স্মৃতির পাতায় চাঁদপুর দ্বিমূখী উচ্চ বিদ্যালয়

প্রকাশিতঃ ৪:৪২ অপরাহ্ণ, শুক্র, ২৪ জুলাই ২০

সাদিয়া আফরোজ

সন্ধ্যা ৭টা বেজে ৩০ মিনিট। চারদিকে অনেক বৃষ্টি হচ্ছে। বারান্দায় বসে আছি আমি, সাথে এক কাপ গরম চা। চায়ের একটা মিষ্টি গন্ধ পুরো সন্ধ্যাটাকে করেছে সুন্দর। চা খেতে খেতে মনের ভেতরের ডায়েরিটাকে ওলটপালট করছি। হঠাৎ মনে পড়ে গেল সেই দিনটার কথা; যেদিন ছিল আমাদের হাই স্কুলের শেষ দিন।

সকাল ৭টা বেজে ৩০ মিনিট। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে স্কুল ড্রেস পরিধান করে বসে আছি। আকাশটা কেমন জানি কালো হয়ে আছে। মাঝে-মাঝেই মেঘের গর্জন আর আকাশে দেখা যায় সুতার মতো সাদা অংশ। সাথে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে অনেক। ভাবছিলাম আজকে তো আমার প্রাণের স্কুল “চাঁদপুর দ্বিমূখী উচ্চ বিদ্যালয়” এ আমার শেষ দিন। আমার এই স্কুলের সৌন্দর্য সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গেলে একটা পুরো খাতা‌’ই শেষ হয়ে যাবে। হাই স্কুলের শেষ দিন কেমন জানি অদ্ভুত এক আবেগের জায়গা। এত বৃষ্টি তবুও ছাতা নিয়ে ৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে গেলাম। দেখি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা এত বৃষ্টিতেও চলে এসেছে। উনারা আমাদের যেমন শাসনে রাখে ঠিক তার থেকেও বেশি ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখতেন। একটা গ্রামের মধ্যে অত্যন্ত সৌন্দর্য নিয়ে চাঁদপুর দ্বিমূখী উচ্চ বিদ্যালয় দাঁড়িয়ে আছে।

এই দ্বিমূখী নামটা নিয়ে অনেক চিন্তা করছিলাম। ভেবেছিলাম আমার স্কুলের দুইটা গেট তাই হয়তো। পরে বুঝতে পারলাম নবম ও দশম শ্রেণীতে শিক্ষার্থীদের হয় আর্টস এ পড়তে হবে, নয়তো সাইন্সে। কমার্স নেওয়ার সুযোগ নাই তাই এ দ্বিমূখী নামকরণ। আমাদের ক্লাস হবে ২ তালায় হলরুমে। ক্লাসে ঢুকব তখন বন্ধুবান্ধবরা এত খুশি হয়েছে আমায় দেখে বলে বোঝানোর ভাষা নাই আমার। সবাই এসে হাজির হয়েছে ক্লাসে। ক্লাসে ঢুকে দেখতে পাই মৌসুমী, কামরুন্নাহার, পার্বতী এক বেঞ্চে বসে। আর দেবী, মিভি আরেক বেঞ্চে বসেছিলো, সাথে আমার বসার জন্য জায়গা রেখেছে তাদের পাশে। বরাবরই বন্ধুদের সাথে একটা ভালো সম্পর্ক। ভাই-বোন বলা যায় যাকে। শাদাব, সোহেল, রমিম, শাকিল, সবাই খুব খুশি হলো এত বৃষ্টিতেও আমি এসেছি বলে। ইসমাম হোসেন মবিন যাকে বলা চলে আমার পাতানো ভাই, সে খুব শান্ত-শিষ্ট হয়ে বসে থাকতো। কেমন জানি ভেজা বেড়াল। ক্লাসের সবথেকে শান্ত ছেলে ছিল ফরহাদ, সে কথা কম বলে কিন্তু কাজে পটু। আর ক্লাসের সবথেকে চঞ্চল ছেলে দুটো শাদাব ও সোহেল। তাদের এসব চঞ্চলতার জন্য শিক্ষকরা তাদেরকে অনেক বকাও দিত। তবে ছেলেগুলো অনেকটা খোলামেলা টাইপের আর বন্ধুত্বপূর্ণ আচারণের।

স্কুলের শেষ দিন তাই ক্লাস করার চেয়েও বেশি ইচ্ছে ছিল বন্ধুবান্ধবীদের সাথে শেষ দেখা করার। এমনভাবে একসাথে বসে তো আর কোনদিন ক্লাস করা যাবে না।

ডায়েরির কয়েক পাতা ওলটপালট করেই আমি অনেক আবেগী হয়ে পড়লাম। ততক্ষণে আমার, “চা” টা খাওয়া ও শেষ। বৃষ্টি এখনো থামেনি আমার তো মনে পড়ে গেল স্কুলের বিদায়ের কথা, আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কিছু কথা। উনারা বলেছিলেন জীবনে সৎ মানুষ হতে, ভালো কিছু করে তাদের মুখ উজ্জ্বল করতে। উনারা আরো বলেছিলেন, এই দিন তোমাদের জন্য বিদায় নয়, বরং তোমাদের পথচলার শুরু”

আমি রান্না ঘর থেকে আরো এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় বসলাম। ডায়েরিটার পাতা এখনো খোলা আছে। সেদিন বান্ধবীদের জড়িয়ে আর্তনাদ এর কথা মনে পরল, ঠিক তখনই আমার জিব্বা গরম চায়ে পুড়ে গেল। তাই ডায়েরির পাতাটা বন্ধ করে পড়ার টেবিলে পড়াশোনা করতে শুরু করলাম।

আরও পড়ুন

স্বপ্নের ক্যাম্পাস
আসুন আমরা সচেতন হই, দেশের জন্য পরিবারের জন্য

কিন্তু পড়াশোনায় মনোযোগ বসানোটা এখন অনেক জটিল। ডায়েরির পাতাগুলো বন্ধ হয়েও হয়নি বন্ধ। বিদায়ের শেষ মুহূর্তের ছবিগুলো আজও ভেসে আছে দুটি চোখে। আমার স্কুলের ছোট একটি জায়গা জুড়ে শহীদ মিনারের অবস্থান। সেখানে বন্ধুবান্ধবীরা মিলে অনেক ছবি তুললাম। পুরো স্কুলের মধ্যে একটা জায়গা আমার অতি আপন। বকুলতলায় বকুল ফুল কুড়িয়ে মালা গাথার একটি অভ্যাস আমার ছিল। আবার অনেক সময় বকুল ফুলগুলো বইয়ের পাতার মধ্যে রাখতে, বকুল ফুলের ঘ্রাণে পুরো বইটি মোহিত হয়ে থাকতো। স্কুলের প্রতিটা জায়গা আমার স্মৃতির পাতায় মিশে আছে।

কিছুক্ষণের জন্য ফিরে গেলাম সেই সুন্দর দিনগুলিতে।

লেখিকা : অধ্যয়নরত, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক শিক্ষার্থী, চাঁদপুর দ্বিমূখী উচ্চ বিদ্যালয়।

সময় জার্নাল/শাহ্ আলম

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।