‌‌‌‘আড়িয়াল খাঁ-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত জনপদের রাজনীতি ও আ.লীগের উত্থান’ পর্ব-৭

প্রকাশিতঃ ৮:০০ অপরাহ্ণ, মঙ্গল, ১ সেপ্টেম্বর ২০

আবদুল্লাহ আল জিয়াদ মূসা

১। ছোট কাকা (শামসুল হক ভূঁইয়া) তখন জেলে। আইয়ুব খান জননিরাপত্তা আইনে মাহতাব কাকাকে দ্বিতীয় দফায় জেলে বন্দী করে রেখেছে। আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি তখন স্কুলে বাজারে বন্দরে শুনতাম বড়রা মিছিল করছে, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, জেলের তালা ভাঙবো -শেখ মুজিবকে আনবো, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই-দিতে হবে। দিন দিন সময়টা উত্তাল হচ্ছিল। কলেজের ছুটিতে যখন রাঙা ভাই জিডি কলেজ থেকে বাড়ি আসতেন, হাজারো জমা প্রশ্নের উত্তর পেতাম। নিজেকে গর্বিত মনে করতাম আমার কাকা দেশের জন্য রাজবন্দী। রাঙা ভাইকে বলতাম, আম্মা ছোট মামাকে বলে ছোট কাকাকে ছাড়িয়ে আনতে পারেন না। রাঙা ভাই বলে যেতেন দেশের রাজনৈতিক উত্থান পতনের ইতিহাস।

১৯৬০ সালে বেসিক ডেমোক্রেট নির্বাচন হয়। বেসিক ডেমোক্রেটরা প্রথমে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। ১৯৬১ সালে নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যানদের ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের মেম্বার নির্বাচিত করলে আমার আব্বা আবদুল লতিফ ভূঁইয়া প্রথমে চেয়ারম্যান পরে ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের মেম্বার নির্বাচিত হন। ১৯৬০ সালে নির্বাচিত মৌলিক গণতন্ত্রীগণ ১৯৬২ সালে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আবদুল হামিদ এমএসসি কে এমএনএ ও প্রাদেশিক পরিষদে আফসারউদ্দিন আহমেদকে এমএলএ নির্বাচিত করেন। উল্লেখ্য যে, হাতিরদিয়ার রাজিউদ্দিন ভূঁইয়া এমএনএ পদে এবং এডভোকেট মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ ভূঁইয়া এমএলএ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।

অধ্যক্ষ আবদুল হামিদ

দ্বিতীয় দফায় ১৯৬৪ সালে আবার মৌলিক গণতন্ত্রীদের মেম্বার নির্বাচন হলে আমার ছোট কাকা সামসুল হক ভূঁইয়া উনার বড় ভাই আমার আব্বা আবদুল লতিফ ভূঁইয়াকে পরাজিত করে বিডি মেম্বার নির্বাচিত হন। লালকান্দি থেকে আমার চাচাত ভাই আফজালুল হক ছন্দু ভাই বিডি মেম্বার নির্বাচিত হন এবং নারায়ণপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হন বরকতউল্লাহ মাস্টার।

