‌‌‌‘আড়িয়াল খাঁ-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত জনপদের রাজনীতি ও আ.লীগের উত্থান’ পর্ব-৮

প্রকাশিতঃ ৭:০৭ অপরাহ্ণ, বৃহঃ, ১০ সেপ্টেম্বর ২০

আবদুল্লাহ আল জিয়াদ মূসা

আর্থ-সামাজিক কারণে আমাদের জনপদের অন্যান্য এলাকা থেকে রায়পুরা থানার উত্তারাঞ্চল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ছিল অগ্রসর। বিশেষ করে নীল বিদ্রোহ, স্বদেশী আন্দোলন, ইজারাপ্রথা বিরোধী আন্দোলন, ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা ও অধিকার সচেতন করে তোলে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য বৃটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের অভয়ারণ্য ছিল রায়পুরা থানা। তাছাড়া রায়পুরা থানা ভূ-প্রাকৃতিক কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা মেঘনার চর , আড়িয়াল খাঁ নদীর পশ্চিম পাড়ে পাহাড়ি এলাকা এবং রায়পুরা থানার সমগ্র উত্তারাঞ্চল ব্রম্মপুত্রের পলল ভূমি হওয়ার কারণে কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে স্বাবলম্বী মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অধিকতর সচেতন ছিল।

রায়পুরা থানার বুক চিড়ে এঁকে বেঁকে রেললাইন চলে গিয়েছে, এছাড়া এ থানার চারিদিক ঘিরে আছে ব্রম্মপুত্র -আড়িয়াল খাঁ- মেঘনা ও পাহাড়ি নদী যাতে নদী পথে সহজ যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং গ্রামে গ্রামে মেঠোপথে পাহাড়ি এলাকা ও পলল এলাকায় সড়ক পথে যোগাযোগের ব্যবস্থা চারশত বছর আগে থেকেই গড়ে উঠে উত্তরাঞ্চলে ফলে সামগ্রিকভাবে স্থানীয় সচেতন মানুষদের ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সম্পৃক্ত থেকে আত্মগোপনে থাকার জন্য আদর্শ স্থান ছিল রায়পুরা এলাকা। পোড় খাওয়া সশস্ত্র বিপ্লবীদের সংস্পর্শে এসে স্থানীয় রাজনৈতিক সচেতন মানুষ যে বিপ্লবী রাজনৈতিক ধারা তৈরি করে তার পথ ধরেই পরবর্তীতে রায়পুরায় কমিউনিস্ট আন্দোলন , অসাম্প্রদায়িক চেতনায় যুবলীগ ও পূর্ব পাকিস্থান ছাত্র ইউনিয়ন গঠন এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন বিনির্মাণের জন্য কৃষকদের সংগঠিত করে কৃষক সমিতির পথ চলা। ব্রিটিশ ভারতে স্বদেশী আন্দোলন, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, খেলাফত আন্দোলন, অনুশীলন ও যুগান্তর দলের পদচারনায় মুখরিত রায়পুরা অঞ্চলে পাকিস্থানি শাসকদের শোষণ , অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ধর্মভিক্তিক পাকিস্থান রাষ্ট্র তৈরি করার হীন প্রচেস্টার করার কারণে সৃষ্টিলগ্ন থেকে রায়পুরা থানায় স্বদেশী, যুগান্তর, অনুশীলন ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের বাম ধারার রাজনীতি বিকশিত হতে থাকে।

