‘সংগঠক, শিক্ষক অতঃপর উদ্যোক্তা’

প্রকাশিতঃ ৯:৪৩ অপরাহ্ণ, বুধ, ২২ জুলাই ২০

জুবায়ের রহমান

আবেদীন কবির। ছোটবেলা থেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সোহাগপুর গ্রামে বড় হওয়া, গ্রাম থেকেই শেষ করেছেন উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা। বর্তমানে পড়ালেখা করছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে। বিভাগ থেকে স্নাতকে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েও অন্যদের থেকে আলাদা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার পাশাপাশি নেতৃত্ব দিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠনের। যুক্ত থেকেছেন নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তা হবার। আর সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে করোনার বন্দি সময়গুলোকেই যথাযথ ব্যাবহার করছেন তিনি।

আবেদিন কবির বর্তমানে স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। এছাড়াও তিনি একাধারে শিক্ষক, সংগঠক ও উদ্যোক্তা। খন্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে কাজ করছেন সিসিএন মডেল কলেজে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র রক্তদান সংগঠন ‘বন্ধু’র বর্তমান সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একমাত্র সংগঠন ‘অর্থনীতি ক্লাব’র সেক্রেটারিও বটে। তবে সকল কিছুকে ছাপিয়ে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন উদ্যোক্তা। নিজের প্রচেষ্টায় গড়ে তুলে ‘আবেদিন ফ্রেশ ফুড’ নামক একটি প্লাটফর্ম।

স্রোতের অনুকূলে সবাই যখন ব্যস্ত চাকরির বাজারে নিজেকে প্রমাণ করতে, সেখানে ভিন্ন এক পথে হাঁটছে তরুণ আবেদিন। ভালো ছাত্র হয়েও মুখ ফিরিয়ে আছেন চাকরি থেকে। যদিও তার দাবি, ‘সমাজে উদ্যোক্তাদের চাকুরীজীবীদের থেকে নিচু করে দেখা হয়, সবার ধারণা চাকরি করতে পারলেই সব হয়ে গেল।” তবুও তিনি চাকরি থেকে বিমুখ হয়ে আছেন শুধুমাত্র জীবনে যাতে একঘেয়েমি চলে না আসে। কারণ সেখানে নেই ব্যাক্তি জীবনের স্বাধীনতা।

শিক্ষার্থী আবেদিন কবির যখন প্রথম বর্ষের ছাত্র, তখন থেকেই তিনি ব্যতিক্রম তার সহপাঠীদের থেকে। বাড়ি থেকে পাঠানো টাকা তিনি আজেবাজে খরচ না করে অল্প অল্প করে সঞ্চয় করতে শুরু করেন। সেই সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে তিনি প্রথমে শুরু করেন টি-শার্টের ব্যবসা। তবে এই ব্যবসা ছেড়ে কিছুদিন পর তিনি অর্গানিক ফুডের ব্যবসা শুরু করেন। শুরুটা হয় প্রাকৃতিকভাবে তৈরি মধু চাকের মধু বিক্রি মাধ্যমে।

ছোটবেলা থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও অর্গানিক ফুডের ব্যবসার ধারণা তার ক্ষেত্রে নতুনই বলা যায়। বাজারে যখন ভেজাল পণ্যের সয়লাব, কিটনাশক নামক বিষে তরতাজা খাদ্য বাজার, তখনই তার মনে ধরে ‘অর্গানিক ফুড’ ব্যবসার। যেখানে উদ্যোক্তা আবেদিনের প্রথম লক্ষ্য ভেজালের ভিড়ে খাঁটি পণ্যের সববরাহ নিশ্চিত করা।

(করোনাকালীন সময়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার আম বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকার মধু ও ড্রাগন ফল বিক্রি করেছেন। এছাড়াও রসমলাই, বাদাম তো আছেই।)

বর্তমানে তিনি মধু বিক্রির পাশাপাশি আম, ড্রাগনফল, বাদাম, কুমিল্লা বিখ্যাত রসমলাই বিক্রি করে আসছেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন প্রকার খাঁটি ও ভেজালমুক্ত পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে সিজন ভিত্তিক সব রকমের ফলের ব্যবসাও করে থাকেন। তিনি বলেন “এই সিজনে আমি প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ টাকার আম বিক্রি করি, যেখানে ৯৫ ভাগ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছি। এছাড়াও ৫০হাজার টাকার মধু ও ড্রাগন ফল বিক্রি করেছি।’ এর সাথে যোগ করে তিনি বললেন, “শুরুর দিকে বন্ধু আনামের সাথে টার্কি মুরগি নিয়েও কাজ করেছি।”

বিভিন্ন সময়ে বাঁধা ও হতাশা চেপে ধরলেও তিনি থেমে থাকেননি। কারণ তিনি পরিশ্রমই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। তাইতো তিনি একাধারে শিক্ষক, সংগঠক এবং উদ্যোক্তা। তবে আবেদিন সবসময় উনার মায়ের কাছ থেকে উৎসাহ পান। অনলাইন বিজনেস উনার বাবা প্রথম দিকে না বুঝলেও বর্তমানে তিনিও তার উদ্যোগের সমর্থক। তার দাবি, সত্যিকার অর্থে যারা শিক্ষিত, শুধু চাকুরির জন্য শিক্ষিত না, তারা তাকে প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বিশ্বাস করেন তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করে ফেস ভেল্যুকে কাজে লাগিয়ে বহুদূর এগিয়ে যেতে পারবেন। ইতোমধ্যে যতটুকু সফলতা তার অধিকাংশই ফেস ভেল্যুর কারণেই সবার কাছে পৌঁছতে পারছেন।

তবে নবীন উদ্যোক্তাদের প্রতি প্রত্যাশা নিয়ে বলেন, “যাদের উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছে আছে, তাদেরকে অবশ্যই পরিশ্রম করার মনমানসিকতা আর ধৈর্য থাকতে হবে। তাহলেই আশা করি অনেক দূর অগ্রসর হতে পারবে এবং উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারবে।”

দিনশেষে তিনি শুধুমাত্র একজন উদ্যোক্তাই নয়, পাশাপাশি তিনি ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে একজন যোদ্ধাও বটে। যেখানে নেই কোন অস্ত্রের ঝনঝনানি, তবু তিনি গণমানুষের পক্ষে হার না এক যোদ্ধা। নীরবে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন দেশের শত্রুদের সাথে। সবার কাছে নির্ভেজাল পণ্য পৌঁছে দিতে তিনি মরিয়া।

লেখক: শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

সময় জার্নাল/

 

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।