বিদায় বেলায় মানবিক হই

প্রকাশিতঃ ৬:১১ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ১৮ জুন ২০

মুশফিক ইলাহী

মৃত্যু! ক্ষণস্থায়ী এই বাসস্থান হতে চিরস্থায়ী জগতের দিকে পাড়ি দেওয়ার মাধ্যম। আল্লাহ পাক বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে।’ (সূরা আল ইমরান : ১৮৫) মৃত্যুর পর আর কেউ ফিরে আসে না এই পৃথিবীতে। চিরস্থায়ী জীবনে যেন মানুষ সুখে থাকে সে জন্য তার পরিবার, প্রিয়জন, আত্মীয়, প্রতিবেশীরা প্রার্থনা করবে এটাই স্বাভাবিক। শান্তির ধর্ম ইসলাম আমাদের মৃত্যু পরবর্তী প্রার্থনার উপায় শিখিয়েছে এবং উৎসাহিত করেছে মৃত্যুর পর যেন শেষ বিদায়ে আমরা অংশ নেই। জানাযা ও দাফন কাজই হলো মুসলিম কর্তৃক তার অপর ভাইদের নিকট দুনিয়াবী শেষ চাহিদা।

প্রত্যেক মুসলিমকে ভাই বিবেচনা করতে শিখিয়েছেন ইসলাম। পবিত্র কুরআন মাজীদে এভাবে উল্লিখিত হয়েছে, ‘মুমিনরা মাত্রই ভাই-ভাই। অতঃপর তোমাদের ভাইদের মাঝে সন্ধি স্থাপন করে দাও। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।’ (সূরাহুজুরাত : ১০)।

প্রিয় নবী (সা:) এরশাদ করেন, ‘এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই।’ (সহীহ তিরমিজি, ১৯২৭)।

ইসলাম এক ভাইয়ের প্রতি এক ভাইয়ের কিছু নির্দিষ্ট হক্ব তথা অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা আমাদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্বকে করবে ইস্পাতের ন্যায় সুদৃঢ়। রাসুলুল্লাহ (সা:) সেই হক্ব সম্পর্কে বলেছেন, ‘তুমি যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তাকে সালাম দেবে। সে যখন তোমাকে দাওয়াত করবে, তখন তা গ্রহণ করবে। সে যখন তোমার কাছে পরামর্শ চাইবে, তখন তুমি তাকে পরামর্শ প্রদান করবে। যখন সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলবে, তখন তুমি ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে। যখন সে অসুস্থ হবে, তখন তাকে দেখতে যাবে। যখন সে মারা যাবে, তখন তার জানাযা ও দাফন-কাফনে অংশগ্রহণ করবে।’ (সহীহমুসলিম : ২১৬২)।

জানাযা ও দাফন কাজে অসংখ্য সাওয়াব ও রয়েছে। সিহাহ সিত্তাসহ বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, মহানবী (সা:) এরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মৃত ব্যক্তির জানাজার নামাজ আদায় করে, সে এক ‘কিরাত পরিমাণ নেকি লাভ করে আর যে ব্যক্তি কোনো মৃত ব্যক্তির জানাজার নামায আদায় করে এবং তার দাফনের কাজে অংশগ্রহণ করে, সে দুই কিরাত পরিমাণ সওয়াব লাভ করে।

”জনৈক সাহাবি প্রশ্ন করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! দুই কিরাত কী? নবী করিম (সা.) বললেন, ‘দুই কিরাতের ক্ষুদ্রতম কিরাত ওহুদ পাহাড়ের সমান।’ (ইবনেকাছির)। অত্র হাদিস হতে সহজেয় অনুমেয়, জানাযা ও দাফনের কাজে কতখানি সাওয়াব নিহিত আছে।

বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর ভয়াল থাবায় সকলেই মৃত্যু ভয়ে জর্জরিত। লাশের মিছিলে সদস্যের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। করোনা ছোঁয়াচে, তাই করোনা আক্রান্ত মুসলিম মৃত ব্যক্তিদের জানাযা ও দাফন নিয়ে ও ভয় ছড়িয়ে পড়ছে। গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ, আলমানাহিল, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনসহ অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন করোনায় আক্রান্ত হয়ে বা করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারীদের জানাযা ও দাফনের দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের মারফতে প্রতিনিয়ত জানা যাচ্ছে যে, বিভিন্ন স্থানে লাশ দাফনে বাঁধা দিচ্ছে এলাকাবাসী। অপমানিত হচ্ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর পরিবার। স্বাভাবিক রাস্তা দিয়ে লাশ বহন করতে দেওয়া হচ্ছে না। দাফন কাজে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকদের সাথেও অনেকে দুর্ব্যবহার করছেন। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরাই ভয়ে লাশের কাছে যাচ্ছেন না। যা সত্যিই একটি জাতীর জন্য লজ্জার ও দুঃখের।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, “মৃতদেহ দাফন বা সৎকার করতে তিন চার ঘণ্টা সময় লেগেই যায়। তিনঘণ্টা পরে আর মৃতদেহে এই ভাইরাসের কার্যকারিতা থাকে না। নিজ নিজ ধর্মীয় বিধি মেনেই মৃতদেহ দাফন এবং সৎকার করা যায়।”

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, সংস্থাটি বলেছে, ‘এখনো পর্যন্ত এটা প্রমাণিত হয়নি যে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে সুস্থ কোন ব্যক্তির মধ্যে করোনা ভাইরাস ছড়ায়।’ (বিবিসি বাংলা)।

করোনায় কবে কে আক্রান্ত হবে, তার কোন নিশ্চয়তা নেই। করোনায় মৃত রোগীর জানাযা-দাফনে বাঁধা দিয়ে যে উদাহরণ আজ আপনি তৈরী করছেন, কাল একই ঘটনা আপনার বা আপনার পরিবারের সাথেও হতে পারে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃতরা আমাদেরই ভাই। আসুন, তাদের শেষ বিদায়ের কার্যক্রম সম্পন্ন করি যথাযথ সম্মানের সহিত। নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুসারে, সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে হোক প্রতিটি মানুষের শেষ বিদায়।

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারী কলেজ।

moshfiqelahi6@gmail.com

সময় জার্নাল/

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।