সেই আড্ডাবাজ ও চা প্রেমীদের আনাগোনা নেই টংগুলোতে

প্রকাশিতঃ ৬:০১ অপরাহ্ণ, রবি, ৫ এপ্রিল ২০

খাদিজা খানম

ক্যাম্পাসিয়ানদের ডিকশনারিতে ‘টং’ এক অন্যরকম ভালোলাগার শব্দ। টং ছাড়া ক্যাম্পাস- সে তো কল্পনার অতীত। পরিবার থেকে দূরে থাকা নিম্নমধ্যবিত্ত ক্যাম্পাসিয়ানদের সকালের নাস্তার একমাত্র ভরসা এই ভালোবাসার টং। কারো কারো কাছে মনের খোরাক জোগানোর জায়গা হয়ে উঠে টংগুলো। আড্ডা-মজা-খুনসুটি নিয়েই গড়ে উঠে টংগুলো।

১০১ একরের নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছেও টংগুলো এক অন্যরকম অনুভূতির জায়গা, আড্ডার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। সকাল-সন্ধ্যে যেখানে মুখরিত থাকে আড্ডাপ্রেমীদের পদচারণায়। আজ সেখানে নেই কারো আনাগোনা, নেই কোন কোলাহল, নেই কোন ভীড়। কেবলই বিরাজমান শুনশান নীরবতা। কোভিড-১৯ যেন থামিয়ে দিয়েছে সকল গুঞ্জন। নিস্তব্ধতার মাঝে ছুটির দিনগুলোতে শোনা যায় কেবল পাখির কলরব।

সারাদিনের ক্লাশের ফাঁকে ক্লান্তি কাটানোর ভরসা যেন এই টং-এর চা। চা ছাড়া যেন দিনটাই মিথ্যে অনেক নোবিপ্রবিয়ানদের। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে শুরু হতো নতুন দিনের সূচনা, এমনকি দিনটার ইতি টানতেও যে আবশ্যক ছিলো চায়ের কাপটি। ক্লাশের ফাঁকে কিংবা শেষে বসতো গল্পের আসর। গল্প হতো হাতছানি দিয়ে ডাকা কোন স্বপ্ন নিয়ে, গল্প হতো বহুদূর ছুটে চলা কোন অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিয়ে, কখনও বা জমতো জয়-পরাজয়ের গল্প, কখনওবা বেঁধে যেত কোন ইস্যু নিয়ে দ্বন্দ। সে যাই হোক না কেন দিনশেষে শেষটা সুন্দরই হতো।

নোবিপ্রবির ১০১ একরে টং মোটে পাঁচটি। যেখানে খালি গলায় কিংবা গিটারে সুরে গাওয়া হতো দু’চার লাইন, বন্ধুরা মিলে লেখা হতো নতুন কোন ছন্দ, কেউবা বাঁধতো নতুন কোন গান, সেখানে আজ নেই কোন সুরের ঐকতান।

টং-এর সে মায়ার রেষ ছুটির দিনগুলোতে ভাবিয়ে তোলে নোবিপ্রবিয়ানদের। বর্ষার দিনগুলোতে কাকভেজা অবস্থায় সবার আশ্রয় জুটতো এই টংগুলোতে। টিনের চালের বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ নাড়া দিত কবির মনকে, সৃষ্টি হতো নতুন কোন কাব্য। অনেক প্রেমিক মন আবার হারিয়ে যেত তার প্রিয়তমার কাছে, কেউবা উদাস হয়ে উলটাতো স্মৃতির ছেড়া পাতা, কেউবা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে একদৃষ্টিতে দেখতো আকাশের অদ্ভুত রঙ পাল্টানো ক্যানভাস, কেউবা মনের রং তুলিতে আঁকতো সে দৃশ্য।

বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বায়েজীদুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের প্রতিদিন ক্লাস থাকত সকাল ৯টা থেকে টানা ১টা পর্যন্ত। একজনের পর একজন টিচার আসতেই থাকত। তবুও একজন টিচার বের হলেই কাছের বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে চলে যেতাম টংয়ে। ফিরে এসে টিচারদের বকা শুনতাম কখনো এটেনডেন্স পেতাম কখনো পেতাম না। অসম্ভব রকমের মিস করছি ক্লাসের মাঝে গিয়ে এই চা খেয়ে আসাটাকে।’

এপ্লাইড কেমিস্ট্রি এন্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তূর্ণা তালুকদার কিছুটা বিরক্তির ছাপ রেখে বলেন, ‘উফ! আর ভাল্লাগেনা বাসায়। কবে যে যাবো ক্যাম্পাসে! ছুটি চেয়েছিলাম ক্লাস, সিটি, এস্যাইনমেন্ট থেকে কিছু দিনের জন্য। কিন্তু এমনটা তো চাইনি, কে জানতো এমন হবে! একেক দিন একেক টং-এ বসে আড্ডা দিতাম বন্ধুরা মিলে। শান্তিনিকেতনে বসে চা, সাথে গিটার আর গান আবার কবে পাবো জানি না। আড্ডা দিতে দিতে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়া আবার কবে পাবো তাও জানি না। খুব মিস করছি দিনগুলো আর দিনগুলোর সঙ্গীদের।’

ইনফরমেশন সায়েন্স এন্ড লাইব্রেরী ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী পার্থ প্রতিম বিশ্বাস বলেন, ‘ক্যাম্পাসে থাকাকালীন দিনগুলোতে টং-এর চায়ে চুমুক না দিয়ে দিন শুরু করার এনার্জি পেতাম না। বাস থেকে নেমেই টং এ গিয়ে বসতেই হতো, বন্ধুরা না এলে তাদের জন্য অপেক্ষা করতাম। সবাই একসাথে হলেই চায়ের কাপে গল্পের ঝড় তুলে দিতাম। এর মাঝে কখন ক্লাসের সময় হয়ে যেতো টেরই পেতাম না। আবার ক্লাসের ফাঁকে অল্প সময়ের ছুটি পেলেও টং এর দিকেই আবার সবাই একসাথে। সেখানে আবার মাঝে মাঝে যোগ হতো সিনিয়র ভাইয়া-আপুরাও। আবার কোন কারণে ক্লাস না হলে অন্যরকম আসর বসতো। সাথে থাকতো স্পেশাল রং চা। বন্ধের দিনগুলোতে ওই বিশেষ সময়ের আড্ডা খুব মিস করছি। মিস করছি বন্ধুদের হাস্যজ্বল মুখ আর খুনসুটিগুলো।’

লেখিকা: শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