রাখাইনে চীনা বিনিয়োগ : গণহত্যা রায়ের প্রভাব ও বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ ১২:৪৮ অপরাহ্ণ, শুক্র, ২৪ জানুয়ারি ২০

মাসুম খলিলী :

চীন-মিয়ানমার কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭০তম বার্ষিকী উপলক্ষে শি জিনপিংয়ের মিয়ানমার সফর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। এটি মিয়ানমারে রাষ্ট্রপতি হিসেবে এবং ২০২০ সালে শি’র প্রথম বিদেশ সফর। ২০০১ সালে জিয়াং জেইমিন মিয়ানমার সফরকারী সর্বশেষ চীনা রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তখন তিনি বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক ও সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। শি’র এবারের সফরে চীন কয়েক শ’ কোটি ডলারের নতুন বিনিয়োগ চুক্তি করেছে, যার মূল ফোকাস হলো রাখাইন স্টেট। আরাকান উপকূলে কিউকফিউতে একটি বৃহদাকার গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠা এবং একটি বড় আকারের অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয় রয়েছে দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিতে।

মিয়ানমারের দুঃসময়ের বন্ধু চীন :

চীন-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। স্টেট কাউন্সিলর সু চির পিতা অং সানের গণতান্ত্রিক শাসনের পরবর্তী সময়ের প্রায় গোটা সময়জুড়ে মিয়ানমার ছিল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসনের অধীনে। বিভিন্ন জাতিগত দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে থাকা মিয়ানমার এ সময় পরিচালিত হয়েছে সামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসনের মাধ্যমে। আর এ সময়ে দেশটি সামরিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চীনের ওপর ছিল বিশেষভাবে নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা শাসকরা বিভিন্ন সময় এ ধারা থেকে মিয়ানমারকে বের করে আনার চেষ্টা করেছেন। সু চিকে মিয়ানমারের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা ছিল তারই অংশবিশেষ।

কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক-বেসামরিক শাসন কাঠামোতে চীনের যে গভীর প্রভাব রয়েছে, সে প্রভাবকে ধারণ করেই রাষ্ট্র চালানোর পথ বেছে নিতে হয়েছে সু চিকেও। ফলে সু চির গণতান্ত্রিক শাসনের পরও মিয়ানমার চীনা প্রভাব থেকে বেরিয়ে মুক্ত বৈদেশিক সম্পর্কের ধারায় যেতে পারেনি।

অং সান সু চি এবং শি জিনপিংয়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক চলাকালীন অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও বাণিজ্যের বিভিন্ন বিস্তৃত খাতে ৩৩টি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের (সিএমইসি) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কিউকফিউ স্পেশাল ইকোনমিক জোন ও গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য দুই দেশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। রাখাইন রাজ্যে কিউকফিউ বন্দরের উন্নয়ন ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতি বাড়িয়ে দেবে; যার ফলে জ্বালানি তেল আমদানিতে ভঙ্গুর মালাক্কা প্রণালীকে এড়িয়ে যেতে পারবে বেইজিং। কিউকফিউই ইতোমধ্যে চীনাদের জন্য একটি তেল ও গ্যাসের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখান থেকে মিয়ানমারে উৎপাদিত তেল-গ্যাস চীনকে সরবরাহ ও রফতানি করা হয়।

মিয়ানমার হলো চীনের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি লিঙ্ক পিন বা সংযোগ স্থাপনকারী দেশ। বিকল্প জ্বালানি রোড ছাড়াও এটি দক্ষিণ এশিয়া এবং এর বাইরে বেইজিংয়ের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের রেলপথ, মহাসড়ক, বন্দর এবং এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার অন্য পয়েন্টগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপনকারী অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের একটি সেতু।

অতীতে ও বর্তমানে মিয়ানমারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার নানা আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার বিপরীতে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে কাজ করেছে চীন। আর বিশ্বফোরামে মানবাধিকারের রেকর্ড নিয়ে ব্যাপক নিন্দার মুখোমুখি হলে মিয়ানমারকে কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে এসেছে বেইজিং। উত্তর রাখাইনে ১০ লাখেরও বেশি মুসলিম সংখ্যালঘু সদস্যকে প্রতিবেশী বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার ঘটনায় পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে চীন। বহু বছর ধরে জাতিসঙ্ঘের মতো ফোরামে এভাবে মিয়ানমারকে সুরক্ষা দেয়ার বিপরীতে দক্ষিণ চীন সাগরের ভূখণ্ড নিয়ে চীনের দাবির মতো বিষয়গুলোতে বেইজিংয়ের অবস্থানকে সমর্থন করেছে মিয়ানমার।

দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই শি জিন পিংয়ের রাষ্ট্রীয় সফরের সময় সর্বাধিক দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার বিষয় ছিল কিউকফিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) এবং গভীর সমুদ্রবন্দর। ২০০৯ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিয়ানমারে শি’র প্রথম সফরকালে নেইপিডো এ ব্যাপারে সম্মত হয়। এবারের চুক্তিতে দক্ষিণ চীন থেকে কুনমিংকে কিউকফিউয়ের সাথে উত্তর এবং মধ্য মিয়ানমারে মিউজিক এবং মান্ডালে যাওয়ার পথের পাশাপাশি একটি নতুন ইয়াঙ্গুন শহরকে যুক্ত করা হয়।

এর আগে বেইজিং সফরকালেই সু চি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকে কিউকফিউ এবং কুনমিংয়ের সংযোগ স্থাপন করে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের ব্যাপারে সম্মত হন। সু চি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চাভিলাষীভাবে পরিকল্পনা এবং চীনা বিনিয়োগ বিষয়েও আনুষ্ঠানিকভাবে আগ্রহ ব্যক্ত করেন। মিয়ানমারের সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লেইংও চীনা বিনিয়োগের কৌশলগত গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে সমালোচনার মুখে নেইপিডোকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে বেইজিং যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তাও উপলব্ধি করেন তিনি। সিনিয়র জেনারেল ২০১৯ সালের এপ্রিলে বেইজিং সফর করেন।

বিভিন্ন জাতিসত্তা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের বিভিন্ন বৈঠকে এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাথে একাধিক যুদ্ধবিরতি আলোচনায় বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার শান্তিপ্রক্রিয়ায় চীন আরো যাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে, তার জন্য জাতিগত সশস্ত্র দলগুলোকে সমর্থন করা থেকে দূরে সরে গেছে। আরাকান আর্মির মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওপর ঘন ঘন আক্রমণ এবং ব্ল্যাকমেইল করার জন্য রাজনীতিবিদদের ধরে নিতে শুরু করলে তা মিয়ানমার সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে। এরপর বেইজিং ঘোষণা করে, তারা রাখাইন রাজ্যে আরো চীনা বিনিয়োগ সমর্থন দেবে আর এখানেই কিউকফিউ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং গভীর সমুদ্রবন্দর আছে। চীনের বিপুল বিনিয়োগের অর্থ হবে এর সাথে সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য নিরাপত্তা উদ্যোগও সাথে থাকবে।

রোহিঙ্গা সঙ্কটের গভীরতা :

রোহিঙ্গা সঙ্কটের বিষয়টি নানা কারণে শুধু মিয়ানমারের একক কোনো বিষয় ছিল না। এর সাথে চীনের স্বার্থও গভীরভাবে জড়িত। এখন যেটি রাখাইন স্টেট, সেটি স্বাধীন আরাকান রাজ্যের একটি অংশ ছিল। শত শত বছর ধরে স্বাধীনভাবে টিকে থাকা এ রাজ্য বর্মি শাসকদের দ্বারা উপর্যুপরি আক্রান্ত হয়েছে; কিন্তু আরাকানের রাখাইন-রোহিঙ্গা মিলে সব সময়ই সেই আক্রমণ প্রতিহত করেছে। যদিও ব্রিটিশ-বার্মার উত্তরাধিকার হিসেবে আরাকান স্বাধীন বার্মার অংশে পরিণত হয়। তবে আরাকানের জাতিসত্তাগুলো এখনো বর্মি আধিপত্য সেভাবে মেনে নিতে পারেনি। বার্মার যেসব অঞ্চলে নৃতাত্তিক বিদ্রোহ চলে আসছে তাতে আরাকান ছিল উল্লেখযোগ্য এলাকা। কিন্তু বার্মার অন্য অনেক অঞ্চল (যেমন ওয়া) প্রায় স্বাধীনভাবে চলার মতো স্বায়ত্তশাসন পেলেও এর ব্যতিক্রম হলো আরাকান। সু চি ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই মিয়ানমারের যেসব নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সাথে অস্ত্রবিরতি চুক্তি হয়েছে অথবা শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে; তার মধ্যে আরাকানের কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনকে রাখা হয়নি।

