বিশ্বায়নে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু

প্রকাশিতঃ ৯:৫১ অপরাহ্ণ, শনি, ১৫ আগস্ট ২০

সালমা নাসরীন, এনডিসি

যারা ইতিহাস রচনা করেন, যারা কিংবদন্তী, তাঁদের অনেকেরই বিদায় বড় করুণ। কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মত ভাগ্যের এমন নির্মম পরিহাস জন এফ কেনেডী, আব্রাহম লিংকন, মার্টিন লুথার কিং এবং মহাত্মা মোহনদাস গান্ধী, এমনকি ইন্দিরা গান্ধী-এদের কারোরই হয়নি। বঙ্গবন্ধুসহ এরা সকলেই আপন মহিমায় সমুজ্জ্ল। তবুও তাঁদের প্রত্যেককে অস্বাভাবিক মৃত্যুকে বরণ করতে হয়েছে। আততায়ীরা এদেরকে হত্যা করেছে বটে কিন্তু তাঁদের কীর্তিকে মুছে দিতে পারেনি। কারণ ইতিহাস মোছা যায় না। ইতিহাস কাউকে ক্ষমাও করে না। যাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলার ইতিহাস তাকে সেখানেই ফেলে দেয়। আর যারা নন্দিত হওয়ার যোগ্য ইতিহাস তাদের অভিনন্দিত এবং মূল্যায়ন করে নির্বিশেষে। তাই জন্য জাতির পিতার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আজ বিশ্বনন্দিত। সমগ্র বিশ্বের “ডকুমেন্টারী হেরিটেজ” হিসেবে ইউনেস্কো এ ভাষণকে দিয়েছে চিরন্তন স্বীকৃতি।

ঠিক একইভাবে আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তবে দেখি যে, আমেরিকার লিবারেলিজম এর অন্যতম ধারক ও বাহক এবং সর্বোপরি প্রবর্তক ছিলেন মার্টিন লুথার কিং। বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতার ধারক ও বাহক এবং বাংলাদেশের আইকন। অথচ এ দুজনের কারোরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। এদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুই সবথেকে করুণ, মর্মান্তিক ও হৃদয় বিদারক। তাঁর অপরিণত বয়সের কিশোর সন্তানটিকেও ঘাতকরা ছাড়েনি, বরং নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। বিশ্বের সকল নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতাকে অতিক্রম করেছে ১৫ আগস্ট এর ঘটনা। এটি ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়।

এদিকে আব্রাহম লিংকন যিনি বিরাজমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে কৃতিত্বের সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করে আসছিলেন অথচ আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের যখন অবসান হতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই গুড ফ্রাইডের (Good Friday) দিন তিনি নিহত হলেন। ঘাতকের নিকট কোন পবিত্র দিন বলে কিছু নেই। নইলে গুড ফ্রাইডেতেও কেউ কাউকে হত্যা করে। ইন্দিরা গান্ধী প্রিয়দর্শিনী তিন তিন বার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বাসঘাতক দেহরক্ষীদের হাতে তাঁকে দিতে হয়েছে প্রাণ। কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকরা বর্ণিল ইতিহাসে কালিমা লেপনের জন্য এ পৃথিবীতে আসে। আর এ জন্যই তারা সর্বজনধিকৃত ও কলংকিত।

ভাগ্যিস বঙ্গবন্ধু জেলখানায় তাঁর সহধর্মিনীর অনুরোধে বন্দী অবস্থায় আত্মজীবনী লিখেছিলেন নতুবা আমরা তাঁর শৈশব ও কৈশোরসহ কর্মময় জীবনের অনেক তথ্য থেকে বঞ্চিত হতাম। হোক না তাঁর আত্মজীবনী অসমাপ্ত তবুও তা আমাদের ভবিষ্যতের পাথেয়। তাঁর অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব তো আমাদের উপরই বর্তায়। একদিকে তিনি ছিলেন পলিটিকাল আ্যাকটিভিষ্ট (Political Activist), অন্যদিকে তিনি ছিলেন দুর্ভিক্ষের সময় জনদরদী ও আর্তের সেবায় নিয়োজিত এক নিবেদিত সেবক। তিনিই তো জাতীয় কবিকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আর কবিও তা গ্রহণ করে বাংলাদেশেই জীবনের শেষ দিনটি অতিবাহিত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে হয়তো দক্ষিণ এশিয়ার জিও পলিটিক্যাল (geo political) বাস্তবতায় বাংলাদেশকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তিনি দিতেন এক নতুন মাত্রা।