আমাদের শৈশব কৈশোর ছিল রূপকথার মত। ছোটদের প্রতি খুব স্নেহপরায়ণ ছোট কাকার ( মাহতাব কাকা ওরফে কমরেড সামসুল হক ভূঁইয়া ) বিপ্লবী হয়ে উঠার কথা শুনতাম আমরা গোল করে বসে । ছোট কাকা বলতেন , সেই ১৯৪১ সালের কথা কাকা তখন স্কুলে পড়েন, রায়পুরায় হিন্দু-মুসলমানের অনেক বড় দাঙ্গা হয়েছিল। এত বড় দাঙ্গা আর আমাদের এলাকায় হয় নাই , প্রায় ৬০/৭০ টা গ্রাম ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। হিন্দুদের শত শত বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছিল দাঙ্গাকারীরা। এই দাঙ্গার জন্য কলকাতা থেকে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী রায়পুরার গরুর বাজারে বিশাল জনসভা করে এই দাঙ্গা বন্ধ করেন। তারপর কাকা বলেন, আমরা মিয়া ভাইয়ের (আমার আব্বা আবদুল লতিফ ভূঁইয়া) পিছনে পিছনে শ্লোগান দিয়েছি , ” হাতে বিড়ি মুমে পান , লড়কে লেঙ্গে পাকিস্থান “। তারপর ২৯৪৭ এ পাকিস্থান হলে দেশটারে শাসকরা ইসলামী রাষ্ট্র বানাতে চাইল। খাজা নাজিমদ্দিনের শাসনামলে আবার দাঙ্গাকারীরা হত্যাযজ্ঞ চালালো, ১৯৫০ সালে দৌলতকান্দি ও ভৈরব ষ্টেশনে হিন্দু মানুষ খুঁজে খুঁজে জবাই করল আবার ট্রেন যখন চলতে লাগলো চলন্ত ট্রেন থেকে অনেককে বাইরে ছুঁড়ে ফেল দিল। আমি জিজ্ঞেস করতাম , পুতু বাচ্চাদেরকেও কি ছুঁড়ে ফেলে দিত? (ছোট কাকাকে আমি পুতু ডাকতাম)। ছোট কাকা বলতেন, বাচ্চা , নারী , পুরুষ সকলকেই; কি হৃদয়বিদারক ঘটনা। চোখের কোনে অজান্তেই পানি জমা হত। সমসাময়িক সময়েই কাকা সৃষ্টিধর খলিফা , রমানন্দ সূত্রধরের মাধ্যমে পরিচিত হন ইলামিত্রের স্বামী রমেন মিত্র , সুনীল রায় প্রমুখের সাথে । উনি বলতে থাকেন রহমান মাস্টার (বিপ্লবী রহমান মাস্টার), আমি, ফয়েজ মাস্টারসহ যোগাযোগ করি অখিল দাস, ধরণী বাবু প্রমুখের সাথে। আমরা গোপনে গড়ে তুলি কমিউনিস্ট সংগঠন । ১৯৫১ সালে রহমান মাস্টারের নেতৃত্বে আমাদের গ্রামেই ( ভাটেরচর) যুবলীগ গঠন করি। প্রথমে যুবলীগের মাধ্যমে পরবর্তীতে একীভূত ন্যাপের ব্যানারে পাকিশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকলে আবদুল হাই ( কৃষক সমিতি ) আমাদের সাথে যোগ দিলে আরও সুসংহত হ্ই আমরা । পূর্ব পাকিস্থান ছাত্র ইউনিয়নের শাখা গড়ে তুলি স্থানে স্থানে। উত্তর রায়পুরায় জনগণের সংগঠন হিসেবে সকল ফ্রন্টে আমাদের অবস্থা ও জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। এভাবেই এগিয়ে যায় আমাদের জনপদের বাম ধারার রাজনীতি।

আমাদের প্রিয় মস্তু ভাই (মুক্তিযোদ্ধা আজিমউদ্দিন) স্কুল জীবন থেকেই ছোট কাকার সংস্পর্শে এসে স্কুল জীবন থেকেই সাম্যবাদী আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন ফলে গ্রাজুয়েশন করেও চাকরি করতে না যেয়ে গ্রামের বাড়ি ভাটেরচরে স্থায়ীভাবে থেকে যান। তিনি বর্তমান নরসিংদী জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি আপাতমস্তক একজন কৃষক মস্তু ভাইয়ের স্মৃতিতে উজ্জ্বল সে সময়ের রাজনৈতিক আবহ। উনি যখন স্কুলের ছাত্র সেই ১৯৬৪ সালের কথা রায়পুরার ঐতিহাসিক গরুর বাজারে ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী মতিয়া চৌধুরীর জনসভা হয়েছিল। সে জনসভায় উনারা দল বেঁধে গিয়েছিলেন। তারপর ১৯৬৬ সালে জঙ্গী শিবপুরে পূর্ব পাকিস্থান কৃষক সমিতির জাতীয় সন্মেলন হয়েছিল । চারিদিকে সাজ সাজ রব ছাত্র ইউনিয়ন নেতা সাহাবউদ্দীন মাস্টার, আজিজ মাস্টার, মজিদ মাস্টার, মতি মাস্টার, আমি ( মস্তু ভাই), সামসুল হক ( দড়িকান্দি) প্রমুখ কাকামনিদের ( সামসুল হক ভূঁইয়া) সাথে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাই। ঐ সন্মেলনে এসেছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী , অধ্যাপক মজাফফর আহমেদ ও মতিয়া চৌধুরী প্রমুখ। এই কৃষক সমিতির এই জাতীয় সন্মেলনে খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন ফজলুল হক খন্দকার ।

