লকডাউনে পবিত্র শবে বরাত: করণীয় ও বর্জনীয়

প্রকাশিতঃ ২:০৫ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ৯ এপ্রিল ২০

ড. আব্দুল্লাহ আল মিজান

শবে বরাত বা ভাগ্য রজনী বলতে আমরা সাধারণতঃ মধ্য-শাবানের রাত বা হিজরি শাবান মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্য রাতকে বুঝি। ফার্সিতে বরাত শব্দের অর্থ হল ভাগ্য বণ্টন বা নির্ধারিত আর শব হলো রাত। এককথায় ভাগ্য রজনী বা যে রাতে ভাগ্য নির্ধারিত হয়। আরবি ভাষাভাষীগণ এ রাতকে বলেন, লাইলাতুন নিফসি মিন শা’বান বা লাইলাতুদ দু‘আ। হাদীসে আইয়ামে বীয এবং শাবান মাসের মধ্য তারিখ ১৫ শাবানের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাকে ‘শবে বরাত’ নামে আখ্যায়িত করা হয়।

আরবিতে শবে বরাত শব্দের ব্যবহার না থাকায় কুরআন ও হাদীসে এ ব্যাপারে তেমন আলোচনা পাওয়া যায় না। তবে কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক শাবান মাসের মধ্য তারিখের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।

হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস এক্ষেত্রে প্রণিধান যোগ্য; তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাত জেগে সালাত আদায় করবে আর দিবসে সিয়াম পালন করবে। কেননা আল্লাহ তা’আলা সূর্যাস্তের পর দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বলেন, আছে কি কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী! আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কোন রিজিক প্রার্থনাকারী! আমি রিজিক দান করব। আছে কি কোন বিপদে নিপতিত ব্যক্তি! আমি তাকে সুস্থ্যতা দান করব। এভাবে ফজর পর্যন্ত বলা হয়ে থাকে। (ইবনে মাজাহ ও বাইহাকী)।

অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা মধ্য শাবানের রাতে আত্মপ্রকাশ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত তাঁর সৃষ্টির সকলকে ক্ষমা করেন। (ইবনু মাজাহ, আস- সুনান ১/৪৪৫;)।

হাদীসের এসকল উদ্ধৃতি থেকে স্বাভাবিকভাবেই এ রাতের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। বিভিন্ন সহীহ হাদীসে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর এ মাসে বেশি বেশি নফল রোযা ও দান-সাদকা করার কথা জানা যায়। শাবান মাসের প্রথম থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত এবং কখনো কখনো প্রায় পুরো শাবান মাসই তিনি নফল সিয়াম পালন করতেন। এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘এ মাসে রাব্বুল আলামীনের কাছে মানুষের কর্ম উঠানো হয়। আর আমি ভালবাসি যে, আমি সিয়াম অবস্থায় আমার আমল উঠানো হোক।’ – (নাসাঈ, আস-সুনান ৪/২০১)।

অন্যদিকে সালাফি আলিমগণ এই দিনটি পালন করেন না। তাদের মতে, এইরাতে বিশেষ কোনো ইবাদাতের নির্দেশ নেই। তবে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন এই দিবস ও রজনীকে উৎসবের সাথে পালন করে থাকেন। তারা এই দিনে তাদের দ্বাদশ ইমাম মাহদির জন্মদিন পালন করেন এবং নামাজ, রোজা ও ইবাদত করে সময় কাটান। মধ্য শাবানের রাতে ইরানী শহরগুলোকে রং-বেরংয়ের আলোক সজ্জায় সাজিয়ে তোলা হয়।

বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশেও শবে বরাত নিয়ে যে কথাগুলো বেশ প্রচলিত, তা হলো, হিজরি শাবান মাসের ১৫ তারিখের শবে বরাতে আল্লাহ তা’আলা আগামী বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করেন। এ রাতে তিনি তার সৃষ্টি জগতের সকলের অতীত কর্মকাণ্ড আমলে নিয়ে আগামী বছরের রিজিক লিপিবদ্ধ করেন। এ রাতে মানুষের জন্ম-মৃত্যুর তালিকা তৈরী করা হয়। বান্দার পাপ ক্ষমা করা হয়।

এ রাতে ইবাদাত-বন্দেগী করলে অনেক বেশী সৌভাগ্য অর্জিত হয়। তাই এ রাতে গোসল করাকে সওয়াবের কাজ মনে করা হয়। আল্লাহ তাআলার কৃপা লাভের আশায় শবে বরাত উপলক্ষে প্রতিটি বাড়িতে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন স্বাদের খাবার। এসবের মধ্যে রয়েছে রুটি, বিভিন্ন রকমের হালুয়া, সুজি-পায়েশ, মিষ্টান্নও নানা স্বাদের খাবার। বিকেলে বা সন্ধ্যায় পাড়া-প্রতিবেশিদের মাঝে এসব খাবার বিতরণ ও পরিবেশন করা হয়। বিলানো হয় গরীব মিসকিনদের মাঝে।