-২-

ভারতের জনৈক ব্যক্তির উদ্ধৃতি অনুযায়ী “শেখ মুজিব ইজ নট এ মেয়ার ইনডিভিজুয়াল। হি ইজ এ্যান ইনষ্টিটিউশন, এ মুভমেন্ট, এ রিভলিউশন। হি ইজ দ্যা আরকিটেক্ট অব দ্যা ন্যাশন। হি ইজ দ্যা এসেন্স অব এপিক পোয়েট্রি এন্ড হি ইজ দ্যা লিজেন্ড এন্ড দ্যা হিষ্ট্রি” (“Sheikh Mujib is not a mere individual. He is an institution, a movement, a revolution. He is the architect of the nation. He is the essence of epic poetry and he is the legend and the history”। তিনি অনন্য সাধারণ এক নেতা।

কৈশোরেই তিনি স্বাক্ষর রেখেছিলেন নেতৃত্বের। গোপালগঞ্জের যে মিশনারী স্কুলে তিনি পড়তেন ঐ স্কুল ভিজিট (visit) এ যখন চীফ মিনিস্টার শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক গেলেন ঠিক তখনই তিনি তাঁর অঞ্চলের নানা রকম বঞ্চনা ও অসুবিধার কথা নির্ভয়ে জানালেন এজিটেশন (agitation) এর মাধ্যম। তিনি ১৯৪৬ সনে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়তে গিয়ে  জেনারেল সেক্রেটারী হিসেবে নির্বাচিত হলেন। রাজনীতিতে তিনি ছিলেন সোহওয়ার্দীর ফারভেন্ট ফ্লাওয়ার (fervent flower)। মোদ্দাকথা তিনিই আমাদের ইমানসিপশেন (emancipation), আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। তাঁর স্মৃতি ও তাঁর কীর্তিই হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার বাতিঘর। তাঁকে পাকিস্তানীরা গ্রেফতার করেছে, সলিটারি কনফাইমেন্টে (solitary confinement) রেখেছে কিন্তু প্রতিহত করতে পেরেছে কি? পারেনি। এমনকি তাঁর অবর্তমানেও ২০০৪ সালে BBC কর্তৃক পরিচালিত সার্ভেতে তাঁকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী হিসেবে অভিহিত করা হয়।

বিশ্ব নেতারা তাঁকে কারিসমেটিক রাষ্ট্র নেতা বলেছেন, জার্মানীর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট খ্রিস্ট্রিয়ান উলফ্  (Christian Wulf) তাঁকে মহান রাষ্ট্র নেতা  হিসেবে বাংলাদেশী জাতির আরকিটেক্ট (architect) এবং  ফাদার অব দ্যা ন্যাশন father of the nation বলেছেন। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাঁকে একজন গ্রেট ভিশনারী স্টেটসম্যান (great visionary statesman) বলেছেন। মমতা ব্যানার্জী বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে মর্যাদা (dignity) দেয়ায় তাঁর অবদানকে মূল্যায়ন করেছেন উচ্চস্তরে, তিনি আরো বলেছেন তাঁর এ অবদান সকল মুক্ত চেতনার মানুষকে অনুপ্রেরিত করবে সব সময়।