আমার মামাত ভাই আনোয়ার দাদা ( মোহাম্মদ আনোয়ার শহীদ) ইতিহাস সচেতন এবং প্রচুর বই পড়েন। আনোয়ার দাদার ভাষ্যনুযায়ী, মৌলিক গণতন্ত্রীদের ভোটে ১৯৬৫ সালে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আবদুল হামিদ এমএসসি, রাজিউদ্দিন ভূঁইয়া ও আমার মামা এডভোকেট মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ ভূঁইয়া এমএনএ পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন এবং শহিদুল্লাহ ভূঁইয়া এমএনএ নির্বাচিত হন। পাশাপাশি প্রাদেশিক পরিষদে মনোহরদী থেকে আলাউদ্দিন আহমেদ ও রায়পুরা থেকে আবদুল মোতালিব ভূঁইয়া এমএলএ নির্বাচিত হন। এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, আমার মামা এডভোকেট মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ ভূঁইয়া প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে রায়পুরা থেকে মনোনয়নের জন্য আবদুল মুতালিব ভূঁইয়াকে ও মনোহরদী থেকে আলাউদ্দিন আহমেদকে সমর্থন দিয়েছিলেন। এখানে আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৯৬৫ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে শহিদুল্লাহ ভূঁইয়া এমএনএ নির্বাচিত হলে উনার যোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করে আবদুল হামিদ এমএসসি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে রিট করেছিলেন। শহিদুল্লাহ ভূঁইয়া উনার পক্ষে ট্রাইব্যুনালে লড়ার জন্য পাকিস্থানের নামকরা আইনজীবী এ কে ব্রুোহি ( একাত্তরে পাকিস্তানের কারাগারে থাকার সময় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন) কে তিনদিনের জন্য ঢাকা নিয়ে আসেন কিন্তু জটিল নির্বাচনী মামলা হওয়ার কারণে তাঁকে সাতদিন থাকতে হয়েছিল। নামকরা আইনজীবী হিসেবে ব্রুোহিকে নিয়ে তখন নিউজ হয়েছিল। আমার স্মৃতিতে আছে, ১৯৭০ এর নির্বাচনের প্রাক্কালে মামা শহীদুল্লাহ্ ভূঁইয়া এমএনএ, পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী ও পূর্ব পাকিস্তান কনভেনশন মুসলিম লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

২। ১৯৬১ সাল থেকে আমাদের জনপদের ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন যুগপৎ আন্দোলন করতে থাকে। নরসিংদী , ভৈরব ও কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজ ভিত্তিক এবং এর বাইরে অত্র এলাকার যারা ঢাকাতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করতেন তারা সহ অঞ্চল ভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাটবাজার কেন্দ্রগুলোতে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। ৬২’র সংবিধান প্রণয়ন বিরোধী এবং হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিলের জন্য ছাত্রদের আন্দোলন উল্লেখযোগ্য ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনকে ঘিরে বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতাদের সাংগঠনিক দক্ষতানুযায়ী বিভিন্ন থানা ইউনিট ও আঞ্চলিক ইউনিট গড়ে উঠতে থাকে। ৫৬’তে পাকিস্থান সরকার যুক্তফ্রন্ট ভেঙ্গে দিলে ও আইয়ুব খানের এবডো এবং সভাপতি হিসেবে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির নিষেধ থাকার কারণে আওয়ামী লীগের তখন কোথাও তেমন সাংগঠনিক তৎপরতা নেই। বলতে গেলে কোথাও কোথাও হাতেগোনা কর্মী-সমর্থক আছে কিন্তু সাংগঠনিক কাঠামো নেই। এদিকে ৫১’তে প্রতিষ্ঠিত অলি আহাদের যুবলীগের সাংগঠনিক কাঠামো রায়পুরা উত্তরাঞ্চলে বিস্তৃত ছিল। একইভাবে ৫১’তে ছাত্র ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হলে যুবলীগের (অলি) প্রভাবে রায়পুরার উত্তরাঞ্চলে ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে উঠে। ৫৭’তে কাগমারী সম্মেলনে আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে মাওলানা ভাসানী ন্যাশন্যাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করলে রায়পুরার উত্তরাঞ্চলে যুবলীগ (অলি) নেতৃবৃন্দ ন্যাপে যোগদান করে।