৬০ দশকে সারা পৃথিবীতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তার প্রভাব নিখিল পাকিস্তান ন্যাপ এর উপরও পড়ে। ফলে ১৯৬৭ সালের দিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রশ্নে ন্যাপ চীনপন্থী ও মস্কোপন্থী এ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। চীনপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন মওলানা ভাসানী এবং মস্কোপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন সীমান্ত প্রদেশের খান আবদুল ওয়ালী খান। পূর্ব পাকিস্তান ওয়ালী ন্যাপের সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। এ অংশ মোজাফফর ন্যাপ নামেও পরিচিত হয়। একইভাবে কৃষক সমিতিও দুই ভাগে বিভক্ত হয় । ফজলুল হক খন্দকার ১৯৬৭ – ৬৮ সালে কৃষক সমিতি মোজাফফর গ্রুপের সাথে পুরোপুরিভাবে যুক্ত হন। সমগ্র রায়পুরা থানা মোজাফফর গ্রুপ তথা মস্কোপন্থী ভাবধারায় বিশ্বাসীদের সাথে সম্পৃক্ত থাকে।

কোহিনূর বু’জি’র ( কোহিনূর বেগম শিক্ষক) স্মৃতিতে উজ্জ্বল তখনকার কথা, ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় একগ্রুপ ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপ যা পড়ে মস্কোপন্থী ও অন্য গ্রুপ ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপ যা পিকিংপন্থী হিসেবে পরিচিতি পায় । ছাত্র ইউনিয়ন দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার প্রভাব আমাদের জনপদে ও পড়ে। রায়পুরা থানা ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপ তথা মোজাফফর ন্যাপের সাথে যোগ দিলে প্রতি স্কুলে স্কুলে সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়। অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী কোহিনূর বু’জিকে আহ্বায়ক করে লক্ষীপুর স্কুল ছাত্র ইউনিয়নের কমিটি গঠিত হয়। একইভাবে রায়পুরা উত্তরাঞ্চলে ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপের শক্ত ঘাঁটি তৈরী হয়।

আন্তর্জাতিক ও জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মনোহরদী উত্তরাঞ্চলে ফয়েজ মাস্টার মোজাফফর ন্যাপকে ও কৃষক সমিতিকে সমর্থন করেন এবং আবদুর রশীদ তারা মাস্টারের নেতৃত্বে চালাকচর অঞ্চলে ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপের সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হতে থাকে।

শিবপুরে আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে শিবপুর, মনোহরদীর দক্ষিণাঞ্চলে ন্যাপ, কৃষক সমিতি ভাসানীর ও ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের প্রভাবাধীন থাকে। ভাসানীর কৃষক সমিতির তরুণ সাধারণ সম্পাদক হন আবদুল মান্নান ভূঁইয়া।১৯৬৭ সালে ভাসানী গ্রুপের কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ।

আমি ক্লাস ফোরে পড়ি ১৯৬৮ সাল। ছোট কাকা তখন কিশোরগন্জ জেলে। পাকিস্তানী শাসকের জননিরাপত্তা আইনে বিপদজনক ব্যাক্তি হিসেবে বন্দী। স্কুল কলেজের বড় ভাইয়েরা মিছিল করত ‘জেলের তালা ভাঙবো-শেখ মুজিবকে আনবো ‘ “আগরতলার মিথ্যা মামলা তুলে নাও – নিতে হবে ” রাজবন্দীদের মুক্তি চাই – দিতে হবে ‘। একসময় আমরা ছোটরাও মিছিলের পিছনে পিছনে হাঁটতে শুরু করলাম। মিছিল করলে মনে হত আমার ছোট কাকার মুক্তির জন্য আন্দোলন করছি। আরও মনে হত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা মানে পাকিস্তানিদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কোন একটা ষড়যন্ত্র।

