সজনীকান্তের জবানবন্দিতে কাজী নজরুল ইসলাম

প্রকাশিতঃ ৬:৫৫ অপরাহ্ণ, মঙ্গল, ২ জুন ২০

আবু সাঈদ নয়ন

সজনীকান্ত দাস—প্যারডি, ব্যঙ্গগুণে বাংলা সাহিত্যে খলনায়ক হিসেবে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন, সন্দেহ নেই। নজরুলের বিরোধী প্রসঙ্গের আলাপে সজনীকান্তের হাজিরা অনিবার্য—বিশেষত ‘বিদ্রোহী’র প্যারডির জন্য। যখনই খবর পেলাম সজনীকান্ত একটি আত্মজীবনী ‘আত্মস্মৃতি’ নামে প্রকাশ করেছেন তখনই মনে আকর্ষণের পুলক জেগে উঠলো। সজনীকান্ত এবং নজরুল সম্পর্কে লেখা আছে বিস্তর—অনেক তথ্যবহুল লেখাও নজরে পড়েছে, কিন্তু সজনীকান্তের ‘আত্মস্মৃতি’র উপর ভিত্তি করে কোনো লেখা অধমের ক্ষুদ্রদৃষ্টিতে পড়েনি। তাই সজনীকান্তের দুর্লভ ‘আত্মস্মৃতি’কে অবলম্বন করে এ লেখাটির আবির্ভাব। সজনীকান্ত এবং নজরুল সম্পর্কে অনেক নির্ভরযোগ্য তথ্য বিদ্যমান সত্ত্বেও এ লেখাটি কেবলই তাঁর ‘আত্মস্মৃতি’র নজরুল-বয়ান।

বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজের পক্ষে ভারতীয় সৈন্য আহ্বানের ফলে বাঙলার বহু তরুণ সাড়া দিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন—নজরুল একটি উদাহরণ। তখন সজনীকান্তও নজরুলের মতো যুদ্ধে যাবার জন্য উদ্বেল হয়েছিলেন—প্রাণে যুদ্ধের হাওয়া লেগেছিল বলে! কিন্তু নজরুলের বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মতো ট্রেন-স্টেশনে গিয়েই যুদ্ধযাত্রা খতম হলো। শোনা যাক সজনীকান্তের জবানেই: “আমরা বিনা টিকিটে ভ্রমণের জন্য ধৃত হইয়া পার্বতীপুর জংশনের ইংরেজ স্টেশন-মাস্টারের কাছে নীত হইলাম। সেই স্নেহপরায়ণ বৈদেশিক বৃদ্ধ কি বুঝিলেন জানি না, তিনি আমাদিগকে বুঝাইয়া-সুঝাইয়া নানা হিতোপদেশ দিয়া বাড়ি পাঠাইয়া দিলেন। সেদিন এই দুর্বিপাক না ঘটিলে বঙ্গভারতীর দরবারে যে আর একজন হাবিলদার কবির আবির্ভাব ঘটিত, তাহা হলফ করিয়া বলিতে পারি।” (আত্মস্মৃতি : সজনীকান্ত দাস, ৬২) —এখানে ‘হাবিলদার কবি’ বলতে যে নজরুলকেই খোঁচা দিলেন তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” প্রকাশের প্রায় দুই বছর পর সজনীকান্ত দাস প্যারডি লিখেছেন। কিন্তু নজরুলের উক্ত বিশ্ববিখ্যাত কবিতা নিয়ে সজনীকান্তের প্রাথমিক অনুভূতি, প্রতিক্রিয়া কিরূপ হয়েছিল তা সাধারণ পাঠকের একেবারেই অজানা! ‘আত্মস্মৃতি’র বদৌলতে আমরা তাঁর প্রাথমিক অনুভূতি তাঁর নিজমুখেই শুনতে পাই: “রবীন্দ্রনাথের প্রথম চিঠি পাওয়ার প্রায় দেড় মাস পূর্বে ১৩২৮ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসের ‘প্রবাসী’র “কষ্টিপাথর” বিভাগে ওই সালের কার্তিক মাসের ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” কবিতা পাঠে মনে ছন্দের দোলা ও ভাবের দ্বন্দ্ব জাগিয়াছিল। সত্যেন্দ্রনাথকে ছন্দের রাজা বলিয়া তখনই চিনিয়াছিলাম। গান্ধী-বন্দনা কবিতাটি পকেটে এবং নজরুলের “বিদ্রোহী” কবিতা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা মনে লইয়া একদিন বৈকালে মফস্বলীয় মূঢ়তাসহ সত্যেন্দ্রনাথের সম্মুখে গিয়া দাঁড়াইলাম। স্বল্পভাষী সত্যেন্দ্রনাথ চক্ষুপীড়ায় অস্বচ্ছ রূঢ় দৃষ্টি আমার প্রতি নিক্ষেপ করিলেন। ভয়ে এবং সঙ্কোচে মরীয়া হইয়া শেষ পর্যন্ত “বিদ্রোহী” সম্বন্ধে আমার বিদ্রোহ ঘোষণা করিলাম। বলিলাম, ছন্দের দোলা মনকে নাড়া দেয় বটে, কিন্তু ‘আমি’র এলোমেলো প্রশংসা-তালিকার মধ্যে ভাবের কোনও সামঞ্জস্য না পাইয়া মন পীড়িত হয় ; এ বিষয়ে আপনার মত কি? প্রশ্ন শুনিয়া প্রথমটা বোধ হয় সত্যেন্দ্রনাথ একটু বিস্মিত হইয়াছিলেন। পরে একটু মৃদু হাসি তাঁহার মুখে ফুটিয়া উঠিল। জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি বুঝি বিজ্ঞানের ছাত্র? বলিলাম, আজ্ঞে হ্যাঁ, বি.এস-সি. পরীক্ষা দিচ্ছি। বস্তুত তখন পরীক্ষা আরম্ভ হইয়াছে এবং প্র্যাক্‌টিক্যাল ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রি পরীক্ষা দেওয়াও হইয়া গিয়াছে। সত্যেন্দ্রনাথ আমার প্রশ্নের জবাবে সেদিন মোদ্দা কথাটা যাহা বলিয়াছিলেন তাহা আমি কোনদিনই ভুলিতে পারি নাই। তিনি বলিলেন, কবিতার ছন্দের দোলা যদি পাঠকের মনকে নাড়া দিয়া কোনও একটা ভাবের ইঙ্গিত দেয় তাহা হইলেই কবিতা সার্থক। “বিদ্রোহী” কবিতা কোনও ভাবের ইঙ্গিত দেয় কি না, তুমিই তাহা বলিতে পারিবে।” (প্রাগুক্ত: ১১৩) বিদ্রোহী কবিতার ভাব নিয়ে সজনীকান্তের অভিযোগ সত্যেন্দ্রনাথ আমলে নিয়ে যে উত্তর তা স্পষ্ট হলেও বিদ্রোহী সম্পর্কে সত্যেন্দ্রনাথের মত বা মন্তব্য সম্পূর্ণই অস্পষ্ট।

বিদ্রোহী কবিতার পর কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তাঁর মনে একটি বিরূপ ধারণা জন্মেছিল এবং ব্যক্তি নজরুলের ব্যাপারেও একটি কুৎসিত চিত্র অঙ্কিত হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর কুৎসিত চিত্রকল্পের ধ্বংস হলো কিভাবে তার বর্ণনা দিচ্ছেন স্বয়ং সজনীকান্ত: “ফাল্গুনী পূর্ণিমায় (১৩২৯) পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ, সন্ধ্যার দিকেই গ্রাস আরম্ভ। চন্দ্রগ্রহণের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখিবার জন্য গঙ্গার বিভিন্ন ঘাটে স্বেচ্ছাসেবক প্রয়োজন। সায়ান্স কলেজের একটা দল এই কাজে আহিরীটোলা ঘাটের ভার পাইল। মেসের বন্ধুরা প্রায় সকলেই ছিলাম। দল বাঁধিয়া সন্ধ্যার একটু আগেই আমহার্স্ট স্ট্রীট ধরিয়া ঘাটের দিকে যাইতেছি, সুকিয়া স্ট্রীট জংশন পার হইয়াই ডান দিকের একটা বাড়ির ফুটপাথে অনেক জনসমাগম দেখিলাম। চেয়ারে বেঞ্চে টুলে বসিয়া এবং দাঁড়াইয়া অনেক লোক। ঠিক রাস্তার পাশের একটা ঘরে প্রবল উৎসাহে গানবাজনা চলিতেছিল। উদাত্ত বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে কানে বাজিল—
“বল ভাই মাভৈঃ মাভৈঃ
নবযুগ ওই এল ওই
এল ওই রক্ত যুগান্তর রে—”