এবার আসা যাক, মনোহরদী অঞ্চলের রাজনৈতিক চালচিত্র বিষয়ে। সাবেক মনোহরদীর উত্তরাঞ্চলে যুবলীগের (অলি) ব্যানারে কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা ফয়েজ আহমেদ (ফয়েজ মাস্টার), একীভূত ন্যাপের এডভোকেট জহিরুল হক (কমিউনিস্ট নেতা চন্দনের বাবা) ও ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্র ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনের নেতা আবদুর রশিদ তারা মাস্টারের প্রভাব ছিল লক্ষণীয়। এই দিকটাতে (উত্তরাঞ্চল) বিপ্লবী রহমান মাস্টারের হাতে গড়া হাররদিয়ার যুবলীগ নেতা (অলি) সিরাজুল হক এবং কাগমারী সম্মেলনের পর মোহাম্মদ দানেশ মোল্লার (দানিশ ডাক্তার) ন্যাপে যোগদানে মূলত দক্ষিণাঞ্চলে-পশ্চিমাঞ্চলেও আওয়ামী লীগের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। কাগমারী সম্মেলন পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের ভাঙনে এবং দানেশ ডাক্তারের একীভূত ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ- সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় হাতিরদিয়া অঞ্চলে অনেকটা নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়েছিল আওয়ামী লীগ।

মনোহরদীর পূর্বাঞ্চলের একীভূত ছাত্র ইউনিয়ন রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন বাজনাবরের সৈয়দ রুহুল আমীন বাচ্চু, ঢাকা কলেজের ছাত্র আবদুল্লাহ আল হারুন তাইফুর ও নরসিংদী কলেজের ছাত্র সরদার সাখাওয়াৎ হোসেন বকুল (পরবর্তীতে বিএনপি’র এমপি) প্রমুখ এবং পাটুলীর সিরাজুল হক ন্যাপের উল্লেখযোগ্য নেতা কর্মী ছিলেন তখন।

বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতাদের হাতে। সে মতে শিবপুরের একীভূত ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল মান্নান ভুঁইয়া ও পরবর্তীতে আসাদুজ্জামান ( শহীদ আসাদ), আবদুল মান্নান খান শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে বিশেষ পরিচিত হয়ে উঠেন। সমগ্র শিবপুর ও মনোহরদীর দক্ষিণাঞ্চলে ছাত্র ইউনিয়নের বড় ঘাঁটি ছিল তখন।

৩। রাজনীতির আলোচনা উঠলেই সেঝো তাইফুর ভাইকে আমার খুব অচেনা মনে হয়। তাইফুর ভাই খুব নির্মোহ পক্ষপাতিত্বহীন রাজনীতির অলি-গলি গুলো চিনিয়ে দেন। নিজে রাজনীতির যে দর্শন লালন করেন তা কোন সময় চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন না। উনি যখন বলেন তখন মনে হয় অবলীলায় ছবি এঁকে যাচ্ছেন।

পাকিস্থান সৃষ্টির ১০ বছরের মাথায় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে একের পর এক অবৈধ অগণতান্ত্রিভাবে ক্ষমতার পালাবদল এবং ক্যু মাধ্যমে আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল; সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ ঘোষণা; সরকার যুক্ত ফ্রন্টের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি; বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীদের প্রতি জেল জুলুম হুলিয়া জারী করে বেসিক ডেমোক্রেসি’র নতুন তত্ত্ব হাজির করে সারা পূর্ব-বাংলার রাজনীতির চেহারা পরিবর্তন করতে থাকে। ১৯৪৯ সালে গঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের ১২ দফা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৯৫০ এ জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হলে তালুকদার ভুঁইয়ারা যে ক্ষমতাহীন হবে ভাবতে ছিল তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ এবং নতুন ধনীক অবস্থাপন্ন কৃষক শ্রেণীর একটা বিশাল অংশ ১৯৬১ তে বিডি মেম্বার নির্বাচিত হয়ে আসে। পরবর্তীতে তাঁরাই মূলতঃ মুসলিম লীগ তথা আইয়ূব খানকে সমর্থন যোগায়। এই নবনির্বাচিত ৪০,০০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী মেম্বাররাই পরবর্তীতে পূর্ব বাংলার স্থানীয়, প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদে প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন। ফলে, ১৯৬৫ সালে আইয়ুব খানের কনভেনশন মুসলিম লীগের হাতে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা চলে যায়। রাষ্ট্রীয় শাসকের সুবিধাপ্রাপ্ত হিসেবে আমাদের জনপদেও স্থানীয় নির্বাচনে মনোহরদী, রায়পুরা ও শিবপুরে মুসলিম লীগের লোকজন অধিকাংশ ক্ষেত্রে জয়লাভ করতো।