সার্জেন্ট আব্দুল জলিল ভাই ‘ আগরতলা ষড়যন্ত্র ” মামলা সম্পর্কে বলেন, বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দেয়ার পর চিন্তা করেন সারা পূর্ব পাকিস্তান তখন আন্দোলন সংগ্রামের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত কিন্তু পাক শাসক গোষ্ঠীর দমন-পীড়নে সে ভাবে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলা কষ্টসাধ্য হবে । কাজেই স্বাধীনতার জন্য দেশকে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। তারই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে এবং পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনীতে লে. কর্ণেল মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বে পাকিস্তান সশস্ত্রবাহিনীর বাঙ্গালীরা প্রাক্তন বাঙ্গালী সৈনিক এবং স্বাধীনতাকামী ছাত্র-জনতার সহযোগিতায় সশস্ত্র পন্থায় বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং প্রস্তুতিও প্রায় সম্পন্ন করেন ।

আমাদের জনপদের সররাবাদ গ্রামের সার্জেন্ট আব্দুল জলিল ভাইয়ের সাথে প্রথম পরিচয় হয় জাহাঙ্গীর ভাইজানের বিয়েতে । এতদিন শুধু নাম শুনে এসেছি, আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত একজন সদালাপী নিরহংকারী বিপ্লবীর কাছ থেকে সরাসরি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে জানার জন্য কৌতুহলী হলাম। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানে এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ ছিল না। কৌতুহল টা রয়েই গেল। তারপর ১৯৮৪ সালে বেলাব থানা সমিতির সাধারণ সভা সহ সমিতির বিভিন্ন সভা সমিতিতে দেখা হলেও বিস্তারিত আলাপ আলোচনার সুযোগ ছিল না। ১৯৯৪ সালে বেলাব থানা সমিতি ঢাকা এর পনুঃগঠিত হওয়ার সময় বিভিন্ন ইস্যুতে দীর্ঘ সময় একসাথে কাটানোর সুযোগে জেনে নেই ” আগরতলা ষড়যন্ত্র ” মামলা সম্পর্কে।

সার্জেন্ট আব্দুল জলিল ভাই বলেন, সশস্ত্র আন্দোলনের ঐ পরিকল্পনায় ‘একটি নির্দিষ্ট রাত্রে নির্দিষ্ট সময়ে ‘ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সবগুলো ক্যান্টনম্যান্টে আচমকা আক্রমণ চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র দখল করে পাকিস্তানীদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে তাদের বন্দী করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ‘ঘোষণা’ ছিল মূল উদ্দেশ্য । তবে, পরিকল্পনায় অংশগ্রহনকারীদের মধ্য থেকে কারও বিশ্বাসঘাতকতার কারনে পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। এই কারণে ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার সূত্রপাত ঘটে।

পাকিস্তান সরকার বলে, ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা বসে কতিপয় দেশদ্রোহী পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করে। তাদের বিরুদ্ধে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মরত ও প্রাক্তন সদস্য এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি অফিসারদের বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের করে পাকিস্তান সরকার তাকে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে অভিহিত করে ও প্রচার প্রচারনা চালায়।

সার্জেন্ট আব্দুল জলিল ভাই ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার ২৯নং অভিযুক্ত হিসেবে গ্রেফতার হন ও চরম কারানির্যাতন ভোগ করেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে গ্রেফতার হন তিনি ও করাচীর বিমানবাহিনীর পুলিশ সেলে সপ্তাহখানেক আটক থাকেন। তারপর ১৯ জুন, ১৯৬৮ তারিখ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯ তারিখ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সাথে বন্দী ছিলেন। তিনি বলেন , রাষ্ট্রপক্ষের আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ সত্য ছিল। কারন আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সশস্ত্র আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করতে চেয়েছিলাম। তবে, মামলার আত্মপক্ষ রক্ষার্থে অভিযোগগুলো তখন আমরা অস্বীকার করেছি ।

