয় !

বিয়ের দ্বিতীয় দিন। বাড়িতে এখনও অনেক আত্মীয় স্বজন। কৌশিক আজ নীচেই ছিল। তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই, কাল রাতেও তার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। হাসি মুখে কথা বলছে সবার সাথে। কথা বলছে ইংল্যান্ডে কোথায় থাকবে, কী করবে, এসব নিয়ে। মাত্র তো আর ক’টা দিন। ও কি অভিনয় করছে ? অভিনয় করতে হয় আমাকেও। লজ্জা রাঙা নববধূর অভিনয়। এর মাঝেও আমার কান খাঁড়া হয়ে থাকে একটা ফোনের আশায়।

আজ আমাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। ফোন না এলেও মেসেজ আসে স্নিগ্ধার। “বাসার ঠিকানা দে। আজ বিকেলেই আসছি। অনেক কথা আছে”। জীবনে এত খুশি কখনও হয়েছি বলে মনে পড়ে না। বুকের ভেতর অনেকগুলি সাদা কবুতর ডানা ঝাপটে ওঠে। হৃদপিণ্ডটা বুকের খাঁচা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে চায়। হঠাৎ করেই আলো ঝলমলে হয়ে ওঠে আমার ফ্যাঁকাসে জীবন। আসছে স্নিগ্ধা। আসছে আমার কায়সারের খবর নিয়ে। আমি জানতাম, স্নিগ্ধা ঠিক ওকে খুঁজে বের করবে। প্রিয় বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে যায় মন।

দুপুরের পর নীরা বাদে সব আত্মীয় স্বজন চলে যায়। কৌশিকও কী এক কাজে বাইরে চলে যায়। ভালোই হল, স্নিগ্ধার সাথে নিরিবিলিতে কথ বলা যাবে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। চারটার দিকেই চলে আসে। নীচে পরিচয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ওকে নিয়ে উপরে আমার ঘরে আসি। আমার ঘর না বলে বোধহয় কৌশিকের ঘর বলাই ভালো। যে ঘর হয়ত একদিন অন্য কোনো মেয়ে করবে আলো। ঘরে ঢুকেই স্নিগ্ধা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। ধরেই থাকে অনেকক্ষণ। অনেক দিন পরে দেখা যে ! আমিই ওকে ছাড়িয়ে দেই। চারিদিকে ঘুরে ঘুরে দেখে স্নিগ্ধা। তার পর চোখ কপালে তুলে বলে,
– এ তো রীতিমতো রাজ প্রাসাদ রে।
– হুম। ওরা বেশ বড়লোক।
– মানুষগুলোও তো ভালো দেখলাম। দুলাভাই কোথায় ? শুনেছি হেব্বী হ্যান্ডসাম।
এবার আমি মেজাজ খুইয়ে বসি। কোথায় আমি কায়সারের খবর শোনার জন্য অস্থির হয়ে আছি, আর উনি এ বাড়ির ঢোল পেটাচ্ছেন ! রেগে মেগে বলি,
– এতই যখন পছন্দ, একটু বস, ও এলে তোর সাথেই বিয়ে দিয়ে দেই।
– রাগছিস কেন ?
– বাহ, রাগব না। তোকে কার খবর আনতে বললাম, আর তুই বসে বসে কী সব শিবের গীত গাইছিস।
– বলছি। বস। নিজ মুখে বলব বলেই তো এসেছি।

বলে খুব সিরিয়াস হয়ে যায় স্নিগ্ধা। দেখে আমার বুকটা কেঁপে ওঠে। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে। কোনো খারাপ খবর নয় তো ? ও আমার হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে দেয়। নিজেও মুখোমুখি বসে। শান্ত কণ্ঠে বলে,
– তুই যা ভাবছিস, তা নয়।
– মানে ?
আমার গলা কেঁপে যায়।
– মানে, পুরো ব্যাপারটা তোর একতরফা ?
– মানে কী ? কী হেয়ালী করছিস ? সব খুলে বল।
– বেশ, তবে খুলেই বলি। আমি জানতাম, কায়সার মহসীন হলে থাকে। যেয়ে ওকে পেয়েও গেলাম। তোর কথা ওকে খুলে বললাম। শুনে তো আকাশ থেকে পড়ল। ও নাকি সে চোখে তোকে কোনোদিনই দেখেনি। তাছাড়া সমবয়সী বিয়েতে ও বিশ্বাসও করে না। আরও বলল, কবিতা আর জীবন নাকি এক জিনিষ নয়। তোর নতুন জীবনের জন্য ওর পক্ষ থেকে অনেক শুভ কামনা জানাতে বলল।