পুলকে বিস্ময়াভূত হইয়া দাঁড়াইয়া গেলাম। গলা বাড়াইয়া দেখিলাম, একজন ঝাঁকড়াচুল বৃষস্কন্ধ সুদর্শন যুবক কোলের উপর হারমোনিয়াম তুলিয়া বাজাইতে বাজাইতে গান গাহিতেছেন এবং তাঁহার ঠিক সম্মুখে আমাদের পথের নিত্যদৃষ্ট পথিক কবি মোহিতলাল মজুমদার আসর জাঁকাইয়া বসিয়া বেশ একটা সাফল্য-গর্বের ভঙ্গিতে এদিকে ওদিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিতেছেন। ভাবটা—দেখ, এটি আমারই কীর্তি। আশেপাশের অস্ফুট গুঞ্জনেই সঙ্গীতরত যুবকটির পরিচয় মিলিল—কাজী নজরুল ইসলাম। গৃহস্বামী মোহিতলালের গুণমুগ্ধ বন্ধু সাহিত্যরসিক কবিরাজ জীবনকালী রায় আমাদিগকেও আপ্যায়িত করিলেন। কিন্তু তখন আর সময় ছিল না। চন্দ্রে গ্রহণ লাগিল বলিয়া। আমরা শকুন্তলা-সমাগমান্তে রাজধানী-প্রত্যাগমনবাধ্য রাজা দুষ্মন্তের মত বিশেষ অনিচ্ছার সঙ্গে আহিরীটোলা ঘাটের দিকে অগ্রসর হইলাম। গান চলিতে লাগিল।

অনেক রাত্রে নয়নমনোহারী বিবিধ পুরস্কারাকীর্ণ কর্তব্য সমাপন করিয়া যখন মেসের দিকে ফিরিলাম, তখন বাসন্তী নিশীথে সদ্য-রাহুগ্রাসমুক্ত পূর্ণচন্দ্র প্রসন্ন হাস্য বিকিরণ করিতেছেন। আমরাও আনন্দে গান গাহিতে গাহিতে লঘু মেঘের মত পক্ষবিস্তার করিয়া আসিতেছিলাম। ভাঙা মানিকতলা হইতে আমহার্স্ট স্ট্রীটে ঢুকিতেই সেই সুরালঙ্কৃত বজ্রনির্ঘোষ কানে আসিল—
“নব নবীনের গাহিয়া গান
সজীব করিব মহাশ্মশান—”

