পরিকল্পিত পরিচর্যার মাধ্যমেই বেগবান হবে গ্রামীণ নারীর কর্মক্ষমতা

প্রকাশিতঃ ৫:০৫ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ১৫ অক্টোবর ২০

রাকিব দেওয়ান

সমাজের অগ্রগতিতে গ্রামীণ নারীর অবদান অনস্বীকার্য। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী; আর তার শতকরা ৮৬ ভাগের বাস গ্রামে। গবেষণায় দেখা দেখা যায়, গ্রামের নারীরা দিনের মোট সময়ের ৫৩ ভাগ ব্যয় করে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প ক্ষেত্রে। যেখানে পুরুষরা ব্যয় করে শতকরা ৪৭ ভাগ সময়।

প্রায় ২ কোটি কর্মজীবী নারীর মাঝে দেড় কোটিই গ্রামীণ নারী। আসবাবপত্র তৈরি, কৃষিকাজ, কুটিরশিল্প, গার্মেন্টসসহ নানান কাজে গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। আগ্রহ দেখাচ্ছে গ্রামীণ নারীরাও। জিডিপিতে নারীর অবদান ২০ শতাংশ।

এত এত অবদান হওয়া সত্ত্বেও দিকে দিকে আজ নারীরা অবহেলিত। লাঞ্ছিত হচ্ছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বঞ্চনার শিকার আজ গ্রামীণ নারীরা, তাদেরকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে সমাজের বিভিন্ন স্তরে।

অনেক সময় গ্রামীণ নারীরা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন সমাজের কানাঘুষার কারণে।

সমাজের এক শ্রেণির মানুষ আছে যারা মানুষের সমালোচনা করতে দিব্বি ব্যস্ত। বিশেষ করে নারীদের সমালোচনায় এগিয়ে। এক্ষেত্রে নারীরা অনেকটা পিছপা হয়ে পড়েন, নিজের কর্মস্থল কিংবা কোনো একটি শিল্পের সাথে বা উদ্যোগ গ্রহণ করলে তা আর চালিয়ে নিতে ইতস্ততবোধ করেন।

ফলে দেখা যায়, সমাজের উন্নতি ও কুটির শিল্প শিথিল হয়ে পড়ে, হারিয়ে যায় গ্রামীণ ঐতিহ্য। রমণীরা ঘরমুখো হয়ে পড়ে। তার মূল কারণ হলো সমালোচনা। এজন্য উচিত নারীর চলার পথে সমর্থন যোগানো আর সৎসাহস দেওয়া।

গ্রামীণ নারী মানে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অতিবাহিত করা এক সামাজিক জীব। জীবন অনিশ্চয়তায় কাটলেও থেমে নেই তার পরিশ্রম, সর্বদা কাজে ব্রতী। পরিবার কে এগিয়ে রাখা যেন তার নৈতিক দায়িত্ব।

উন্নয়নের এ চরম উৎকর্ষের যুগে গ্রামীণ নারী সমাজ আজও পিছিয়ে। বিশ্বের কিছু কিছু দেশে নারীরা সমভাবে এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু উপমহাদেশের নারীরা তত অগ্রগামী নয় আর সে হিসেবে বাঙালি গ্রামীণ নারী তো আরো পিছিয়ে। তবে আশার দিক হচ্ছে কালের বিবর্তনে অতীতের অবহেলিত জীবন থেকে নারীসমাজ সম্পূর্ণ না হলেও অনেকাংশে মুক্তি লাভ করেছে।

গ্রামীণ নারীর অন্যতম যোগ্যতার মধ্যে কৃষি উন্নয়ন বেশ লক্ষণীয় কৃষিক্ষেত্রে নারীদের অবদান অপরিসীম, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গ্রামীণ নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে তাদের এ যোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রায়ত্ত ভূমিকা, প্রয়োজন কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠানমালা, প্রয়োজন কৃষিবিস্তার ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীর প্রশিক্ষণমূলক প্রোগ্রাম। এতে করে গ্রামীণ নারীরা সক্ষমতায় এগিয়ে যাবে, জাতীয় জীবনে ভূমিকা পালন করবে। সামাজিক জাগরণের আলোড়ন তাদের জীবনকেও আলোকিত করবে।

দেশের শিক্ষিতের হার সামগ্রিকভাবে উন্নত হলেও গ্রামীণ নারীরা পিছিয়ে, দারিদ্র বিমোচনের সম্ভাবনা সুদূরপরাহত। তবুও গ্রামীণ নারীসমাজের আসন এখন আর অমর্যাদাকর নয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নারীরা বিচিত্রভাবে সম্পর্কিত হচ্ছে। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে গ্রামীণ নারী সমাজকে অতীতের মতো পশ্চাৎপদ বলে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এখন চাই যথোপযুক্ত পরিচর্যা, গ্রামীণ নারী এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে তাদের স্থান করে দেওয়া।

