বন্যেরা বনে সুন্দর, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে

প্রকাশিতঃ ৫:৪৪ অপরাহ্ণ, রবি, ২৬ জুলাই ২০

তাজমিন নাহার

‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই…আজ আর নেই, কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী বিকেল গুলো সেই, আজ আর নেই।’ মান্না দে’র গাওয়া এই গানটা যেন আজ চরম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে শিক্ষার্থীদের জীবনে। গত ১৭ মার্চ থেকে সরকার বন্ধ করে দিয়েছে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে ক্যাম্পাস।

কবে খুলবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। এই সংকটকালীন মুহুর্তে মিস করছি সেই ফেলে আসা সোনালি দিনগুলো। যা বর্তমানে কেবল এক সুন্দর অতীত। ক্যাম্পাসের রঙিন দিনগুলো ছেড়ে এখন অনেকটা মনমরা ভাবেই দিন কাটছে। মায়াভরা সেই ক্যাম্পাস, বন্ধুবান্ধবীদের সাথে আড্ডা, খুনসুটি কিছুই নেই। এখন আর ক্লাস শেষে হুটহাট করে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। মাসশেষে টিউশনের বেতনটা আর পাওয়া হয় না।

নেই কোন ব্যাস্ততা, নেই ক্যাম্পাসের সেই কোলাহল। জীবন যেন থমকে গেছে। বারবার চোখে ভেসে উঠে সেই দোতলা লাল বাস। হয়তো এখন আমাদের রাত জেগে আ্যসাইনমেন্ট করার কথা ছিল, সন্ধ্যা অবধি ল্যাবে পরে থাকার কথা ছিল, ফরমাল পোশাকে আর প্রেজেন্টেশন দেওয়া লাগে না, নেই টিউটোরিয়ালের চিন্তা।

অনেক দিন টংয়ের দোকানের বসে চা খাওয়া হয় না,খাওয়া শেষে বিলটা কে দিবে সেটা নিয়ে খুনসুটিও হয় না। অডিটোরিয়ামের সিড়িতে বসে এখন হয়তো কেউ গিটারে সুর ও তোলে না।টিএসসিতে বসে খিচুড়ি খাওয়া আর রাজনৈতিক আলাপন টাও এখন হয় না। ভার্সিটি গেটে বসে প্রান খুলে গান গাওয়াও হয় না। ভার্সিটি গেটে তালা লাগিয়ে আন্দোলন, বিক্ষোভ হয়না।

চিরচেনা সেই বিদ্যাপীঠ আর ভালোবাসায় রাঙানো বন্ধু বান্ধব, বড় ভাইবোন, ছোট ভাইবোন, শিক্ষক শিক্ষিকা যারা আমাদের আমাদের দ্বিতীয় পরিবার তাদের সাথে আর দেখা হয় না। যেখানে আমাদের বিচরণ ছিল অবিরত, সেখানে আজ আর পা মাড়ানো হয় না। এখন আর ঝালচত্ত্বরে বসে ফুসকা, চটপতি, ঝালমুড়ি খাওয়া হয় না, লেকের জলে পা ডুবানো হয় না। রাত হলে এখন আর ডাইনিংয়ে ভীড় জমে না। সকালে উঠে ঘুম ঘুম চোখে ক্লাসে যেতে হয় না, নেই সন্ধ্যায় হলে ফেরার তাড়া। দীর্ঘদিন সেমিনারে যাওয়া হয় না।

এ যেন বন্দি এক জীবন। ক্যাম্পাসে থাকলে এতদিন হয়তো সেমিষ্টার শেষ হয়ে যেত, নতুন সেমিষ্টারে নতুন বই পড়ার আনন্দ পেতাম। লেখাপড়ার স্বার্থে হলেও আবার সেই দিনগুলো ফিরে পেতে চাই।

ছুটি বরাবরই আনন্দের কিন্তু করোনাকালীন এই অনির্দিষ্টকালের ছুটি যেন বিরক্তিকর আর বিষাদময় ছাড়া আর কিছুই নয়। চার দেয়ালের মাঝে নিজেকে অসহায় মনে হয়। ক্যাম্পাস ছাড়া নিজেকে বোঝা মনে হয়। কোন ব্যাস্ততা নেই, দেহ অসার লাগে। সবকিছু যেন রঙ হারিয়ে সর্বদা খোঁজে প্রান চাঞ্চল্যতাকে। বন্দিকালীন এ জীবনের আনন্দ, রঙ, রুপ, রস, গন্ধ কিছুই নেই। আছে শুধু মানসিক কষ্ট।

বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃকোলে আর শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ভালোবাসার ঘেরা প্রিয় ক্যাম্পাসে, পরিচিত মানুষদের ভীড়ে আবার হারাতে চাই। সোনালি দিনের অপেক্ষায়।

লেখক : শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।