জলসা তখনও শেষ হয় নাই জানিয়া নিজেদের ধন্য মনে করিলাম। পথের জনতা তখন বিরল হইয়া আসিয়াছে। মোহিতলাল বাহিরের একটা চেয়ারে আসিয়া বসিয়াছেন ; তাঁহার পাশে একজন নগ্নগাত্র পুরুষ গামছা কাঁধে বসিয়া হাস্য-পরিহাসে অবশিষ্ট কয়েকজনকে মাতাইয়া রাখিয়াছেন। ভিতরে গান চলিতেছে। নজরুল ইসলামের বোতাম-খোলা পিরহান ঘামে এবং পানের পিচে বিচিত্র হইয়া উঠিয়াছে, কিন্তু তাঁহার কলকণ্ঠের বিরাম নাই। “বিদ্রোহী”র প্রলাপ পড়িয়া যে মানুষটির কল্পনা করিয়াছিলাম, ইহার সহিত তাঁহার মিল নাই। বর্তমানের মানুষটিকে ভালবাসা যায়, সমালোচনা করা যায় না। এটনা-বিসুভিয়াসের মত সঙ্গীতগর্ভ এই পুরুষ, ইহার ক্রেটার-মুখে গানের লাভাস্রোত অবিশ্রান্ত নির্গত হইতেছে।” (প্রাগুক্ত : ১২২-১২৪)—আমরা দেখছি, সজনীকান্ত নজরুলের গান শুনে ‘পুলকে বিস্ময়াভূত’ হয়ে পদচারণা রুদ্ধ করতে বাধ্য হলেন এবং তাদের কর্মযজ্ঞের পর ফেরার সময় নজরুলের গানের আসর চলমান দেখে নিজেকে ‘ধন্য’ মনে করলেন। এবং তখন‌ও যে নজরুলের সাথে মোহিতলালের গুরু-শিষ্যের মধুর সম্পর্ক বিরাজমান ছিল তাও দৃশ্যমান। বিদ্রোহী কবিতা পড়ে হৃদমন্দিরে অঙ্কিত নজরুলের কুৎসিত চিত্রের সাথেও সত্যিকারের নজরুলের মিলন হলো না! সবচেয়ে মুগ্ধকর এবং উপভোগ্য বিষয় হচ্ছে, গায়ক নজরুলের প্রশংসা করার জন্য সজনীকান্ত ইউরোপের সর্বোচ্চ সচল আগ্নেয়গিরি ‘এটনা’ এবং অচল কিন্তু বিরাট আগ্নেয়গিরি ‘ভিসুভিয়াস’কে উপমা হিসেবে ব্যবহার করলেন; সাথে নজরুলের জবান থেকে গান বের হবার চিত্রকে তুলে ধরলেন সাড়ে সাত হাজার বছর পূর্বে আগ্নেয়গিরি থেকে সৃষ্ট যুক্তরাষ্ট্রের গভীরতম লেক ‘ক্রেটা’র সাথে। গায়ক নজরুলের এমন উচ্চস্তরের তারিফ সজনীকান্তের জবানে যারপরনাই বিস্ময়কর!

নজরুলের ‘বিদ্রোহী’র বিরুদ্ধে সজনীকান্ত সর্বপ্রথম বিদ্রোহ করলেন ‘যৌবন’ কবিতার মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কাশীতে থাকিতে একটি কবিতা লিখিয়াছিলাম, যাহার নাম দিয়াছিলাম “যৌবন” ; নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী”র প্রভাব স্পষ্ট, কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথের নির্দেশমত নানা অসম্বন্ধ উপমার মধ্যে একটা ভাবের ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা ইহাতে আছে। এই কবিতাটিই “বিদ্রোহী”র বিরুদ্ধে আমার প্রথম বিদ্রোহ হিসাবে শুধু নয়, আমার তখনকার উদ্দাম মনের পরিচয় হিসাবেও উদ্ধারের যোগ্য।” (প্রাগুক্ত : ১১৬) নজরুলের বিরুদ্ধাচারণের জন্য যে কবিতার জন্ম সে কবিতাও যে নজরুলের বিদ্রোহীর প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি, বরং স্পষ্ট তা সজনীকান্ত অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করেছেন।—এ সৎসাহসের জন্য তাঁর তারিফ না করলে কৃপণতা হবে বৈ কি!