নানান বৈচিত্র‍্যে গ্রামীণ নারীর জীবন অতিবাহিত হয় তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো নারী নির্যাতন। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারী নির্যাতন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। একবিংশ শতাব্দীতে নারী নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পত্র-পত্রিকাগুলোত দিকে তাকালে প্রতিদিনই ভেসে উঠে নারী নির্যাতনের নানা চিত্র।

করোনাকালীন তা আরো তুঙ্গে পৌঁছেছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ নারীদের খেয়াল খুশিমতো ব্যবহার করে। নারীদের কোনো অধিকার এ সমাজ স্বীকৃতি দেয় না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিরস্কারের শিকারও হতে হয়। ব্যাহত হয় তার উদ্যম।

গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা নারীর কর্মকাণ্ডকে অন্দরমহল কেন্দ্রিক বলে স্বীকৃতি দেয়। স্বামীরা বাইরে ৮ ঘন্টা কাজ করে যে মূল্যায়ন পায়, নারীরা তার চেয়ে দ্বিগুণ সময় কাজ করেও তার কাছাকাছি মূল্যায়ন পায় না। এ সমাজ ব্যবস্থা মনে করে নারী হলো ঘরকন্যা, এরা ঘরেই অবস্থান করবে। সন্তানাদি লালন পালন করবে আর স্বামীর সেবাশুশ্রূষা করবে। এতেই জীবন পার হয়ে যাবে, আসলে নারী তা নয়, তারা সক্ষম যেকোনো কাজে পারদর্শিতা অর্জন করতে। সমাজ ব্যবস্থার উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে। তাদের সে স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। তাদের সহায়তা করা দরকার, সেজন্য প্রয়োজন বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ।

এতদসত্ত্বেও গ্রামীণ নারী উন্নয়নে প্রকল্পে যে সমস্ত পদক্ষেপ নিতে পারে তাও আলোচ্য বিষয়, সাম্প্রতিক কালে গ্রামীণ নারীশিক্ষা, নারী উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও নানা পদক্ষেপ অনেকটা প্রশংসনীয়। তবে নিম্নোক্ত কিছু বিষয়সূচি গ্রামীণ নারী উন্নয়নে সহায়তা করবে বলে আশাকরি। তা হলো:

১. দেশে নারী শিক্ষার্থী অনুপাতে প্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। ২. সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৩. বয়স্ক নারীর জন্য শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
৪. গ্রামীণ উন্নয়নে নারীর প্রয়োজনীয়তা অনুসারে সচেতনতা বৃদ্ধি।
৫. স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি নারীর অগ্রাধিকার দান।
৬. প্রশিক্ষণ মূলক প্রোগ্রাম ও প্রচারণা।
৭. অনগ্রসরতা ও কুসংস্কার দূর করা।
৮. সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৯. কর্মমুখী শিক্ষাপ্রদান।
১০. স্বীকৃতি স্বরূপ উন্নয়নে এওয়ার্ড প্রদান।
উপরিউক্ত পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়ন করা হলে আশাকরা যায়, অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দেশের নারীসমাজ জাতিগঠনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখবে।

ঘর- সংসারের মধ্যে আবদ্ধ থেকে বহির্জগতের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপনের ধারাটি এখন পরিবর্তিত হয়ে গেছে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী তার কল্যাণকর ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশে সাম্প্রতিককালে নারীশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে। তবুও গ্রামীণ নারীরা পিছিয়ে আছে। তাদের জন্য উচিত প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

প্রশিক্ষণ প্রদান, বিভিন্ন সেবা দেওয়া।আমাদের সমাজে আমরা চাই আদর্শ জননী, আদর্শ গৃহিণী, আদর্শ কন্যা, আদর্শ জীবন ও সমাজ গঠনে চাই উপযুক্ত নারীশিক্ষা।

তাই নারীকে অবহেলা না করে তার শিক্ষার প্রসারে এগিয়ে নিয়ে এসে দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণ সাধন করার সুযোগ দিতে হবে।

জাতির সামগ্রিক কল্যাণের জন্য নারীর ভূমিকার গুরুত্ব সম্পর্কে দ্বিমতের অবকাশ নেই। বর্তমান আমাদের সমাজ জীবনে যেসব সমস্যা রয়েছে সেসব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান ভাবে দায়দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে হবে।

সমাজ সংস্কারে নারীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি করতে হবে। নারী-পুরুষের কর্মক্ষেত্র আলাদা বলে বিবেচিত না হওয়া। তাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিশেষে বলব জাতি গঠনে নারীসমাজকে তার কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করতে হবে। জাতীয় জীবনে নারীসমাজ কে উপেক্ষা করে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে যে “বিশ্বের যা কিছু মহান চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”

লেখক: শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

rakibdewancu@gmail.com

সময় জার্নাল/

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।