সাংবাদিক হেদায়েত উল্যাহ সীমান্তের করোনা জয়ের গল্প

প্রকাশিতঃ ৯:১০ পূর্বাহ্ণ, বুধ, ৩ জুন ২০

সময় জার্নাল প্রতিবেদক : বৈশ্বিক মহামারি করোনায় সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও এর ভয়াল থাবা চলমান রয়েছে। এতে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। এ মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হয়েছেন অগ্রগামী সৈনিক পুলিশ, সাংবাদিক, ডাক্তার। প্রতিদিনই আক্রান্ত এবং মৃত্যুর নতুন নতুন সংখ্যা যুক্ত হচ্ছে।

সম্প্রতি করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এসএটিভি’র স্টাফ রিপোটার হেদায়েত উল্যাহ সীমান্ত। গত ৬ মে করোনায় আক্রান্ত হন তিনি। করোনার ধকল কাটিয়ে আবারও অফিসে ফিরেছেন তিনি। তার সেই করোনা জয়ের গল্প তুলে ধরেছেন সময় জার্নালের কাছে।

সাংবাদিক হেদায়েত উল্যাহ সীমান্ত জানান, দীর্ঘ একমাস পর আমি ও আমার পরিবার করোনা মুক্ত হলাম। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া তিনি আমাদের হেফাজত করেছেন। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে সবার কাছ থেকে যে সহযোগিতা পেয়েছি তার জন্য আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। এ দুঃসময়ে গণমাধ্যমকর্মীসহ অনেকে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, খোঁজ খবর নিয়েছেন। অনেকেই ফোনে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত খবর নিয়েছেন। আবার অনেককে সময়মত রিপ্লাই দিতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করছি।

বিশেষ করে এসএটিভির কর্ণধার প্রিয় এমডি স্যার জনাব সালাহউদ্দিন আহমেদের অনুপ্রেরণা, দোয়া, ভালবাসা ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সংকটকালীন এ সময়ে তিনি প্রতিমুহুর্তে খোঁজ খবর নিয়েছেন। ওনার অনুপ্রেরণা আমাকে নতুন করে বাঁচতে সাহস জুগিয়েছে। পাশাপাশি এসএটিভির পরিচালক জনাব নুরে আলম রুবেল সহ অন্যান্য সহকর্মীরাও নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন, প্রেরণা জুগিয়েছেন।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত পেশাগত দায়িত্ব পালনে মাঠে কাজ করেছি। সমাজের অসঙ্গতিগুলো যেমন তুলে এনেছি, তেমনি করোনাকালে রাজধানীর চিত্র তুলে ধরেছি এসএটিভির পর্দায়। যেভাবে প্রতিনিয়ত বাইরে মানুষের মাঝে কাজ করছি তাতে যে কোন মুহুর্তে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায় ছিলাম। অবশেষে তাই হলো।

৩ মে থেকে কিছুক্ষণ পর পর জ্বর অনুভব করি। রাতে প্রচণ্ড ব্যাথাসহ কাশি শুরু হয়। এসময় সহকর্মী মিজান আহমেদের বড় ভাই ডা. খিজির আহমেদ শিশিরের পরামর্শ নিই। ডা. শিশিরও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার পরামর্শে রোজিট-৫০০, রুপা, নাপা ইত্যাদি সেবন করতে শুরু করি। পাশাপাশি সিনিয়র সাংবাদিক ইউসুফ আলীর পরামর্শে ঘরোয়া চিকিৎসা শুরু করি। তার পাঠানো গাছ-গাছালির ঔষধ গরম পানির সাথে মিশিয়ে খাওয়া শুরু করি।

৬ মে ভোরে বিএসএমএমইউয়ে গিয়ে চ্যাম্পল দিয় আসি। পরে রাত ১০ টার দিকে ফলাফল আসে করোনা পজেটিভ। সেই মুহুর্তটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। কতোটা কঠিন, তা লিখে বা বলে বোঝানো যাবে না। কেবল তারাই অনুভব করতে পারবে, যারা এ অবস্থার মুখোমুখি হন। এসময় বাসার সবাইকে অন্য রুমে পাঠিয়ে নিজে এক রুমে একা থাকতে শুরু করি। ডা. খিজিরকে বিষয়টি জানালে তিনি ভয় না পেয়ে মনোবল শক্ত রাখার পরামর্শ দিয়ে আরও কিছু ঔষধ সেবন করতে বলেন। সেগুলো মধ্যে একটি ছিল ঘুমের আর দুটি ভিটামিন। তারপর করোনা থেকে সুস্থ হতে যা যা করা দরকার চিকিৎসকদের পরামর্শে সবই করতে থাকি।

তিন দিন পর আমার স্ত্রীর উপসর্গ দেখা দেয়। তখন থেকে বাসার সবাই একই ওষধ খেতে থাকি। বেশি ভয়ে ছিলাম ৭০ বছর বয়সী মা এবং তিন বছরের কন্যাকে নিয়ে। শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহ তায়ালা সবাইকে করোনা থেকে রক্ষা করলেন। এর জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।

