বিপর্যস্ত রেন্ট-এ-কার ব্যবসা

প্রকাশিতঃ ১:১১ অপরাহ্ণ, মঙ্গল, ৫ মে ২০

# জড়িত ৫০ লাখ পরিবারের জীবন দূর্বিষহ,
## ধ্বস কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত,
### পরিস্থিতি উত্তরণে চাই প্রধানমন্ত্রীর সু-দৃষ্টি

রিফান আহমেদ, অতিথি প্রতিবেদক : গোটা বিশ্ব আজ করোনা ভাইরাসের কারণে স্তব্ধ। গত মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে সরকারি সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে চলছে সাধারণ ছুটি। গত প্রায় দেড় মাস মানুষ ঘরবন্দি। চলাচলে বাধ্যবাধকতাসহ দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের প্রতিটি সেক্টরেই বিরাজ করছে চরম অস্থিরতা। বিভিন্ন দেশে আটকে পড়া বাঙ্গালীরা যেমন দেশে ফিরে এসেছে, তেমনি এদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত বিদেশীরাও নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। আর এই স্থবির পরিস্থিতির মাঝে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের মতো মহাবিপাকে পড়েছে ভাড়ায় চালিত গাড়ির মালিক, গাড়ির চালক ও রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ে সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র মতে, রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ের নেটওয়ার্ক সারাদেশে কমবেশি থাকলেও একটি বৃহৎ অংশই রয়েছে রাজধানী ও আশপাশ এলাকায়। এক জরিপে শুধু রাজধানীতে দুই লাখ লোক গাড়ী ভাড়ায় চালিত বা রেন্ট-এ-কার নামক এ ব্যবসায় জড়িত। তাদের পরিবার পরিজনের খাওয়া থাকাসহ সকল ব্যয়ভার বহন করতে এ ব্যবসার উপরই তারা নির্ভরশীল। শুধু তাই নয়, আরো প্রায় দেড় লাখ গাড়ির চালক রয়েছেন, যাদের পরিবার গাড়ি চালকদের আয় রোজগারের ওপর নির্ভরশীল। ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত গাড়ি ভাড়ায় দিয়ে অতিরিক্ত কিছু আয়ের উৎস বের করতে ইদানিং অনেকেই নিজের গাড়ি রেন্ট-এ-কারে দিয়ে থাকেন। আবার অনেকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েও রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ে নামেন। রেন্ট-এ-কার ব্যবসার পিক আওয়ার সাধারণত শীতকালে পর্যটন মৌসুমে। এ সময় কক্সবাজার, কুয়াকাটাসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় ভাড়ায় চলে থাকে এ গাড়িগুলো। শীত মৌসুমের শেষদিকে অর্থাৎ মার্চ পর্যন্ত রেন্ট-এ-কার ব্যবসার রমরমা থাকলেও করোনা দূর্যোগে পুরো মৌসুম ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িরা। মার্চের শেষ দিকে সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক পর্যটন স্পটসমূহ পরিদর্শনে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণায় প্রাথমিক ধাক্কা খায় এ পেশায় জড়িত ব্যবসায়ীরা। তবে কমবেশি সারা বছরই ভাড়ায় চালিত গাড়ির চাহিদা থাকায় আশায় বুক বাঁধে ব্যবসায়ীরা। আর এর মূল কারণ বিভিন্ন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ও বেসরকারি অফিস, যারা প্রতিনিয়ত রেন্ট-এ-কার থেকে গাড়ি ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করে থাকে। রাজধানীর উত্তরা, সাভার, মালিবাগ, বাড্ডাসহ অনেক এলাকায় রয়েছে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। ব্যবসায়িক সূত্রে এ গার্মেন্টস মালামাল কিনতে বিভিন্ন দেশ থেকে বিদেশী বায়াররা আসেন বাংলাদেশে। আর এই সকল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ও বিদেশী বায়ারদের কাছে দৈনিক বা মাসিক চুক্তিতে বিভিন্ন মডেলের গাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকেন রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ীরা। কিন্তু করোনা দুর্যোগের এ ক্রান্তিকালে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী বন্ধ করে দেওয়া হয় গার্মেন্টসগুলো। আর এই সেক্টর বন্ধ ঘোষনায় বিদেশী বায়াররাও নিজ দেশে ফিরে যান। সাধারণ ছুটির আওতায় দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি অফিস বন্ধ হয়ে যায়। আর এতেই চরম ধ্বস নামে রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়। পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও গাড়ির মালিকরা। সারাদেশের মানুষ আজ গৃহবন্দি থাকায় এক অনিশ্চিত দোলাচলে দুলতে থাকে এ ব্যবসায় জড়িতদের ভাগ্য। পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়ায় দূর্বিষহ জীবন অতিবাহিত করছে এ ব্যবসায়ীদের পরিবার।

সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়িদের সাথে যোগাযোগ করলে সকলেই অভিন্ন হতাশা ব্যক্ত করেন। আর রাজধানীতে ভাড়ায় খাটানো এমন একাধিক গাড়ির মালিক জানিয়েছেন, করোনার প্রভাবে সবকিছুই বন্ধ। রাস্তায় কোনো গাড়ি বের হতে পারছে না। আর বের হলেও লাভ নেই, কারণ প্যাসেঞ্জার পাওয়া যায় না। সব মিলিয়ে বেহাল অবস্থায় পড়েছেন তারা। কয়েকজন গাড়ির চালক বলেছেন, আমরা দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। গাড়ি ভাড়া হলে উপার্জন হয়, যে দিন ভাড়া হয় না, আয়ও বন্ধ। কিন্তু এভাবে একাধারে সবকিছু বন্ধ থাকলে আমাদের করোনায় নয়, না খেয়েই মরতে হবে পরিবার নিয়ে। চালকরা বলছেন, সবাই মনে করে একটা গাড়ি ভাড়ায় গেলেই আমাদের অনেক আয় হয়। যে কারণে কেউ সহযোগীতাও করে না। আর আমরা কারো কাছে হাত পাততেও পারি না।

রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ী শহীদুল জানান, তিনটি প্রাইভেটকারসহ তার ৪টি নিউসেফ (১৪ সিটের) মাইক্রোবাস রয়েছে। এগুলো ভাড়ায় চলে। ২টি মাসিক ভিত্তিতে সাভারের একটি বিদেশি কোম্পানিতে এবং বাকিগুলো দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া চলে। কিন্ত গত প্রায় এক মাসের ওপর ব্যবসা নেই বললেই চলে। বিদেশিদের কাছে মাসিক ভাড়ায় চালানো হত তারাও দেশে ফিরে গেছেন। ফলে চরম বিপাকে পড়তে হয়েছে।

রাজধানীর বাড্ডা এলাকার রেন্ট এ কারের ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান জানান, তাদের ব্যবসা প্রায় বন্ধ। কোন কাস্টমার নেই। বিভিন্ন জেলা লকডাউন থাকায় চলাচলে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে, আর তাই কেউ গাড়িও ভাড়া নিচ্ছে না। তিনি বলেন, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ব্যংাকের লোনের কিস্তির টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে গাড়ি বিক্রি করা ছাড়া কোন উপায় নেই।

অপর একটি সূত্র জানায়, রাজধানীর দুই লাখ রেন্টে কারের ব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ও অন্যান্য খাতের লোন রয়েছে। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে যারা গাড়ি কিনেছেন তারা সময় মত কিস্তির টাকাও পরিশোধ করতে পারছেন না।ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, শুধু বিদেশিরা চলে যাওয়াতেই নয়, নানা কারণে এখন এ ব্যবসায় ধস নেমেছে। তারা বলছেন, দেশের ট্যুরিজম ব্যবসায়ীদের সাথে অনেক রেন্ট এ কার ব্যবসায়ী সম্পৃক্ত রয়েছেন। সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ট্যুরিজম ব্যবসায়ীরা সর্বাধিক হারে রেন্টে কারের ব্যবসায়ীদের গাড়ি ব্যবহার করে থাকেন। কিন্ত এবার তাও বন্ধ রয়েছে।

রেন্ট-এ-কার ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক মোঃ নূর আলম জানালেন, দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন গাড়ি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ৫০ লাখ পরিবার। আমাদের সংগঠনের আওতায় সারা দেশে আনুমানিক ৫ লক্ষ গাড়ি রয়েছে। গাড়ির মালিক, চালক ও রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়ী মিলিয়ে ৫০ লাখ পরিবারের উপার্জনের মাধ্যম হচ্ছে গাড়ি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সবার আয় থেমে গেছে। পাশাপাশি তিনি হতাশা প্রকাশ করলেন, সরকার থেকে আপাতত ঋণের কিস্তি না নিতে বলা হলেও ব্যাংক এবং অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সে নির্দেশনা যথাযথ মানছে না। তাই মরার ওপর খাঁরার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণ নিয়ে ক্রয় করার গাড়ির মাসিক কিস্তির বোঝা। চালকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, করোনার কারণে সব কর্পোরেট অফিস বন্ধ। তাই তাদের কাছে যেসব গাড়ি নিয়মিত ভাড়ায় থাকতো তাও ছেড়ে দিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবেও কেউ নিচ্ছে না।

সংগঠনটির সভাপতি লুৎফুর রহমান বলেছেন, গাড়ি মালিকদের মাথার ওপর স্টাফ খরচ, গাড়ির লোনসহ আরো অনেক রকম চাপ রয়েছে। তাছাড়া গাড়িগুলো এভাবে মাসের পর মাস বসে থাকলে ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন পার্টস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি আরো বলেন, সরকার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে নির্দেশনা দিয়েছে তা কেউ মানছে না। চলতি মাসেও অনেক গাড়ি মালিকের ঋণের কিস্তির টাকা ব্যাংক ও ফিন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান কেটে নিয়েছে। এমতাবস্থায় ধ্বস নামা রেন্ট-এ-কার ব্যবসায়কে আবারও চাঙ্গা করতে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত।

এ অবস্থায় রেন্ট-এ-কার ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, গাড়ি মালিক, চালকরা সম্মিলিতভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সু-দৃষ্টি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্ততপক্ষে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি ৬ মাসের জন্য স্থগিত এবং সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে এ ব্যবসায়ে জড়িতরা, পাশাপাশি চলমান এ ধ্বস ঠেকানো সম্ভব হবে। তাই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তারা প্রধানমন্ত্রীর সু-দৃষ্টি ও আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