আমেরিকার অ্যামবাসেডর জোসেফ ফারল্যান্ড (Joseph Farland) তাঁকে তদানীন্তন “পূর্ব পাকিস্তানের মুকুটবিহীন রাজা” হিসেবে এক তার বার্তায় সে সময় উল্লেখ করেছিলেন। ঢাকায় তখনকার কনসুল জেনারেল (consul general) আর্চার ব্লাড বিভিন্ন তারবার্তায় তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষক এবং গেরিলা যুদ্ধের নির্দেশক হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আর্চার কেন্ট ব্লাড নির্ভিক চিত্তে তার টেলিগ্রামের মাধ্যমে সেই সময়ে ঢাকায় পাকিস্তানীদের অত্যাচারের সকল বিবরণী ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন, লিখেছিলেন ঢাকার নির্বাচিত গণহত্যা বা সিলেকটিভ জেনোসাইড (Selective genocide) সম্পর্কে। আর তার এ সব টেলিগ্রাম যখন ডিক্লাসিফাই (declassify) করা হয় ঠিক তখনই গ্যারী জে, বাস (Garry J.Bass) লিখেছেন সেই বিখ্যাত বই  “দ্যা ব্লাড টেলিগ্রাম, নিক্সন, কিসিঞ্জার এন্ড এ ফরগটেন জেনোসাইড” (The Blood Telegram, Noxon, Kissinger and a forgotten Genocide) শীর্ষক কালজয়ী এ বই। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস একজন বিদেশী এমনভাবে প্রতিফলিত করেছেন তার বইয়ে, তার ফলে যে কোন পাঠক অত্যাগ্রহে বইটি পড়বে।

-৩-

আর্চারকে এ জন্য চরম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। কিসিঞ্জার বিরক্ত হয়ে তাঁকে বাংলাদেশ থেকে ওয়াশিংটনে ফেরত নিয়ে গিয়ে ডিমোশন দেয়। ১৯৭১ এ বিশ্বব্যাংকের যে টীম বাংলাদেশে এসেছিলেন তারাও এ দেশের গণহত্যা ও অত্যাচারের সত্য বর্ণনা, এমন কি তারা পাকিস্তানী সৈন্যদের নৃশংসতার অনেকটাই তুলে ধরেছিলেন তাদের প্রতিবেদনে। কিন্তু তদানীন্তন বিশ্বব্যাংক (World Bank) এর প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা (Robert Mc Namara) সেদিন ঐ রিপোর্ট  (desperately) চেপে রাখার জন্য প্রাণপনে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু  শেষে রক্ষা করতে পারেননি। সৌভাগ্যক্রমে নিউ ইয়র্ক টাইমস (New York Times) পত্রিকা ঐ প্রতিবেদনটি ছেপে দেয় ফ্রন্ট পেইজে (front page)। ম্যাকনামারা অবশ্য বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার জন্য তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের কাছে মাফ চেয়েছিল।

প্রকৃতপক্ষে আর্চার ব্লাড বুঝেছিলেন বাংলাদেশ বিজয়ী হবেই। তাই এ কথা তিনি তার নিজের লেখা “দ্যা ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশঃ মেমোরিজ অফ অ্যান অ্যামেরিকান ডিপ্লোম্যাট” (“The cruel birth of Bangladesh: Memories of an American Diplomat”)– বইটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। এ বইয়ে আমাদের মুক্তি যুদ্ধকে গ্লোরিফাই (glorify) করা হয়েছে। তাইতো তাঁর গভীর কমিটমেন্ট (deep commitment) তার সহকর্মীসহ নিজের চোখের সামনে দেখেছেন। বাংলাদেশে সংঘটিত স্বাধীনতা যুদ্ধ, যুদ্ধ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল ঘটনা এ বইয়ে প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁর এ বইটির ২৪টি চ্যাপ্টার তিনি এমনভাবে লিখেছেন যেন তিনি আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এই যে, এ বই লেখার জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয় ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত। কারণ আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট (State Department) তখনই কেবল আর্চারের টেলিগ্রামগুলো ডিক্লাসিফাই (Declassify) করে।

অতএব, বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশেরই বরেণ্য নেতা নেন, তিনি সার্বজনীন এবং বিশ্বজনীন। তাই তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করার, তাঁর স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব কেবল আমাদেরই।

লেখিকা : সদস্য, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

সময় জার্নাল/শাহ্ আলম

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।