৪। আমাদের জনপদে সার্বিক বিবেচনায়, ১৯৪৮ সালে পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ ও ১৯৪৯ আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলেও সংগঠন হিসেবে তেমন ভাবে দাঁড়ায়নি। মূলত ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে কেন্দ্রীয় ছাত্র লীগের মেধাবী ছাত্রনেতা শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরিফে প্রমুখদের হাত ধরে প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের কমিটি গঠিত হতে থাকে। তদূর্ধ্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও জিল্লুর রহমানের তত্ত্বাবধানে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজ ও ভৈরব কলেজে ছাত্রলীগ সাংগঠনিক যাত্রা আরম্ভ করে।

আমাদের বেলাব-মনোহরদীর এম আবেদ আহমেদ ১৯৬২-৬৩ সালে ইন্টার মিডিয়েট ছাত্র হিসেবেই কলেজ ছাত্ররাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের মাধ্যমে। শুনেছি উনি যখন ভর্তি হন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি তখন চোঙা ফুঁকে স্লোগান দিয়ে আইয়ুবের বিরুদ্ধে মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ১৯৬৬-৬৭ সালে ভিপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে এম আবেদ আহমেদ কলেজের ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিজ এলাকায় বিশেষ করে সালুয়া, কুলিয়ার চর অঞ্চল, বেলাব বাজার, পোড়াদিয়া বাজার কেন্দ্রিক এবং মনোহরদী থানার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চালাতে থাকেন।

পূর্বেই বলেছি, আমাদের জনপদের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের ছাত্রদের যাতায়াত ও হোস্টেল সুবিধার জন্য প্রথম পছন্দ ছিল কিশোরগঞ্জ গুরু দয়াল কলেজ তারপর ভৈরব কলেজে। সে হিসেবে দাদা ভাই ভৈরব কলেজে এবং রাঙা ভাই কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজে ভর্তি হন। রাঙা ভাইয়ের কাছ থেকে শৈশব থেকেই আবেদ ভাইয়ের নামটি আমার কাছে সুপরিচিত। রাঙা ভাই আম্মার সাথে গল্প করতেন অনলবর্ষী বক্তা আবেদ ভাই ক্রমান্বয়ে কলেজে সুপরিচিত হয়ে উঠছেন; কলেজে ছাত্র-সংসদ প্রতিষ্ঠা করা এবং কলেজে ছাত্রদের অধিকার আদায় থেকে শুরু করে শিক্ষা আন্দোলনে সরকার বিরোধী মিছিলে জড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন আবেদ ভাই; তৎকালে তিনি বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম শ্রেণি পেয়ে এই কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। আম্মা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে রাঙা ভাই বললেন, আসাদুল হক খসরু ভাইয়ের ভাই হয় ; দীঘলদী কান্দা গ্রামে বাড়ি।

৫। আম্মা বকুল ফুল ভীষণ পছন্দ করতেন। শৈশবে দলবেঁধে চলে যেতাম পোড়াদিয়া বাজারের আঁড়িয়াল খাঁ নদীর বিন্নাবাইদ-পোড়াদিয়া সাঁকো পাড় হয়ে নদীর তীরে; বকুল তলায়। বাঁশের তৈরি ঝুড়িতে বকুল ফুল কুঁড়িয়ে চলে যেতাম সবাই যেতাম বাজারের ভিতর । আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল পুরাতন বাজারের এক্কেবারে পশ্চিম-উত্তর কোণায় কাঞ্চন ভাইয়ের (তখন মেম্বার পরবর্তীতে চেয়ারম্যান এরশাদুল হক ভূঁইয়া কাঞ্চন) বাজারের ঘরের ভিতর বিশাল হোল্ডিংয়ে পাকা চুলের মহিলার ছবি। রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে হোল্ডিং এর কথাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তাম। নিচে লেখা ছিল “প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহকে হারিকেন মার্কায় ভোট দিন।“ তারও নিচে লেখা ছিল ‘গণমুক্তি পার্টি’। আইয়ুব খানে মার্কা ছিল গোলাপ ফুল। কাঞ্চন ভাই আমাদের নারায়ণপুরের কৃতিসন্তান আবদুল হামিদ এমএসসি সাহেবের ভক্ত ছিলেন এবং তখন তিনি গণমুক্তি পার্টি করতেন।