এবার পালা বিদ্রোহীর প্যারডি রচনার! বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে সাহিত্যে কর্মজীবন স্থাপনের চিন্তায় অস্থির সজনীকান্ত কিভাবে বিদ্রোহীর প্যারডি প্রসব করলেন তার গভীর বিবরণ শুনি: “অসহায় অনিশ্চিত অবস্থার মনের মধ্যে কি বিপর্যয় ঘটিল জানি না, কলমের ডগায় ব্যঙ্গকবিতার বান ডাকিল। কামস্কাটকীয় ছন্দ রচনার ছলে কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী”কে ব্যঙ্গ করিয়া একদিন “ব্যাঙ” লিখিয়া ফেলিলাম এবং প্রত্যহই একাধিক কবিতা রচনা করিতে লাগিলাম। … একদিন প্রাতে আমার ঘরে বেশ ঘটা করিয়া বসিয়া দুই-চারিজন বন্ধুর নিকট কামস্কাটকীয় ছন্দ এবং বিশেষ জোর দিয়া “আমি ব্যাঙ” পাঠ করিতেছি, মোহিতলাল ধীরে ধীরে আমার দরজার সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। সেই “পুরূরবা”-পাঠের পর তাঁহার আর অধীনের দিকে নজর দেওয়ার অবকাশ হয় নাই—কবিতা শোনা তো দূরের কথা। পরে বুঝিতে পারিয়াছিলাম, তিনি তখন নজরুল ইসলামের প্রতি অপ্রসন্ন তাই “বিদ্রোহী”র প্যারডি কানে প্রবেশ করিতেই আত্মবিস্মৃত ভাবে আমার ঘরে চলিয়া আসিয়াছেন। সমগ্র কবিতাটি আবার তাঁহাকে শুনাইতে হইল। তিনি আমাকে আশাতীত রূপে তারিফ করিলেন এবং মেঝেয় পাতা শতরঞ্চিতে বসিয়া আমার অন্যান্য রচনাও শুনিতে চাহিলেন।” (প্রাগুক্ত : ১৩৬) —নজরুলের বিদ্রোহীর প্যারডি রচনাই যে মোহিতলালের সাথে সজনীকান্তের ঘনিষ্ঠতার প্রধান বন্ধন তা হলফ করেই বোঝা যাচ্ছে।

এবার সেই প্যারডির প্রকাশ এবং প্রকাশোত্তর দ্বন্দ্বের আবাহন শুনতে পারি: “বৎসর দেড়েক পরে সেই কথাটা (বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে অভিযোগে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের উত্তর) বলিতে গিয়া আমার “কামস্কাট্‌কীয় ছন্দে”র অন্তর্ভুক্ত করিয়া “বিদ্রোহী”র একটা মারাত্মক প্যারডি লিখিয়াছিলাম, যাহার আরম্ভটা ছিল এইরূপ—
“আমি ব্যাঙ্
লম্বা আমার ঠ্যাং
ভৈরব রভসে বরষা আসিলে ডাকি যে গ্যাঙোর গ্যাঙ্।
আমি ব্যাং….
দুইটা মাত্র ঠ্যাং।”

এই কবিতাই সাপ্তাহিক ‘শনিবারের চিঠি’র একাদশ বা পূজা-সংখ্যায় (১৯২৪, ৪ঠা অক্টোবর) প্রকাশিত হইয়া বিবিধ বিপর্যয়ের সৃষ্টি করিয়াছিল। স্বয়ং নজরুল ইসলাম ইহা তাঁহার গুরুকল্প মোহিতলাল মজুমদারের রচনা অনুমান করিয়া পরবর্তী সংখ্যা ‘কল্লোলে’ তাঁহাকে একটি কবিতায় ভীষণ আক্রমণ করেন এবং ‘শনিবারের চিঠি’র সহিত সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন মোহিতলাল ‘চিঠি’র পরবর্তী সংখ্যায় (২৫ অক্টোবর, ১৯২৪) “দ্রোণ-গুরু” শীর্ষক একটি কবিতা প্রকাশ করিয়া ‘শনিবারের চিঠি’র সহিত যুক্ত হইয়া পড়েন।” (প্রাগুক্ত : ১১৪)

