ভিয়েতনামে কেন করোনাভাইরাসে মৃত্যু শূন্য?

প্রকাশিতঃ ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ, শনি, ১৩ জুন ২০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চীনের সঙ্গে দীর্ঘ সীমানা থাকলেও এবং লাখ লাখ চীনা পর্যটক প্রতিবছর ভিয়েতনামে এলেও ৯ কোটি ৭০ লাখ মানুষের দেশটিতে শনিবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি! মাত্র ৩২৭ জন এই মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে আবার ২৭৯ জন সেরে উঠেছেন।

এ সাফল্য আরও অসাধারণ কারণ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ ভিয়েতনামের এশিয়ার অন্যদেশগুলোর তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা স্বল্পোন্নত। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবে, দেশটিতে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র আটজন চিকিৎসক আছে, যা দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ।

দেশজুড়ে তিন সপ্তাহের লকডাউনের পর এপ্রিলের শেষে ভিয়েতনাম সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ তুলে নেয়। দেশটিতে স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ হয়নি ৪০ দিনের বেশি সময়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবার চালু হয়েছে। জীবনযাত্রা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে।

সংশয়বাদীরা হয়ত ভিয়েতনামের এই সরকারি সংখ্যার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। কিন্তু কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় দেশটির প্রধান একটি হাসপাতালে কর্মরত সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসক গাই থোয়াইটস মনে করছেন, এই সংখ্যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

হো চি মিন সিটিতে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ইউনিটেরও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই চিকিৎসক সিএনএনকে বলেন, “আমি প্রতিদিন ওয়ার্ডগুলোতে যাই, আমি জানি সেখানে মৃত্যুর কোনো ঘটনা নেই।”

তিনি জানান, শহরে বাসিন্দাদের মধ্যে করোনাভাইরাসের অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়লে তো হাসপাতালে রোগীরা আসতোই। কিন্তু এমনটা কখনও ঘটেনি।

তাহলে কীভাবে ভিয়েতনাম বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীতে ব্যাপকভাবে করোনভাইরাসের মহামারী থেকে বেঁচে গেল?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারীর বিস্তার রোধে সরকারের শুরুতেই দ্রুত পদক্ষেপ থেকে শুরু করে ব্যাপকভাবে কন্টাক্ট ট্রেসিং ও কোয়ারেন্টিন করা এবং জনগণের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের মধ্যে এর উত্তর মিলবে।

দেশটিতে প্রথম কেউ আক্রান্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই ভিয়েতনাম করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করেছিল। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের কোনও ‘সুস্পষ্ট প্রমাণ’ মেলেনি বলে তখনও চীন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জোর দিয়ে বলে আসছিল। কিন্তু ভিয়েতনাম কোনো ঝুঁকি নেয়নি।

হ্যানয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হাইজিন ও এপিডেমিওলজির সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের উপ-প্রধান ফ্যাম কোয়াং থাই বলেন, “কেবল ডব্লিউএইচওর দিকনির্দেশনার জন্য আমরা বসে থাকিনি। আগেভাগে পদক্ষেপ নিতে দেশের ভেতরে-বাইরে থেকে আমরা উপাত্ত সংগ্রহ করেছি।”

জানুয়ারির শুরুতেই হ্যানয়ের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীনের উহানফেরত যাত্রীদের তাপমাত্রা পরীক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। জ্বর থাকলে যাত্রীদের বিচ্ছিন্ন রেখে তাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে বলে তখন দেশটির জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমে বলা হয়।

জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে উপ-প্রধানমন্ত্রী ভু ডাক ডাম ভিয়েতনামে প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়া রোধে স্থল বন্দর, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরগুলিতে মেডিকেল কোয়ারেন্টিন জোরদার করতে ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নিতে সরকারি সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দেন।

ভিয়েতনামে ২৩ জানুয়ারি প্রথম দুজনের করোনভাইরাস শনাক্ত হয়। এরা ভিয়েতনামে বসবাসরত এক চীনা নাগরিক ও তার বাবা, যিনি উহান থেকে এসেছিলেন। এরপর উহানের সব ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় ভিয়েতনাম।

ভিয়েতনামের বাসিন্দরা যখন চান্দ্র নববর্ষের ছুটি উদযাপন করছিল তখন ২৭ জানুয়ারি ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির এক জরুরি সভায় করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধের’ ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী নুয়েন সুয়ান ফুক। প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে তিন দিন পর গঠন করেন জাতীয় নির্বাহী কমিটি। সেদিনই করোনাভাইরাসকে বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি হিসেবে ঘোষণা করে ডব্লিউএইচও।

১ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে ‘জাতীয় মহামারী’ ঘোষণা করে ভিয়েতনাম, যখন দেশটিতে মাত্র ছয় জন আক্রান্ত ছিল। চীনের সঙ্গে সব ফ্লাইট বন্ধ করে ভিয়েতনাম। পর দিন চীনাদের ভিসা দেওয়াও স্থগিত করে দেশটি।

এরপর একে একে দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান ও ইতালির মতো দেশের ক্ষেত্রেও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, আগমণে কোয়ারেন্টিন ও ভিসা স্থগিত করা হয়। আর মার্চের শেষের দিকে সব বিদেশিদের প্রবেশ স্থগিত করা হয়।

কার্যকর লকডাউন ব্যবস্থাও শুরুতেই নিয়েছিল ভিয়েতনাম। সাত জন ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর ১২ ফেব্রুয়ারি হ্যানয়ের উত্তরে ১০ হাজার বাসিন্দার পুরো একটি গ্রামাঞ্চল ২০ দিনের জন্য লকডাউন করে রাখা হয়- যেটা ছিল চীনের বাইরে প্রথম বড় আকারের লকডাউন।

নববর্ষের ছুটির পরে ফেব্রুয়ারিতে পুনরায় চালু হতে যাওয়া স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে মে মাস পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

হো চি মিন সিটির সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ থোয়াইটস জানান, ভিয়েতনামের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই সাফল্যের মূল কারণ।

“জানুয়ারির শেষ দিকে ও ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ অন্য অনেক দেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল। প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে এগুলো অত্যন্ত সহায়ক হয়েছে।”

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।