১৯৬৪ সালে পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হলেও ফাতেমা জিন্নাহর ছবি সংবলিত হোল্ডিং কাঞ্চন ভাইয়ের বাজারের ঘরে ছিল অনেক দিন। আমি বলছি ১৯৬৭-৬৮ সালের কথা । এই পোড়াদিয়া বাজারে এক হাটবারে আমি আবেদ ভাইকে দেখি । স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে স্কুলের মাঠের দিকে যাচ্ছেন। শোনতাম, ছাত্রদের নিয়ে রাজনীতির আলোচনা করবেন আবেদ ভাই।

১৯৬৩ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি বৈরুতে ইন্তেকাল করলে ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশকে সভাপতি করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে আওয়ামী লীগ আবার আত্মপ্রকাশ হয়; ১৯৬৪ সালে কপ গঠন করে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ফাতেমা জিন্নাহকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করেন। ১৯৬০ সালে বিডি মেম্বার নিয়ে যে ইলক্টোরাল কলেজ গঠিত হয় তাদের ভোটেই প্রেসিডেন্ট ইলেকশন। আইয়ুব খানের মৌলিক গনতন্ত্রী মেম্বারদের বিরুদ্ধে ফাতেমা জিন্নাহকে বিজয়ী করা অসম্ভব ব্যাপার তবু রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলো এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক গণসংযোগ চালায় এবং ঐক্যবদ্ধ হয়।

প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন দিলেও ভেতরে ভেতরে বঙ্গবন্ধু পূর্ব-বাংলার মানুষের মুক্তির পথ খুঁজে নিচ্ছিলেন ঠিকই। ১৯৬৬’র ছয় দফার প্রস্তুতি স্বরূপ ১৯৬৪ সালে রায়পুরার ঐতিহাসিক গরুরবাজারে বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের ১৯৪০ এর লাহোর প্রস্তাবকে পাশ কাটিয়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ বিভক্ত হল ঠিক কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে পূর্ব বাংলার জনগণের কোন স্বাধীনতা আসলো না। সামরিক শাসন, মৌলিক গনতন্ত্র, হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন, ১৯৬৪ সালে বিহারীদের নিরাপরাধ বাঙালীদের উপর লেলিয়ে দিয়ে দাঙ্গার নামে বাঙালী হত্যা করে ফলে পূর্ব বাংলার জনগণের বোধোদয় হল ‘এ দেশ আমার না ‘। তদুপরি মৌলিক গনতন্ত্রীদের ভোটে স্থানীয়, প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদ এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাঝে পূর্ব বাংলার জনগন দেখল তাদের ভোটের অধিকার হরন করে আইয়ুব খান ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। উপরন্ত পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তকে অরক্ষিত রেখে সকল প্রকার সামরিক শক্তিকে পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্তে সন্নিবেশিত করায় এ দেশের জনগণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে অন্য দিকে শিক্ষা দীক্ষা, সামরিক, বেসামরিক, সরকারি প্রশাসনে চাকরী এবং উন্নয়ন, শিল্প কারখানা, আমদানী -রপ্তানি আয়ে চরম বৈষম্য আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো পুনঃগঠিত হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে। এ প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে পুনঃ গঠিত করার প্রয়োজনতা বোধ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তাজউদ্দিন আহমেদ কে সাধারণ সম্পাদক এবং নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খানকে পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে সাধারণ সম্পাদক করে সারা দেশব্যাপী সাংগঠনিক শাখা করার উদ্যোগ নেয়। এ ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগ অগ্রনী ভূমিকা পালন করে।

ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে উপনিবেশে পরিনত করে। আমাদের সকল ক্ষেত্রেই বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। ফলে ১৯৬৬ সালে ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬ দফা দাবি পেশ করেন। ছয় দফা দাবির মূল উদ্দেশ্য- পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র এবং ছয় দফা ভিত্তিতে এই ফেডারেশনের প্রতিটি প্রদেশকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। পরবর্তীতে এই ৬ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন জোরদার করা হয়।

ছয় দফা’র মূল প্রতিপাদ্যঃ এক. জনসংখ্যার ভিক্তিতে সার্বজনীন প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটে সংসদীয় পদ্ধতির প্রাদেশিক ও ফেডারেল সরকার গঠন। দুই. শুধু মাত্র প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয় থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। তিন.পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু করতে হবে ; অথবা কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে দুই দেশে দুইটি রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে যাতে সম্পদ হস্তান্তর কিংবা মূলধন পাচার হতে না পারে। চার. রাজস্ব ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে প্রদেশের হাতে। তবে প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় রাজস্বের যোগান দেয়া হবে। পাঁচ. ফেডারেলের প্রতিটি প্রদেশ যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে, সেই প্রদেশের সরকার যাতে স্বীয় নিয়ণ্ত্রনাধীনে তার পৃথক হিসাব রাখতে পারে, সংবিধানে সেরূপ বিধান থাকতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে, সংবিধান নির্দেশিত বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত অনুপাতের ভিত্তিতে প্রদেশ থেকে তা আদায় করা হবে।

ছয়. ফলপ্রসূভাবে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার কাজে সাহায্যের জন্য প্রদেশগুলোকে মিলিশিয়া বা আধা-সামরিক বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে। বঙ্গবন্ধু ছয় দফা জনগণের কাছে তুলে ধরে এবং জনগণের প্রাণের দাবিতে পরিণত করার জন্য ছাত্র লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ প্রদান করেন । মূলত ১৯৬৬ সালে আমাদের জনপদের একটা মাইলস্টোন ছাত্র লীগের রাজিউদ্দীন আহমেদ রাজু ভাই জগন্নাথ কলেজে ও কিশোরগঞ্জ জিডি কলেজে এম আবেদ আহমেদ আবেদ ভাই ভিপি নির্বাচিত হওয়া। কিন্তু রাজু ভাই কেন্দ্রের নির্দেশে জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) ও পুরাতন ঢাকায় ছাত্রলীগ ও আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত করতে থাকেন। আমাদের জনপদে জিডি কলেজের ভিপি হিসেবে ছাত্রলীগ তথা আওয়ামী লীগকে আন্দোলন সংগ্রামে সংগঠিত করার জন্য আবেদ ভাইয়ের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তুখোড় বক্তা হিসেবে ছয় দফায় পূর্ব বাংলার জনগণের মুক্তির সনদ হিসেবে গ্রহণ করার যুক্তি বিশ্লেষণ নিয়ে আবেদ ভাই কিশোরগঞ্জ মহকুমা তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবার পাশাপাশি সাবেক মনোহরদী থানা, পোড়াদিয়া ও বেলাব অঞ্চলে যুগপৎ সংগঠন ও আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত করতে থাকেন।