কথাগুলো ফুটন্ত লোহার মতো আমার দু’কান দিয়ে ঢুকে বুকটা পুড়িয়ে ভস্ম করে দিল। আমার মুখের সব কথা কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেল। তাহলে যে অনেকেই বলে, মনের কথা নাকি মন ঠিক টের পেয়ে যায় ? তাহলে এতদিনেও কায়সার আমার মনের কথা টের পায়নি ? আমার বিশ্বাস হতে চায় না। জেদি কণ্ঠে বলি,
– আমি বিশ্বাস করি না। তুই মিথ্যা বলছিস। আমি নিজ কানে ওর মুখ থেকে শুনতে চাই। ও কত নম্বর রুমে থাকে বল। আমি যাব।
– পাগলামি করিস না অহনা। আমি কেন মিথ্যা বলব ? আমি জানতাম তুই বিশ্বাস করবি না। তাই কায়সারকে বলেছিলাম, কথাগুলো নিজ মুখে তোকে বলতে। শুনে বলল, জীবনটা বড়লোকের মেয়ের খেয়ালী পুতুল খেলা নয়। ইচ্ছে হল, দিলাম, ইচ্ছে হল ভেঙ্গে দিলাম। এ সব ছেলেমানুষি করার সময় বা ইচ্ছা কোনোটাই নেই তার। তুই যাতে দেখা করতে না পারিস, তাই কালই সে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে।
– ওর ফোন নম্বর আছে ?
আমি শেষ বারের মত চেষ্টা করি।
– চেয়েছিলাম, দেয়নি। বলল, ও চায় না, তুই ওর সাথে কোনো যোগাযোগ করিস।
আমি আর শুনতে পারি না। চিৎকার করে উঠি,
– স্টপ ইট স্নিগ্ধা। আমি আর শুনতে চাই না।

তাহলে গত দুদিন ধরে, জেগে থেকে কিংবা ঘুমের ঘোরে, এই যে এত স্বপ্নের জাল বোনা, সব মিথ্যা? সব আমার বিকারগ্রস্ত মনের অলীক কল্পনা ? কী ভাবে সে নিজেকে ? কীসের এত অহংকার ? আমি কী এতই ফেলনা যে আমার সাথে কথা বলার মতো সময় নেই তার ? রাগে, ঘৃণায়, অপমানে আমার মগজ টগবগ করে ফুটতে থাকে। আর ভাবতে পারি না। স্তব্ধ হয়ে থাকি আমি। স্তব্ধ হয়ে থাকে সময়। শুধু চোখ ফেটে গড়িয়ে পড়ে কষ্টের লোনা জল।

কথা বলে না স্নিগ্ধাও। চুপ করে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। হয়ত সময় দেয় আমাকে সামলে ওঠার। এক সময় মৃদু স্বরে বলে,
– শান্ত হ বোন। এমনটা তো হতেই পারে। তোর যেমন অনুভূতি হবে, অন্যেরও যে তেমনই হতে হবে, তার তো কোনো মানে নেই। কত বড় ঘর পেয়েছিস, কত সুন্দর বর পেয়েছিস। ক’জন মেয়ের ভাগ্যে এমন জোটে বল ? দুলাভাই ইঞ্জিনিয়ার মানুষ। লোহা লক্কড় নিয়ে কারবার। হয়ত তেমন রোমান্টিক নয়। তাতে কী ? তুই তাঁকে রোমান্টিক বানিয়ে নিস। তাছাড়া সমঝোতা করে মানিয়ে চলার জন্যই তো জন্ম মেয়েদের। তুই আর কোনো ভুল করিস না।