তবে জলিল ভাইয়ের জীবনের সুখের স্মৃতি, মামলা চলাকালীন সময় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বিয়ের দিন মামলার শুনানী কার্যক্রম ছিল। বিয়ের পর বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব দুই হাড়িভর্তি মিষ্টি নিয়ে শুনানী চলাকালীন সময় কোর্টে উপস্থিত হন। বঙ্গবন্ধু জলিল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দরাজ গলায় বলেছিলেন, ‘জলিল, ইউ ডিস্ট্রিবিউট দ্য সুইটস’। এরপর তিনি অভিযুক্তদেরসহ নিরাপত্তারক্ষীদের মাঝে ঐ মিষ্টিগুলো বিতরণের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

১৯৬৮ সনের শেষের দিকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মাধ্যমে পুর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ প্রায় সকল নেতাদের জেলে অন্তরীন করা হয়। সারা পূর্ব বাংলার জনগণের মাঝে দানা বেঁধে উঠে স্বাধীকার অর্জনের, ফুঁসে উঠে সারা দেশ।

সকল স্কুল গুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছে । আমরা প্রায় সকলেই খেলার মাঠ থেকে ফিরি দেরী করে। প্রায় সন্ধা হয় হয় ফুটবল খেলা শেষ করে মাঠের পাশে বাজারে দেখি মানুষের গোল, মনে হল একজন কেউ কিছু বলছে সকলেই তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। আমরা খেলার মাঠ থেকে সকলেই গেলাম শুনতে কি হয়েছে। একজন সাইকেল আরোহী, কে ছিল এখন আর মনে নেই ; বলছেন হাতিরদিয়া বাজারে আন্দোলনকারী ছাত্রদের সাথে পুলিশের গন্ডগোল হয়েছে। পুলিশ বাজারের মানুষের উপর গুলি করেছে। কতজন মারা গিয়েছে বলতে পারছে না তবে বাজারে যেহেতু গুলি করেছে অনেক মানুষ মারা গিয়েছে। এর মাঝেই কে একজন শ্লোগান দিয়ে উঠলো, ‘ হাতিরদিয়ার রক্ত বৃথা যেতে দিবনা ‘। সবাই চুপ হয়ে রইল প্রতিউত্তর কি হবে কারও জানা নেই। কেউ এ ধরনের শ্লোগানে অভ্যস্ত নয়। যিনি শ্লোগান দিলেন তিনি বলে দিলেন, আমি যখন বলব ‘ হাতিরদিয়ার রক্ত বৃথা যেতে দিব না ‘ আপনারও বলবেন ” হাতিরদিয়ার রক্ত বৃথা যেতে দিব না ” ‘আইয়ুব খানের গদিতে লাথি মারো একসাথে ‘। আমরা শ্লোগান দিতে দিতে বাড়ি চলে আসলাম।

আমার ছিল বরাবরই হোম সিকনেস। অথবা বলা যায় আম্মার কাছ থেকে দূরে বেশী দিন থাকতে পারতাম না অথবা এমনও হতে পারে আমার মত আমি থাকতে পছন্দ করতাম। এককথায় স্বাধীনতা প্রিয়। ক্লাস সিক্সে ঢাকা ভর্তি হলেও ক্লাস নাইনে এসে এসএসসি পরীক্ষার চিন্তা করে দাদা ভাই বিন্নাবাইদ আম্মার কাছে রেখে আসেন। কলেজেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঢাকা ভর্তি হয়ে রাঙা ভাইকে বললাম আমার ভাল লাগেনা আমি নরসিংদী কলেজে পড়ব। রাঙা ভাই আলাদা রুম, টেবিল চেয়ার ঠিক করে দিলেন। ছয় মাসও গেলনা আব্বা তখন রাঙা ভাইয়ের বাসায় এরই মাঝে আলম ভাই বেড়াতে আসলেন রাঙা ভাইয়ের বাসায় কথা প্রসঙ্গে বললেন ভাইস প্রিন্সিপাল আবদুল কাদির স্যারের কথা। আব্বাকে বললাম আপনার যেহেতু ছাত্র কাদির স্যার উনার কাছে চলে যাই। হাতিরদিয়া ভর্তি হই। আব্বা রাঙা ভাই রাজী হলে হাতিরদিয়া কলেজে চলে আসলাম। আমি থাকি কলেজ হোষ্টেলে। হাতিরদিয়ার দিনগুলো ছিল আমার সোনালী দিন। আমার সরাসরি শিক্ষক অধ্যাপক তোফাজ্জল হোসেন ভূঁইয়া শাহজাহান স্যারের কাছ থেকে শুনি হাতিরদিয়ার কৃষক আন্দোলনের কথা।