শবে বরাত উপলক্ষে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। জাতীয় পত্রিকাগুলো এ দিন বিশেষ ক্রোড়পত্র ও সাময়িকী প্রকাশ করে। শবে বরাতের পর আসন্ন দিনটি বাংলাদেশে সাধারণ ছুটির দিন হিসবে পালিত হয়। পবিত্র কুরআন-হাদীসের কোন ভিত্তি না থাকলেও এগুলো শুধুই রেওয়াজ।

যেহেতু পবিত্র কুরআন ও হাদীসে এ রাত নিয়ে তেমন কিছু পাওয়া যায় না, তাই এই রাতকে উপলক্ষ্য করে বিশেষ খাবার তৈরি, বিতরণ বা রাতভর ইবাদাত বন্দেগীতে বিশেষ কোন ফায়দা নেই। আর ভাগ্য রজনী বলতে যা বোঝানো হয়, তা মূলত লাইলাতুল ক্বাদর। কুরআন ও হাদীসের আলোকে এই লাইলাতুল ক্বাদর হলো রমজান মাসের শেষ দশকের যেকোন বিজোড় রাত। তবে ইবাদাত-বন্দেগী বা দান-সাদকাতো যে কোন সময়েই করা যায়। রাসুলের (সা.) সুন্নাত অনুসরণ করে এ মাসে বেশী বেশী সিয়াম পালন করা যেতে পারে।

২০২০ সালের শবে বরাত পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যরকম গুরুত্ব বহন করে। যে সময় এই পবিত্র রজনী আমাদের মাঝে আসছে ঠিক সেই সময় বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানবতা করোনা বা কভিড-১৯ নামক এক মরণঘাতি ভাইরাসের শিকার। আক্রান্ত হচ্ছে লক্ষ প্রাণ। মৃত্যুর মিছিলে যোগ দিচ্ছে মানবতা। প্রাণসংহারী নভেল করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে দেশে লকডাউনের মধ্যে প্রতিটি মুসলিমের তাই উচিৎ মসজিদে মসজিদে ভিড় না করে নিজ নিজ বাসায় অবস্থান করে পবিত্র শবে বরাতের ইবাদাত-বন্দেগী চালিয়ে নেয়া। যেহেতু ইসলামে নফল ও সুন্নাত নামাজ নিজ ঘরে আদায়ের ব্যাপারে তাকিদ করা হয়েছে।

হাদিসে এসেছে, হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের উচিত নামাজের কিছু অংশ (সুন্নাত নামাজ) নিজের বাড়ির জন্য রাখা।কারণ বাড়িতে আদায় করা কিছু নামাজের মধ্যে আল্লাহ তাআলা কল্যাণ নিহিত রেখেছেন। -(মুসলিম)। অন্য একটি হাদিসে হজরত যায়েদ বিন সাবেত (রা.) বলেন, মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, হে মানবমণ্ডলী! তোমরা নিজ ঘরে নামাজ আদায় কর। যেহেতু ফরজ নামাজ ছাড়া মানুষের শ্রেষ্ঠতম নামাজ হলো নিজ ঘরে আদায় করা নামাজ। -(নাসাঈ)।

করোনার লকডাউনের মধ্যে পবিত্র শবে বরাতের এ মহিমান্বিত সময়ে নিজ ঘরে লোকচক্ষুর অন্তরালে মহান আল্লাহ তাআলার সঙ্গে বান্দার সেতুবন্ধনে সুন্নাত ও অন্যান্য নফল ইবাদাত তাই বাসায় বসে পালন করা সময়ের দাবী।

তাছাড়া করোনা মহামারির আক্রমণ থেকে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, মুসলিম উম্মাহ ও বিশ্ববাসীকে নিরাপদ রাখার বিষয়েও মানবজাতির কল্যাণ কামনায় নিজগৃহে অবস্থান করে আল্লাহর অশেষ কল্যাণ কামনা করে বিশেষ নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও অন্যান্য ধর্মীয় ইবাদত পালন করা। তবে মহামারি প্রতিরোধে নিকটাত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে বের না হওয়ায় উত্তম।

দুস্থ, গরিব প্রতিবেশী ও গরীব আত্মীয় স্বজনদের জন্য শুকনা খাবার তাদের কোথাও জড়ো না করে তাদের বাসায় বাসায় পৌঁছে দেয়া। লকডাউনে কোন কাজের ঝামেলা না থাকায় রমযানের প্রস্তুতি হিসেবে বেশি বেশি নফল সিয়াম পালন করা।

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র এ রজনীকে উছিলা করে আমাদের যাবতীয় ইবাদাত-বন্দেগী ও তাওবা-ইস্তেগফারের মাধ্যমে নিশ্চয় প্রাণঘাতি মহামারি করোনা ভাইরাস থেকে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের মানবতাকে মুক্তি দিবেন এ কামনা করছি।

লেখক: সহকারি অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