স্বাস্থ্যকর্মীদের মাঝে ভুয়া এন-৯৫ মাস্ক বিতরণ; দায়ী কে?

প্রকাশিতঃ ৯:১৩ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ২৩ এপ্রিল ২০

সময় জার্নাল রিপোর্ট:
ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্ধারিত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) নীতিমালা অনুযায়ী, রোগীর নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য এন-৯৫ মাস্ক পরা জরুরি। অথচ মার্চের শেষ ভাগে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে যেসব মাস্ক পাঠানো হয়, তার প্যাকেটে ‘এন-৯৫’ লেখা থাকলেও ভেতরে ছিল সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক।

গত সোমবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানহীন পিপিই ও মাস্কের বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। ওই ভিডিও কনফারেন্সে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ও সিএমএসডির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদ উলল্গাহ যুক্ত ছিলেন। মানহীন মাস্কের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী করোনা চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত মহানগর হাসপাতালের উদাহরণ তুলে ধরেন।

পরে ওইদিন দুপুরে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে অংশ নিয়ে সিএমএসডির পরিচালক বলেন, সব মান যাচাই করে পিপিই ও এন-৯৫ মাস্ক নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে কিছু গণমাধ্যম ভুল তথ্য প্রকাশ করেছে।

বুধবার দুপুরে আবারও ব্রিফিংয়ে আসেন সিএমএসডির পরিচালক। গণমাধ্যমের উদ্দেশে তিনি বলেন, গতকালও (মঙ্গলবার) একটি বিষয় আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। মহানগর হাসপাতালে গল্গাভস-সংক্রান্ত একটি বিষয়ে পরিস্কার করেছিলাম যে, গল্গাভসটি সিএমএসডির দেওয়া নয়। এরপরও দেখা যাচ্ছে, কিছু গণমাধ্যম পাতলা গল্গাভস ও ফুটওয়্যার পরিহিত কিছু বিভ্রান্তিমূলক ছবি প্রকাশ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এ সময় তিনি সিএমএসডি থেকে সরবরাহ করা কয়েকটি সামগ্রীর নমুনা প্রদর্শন করেন।

পরিচালক বলেন, সিএমএসডির বাইরেও বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালক ও কর্তৃপক্ষ নানা সামগ্রী গ্রহণ করে থাকেন। এ বিষয়ে ওইসব প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অবহিত নন। তারা ওইসব পণ্যের ছবি তুলে পাঠান। তিনি উপহার পাওয়া ওইসব পণ্যের মান দেখে ব্যবহার করার আহ্বান জানান।

পরিচালকের এই বক্তব্যের সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলমান করোনা পরিস্থিতিতে পিপিই, মাস্কসহ বিভিন্ন সামগ্রী সিএমএসডির মাধ্যমে সরকার ক্রয় করছে। এই ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সিএমএসডি পরিচালক ছাড়া অন্যরা কিছুই জানতে পারছেন না। এতে করে কোনো সামগ্রীর মূল্য কত তা জানা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছেন।

এদিকে, পিপিই ও মাস্কের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে বদলি করে দেওয়া হয়েছে খুলনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদকে। প্রথমে তাকে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এবং পরে পাবনা মানসিক হাসপাতালে বদলি করা হয়। এ ছাড়া নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের এক চিকিৎসককে শোকজ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও অন্তত ১০ জন চিকিৎসককে শোকজ করা হয়েছে।

এদিকে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪ শতাধিক স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর অন্যতম কারণ হিসেবে ভুয়া এন-৯৫ মাস্ক-সহ দুর্বলমানের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) সরবরাহ করাকে দায়ী করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।

এরই মধ্যে, কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে সরবরাহ করা ২০ হাজার ৬০০টি মাস্ক এন-৯৫ নয় স্বীকার করে একে ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ বলছে এগুলোর প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানফ্যাকচারিং।

এসব মাস্ক এখন সেগুলো ফেরত নিয়ে এ দায় থেকে মুক্তি চাইছে কোম্পানিটি।

তবে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার বলছে, জেএমআইয়ের বিষয়ে নিয়ম অনুযায়ীই ব্যবস্থা নেবে তারা।

দেশে নতুন করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর গত মার্চে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যবহারের জন্য এসব মাস্ক কেন্দ্রীয় ঔষধাগারকে (সিএমএসডি) সরবরাহ করেছিল জেএমআই।

মাস্ক কেলেঙ্কারীর রহস্য যেভাবে আলোতে এলো :

রাজধানীর মুগদা হাসপাতালেও এন-৯৫ লেখা মোড়কে সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক সরবরাহ করা হয়েছিল। স্থানীয় এমপি সাবের হোসেন চৌধুরী লিখিতভাবে বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অবহিত করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পায়। পরে এই মাস্ক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ করার কথা জানান। জেএমআই নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি একটি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছে, তারা এন-৯৫ মাস্কের বাক্সে সাধারণ মাস্ক ভুলবশত সরবরাহ করেছে। কিন্তু মূল্য নেওয়া হয়েছে সাধারণ মাস্কের। আর সিএমএসডিও এন-৯৫ মাস্কের কার্যাদেশ দেয়নি।

এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানই এন-৯৫ মাস্ক তৈরির অনুমতি পায়নি। তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে মোড়ক তৈরি করল। আবার সেই মোড়কে করে সাধারণ মাস্ক সরবরাহও করল।

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