ততোক্ষণে মাথার ভেতর প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। কেউ যেন হাতুড়ী পিটিয়ে যাচ্ছে অবিরাম। বুঝি এখনই ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। কোনো কথা সহ্য হচ্ছে না আমার। কোনো আলো সহ্য হচ্ছে না আমার। বাইরে সন্ধ্যা নেমেছিল অনেক আগেই। এখন তা আমার জীবনেও নেমে আসে। কোনোমতে বলি,
– তোর লেকচার শেষ হয়ে থাকলে চলে যা স্নিগ্ধা। আমি একটু এক থাকতে চাই। যাওয়ার সময় দয়া করে বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে যাস।
কিছুক্ষণ অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে স্নিগ্ধা। হয়ত সে দৃষ্টিতে থাকে মমতা, থাকে ভরসা, আমি বুঝতে পারি না। তবে আর কিছু না বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরে ধীরে ঘর ছেড়ে বের হয়ে যায়। যাবার সময় লাইট নিভিয়ে দেয়, দরজাটা ভেজিয়ে দেয়। আমার ঘরে আঁধার নেমে আসে।

অন্ধকার ঘরে শুয়ে শুয়ে ভাবি, আসলেই কি আমি অন্ধকারে ছিলাম এতদিন ? স্নিগ্ধার কথাগুলো মনে পড়ে। সবটাই ছিল আমার একতরফা অনুভূতি ? হঠাৎ নিজের উপর প্রচণ্ড রাগ হয় আমার। রাগ হয় কেন হ্যাংলার মতো স্নিগ্ধাকে পাঠিয়েছিলাম কায়সারের কাছে ? রাগ হয়, একজন ভুল মানুষের জন্য দুটো পরিবারের মান সম্মান ধুলায় মিটাতে বসেছিলাম বলে। বুকের ভেতর একগুঁয়ে জেদটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কী ভেবেছে কায়সার ? ওকে ছাড়া বাঁচব না ? আমিও দেখিয়ে দেব। কারও জন্যই জীবন থেমে থাকে না। যে ভালোবাসাকে তুমি পায়ে ঠেলে দিলে কায়সার, আজ সেই ভালোবাসার অভিশাপ দিলাম আমি, এই পৃথিবীতে ভালোবাসা-হীন বেঁচে থেকো তুমি। বেঁচে থেকো হাজার বছর। আমার চোখ ফেটে আবার পানি বেরিয়ে আসে ।

হঠাৎ দরজায় নক হয়। চমকে উঠি আমি। কে এলো আবার ? মনের এ অবস্থায় কারও মুখোমুখি হবার ইচ্ছে নেই আমার। বাইরে নীরা কণ্ঠ শোনা যায়।
– ভাবী, ভেতরে আসব ?
না আসতে বলি কেমন করে ? অনিচ্ছা স্বত্বেও ভেতরে আসতে বলি। ভেতরে ঢুকেই নীরা লাইট জ্বালিয়ে দেয়। আমাকে দেখে চমকে ওঠে।
– ভাবী, তুমি ঠিক আছ ? ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছ কেন ?
এতটা দ্রুত ঘটে যে আমি সামলে নেবার সময় পাই না। আমার কান্না ভেজা মুখ ওর চোখ এড়ায় না। থতমত খেয়ে বলি,
– আমি ঠিক আছি নীরা। একটু মাথা ধরেছিল।
সদা হাস্যজ্জ্বল চোখ দুটো নিরার একটু ছোট হয়ে যায়। সে খানে কি একটু সন্দেহের ছায়া দেখতে পেলাম? বরাবরের মতো ঠোঁট টিপে হাসে না সে। শান্ত ভাবে বলে,
– নীচে তোমার আম্মু আই মিন মাওই মা এসেছেন। তুমি ফ্রেস হয়ে নীচে আসো।
আর কিছু না বলে নীরা চলে যায়। মেয়েলী কৌতূহল দেখিয়ে আমাকে বিব্রত করে না। ভালো লাগে মেয়েটির এই পরিমিতি বোধ। আমি উঠে ওয়াশ রুমে চলে যাই। আয়নাকে নিজেকে দেখে আমিও চমকে উঠি। চোখ দুটো ফুলে লাল। মুখে কায়সারের দেয়া কষ্টের মানচিত্র। এই মুখ নিয়ে মায়ের সামনে গেলে নির্ঘাত ধরা পড়ে যাব। দেখতে এসেছে মা, কত সুখে আছে তার মেয়ে। এই মুখ দেখলে উদ্বিগ্ন মায়ের মন কোনো পরিমিতি বোধের সীমায় বাঁধা থাকবে না। আমার ভুলের জন্য কেন মায়ের মন কষ্ট পাবে? আমি পানি দিয়ে মুছে ফেলি পানির দাগ। পাউডারের প্রলেপে ঢেকে দিই সব কষ্টের চিহ্ন। কী অদ্ভুত জীবন মেয়েদের? প্রিয় মানুষগুলো কষ্ট পাবে বলে নিজের কষ্টগুলো বুকের পাঁজরেই লুকিয়ে রাখতে হয়। কাউকে দেখাতে পারে না।

