সোশ্যাল ডিসট্যান্স : আরিফ আজাদ

প্রকাশিতঃ ৯:৩৬ অপরাহ্ণ, বুধ, ১৫ এপ্রিল ২০

সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং সবসময় খারাপ নয়, বরঞ্চ ভালো। এরকম বিপদ-আপদের দিনে মুসলমানদের ক্ষেত্রে তা আরো বেশি করে প্রযোজ্য। মারইয়াম আলাইহাস সালাম সোশ্যাল ডিসট্যান্সে চলে গিয়েছিলেন। সবার থেকে আলাদা হয়ে, নিজের মেহরাবে তিনি দিনানিপাত করতে শুরু করেন। কারো সাথে দেখা নেই, কথা নেই। কিন্তু তাতে কি! আল্লাহ তো আছেন। দিনরাত তিনি আল্লাহর স্মরণে মশগুল থাকলেন। দুনিয়া থেকে যতো বেশি দূরত্ব, আল্লাহর কাছাকাছি যাওয়ার ততোবেশি সুযোগ।

সোশ্যাল ডিসট্যান্সে ছিলেন আসহাবে কাহাফের সেই যুবকেরা, যাদের বর্ণনা আমরা সূরা আল-কাহাফে দেখতে পাই। চারদিকের পাপ আর পঙ্খিলতার ছড়াছড়ি দেখে, ঈমান টিকিয়ে রাখার নিমিত্তে তারা আল্লাহর কাছে দুয়া করলেন যেন তিনি তাদের এই ফিতনা থেকে বাঁচিয়ে নেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা তাদের দুয়া শুনলেন এবং তাদের জন্য সোশ্যাল ডিসট্যান্সিংয়ের ব্যবস্থা করলেন। একটা গুহার মধ্যে, ওই সকল যুবককে তিনি ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। এমন নিশ্চিন্ত ঘুমে তারা পার করে দিলো কয়েক শতাব্দী। ফিতনার অবসান হলে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা তাদের ঘুম ভাঙালেন।

ওই যে বলছিলাম, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং সবসময় খারাপ নয়। এটা একটা সুযোগ আল্লাহর কাছাকাছি আসার। আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের এক সুন্দর পদ্ধতি। কিন্তু দেখার বিষয় হলো, এই সোশ্যাল ডিসট্যান্সিংয়ে আমরা ঠিক কিরূপ আচরণ করছি।

মারইয়াম আলাইহাস সালাম সোশ্যাল ডিসট্যান্সের সময় আল্লাহর স্মরণে মশগুল ছিলেন। ফলাফল হিশেবে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তায়ালা ফেরেশতাদের মাধ্যমে তার জন্য খাবার পাঠাতেন। ফলমূল পাঠাতেন।

আবার, আসহাবে কাহাফের যুবকেরা ফিতনা থেকে বাঁচতে, ঈমান বাঁচাতে সোশ্যাল ডিসট্যান্সে গেলো। আশ্রয় নিলো গুহার মধ্যে। আল্লাহ তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। তাদের তো আর আহারেরই দরকার পড়েনি।

কথা হচ্ছে, সোশ্যাল ডিসট্যান্স তো অবশ্যই, আপনার যাবতীয় সবকিছু যখন কেবল আল্লাহর ওপরেই সম্পূর্ণরূপে সোপর্দ করে দেন, তখন আপনার সবকিছুর দায়িত্ব আল্লাহ নিয়ে নেন। তিনি মারইয়াম আলাইহাস সালামের জন্য ফেরেশতার মাধ্যমে খাবার পাঠাতেন, আর আসহাবে কাহাফের যুবকদের জন্য এমন ব্যবস্থা করেছিলেন যে, তাদের আর আহারের দরকারই পড়তো না। রিযিকের ব্যবস্থা তিনি করবেনই। কোন উপায়ে করবেন তার ভার তার ওপরেই ছেড়ে দেন।

‘লক ডাউন’ জিনিসটাও মন্দ না, যদি তা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের নিয়ামক হয়।

ইউনুস আলাইহিস সালাম মাছের পেটে লক ডাউন অবস্থায় ছিলেন। চারপাশ বন্ধ। এমন নিশ্ছিদ্র সেই অবস্থা, যার সাথে দুনিয়ার কোন লক ডাউনেরই তুলনা চলেনা। লক ডাউনের এমন সংকটময় মূহুর্তেও, নবি ইউনুস আলাইহিস সালাম আল্লাহর স্মরণ থেকে বিন্দুমাত্র গাফেল হোন নি। মাছের পেটে, ওই দম বন্ধ করা অবস্থায় তিনি যে দুয়া করেছিলেন, তা তো কুরআনেই স্থান পেয়ে গেছে। সেই দুয়ায় আমরা দেখতে পাই আল্লাহর দয়া লাভের আকুতি, নিজের সীমাবদ্ধতা, এবং সবার আগে মহান রবের প্রশংসা। আল্লাহ নবি ইউনুস আলাইহিস সালামকে মুক্ত করেছিলেন ওই অবস্থা থেকে।

লক ডাউনে ছিলেন নবি ইউসুফ আলাইহিস সালামও। বন্দী ছিলেন মিশরের রাজার কারাগারে। সেখানেও তিনি আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হোন নি একেবারেই। পরবর্তী ফলাফল তো আমরা জানিই।

লক ডাউন কিংবা সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং- যে বিপদ কিংবা দূর্যোগই আঘাত হানুক না কেনো, আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্ক যদি মারইয়াম আলাইহাস সালাম, আসহাবে কাহাফের সেই যুবক, ইউনুস আলাইহিস সালাম আর নবি ইউসুফ আলাইহিস সালামের মতো হয়, তাহলে বিপদগুলো আপনার জন্য নিয়ামত হিশেবে পরিগণিত হবে। আপনি হয়ে উঠবেন আল্লাহর আরো প্রিয়, আরো কাছের। দূরত্ব কিংবা বন্দীত্ব মানে সবসময় একাকীত্ব আর দম আটকানো নয়, কখনো কখনো সেগুলো হয়ে উঠে মধুর এবং উপভোগ্য।

আসুন, এই সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং আর লক ডাউন অবস্থাকে উপভোগ করি। জায়নামাজে। সিজদায়। অশ্রুজলে।

লিখেছেন: আরিফ আজাদ
“তার বিখ্যাত বই – প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ সিরিজ “

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