বাংলা সাহিত্যে নূতনের কেতন উড়িয়েছে নজরুল

প্রকাশিতঃ ২:২৪ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ২৮ মে ২০

আবু সাঈদ নয়ন

তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখির ঝড়।

নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার প্রথম অংশটি রূপকার্থে নজরুলের‌ই আগমনী বার্তা বহন করে—‘ঐ নূতন’ বলতে মূলত ‘ঐ নজরুল’ বুঝতে হয়। কেন?

কথাসাহিত্য
নজরুলের প্রথম প্রকাশিত রচনা ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’ নামক গল্পের মাধ্যমে। এরপর টানা তিনটি গল্প প্রকাশিত হয়, যখন তিনি সৈনিকজীবনে আবদ্ধ। অর্থাৎ, কথাসাহিত্যের মাধ্যমেই নজরুলের সাহিত্যযাত্রা। কিন্তু অস্বাভাবিক ব্যাপার হচ্ছে, কথাসাহিত্যের নজরুল তেমন আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেননি, যতটা না পেরেছেন কবি নজরুল বা সঙ্গীতস্রষ্টা নজরুল। তাই বলে কি বাঙলার কথাসাহিত্যে তাঁর অবদান একেবারেই নেই? আদতে ব্যাপারটি ডাহা মিথ্যা হলেও হাল-জামানার অদক্ষ এবং অজ্ঞ কথাসাহিত্য-বিশ্লেষকদের হলফনামা দেখলে তা-ই মনে হয়।
১. বাঙলা কথাসাহিত্যের জগতে সৈনিকজীবন এবং যুদ্ধজীবনের আমদানিকারক নজরুল।
২. বাঙলা কথাসাহিত্যে ‘জারজ নায়ক’র আমদানি নজরুলের পূর্বে কেউ করার সাহস পায়নি।
৩. নজরুলের পূর্বে কাব্যিক গদ্যের অস্তিত্ব ছিল না; বাঙলা সাহিত্যে কাব্যিক গদ্যের জন্মদাতা নজরুল।

কবিতা
নজরুলের প্রাথমিক পরিচিতি ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে হলেও—আমরা অনেকেই তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করলেও তিনি কেবল বিদ্রোহী ছিলেন না, তাঁর কাব্যগগন যথার্থ অর্থেই রঙধনু—রঙধনুর সাত রঙের মতো নজরুলের কাব্যগগন‌ও বর্ণিল এবং বৈচিত্র্যময়। বাঙলা কাব্যজগতে নজরুলের স্থান অমর এবং অনড়—গবেষণা হয়েছে অনেক, দেশে-বিদেশে পিএইচডি ডিগ্রিও হয়েছে বেশ। বাঙলা কাব্যজগতে নজরুলের ৩টি সুনির্দিষ্ট অবদান চিহ্নিত করছি:
১. বাঙলা কাব্যজগতে রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল সম্পূর্ণরূপে সর্বপ্রথম ছিন্ন করেছেন নজরুল।
২. বাঙলা কবিতাকে সংস্কৃত-পূঁজা থেকে মুক্ত করেছেন নজরুল।
৩. বাঙলা কবিতাকে পুরুষত্ব দান করলেন নজরুল এবং তার কণ্ঠে তেজোদীপ্ততাও ঢাললেন নজরুল‌ই।

