‘মহামারী’ মোকাবেলা করে ভালো থাকুক প্রাণের বাংলাদেশ!

প্রকাশিতঃ ১২:৫০ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ১৬ এপ্রিল ২০

ডা. মো. মারুফ হক খান :
‘মহামারী’ মোকাবেলায় দরকার বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, দূরদর্শিতা, দীর্ঘমেয়াদী সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং সকলের সহযোগীতা:

কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সারা বিশ্ব যখন টালমাটাল তখন আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিগণ কোন প্রস্তুতি ছাড়াই মিডিয়ায় প্রস্তুতির বাণী দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন। যখন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে রোগ প্রতিরোধের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল, তখন প্রতিরোধের দিকে না দিয়ে আমাদের কর্তাব্যক্তিগণ চিকিৎসার উপর জোড় দিয়ে ভেন্টিলেটরে ও আইসিইউ বেডের হিসাব নিকাশ শুরু করেছেন! যখন প্রবাস ফেরত ২-৩ লক্ষ লোককে যথাযথভাবে আইসোলেশনের দরকার ছিল তা না করে এখন ১৮ কোটি লোককে লকডাউনের চেষ্টা করছেন। যখন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য জনগণকে তাদের যার যার স্থানে অবস্থান নিশ্চিত করা দরকার ছিল, তখন পরিবহন ব্যবস্থা চালু রেখে সরকারী ছুটি ঘোষণা করা, ছুটি ঘোষণার মাঝেই গার্মেন্টস সেক্টর খুলে দেওয়া, গার্মেন্টস এর কর্মীগণ কর্মস্থলে আসার পর আবার ছুটি ঘোষণা করা, চিকিৎসকদের ব্যাক্তিগত চেম্বার খোলা রাখার জন্য চাপ প্রয়োগ করার মতো কিছু অপরিপক্ক সিদ্ধান্তই প্রমান করে দেয় সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কর্তাব্যাক্তিদের সমন্বয়হীনতা, অদক্ষতা এবং অজ্ঞতা, যার জন্য দেশেকে বড় খেসারত দিতে হবে। যেহেতু আমরা রোগ প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে, এখন পরিকল্পিত উপায়ে আগামী দিনে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে নেওয়াটাই হবে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেন্জ।

১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে’ নিবন্ধিত মোট চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ৯৩ হাজার (দন্ত চিকিৎসক ব্যাতিত)। ধারণা করা হয় এরমধ্যে ১০/১২ হাজার চিকিৎসক ইতিমধ্যে বিদেশে চলে গিয়েছেন (সামনে হয়তো আরো চলে যাবে)। এর মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার চিকিৎসক ‘সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত’ হাসপাতাল সমূহে নিয়োজিত আছেন। যদিও সরাসরি চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসকের সংখ্যা আরো কম হবে কারণ অনেকে বেসিক সাবজেক্টে এবং প্রশাসনিক পদে কর্মরত আছেন।

চিকিৎসক স্বল্পতা এবং মহামারীর বিস্তৃত সময়ের কথা চিন্তা করে এখনই উচিৎ সরকারী চিকিৎসকদের সাথে বেসরকারী চিকিৎসকদের সমন্বয় করে একটি পুল তৈরি করা এবং অতি সত্বর করোনা রোগীর চিকিৎসার সাথে সাথে অন্যান্য রোগের জরুরী চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স সহ অন্যান্য লোকবল নির্ধারণ করা যারা অন্য কোন রোগে (হৃদরোগ, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, ডায়েবেটিস, ক্যান্সার ইত্যাদি) আক্রান্ত নয় এবং বয়স্ক নয়।
চিকিৎসেবা প্রদানে নির্ধারিত লোকবলকে সকল ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পরিবার থেকে পৃথক করে হাসপাতালের নিকটবর্তী স্থানে বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে করে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কেউ কমিউনিটির কারো সংস্পর্শে আসতে না পারেন।

চিকিৎসেবা প্রদানে নির্ধারিত লোকবলকে তিনটি/চারটি গ্রুপে ভাগ করতে হবে যেখানে প্রতিটা গ্রুপ পর্যায়ক্রমে ৭ দিন চিকিৎসা সেবা প্রদান করবে এবং ১৪ দিন আইসোলেশনে থাকবে যেখানে এক প্রুপের সাথে অন্য গ্রপের কোনধরনের যোগাযোগ থাকবে না! যদি এক গ্রপের মধ্যে কেউ আক্রান্ত হোন তাহলে চতুর্থ গ্রুপ বা রিজার্ভ গ্রুপ দায়িত্ব নিবে।

চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত সকলের যেহেতু পরিবার পরিজন ছেড়ে থাকবেন তাদের মনোবল ধরে রাখা এবং মনোবল বৃদ্ধিতে সকলের উৎসাহ প্রদান করতে হবে। পিপিই-র যথাযথ সরবরাহ না করতে পারার ফলে ইতিমধ্যে স্বাস্থসেবায় নিয়োজিত সকলের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম নিয়েছে। পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন পিপিই-র সরবরাহ নিশ্চিত করার সাথে প্রতিটি সরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সহ কিছু নির্ধারিত বেসরকারী হাসপাতালে কোভিড-১৯ এর পরীক্ষা সহজলভ্য করতে হবে।

উন্নত দেশসমূহের স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা যেখানে ভেঙে পড়েছে এবং হিমশিম খাচ্ছে সেখানে আমাদের মতো নিম্ন-মধ্যম আয়ের ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশের জন্য হাজারো সীমাবদ্ধতা নিয়ে এই দুর্যোগ মোকাবেলা করা যে খুব চ্যালেন্জিং এবং কষ্টসাধ্য হবে তা সহজে অনুমেয়!

আশা করা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যাক্তিগণ দূরদর্শিতার সাথে সমন্বয়হীনতা কাটিয়ে, দীর্ঘমেয়াদী সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এবং সকলের সহযোগীতায় মহামারী মোকাবেলায় কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।

ভালো থাকুক প্রাণের বাংলাদেশ !

ডা. মো. মারুফ হক খান
এমবিবিএস, এমপিএইচ, এমএসসি, পিএইচডি
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