রাখাইনকে পদানত করে রাখার জন্য মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল আরাকানের প্রধান দুই জনগোষ্ঠী রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা। সেটিকে স্থায়ী রূপ দেয়ার জন্য ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন তৈরি করে তাতে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার অস্বীকার করা হয়। অথচ বার্মা স্বাধীন হওয়ার পরও বর্মি সংসদ ও মন্ত্রিসভায় রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা ছিল। কিন্তু এরপর থেকে সেনা সরকারগুলো ক্রমাগতভাবে তাদের প্রান্তিক অবস্থানের দিকে ঠেলে দিয়ে নাগরিক অধিকারগুলো অস্বীকার করে। আর এটিই রোহিঙ্গা সঙ্কটকে আজকের এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।

চীনের সাথে কৌশলগত উন্নয়ন ও বাংলাদেশ :

শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক মিয়ানমার সফর ও ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশের ওপর বিশেষভাবে পড়বে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র কৌশলে গত এক যুগে বেশখানিকটা অস্থিরতা দেখা গেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধান অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কৌশলগত মিত্রদেশ ছিল ভারত। সে সম্পর্কে বেশখানিকটা ব্যত্যয় ঘটছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষত বিজেপি সরকারের এনআরসি ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর যেভাবে ক্রমাগত বাড়ছে, তাতে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সরকারও বেশ উদ্বিগ্ন বলে মনে হয়। গাল্ফ নিউজের সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারেও বিষয়টি ফুটে উঠেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের একাধিক মন্ত্রীর দিল্লি সফর বাতিলে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

বৃহৎ প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কে এ টানাপড়েনে বাংলাদেশ চীনের সাথে ঢাকার সম্পর্ককে আরো কাছাকাছি করছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এ অঞ্চলের বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে চীনের চুক্তি ও সমঝোতায় মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ চীনের পররাষ্ট্র কৌশলের ক্ষেত্রে বেশখানিকটা গুরুত্ব হারাচ্ছে। বেইজিং দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক কৌশলে তার নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশকে প্রকৃত স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। আর একই কারণে বাংলাদেশ বৃহৎ প্রতিবেশীর একক প্রভাব বলয়ে চলে যাক, সে ধরনের পরিস্থিতিকে রোধ করতে চায়। এ বিবেচনায় বাংলাদেশের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহায়তা নিয়ে সব সময় ঢাকার পাশে থাকে বেইজিং। তবে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় কোনো স্বার্থগত বিরোধ বৈশ্বিক ফোরামে এলে সে ক্ষেত্রে বেইজিং সরাসরি নেইপিডোকে সমর্থন করে।

অতি সম্প্রতি একজন চীনা বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপকালে তিনি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাস রাখার মতো প্রমাণ তারা ঢাকার বিভিন্ন কার্যক্রমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাচ্ছেন না। বর্তমান চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে সরাসরি বাংলাদেশের বর্তমান প্রধামন্ত্রীর কাছে নিজের আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। তখন চীনকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হলেও পরে সে অঙ্গীকার থেকে সরে আসেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এরপর চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং তাদের অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ‘রোড অ্যান্ড বেল্ট’ প্রকল্পের আঞ্চলিক সংযোগের ব্যাপারে মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়। বিসিআইএম করিডোরের ব্যাপারে বাংলাদেশের রেসপন্স এতটাই দুর্বল যে, বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক কোনো প্রকল্পই এখন আর সেভাবে এগোচ্ছে না।