আমার করোনা পজেটিভের কথা শুনে এসএটিভির সমন্বয়ক শাহীন আব্দুল বারী, হেড অফ নিউজ মাহমুদ আল ফয়সাল, সিএনই জাহিদুর রহমান খান সহ সকল বিভাগের কর্মকর্তারা আমার জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েন। সবাই নিয়মিত খবর নিয়েছেন, দোয়া করেছেন। সহকর্মী এসকে সৌরভ এবং তাইফুর রহমান তুহিন বাজার করে বাসায় পৌঁছে দিয়েছেন। একজন কর্মীর এমন দুর্দিনে ছায়া হয়ে পাশে থাকার জন্য এসএটিভি পরিবারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংবাদকর্মীসহ সাংবাদিক নেতারা নিয়মিত খোঁজ খবর নিয়েছেন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরাম, ব্রডকাস্ট জানালিস্ট সেন্টার, সাংবাদিক ইউনিয়ন সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিছু সংগঠনের সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও আমার জন্য করোনা মোকাবেলায় সুরক্ষা সামগ্রীর পাশাপাশি উপহার পাঠিয়েছেন।

আমার এ অবস্থায় শত শত ফোন এবং ম্যাসেজের রিপ্লাই দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবুও যতটুকু পেরেছি সবার সাথে যোগযোগ রাখার চেষ্টা করেছি। অবশেষে দীর্ঘদিন পর মহান স্রষ্টা আমাকে মহামারীর হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন।

করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে যেসব চিকিৎসা গ্রহণ করেছি সেগুলো হলো-

চিকিৎসা- ১

  • Rrozith-500 mg (০+০+১) জ্বর থাকলে
  • Cap. D-rise 40000 (সাপ্তাহে ১টি করে ১ মাস)
  • Tab. Xinc-B (১+০+১) ১ মাস
  • Rex (০+০+১) ১০ দিন
  • Rupa (০+০+১) ১৫ দিন
  • Napa 500 mg (১+১+১) ১০ দিন
  • Tab Ivera 6 mg ৩ টা ট্যাবলেট একসাথে একবার
  • Cap. Doxin 100 mg (১+০+১) ৭ দিন।
  • Vertex Homoeo Hall এর করোনার জন্য তৈরি বিশেষ ঔষধ সেবন করেছি।

চিকিৎসা- ২

  • লবঙ্গ, দারুচিনি, আদা, রসুন, তেজপাতা, গোলমরিচ, এলাচি ইত্যাদি একসাথে পানিতে সেদ্ধ করে লাল চা -এর মত করে প্রতিদিন দুই ঘন্টা পর পর নাকে ভাপ নিয়েছি এবং পান করেছি।
  • মসলা পানির সাথে মধু মিশিয়ে দিনে দুই বার করে পান করেছি।
  • মধুর সাথে কালোজিরা মিশিয়ে দিনে দুই বার সেবন করেছি।
  • প্রতিদিন লবণ ও গরম পানি দিয়ে তিন থেকে চার বার গরগরা করেছি।
  • প্রতিদিন নিম পাতার গরম পানির ভাপ এবং তিনবার নিমপাতার পানি পান করেছি।
  • প্রতিদিন স্যাভলন সাবান এবং গরম পানি দিয়ে গোসল করেছি।

কোরআন হাদীসের আমল

  • رَبِّ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ (উচ্চারণ- রাব্বি আন্নী মাছ্ছানিয়াদ দুররু ওয়া আনতা আরহামুর রাহিমীন) প্রতিদিন এ দোয়া পড়েছি।
  • প্রতি ওয়াক্ত নামায শেষে সূরা নাস, সূরা ফালাক, সূরা ইখলাস, সূরা কাফিরূন পড়ে পুরো শরীর মাসেহ করেছি।
  • প্রতিদিন এশার নামায শেষে ৪১ বার সূরা ফাতেহা পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে তা পান করেছি।

যেসব খাবার খেয়েছি

  • নিয়মিত খাবারের সাথে শাক-সবজি, মাছ-মাংস, ডিম, দুধ।
  • প্রতিদিন ২টি মাল্টা, ২টি আপেল, ১টি পেয়ারাসহ পরিমাণমত আনারস।
  • এছাড়াও লেবুসহ ভিটামিন-সি জাতীয় সব ফল।

পরিশেষে বলতে চাই, করোনা আতঙ্কের এই সময়ে একজন আক্রান্ত রোগীর মানসিক শক্তিই জীবনে মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। করোনা কোন মরণব্যাধি নয়। কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চললে এর থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তাই মনোবল না হারিয়ে নতুন করে বাঁচতে শিখুন। এসময় আশপাশের মানুষের সাহায্য ও সহানুভূতি একান্ত প্রয়োজন। তাই আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে পাশে থাকুন। আপনার দেয়া অনুপ্রেরণা একজন আক্রান্ত ব্যাক্তিকে নতুন করে বাঁচতে শেখাবে। আসুন করোনাকে ভয় নয়, জয় করতে শিখি।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।