মোহিতলাল এবং নজরুলের দ্বন্দ্ব সম্পর্কে আরও বিশদভাবে তুলে ধরে সজনীকান্তের বয়ান: “আমি ব্যাঙ” পড়িয়া কাজী নজরুল ইসলামের রক্তে “সর্বনাশের নেশা” জাগিয়া উঠিল, গুরুসম্বোধনে মোহিতলালকে রণে আহ্বান করিয়া তিনি লিখিলেন, “রক্ত অসির কৃষ্ণ মসী”র যে কোন যুদ্ধে তিনি গুরুর সহিত বোঝাপড়া করিতে প্রস্তুত আছেন এবং মোহিতলালকে শেষে এই বলিয়া শাসাইলেন “ভূধরপ্রমাণ উদরে তোমার এবার পড়িবে মার।” মোহিতলাল হন্তদন্ত হইয়া ‘শনিবারের চিঠি’র আপিসে ছুটিয়া আসিলেন। হাতে একটি দীর্ঘ রচনা-“দ্রোণ-গুরু” নামে একটি কবিতা। বলিলেন, নজরুল গালাগালি দিলেও ‘শনিবারের চিঠি’র সহিত সরাসরি যুক্ত হইতে তাঁহার আপত্তি আছে। তাঁহার কবিতাটি ‘শনিবারের চিঠি’র “ক্রোড়পত্র” করিয়া ছাপাইতে হইবে। আমরা তাহাতেই রাজী হইলাম। “বিশেষ বিদ্রোহ সংখ্যা” বা দ্বাদশ সংখ্যায় (৮ কার্তিক ১৩৩১) কবিতাটি মুদ্রিত হইল।” (প্রাগুক্ত : ১৬০)

শনিবারের চিঠিতে কাজী নজরুল ইসলামের নামকে ব্যঙ্গ করার ঘৃণিত ইতিহাস অনেকেরেই জানা। সজনীকান্তের জবানে এ ইতিহাসের আত্মস্বীকৃতি শোনা যাক: “প্রথম সংখ্যাতেই কাজী নজরুল ইসলামকে ব্যঙ্গ করিয়া “গাজী আব্বাস বিটকেল” এই নামে দুইটি কবিতা মুদ্রিত হইয়াছিল ; আমিও স্বাধীনভাবে “বিদ্রোহী”র কবির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়াছিলাম। মনে মনে আঁচিয়া রাখিলাম, এই বিটকেলী-পথই ‘শনিবারের চিঠি’র সহিত আমার সংযোগের পথ।” (প্রাগুক্ত : ১৪৯)

শনিবারের চিঠির ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের প্রধান লক্ষ্য যে ছিলেন নজরুল এ ব্যাপারে সন্দেহ পোষণের কারণ নেই। এ নিঃসন্দিহান ব্যাপারটি নিয়ে আরও নিশ্চিত হওয়া যায় সজনীকান্তের স্বীকৃতিতে: “রাজনীতির ক্ষেত্রে দেশবন্ধু এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলাম ও হেমেন্দ্রকুমার রায় সাপ্তাহিক ‘শনিবারের চিঠি’র প্রত্যক্ষ লক্ষ্য ছিলেন ; শেষোক্ত দুইজন বিদ্রূপে ব্যঙ্গে বারবার আক্রান্ত হইয়াছেন।” (প্রাগুক্ত : ১৮৪)

উপর্যুক্ত জবানবন্দির সমন্বয়ে সজনীকান্তের নজরুল-ভাবনা সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। ‘বিদ্রোহী’ রচয়িতা নজরুলের বিরোধী হলেও সঙ্গীতকার নজরুলের মুগ্ধ ভক্ত ছিলেন—গায়ক নজরুলের ব্যাপারে এমন উচ্চস্তরের তারিফ অনন্য। নজরুলের বিরোধীতা এবং বিদ্রোহীর প্যারডি রচনা যে পূর্বপরিকল্পিত ছিল না তা বেশ পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে। ‘শনিবারের চিঠি’র সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার মনোবাসনাও নজরুল-বিরোধিতার অন্যতম একটি কারণ বলে সজনীকান্তই স্বীকার করেছেন। সবমিলিয়ে বলা যায়, সজনীকান্তের নজরুল-মানস শৈল্পিক বা সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে একচেটিয়া বিরোধী ছিল না—নিছক সাময়িক উত্তেজনা থেকে কেবল বিরোধিতার জন্য বিরোধিতাই ছিল।

আত্মস্মৃতি : শ্রী সজনীকান্ত দাস,
প্রকাশ: অগ্ৰহায়ণ, ১৩৬১;
ডিএম লাইব্রেরী, কর্নওয়ালিশ স্ট্রীট, কলকাতা।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।