এই চীনা বিশেষজ্ঞদের ধারণা হলো, চীনের দক্ষিণ এশীয় কৌশলে বাংলাদেশ এখন আর পাকিস্তান বা মিয়ানমারের মতো অতি অগ্রাধিকারপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। এমনকি নেপাল যতটা গুরুত্ব বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র কৌশলে পাচ্ছে, সেটিও থাকছে না বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। তবে বাংলাদেশ যাতে তার প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে না যায় সেজন্য চীন অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা দিয়ে যাবে। বেইজিংয়ের অগ্রাধিকারপূর্ণ রাষ্ট্রের সাথে রোহিঙ্গা বা অন্য কোনো ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্ঘাত সৃষ্টি হলে ঢাকা বেইজিংয়ের প্রত্যক্ষ সমর্থন পাবে না, বরং এর পরিবর্তে সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতা করার মতো কিছু আশ্বাস পাবে; যেটি এখন রোহিঙ্গা ইস্যুর ক্ষেত্রে পাচ্ছে। এর অর্থ হলো বাংলাদেশকে চীন কৌশলগত মিত্র হিসেবে বিবেচনা করছে না। তারা বাংলাদেশকে উন্নয়ন অংশীদার ও বাজার হিসেবে বিবেচনা করছে।

২৩ জানুয়ারির নেদারল্যান্ডের হেগস্থ আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা ও বৈষম্য অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।আদালত সর্বসম্মতভাবে বলেছেন, গণহত্যা সনদের বিধি ২ অনুযায়ী মিয়ানমারকে তার সীমানার মধ্যে রোহিঙ্গাদের হত্যা, জখম বা মানসিকভাবে আঘাত করা, পুরো জনগোষ্ঠী বা তার অংশবিশেষকে নিশ্চিহ্ন করা এবং তাদের জন্মদান বন্ধের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ থেকে অবশ্যই নিবৃত্ত থাকতে হবে। মিয়ানমারকে অবশ্যই তার সীমানার মধ্যে সেনাবাহিনী বা অন্য কোনো অনিয়মিত সশস্ত্র ইউনিট বা তাদের সমর্থনে অন্য কেউ যাতে গণহত্যা সংঘটন, গণহত্যার ষড়যন্ত্র, প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে গণহত্যার জন্য উসকানি দেওয়া, গণহত্যার চেষ্টা করা বা গণহত্যার সহযোগী হতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। গণহত্যা সনদের বিধি ২–এর আলোকে গণহত্যার অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত সব সাক্ষ্যপ্রমাণ রক্ষা এবং তার ধ্বংস সাধনের চেষ্টা প্রতিরোধ করতে হবে। আর এই আদেশ জারির দিন থেকে চার মাসের মধ্যে আদালতের আদেশ অনুযায়ী মিয়ানমার যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে, তা আদালতকে জানাতে হবে। এরপর থেকে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রতি ছয় মাস পরপর এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে।

নেদারল্যান্ডসের হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) এই আদেশ প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই আদেশ পরিস্থিতির বিকৃত চিত্র উপস্থাপন করেছে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, তাদের গঠিত ইনডিপেনডেন্ট কমিশন অব ইনকোয়ারি (আইসিওই) রাখাইনে কোনো ধরনের গণহত্যার আলামত খুঁজে পায়নি।

আন্তর্জাতিক আদালতের এই রায়ের পর ঢাকা-নেইপিডো দূরত্ব বাড়তে পারে। যদিও এই রায়ে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক বা সামরিক অবরোধ আরোপের মতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়নি বিশ্ব ফোরামকে। এ রায়ের পর রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা দেশগুলো অথবা চীন-রাশিয়া যেকোনো একটি বলয়ের বেশি ঘনিষ্ঠ হতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে বলয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া প্রয়োজন রোহিঙ্গা ইস্যুর জন্য ঠিক এর বিপরীত পক্ষের সহযোগিতা দরকার ঢাকার। আর এতে শেষ পরযন্ত বাংলাদেশ এমন এক দ্বিমুখী সঙ্কটে পড়তে পারে, যার প্রভাব রাজনীতি অর্থনীতি কূটনীতি নির্বিশেষে ব্যাপক পরিসরে দেখা যেতে পারে। এমনকি বড় আকারের ভূরাজনৈতিক বিপদের মুখেও পড়তে পারে রাষ্ট্র ও বর্তমান সরকার।

mrkmmb@gmail.com

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