শেখ হাসিনার ট্রেনবহরে হামলা: ৯ জনের ফাঁসি, ২৫ জনের যাবজ্জীবন

প্রকাশিতঃ ৯:১২ অপরাহ্ণ, বুধ, ৩ জুলাই ১৯

নিউজ ডেস্ক: পাবনার ঈশ্বরদীতে ১৯৯৪ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ট্রেনবহরে হামলা ও গুলি ছোড়ার ঘটনায় করা মামলায় ৯ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, ২৫ জনকে যাবজ্জীবন ও ১৩ জনকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

বুধবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে পাবনার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-১ এর বিচারক মো. রোস্তম আলী বেশির ভাগ আসামির উপস্থিতিতে দীর্ঘ ২৫ বছর পর এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের প্রত্যেককে ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে তিন বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ৩ লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দণ্ডপ্রাপ্তরা সবাই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন– তৎকালীন ছাত্রদল নেতা ও বর্তমানে ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু, ঈশ্বরদী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মকলেছুর রহমান বাবলু, ঈশ্বরদী পেীর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র শামসুল আলম, ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি বর্তমানে জেলা বিএনপির মুক্তিযুদ্ধ বিষয় সম্পাদক একেএম আখতারুজ্জামান, ঈশ্বরদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম ওরফে ভিপি শাহিন, বিএনপি নেতা শহিদুল ইসলাম অটল, বিএনপি নেতা ও ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আজিজুর রহমান শাহিন, বিএনপি নেতা মোস্তফা নুরে আলম শ্যামল ও বিএনপি নেতা মাহবুবুর রহমান পলাশ। এদের মধ্যে সাবেক পৌর মেয়র মোকলেছুর রহমান বাবলু, রেজাউল করিম শাহিন ওরফে ভিপি শাহিন ও মাহবুবুর রহমান পলাশ আপন তিন ভাই। এছাড়া মামলার প্রধান আসামি জাকারিয়া পিন্টু পলাতক রয়েছেন।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন– বিএনপি নেতা আমিনুল ইসলাম আমিন (পলাতক), আজাদ হোসেন খোকন, ইসমাইল হোসেন, মো. আলাউদ্দিন বিশ্বাস, মো. শামসুর রহমান শিমুয়া ওরফে ছামুয়া, আসিছুর রহমান ওরফে সেকম (পলাতক), আক্কেল আলী, মো. রবি (পলাতক), এনাম, আবুল কাশেম ওরফে হালট কাশেম (পলাতক), কালা বাবু (পলাতক), মামুন (পলাতক), মমিন ওরফে মামুন (পলাতক), সোলিম আহমেদ ওরফে কালা সেলিম, কলেতাল, তুহিন, শাহ আলম লিটন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, লাইজু (পলাতক), আব্দুল জব্বার, পলাশ, আব্দুল হাকিম ওরফে টেনু, আলমগীর, আবুল কালাম(পলাতক) ও একেএম ফিরোজুল ইসলাম পায়েল।

১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন– নেফাউর রহমান রাজু, আজমল হোসেন ডাবলু, আনোয়ার হোসেন জনি, রনো, বরকত আলী, চাঁদ আলী, এনামুল কবীর, মোক্তার, হাফিজুর রহমান ওরফে মুকুল, হুমায়ুন কবীর ওরফে দুলাল, জামরুল, তুহিন বিন সিদ্দীক ও ফজলুর রহমান প্রামাণিক।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম হাসনায়েন, পিপি অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান মুক্তা, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আমিনুল ইসলাম পটল, সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন, সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আহসান হাবিব হাসান, অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট ওবায়দুল হক প্রমুখ।

আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট নুরল ইসলাম গ্যাদা, অ্যাডভোকেট মাসুদ খন্দকার, অ্যাডভোকেট সনৎ কুমার সরকার, অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম সুমন, অ্যাডভোকেট শরিফুল ইসলাম শরীফ, অ্যাডভোকেট মনিরুজ্জামান মিজান, অ্যাডভোকেট শেখ নীলা খাতুন, অ্যাডভোকেট আবু খান শামীম নয়ন প্রমুখ।

পাবনা জজকোর্টের পিপি অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান মুক্তা জানান, ‘নানা কারণে, নানা কৌশলে এ মামলার বিচার বিলম্বিত করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাসুদ খন্দকার বলেন, ‘আমরা ন্যায় বিচার পাইনি। উচ্চ আদালতে আমরা আপিল করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি ঘটনায় মামলা দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। একটি সাধারণ মারামারি মামলা এবং আরেকটি বিস্ফোরক মামলা। ২০ বছর আগেই মারামারি মামলায় সকল আসামি বেকসুর খালাস পেয়েছে। যেহেতেু একই ঘটনা, একই স্থান বা একই অভিযোগ সেক্ষেত্রে ন্যায়বিচার হলে এই মামলার সকল আসামির বেকসুর খালাস হওয়া কথা। কিন্তু আমরা সেটা থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’

এ বিষয়ে পাবনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার হাবিবুর রহমান তোতা বলেন, ‘রায় নিয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। কোনো কর্মসূচিও নেই। তবে আইনি প্রক্রিয়ায় মামলার মোকাবেলা করা হবে।’

এদিকে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে করা এই মামলায় রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে দলটির নেতাকর্মী ও আইনীজীবীরা আনন্দ মিছিল বের করেন। অন্যদেক রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত বিএনপি নেতাকর্মীরা অসন্তোষ প্রকাশ করে বিক্ষোভ করেন। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও পাবনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার হাবিবুর রহমান তোতা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ মাসুম বগা, স্বেচ্ছাসেবকদলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় কর্মসূচির পালনে বহর নিয়ে ট্রেনে খুলনা থেকে সৈয়দপুর যাচ্ছিলেন। ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশনে শেখ হাসিনার পথসভা হওয়ার কথা ছিল। তার ট্রেনবহর পাবনার পাকশী পৌঁছলে সন্ত্রাসীরা দফায় দফায় ওই ট্রেন ও শেখ হাসিনার কামরা লক্ষ্য করে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে শেখ হাসিনার কামরার জানালার কাঁচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ঈশ্বরদী জংশনে দলীয় পথসভার কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করে শেখ হাসিনা দ্রুত ঈশ্বরদী ত্যাগ করেন।

এ ঘটনায় ঈশ্বরদী জিআরপি থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে তৎকালীন ছাত্রদল নেতা ও বর্তমানে ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুসহ পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ এক মাসের মধ্যে ঘটনার তদন্ত শেষ করে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। পাবনা কগনাইজিং আদালত-২ এর তৎকালীন বিচারক মো. তোফাজ্জল হোসেন স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য সিআইডিতে পাঠান।

তদন্ত শেষে তিন বছর পর ১৯৯৭ সালের ৩ এপ্রিল নতুনভাবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও ঈশ্বরদী পৌরসভার সাবেক মেয়র মকলেছুর রহমান বাবলু, ঈশ্বরদীর শীর্ষস্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ ৫২ জনকে আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হয়।

পাবনার অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত-১ এর বিচারক মো. রোস্তম আলী রায়ে বলেন, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবে।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