হুজুগে মাতাল বাঙালি!

প্রকাশিতঃ ৯:০৯ পূর্বাহ্ণ, বুধ, ২০ নভেম্বর ১৯

আফতাব হোসেন, যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি চিকিৎসক :

ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে, কানে হাত না দিয়ে চিলের পেছনে ছোটা ঠিক না। কিন্তু কে শোনে কার কথা? পৃথিবীতে বাঙালির মত হুজুগে মাতাল জাতি আর আছে বলে আমার জানা নেই।

পেঁয়াজের ঝাঁঝ কেবল কমতে শুরু করেছে, এর মধ্যেই আজ হঠাৎ গুজব উঠল, লবণের ক্রাইসিস। ব্যাস, আর যায় কোথায়? পেঁয়াজ না খেতে পেরে পানসে হয়ে যাওয়া বাঙালি এবার বির বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ল মুদি দোকানে, বাজারের থলে হাতে। পেঁয়াজের সময় যে ভুল করেছে, লবণে সে ভুল করতে নারাজ। পেঁয়াজ না খেয়ে তাও থাকা যায়, লবণ না খেয়ে থাকবে কেমন করে? প্রতি জন দুই থেকে দশ কেজি পর্যন্ত কেনা শুরু করল। একজন মুদি দোকানদার কিংবা খুচরা বিক্রেতা কত কেজি লবণই বা রাখে? বিশ কেজি? চল্লিশ কেজি? মওকা বুঝে সেও দাম হাঁকালো তিন থেকে পাঁচ গুন। ত্রিশ পঁয়ত্রিশ টাকা কেজির লবণ বিক্রি করল পঞ্চাশ থেকে দেড়শ টাকা পর্যন্ত। তাও কয়েক মিনিটে শেষ হয়ে গেল! বাঙালি ত্রিশ টাকার পেঁয়াজ তিন দিনে তিনশ টাকা হতে দেখেছে। তাই অপেক্ষাকৃত কম দামে লবণ কিনে কেউ কেউ বিজয়ীর বেশে ঘরে ফিরে গেল। আর যারা পেল না, তারা বিরস বদনে দোকানে দোকানে জটলা পাকাতে লাগল আর সরকারের চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করতে লাগল।

অথচ একবারও ভেবে দেখল না, লবণের ক্রাইসিস হবার কোনো কারণ নেই। পেঁয়াজ আমদানি করতে হত। ভারত নাহয় পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করাতে সুযোগ বুঝে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছিল, কিন্তু লবণ তো আমদানি করতে হয় না। বুলবুল লবণের মজুদ ধুয়ে দিয়েও যায়নি কিংবা লবণের ফ্যাক্টরি ভাসিয়েও নিয়ে যায়নি, তাহলে কোন অজুহাতে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াবে? কিন্তু এ সব চিন্তা না করেই বাঙালি যে যা পারে কিনে মজুদ করতে লাগল!

সন্ধ্যায় হাউজিং বাজারে গিয়েছিলাম ছোট চাচার ( কলিম বয়াতী) সাথে আড্ডা মারতে। দেখি বাজার প্রচুর লোকের সমাগম। সবার মুখে একই কথা, বাজার লবণ শূন্য! এবার বাঙালি লবণ না খেয়েই মরবে! হঠাৎ এক পুলিশের গাড়ি এসে থামল বাজারে। হুড়মুড় করে গাড়ি থেকে নামল অনেকগুলো পুলিশ, বিজিবি। আমরা একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। ভাবলাম, হয়ত কোনো সন্ত্রাসী পাকরাও করতে এসেছে। না, তারা সোজা প্রতি দোকানে যেয়ে বলল, বাজারে লবণের মজুদে কোনো ঘাটতি নেই। দোকানীরাও বেশি দাম দিয়ে লবণ কেনেনি। সুতরাং তারা যদি ক্রেতার কাছ থেকে এক পয়সাও বেশি দাম নেয়, সোজা হাজতে পুরে দেবে। ব্যাস! বীর বাঙালি কেঁচো হয়ে গেল! লবণের দামও স্বাভাবিক হয়ে গেল! পুলিশের বড় কর্তা বাজার কমিটিকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে চলে গেল।

পুলিশ চলে যাবার পরও দেখি এক দোকানের সামনে জটলা। বেশ চেঁচামেচি! কৌতুহুলি হয়ে এগিয়ে গেলাম। দেখি, এক ভদ্রমহিলা ফেসবুকে যেই দেখেছেন, লবণের দাম বাড়ছে, স্বামীর জন্য অপেক্ষা না করে, রাতেই চলে এসেছেন লবণ কিনতে এবং একাই কিনে ফেলেছেন সাত কেজি ! কিনেছেন একশ টাকা দরে। জায়গায় দাঁড়িয়ে পাঁচশ টাকা লস! তিনি এখন সে লবণ ফেরত দিতে চান। দোকানদার বলছে, মুদি জিনিষ ফেরত হয় না! মহিলার তো কাঁদো কাঁদো অবস্থা। পুরা ছয় মাসের লবণ কিনে কোথায় স্বামীর পৌরুষ নিয়ে দুটো খোঁচা দিয়ে একটু ক্রেডিট নেবেন, উলটো বাজার খরচ থেকে পাঁচশ টাকা হাওয়া! আমার আর বাকিটা দেখার রুচি হল না। নীরবে চলে এলাম।

আমার মনে হয়, আমরা বাঙালিরা হুল্লোড়ে মেতে থাকতে পছন্দ করি। হোক সেটা ঘরে কিংবা অফিসে, রাজপথে কিংবা ফেসবুকে। হোক তা নুসরাত,‌ আবরার হত্যার মত গুরুতর বিষয়ে কিংবা পেঁয়াজ লবণের মত তুচ্ছ বিষয়ে। আমার তো আরও মনে হয়, এই যে পেঁয়াজ নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড হয়ে গেল, এর দায় ফেসবুকেরও কম নয়। কদিন ধরে সবাই এত সব রকমারি পেঁয়াজ স্ট্যাটাস দেয়া শুরু করল যে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদি বিক্রেতাও জেনে গেল, পেঁয়াজ সংকটে ধুঁকছে স্বদেশ। ব্যাস, সেও স্বাভাবিক মূল্য কেনা পেঁয়াজ অধিক মুনাফার আশায় হয় মজুদ করল কিংবা চড়া দামে বিক্রি করল।

ফেসবুকে প্রায়ই দেখি, যে যা পায়, বাছ বিচার না করে, সত্যতা যাচাই না করে হরদম শেয়ার করে দেয়। কালই দেখা যাবে, আমার এই লেখা শত সহস্র লবণ পোষ্টের নীচে চাপা পড়ে গেছে ! আলেকজান্ডার আজ বেঁচে থাকলে হয়ত বলত, সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এই ফেসবুক!!!

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মতামত জানানঃ