কী বোঝে মা কে জানে। আমি কেমন আছি, জানতে চায় না। বেশি কথা বলে না। কেমন গুমসুম হয়ে থাকে। বসেও না বেশিক্ষণ। শুধু যাবার আগে বলে যায়,
– মারে, আমি জানি, তুই ভালো নেই। কেন ভালো নেই, জানতে চাই না। যে জীবন তুই স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিস, সে জীবনের ভার তোকেই বইতে হবে। মানিয়ে চলার নামই জীবন। তোর কোনো কাজ কিংবা আচরণে যেন তোর বাবার মাথা হেঁট না হয়ে যায়।
মা কি কিছু টের পেল ? সন্তানের কষ্ট কি মায়ের চোখকে ফাঁকি দিতে পারে ? নইলে সেও কেন স্নিগ্ধার সুরে কথা বলে গেল ? মানুষ হয়েই তো জন্মাই সবাই। তবু কেন নারী পুরুষের এই ব্যবধান ? কেন সব ত্যাগ, সব সমঝোতা নারীকেই করতে হয় ? কেন শুধু নারীকেই মানিয়ে চলতে শেখানো হয়। এর জন্য হয়ত আমরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকেই দায়ী করি। এই মানসিকতার জন্য কি নারীদেরও কোনো দায় নেই ? নইলে, নারী হয়েও মা, স্নিগ্ধা, কেন আমাকেই সমঝোতা করতে, মানিয়ে চলতে বলে গেল ?

মনটা আবার বিদ্রোহী হতে চায় ? কিন্তু কী লাভ ? কার জন্য করব বিদ্রোহ ? কী হবে আমার একার বিদ্রোহে ? বদলে কি যাবে এই সমাজ ব্যবস্থা ? বদলে কি যাবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ? নিন্দার কাঁটা উলটো এসে আমাকেই বিদ্ধ করবে। সমাজের লাঞ্ছনা, গঞ্জনা সইতে হবে দুটো নিরপরাধ পরিবারকে। আমার জন্য কেন এই মানুষগুলো কষ্ট পাবে ? তাঁদের তো কোনো দোষ নেই। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আমার কষ্টের বিনিময়ে যদি এতগুলো মানুষ সুখী হয়, তবে তাই হোক।