তৎকালীন সময়ে মনোহরদীর পূর্বাঞ্চলের গোতাশিয়ার নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন (এডভোকেট বর্তমান এমপি ও শিল্পমন্ত্রী) ঢাকা কেন্দ্রীক ছাত্রলীগ রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। এছাড়া ছাত্রলীগ রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন মনোহরদী উত্তরাঞ্চলের জিডি কলেজের ছাত্র ফজলুর রহমান ফজলু ভাই (এডভোকেট, সভাপতি ),নজরুল ইসলাম নজরুল ভাই (সাবেক ভিপি কটিয়াদী কলেজ), আবদুল হেকিম (চেয়ারম্যান) বড়চাপা’র নুরুল ইসলাম (আততায়ীর গুলিতে নিহত চেয়ারম্যান), সৈয়দ আবদুল হাদী( এডভোকেট), বাজনাব এর সালাহউদ্দিন (চেয়ারম্যান) পোড়াদিয়া অঞ্চলে দিঘলদী কান্দার শরিয়ত ভেস্তী, ভাওয়ালের চরের আলাউদ্দিন মৃধা, বিন্নাবাইদের আবদুল ওয়াহাব (ওয়াহাব মৌলভী) বিন্নাবাইদ হাই স্কুলের ছাত্র গোলাম মুহাম্মদ রতন(রতন মামা), জসিমউদদীন ভাই (কাঞ্চন চেয়ারম্যানের ছোট ভাই) লুৎফর রহমান কাঞ্চন ভাই প্রমুখ। বেলাব অঞ্চলে কলেজ ছাত্র সফিউল্লাহ আবু ভূঁইয়া, নুরুজ্জামান খান বাচ্চু ( বাচ্চু ভাই), ইখতিয়ারউদ্দিন খান ( ইখতু মেম্বার) চরউজিলাব গ্রামের আবদুল মান্নান ভাই, নীলক্ষীয়ার বজলুর রহমান ( বজলু মাস্টার) , ভাটেরচর গ্রামের আবু সাঈদ চৌধুরী প্রমুখ ছাত্র লীগ নেতৃবৃন্দ ছয় দফা আন্দোলনকে সংগঠিত করতে সচেষ্ট থাকেন।

আমার জন্ম ষাটের দশকে। ষাটের দশকেই পাকিস্থানী উপনিবেশ থেকে শিকল ছিঁড়ে মুক্তির ঝাণ্ডা উড়াতে একদল তরুণ ছাত্র জীবন বাজী রেখে নাওয়া খাওয়া ভুলে রাতকে দিন করে সংগঠনের কাজ চালিয়ে যেতেন। উনাদের সাথে রাজনীতি সমাজনীতি নিয়ে আলাপ আলোচনায় মশগুল থাকা আমার অতীব পছন্দের বিষয়। আমার এ পছন্দের তালিকায় অন্যতম এম আবেদ আহমেদ, আবেদ ভাই। আবেদ ভাই বলতেন, ছয় দফাটা প্রাণের দাবি হয়ে দাঁড়াল। ভিপি নির্বাচিত হওয়ায় আরও দায়িত্ব বেড়ে গেল। কলেজে ত ছাত্র আছে সংগঠন আছে তাও মোনায়েম খানের নিজ মহকুমা হওয়ায় মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন এনএসএফের সাথে প্রায়ই দ্বন্দ্ব বিবাদ লেগেই থাকত। জীবন টা ছিল হুমকির মুখে। আবার মনোহরদী নিজের থানা, পোড়াদিয়া বেলাব নিজের এলাকা সেখানে ও সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে লাগলাম। বড় কঠিন সময়, সমর্থক আছে, কর্মী আছে কিন্তু সংগঠন নেই।অন্যদিকে দ্বিতীয় দফায় বেসিক ডেমোক্র্যাট নির্বাচনের ফলে স্থানীয় সকল পদে অবস্থাপ্নন মোড়ল মাতাব্বর শ্রেণী ও উঠতি ব্যাবসায়িরা নির্বাচিত হয়ে মুসলিম লীগ তথা আইয়ুব – মোনায়েম খানের শক্তিশালী বলয় তৈরি করে । একটা কঠিন সময়ের মধ্যে ছাত্রদের দ্রোহকে সাথে নিয়ে সায়ত্বশাসনের দাবি নিয়ে আমরা সংগঠিত হতে থাকি।

লেখক : সমাজসেবক

সময় জার্নাল/রায়হান তন্ময়

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।