বাঙলা ভাষা
বাঙলা ভাষার ইতিহাসে ‘নজরুল’ একটি অনিবার্য অংশ। কেননা, ফোর্ট উইলিয়াম এবং তার হর্তাকর্তাগণ বাঙলা ভাষাকে আরবি-ফারসি মুক্ত করে গলা টিপে হত্যা করার যে ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র করেছিল একা নজরুল‌ই সে ষড়যন্ত্রের দ্বার রুদ্ধ করে দিয়েছেন। নজরুলের পূর্বেও রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, মোহিতলাল প্রমুখ কবি আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার করেছিলেন; কিন্তু নজরুল‌ই সর্বপ্রথম দ্বিধাহীনভাবে—স্বাচ্ছন্দ্যে খ‌ইমুড়ির মতো আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার করেছেন। ফলে, বাংলা ভাষার কবিতায়, উপন্যাসে, গল্পে আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারে লেখকদের যে সঙ্কোচ এবং দ্বিধা ছিল তা একেবারেই কেটে গেল। বলা যায়, বাংলা ভাষাকে পঙ্গুত্ব থেকে রক্ষা করে চলার শক্তি দান করলেন নজরুল। নজরুলের এ ঐতিহাসিক এবং শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব সম্পর্কে আমাদের দেশের নামধারী ভাষাতাত্ত্বিকদের কণ্ঠে তেমন কিছু শোনা যায় না—‘নজরুলের নিকট আমাদের ঋণ’ নামক প্রবন্ধে এ ব্যাপারে মহাত্মা আহমদ ছফা আলোচনা তুলেছিলেন, কিন্তু তারপর আর কেউ তেমন এ ব্যাপারে মোটাদাগে আলোচনা করেননি।

সঙ্গীত
নজরুলের অবদান সঙ্গীতের জগতে সবচেয়ে বেশি। একটি অভিভাষণে তিনি নিজেই এ ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দিয়েছেন। বাংলার সঙ্গীত জগতে নজরুলের ৩টি নতুনত্ব তুলে ধরছি:
১. সঙ্গীতের মাধ্যমে জনরব উঠানোর পদ্ধতির আবিষ্কারক তিনিই—অন্তত বাংলায়।
২. সঙ্গীতের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চেতনার খাঁটি বীজ গণমানসে বপন করার ক্ষেত্রে প্রথম সফল বাঙালি নজরুল; লালনের কথা এখানে উল্লেখ করলেও অসাম্প্রদায়িকতার ক্ষেত্রে লালন এবং নজরুলের সফলতার পার্থক্য মোটাদাগে চিহ্নিত।
৩. বাংলা সঙ্গীতের জগতে একা নজরুল যে বিশিষ্টতা এবং বৈচিত্রতার গাঢ় স্বাক্ষর রেখেছেন তা বাংলার সঙ্গীতজগতে পূর্বাপর তুলনারহিত।

জরুরী দ্রষ্টব্য: নজরুলের বিভিন্নতা, বিচিত্রতা আমরা এখনো স্বীকার করতে কুণ্ঠিত হ‌ই—কুণ্ঠিত হ‌ই এই অর্থে যে, আমরা মানুষ নজরুল-গায়ক নজরুল-কবি নজরুল-ঔপন্যাসিক নজরুল-রাজনীতিবিদ নজরুল-অসাম্প্রদায়িক নজরুল ইত্যাদি নজরুলের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনটাকে আলাদা আলাদা করে বিচার করতে এখনো পর্যন্ত অক্ষম। মানুষ নজরুলকে অনেক সময় টেনে নিয়ে যাই কবি নজরুলের নিকট, কবি নজরুলকে দাঁড় করিয়ে দেই সঙ্গীতস্রষ্টা নজরুলের মুখোমুখি, ঔপন্যাসিক নজরুলকে বিচার করি উপন্যাসের অসম্পূর্ণ জ্ঞানে এবং গায়ক নজরুলের পূর্ণতা ভরে রাখতে চাই ইসলামী/হিন্দুয়ানী সঙ্গীতগুলোর গোলায়—এসব নজরুলের উপর অবিচার, অন্যায়। মানুষ নজরুলকে জানতে কবি নজরুল সহায়তা করতে পারে—একটি অংশ অন্য অংশের মর্মোদ্ধারে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণতা তো দিতে পারে না! আমরা অজ্ঞতার বশে সহায়তাকে সম্পূর্ণতায় পর্যবসিত করছি। সাহিত্যের প্রতিটি আঙিনায়, সঙ্গীতের প্রতিটি দিগন্তে খণ্ড-খণ্ড আকারে নজরুল-সদ্বিচার যতদিন না সম্ভব হচ্ছে ততদিন নজরুলের উপর আমাদের অন্যায়ের ধারা জারি থাকবে, ইনশাআল্লাহ।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।