বিয়ের তৃতীয় রাত। আমি বসে আছি ঘর নামের এক মন্দিরে দেবদাসী হয়ে। একটু পরেই গৃহ প্রবেশ করবেন আমার পতি দেবতা। যিনি ধৈর্য ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এই শরীরের অর্ঘ্য বুঝে নেয়ার। কতদিন আর মিথ্যা অজুহাতে বঞ্চিত করব তাঁকে ? আমি ওয়াশ রুমে যেয়ে নিজ হাতে তুলে নিই আমারই গড়ে তোলা অবরোধ। উন্মুক্ত করে দেই বনভূমি। সে ভূমিতে এখন লাঙ্গল চালাবে কোন সে কৃষক, আমার আর তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। আমি বাতি নিভিয়ে ডিম লাইট জ্বালিয়ে অপেক্ষা করি। উজ্জ্বল আলোয় লুণ্ঠিত হোক পৃথিবীর আদিমতম গুপ্ত ধন, সইতে পারব না আমি।

বেশ দেরি করেই ঘরে আসে কৌশিক। আজ তাঁকে খুব খুশি খুশি মনে হয়। সম্ভবত বাইরের দুনিয়ায় সাফল্য পেয়েছে সে। তারই আলোচনা হচ্ছিল নীচে। পুরুষ মানুষগুলো বোধহয় এমনই। তারা জয় করতে পছন্দ করে। হোক সে ঘরে কিংবা বাইরে। সে বিজয়ে বিজিতের মনের অবস্থা কী হয়, তার হিসাব রাখার প্রয়োজন মনে করে না। বিজয়েই তৃপ্ত তাঁদের মন। আমি অপেক্ষায় থাকি। কখন সে তার বিজিতের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবে। আজ আর তাঁকে বাঁধা দেব না।

– কেমন আছ আজ ?
– সুস্থ।
– আলো নিভিয়ে রেখেছ কেন?
– আলোতে ভালো লাগে না।
– ওহ ! তাহলে আজ আপত্তি নেই তোমার ?
শুনে আমার কান গরম হয়ে যায়। তবে অবাক হই না। এই তিন দিনে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি। কাজ পাগল মানুষটা কথা খুব কম বলে। অথচ আমি চাই, মানুষটা অনেক কথা বলুক। নিজেকে বোঝাক। আমাকে বুঝুক। তাঁকে তো আমি মনের বিপক্ষেও মেনে নেয়ার চেষ্টা করছি। মনের সাথে এই অসম যুদ্ধে লোকটা কি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারে না ? অন্তত আজ বাইরে কী হল, তা তো বলতে পারে। যদিও সে নীচে সবাইকে বলেছে। আমার শোনার ইচ্ছা হয়নি। সে সম্ভবত শুধু ক্লাসের বই পড়েছে, মনের বই পড়েনি। করুণা হয় লোকটার উপর। করুণা হয় নিজের দুর্ভাগ্যের উপর।

শত চেষ্টা করেও মনটাকে কোনমতেই বশে আনতে পারছি না। ঘুরে ফিরে কায়সারের কথাই মনে পড়ছে। যাকে আমি ঘৃণা করতে চাই, যাকে ভুলে যেতে চাই, বারবার কেন এসে সে কড়া নাড়ছে আমার মনের দরজায় ? আমি নির্জীব হয়ে পড়ে থাকি বিছানায়। শরীরটাকে কেমন মন-হীন, অনুভূতিহীন মনে হয়।

কৌশিক প্রবেশ করে তার বিজিত রাজ্যে। বিজয় উল্লাসে সে ঘুরে ফেরে পাহাড়, নদী, উপত্যকায়। সে রাজ্যে প্রাণের সাড়া তো আছে, কিন্তু মনের সাড়া নেই। সে রাজ্যে বয় না কোনো উদ্দাম দখিনা বাতাস। মেঘে মেঘে ঘর্ষণে ঘটে না বিজলীর চমক। ওঠে না ঝড়, হয় না বৃষ্টি। অথচ কৌশিক তা বুঝতেও পারে না। বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনে সে যতটা পটু, শরীর কনস্ট্রাকশনে সে ততটাই অপটু। লজ্জায় কিছু বলতেও পারি না। খরার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় হয়ে ওঠে। আর কষ্টে, যন্ত্রণায়, আমার দুচোখের কোন বেয়ে নীরব কান্না গড়িয়ে পড়ে। কৌশিক তা জানতে পারে না।

চলবে…।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