শাহজাহান স্যার বললেন, মাওলানা ভাসানী আহুত ২৯ ডিসেম্বরের হরতাল সফল করার জন্য ২৮ ডিসেম্বর শনিবার বিকেলে পুর্ববাংলা ছাত্র ইউনিয়নের ছাত্রনেতা এ.এম. আসাদুজ্জামান আসাদ ভাইয়ের নেতৃত্বে শিবপুর থানা থেকে ১৫/২০ জন ছাত্র হাতিরদিয়া বাজারে আসে। বাজারের পুরনো সমিতি ঘরে বসে হরতাল সফল করার লক্ষে পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়। হাতিরদিয়া বাজার ছিল এতদাঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাট। বিশেষ করে গরু ও পাটের হাট ছিল খুবই সমৃদ্ধ। প্রতি রবিবার এই হাটে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটত।

২৯ ডিসেম্বর ,১৯৬৮ সন, রবিবার, সকাল ১১ টা। আসাদ ভাইয়ের নেতৃত্বে আগত লোকজন ও আমার সাথে থাকা ১০/১৫ জন পিকেটিংয়ে নামি। বেলা ১২ টার দিকে পিকেটিংয়ের এক পর্যায়ে পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনী আমাদের উপর নজরদারী করতে শুরু করল। ইতিমধ্যে আমরা বাজারের সকল দোকানঘর বন্ধ করে দিয়েছি এবং বাজারে প্রবেশের বড় ৪ টি রাস্তার মোড়ে দাড়িঁয়ে লোকজনকে বাজারে প্রবেশে বাঁধা দেই। বেলা ২ টার দিকে পুলিশ হটাৎ মারমুখী হয়ে উঠে। পুলিশ পিকেটিংয়ে অংশগ্রহণকারী কতিপয় নেতাকর্মীকে বেধরক লাঠিচার্জ ও ধরপাকড় শুরু করে। গ্রেপ্তার করে আমাকে, শিবপুরের তোফাজ্জল হোসেন ( তোফাজ্জল মাস্টার) , সেন্টু মোল্লা এবং মাইকম্যান গড়বাড়ির শাজাহানকে। আসাদ ভাই কোনরকম পুলিশের হাত থেকে ফসকে বেরিয়ে যান। কিন্ত তিনি পুলিশের রাইফেলের বাটের আঘাতে আহত হন। আসাদ ভাই আহত অবস্থায় ঢাকায় চলে যান।

পুলিশ আমাদের ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে গরু বাজারে অবস্থিত স্থানীয় রমিজ উদ্দিন ব্যাপারীর পাটের গুদামে আটকে রাখে। আমাদের গ্রেপ্তারে ছাত্র-জনতা ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে। পাটের গুদাম থেকে আমাদের ৪ জনকে উদ্ধারের জন্য ছাত্র-জনতা পুলিশের প্রতি ইট পাটকেল ছুড়তে থাকে। শিবপুরের আব্দুল মান্নান খান, মনোহরদীর জসিম উদ্দিন খোকা, আমিন উল্লাহ এবং আমীর আলীর নেতৃত্বে তখন একটি জঙ্গী মিছিল হাতিরদিয়া বাজারে ঘটনাস্থলে আসে। মিছিলকারীরা আমাদের ছাড়িয়ে নিতে আপ্রান চেষ্টা চালায়। উক্ত মিছিল থেকে আমাদের ৪ জনের মুক্তির জন্য শ্লোগান চলতে থাকে। এরই মধ্যে পুলিশ বিনা উস্কানিতে গুদাম থেকে জনতার উপর গুলি চালায়। ভিতর থেকে আমরা কিছুই দেখতে পারছিলামনা। পুলিশের হাতে আটক অবস্থায় জানতে পারলাম ঘটনাস্থলে ৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়েছেন। এরা হলেন – বাশুলীকান্দী গ্রামের মোঃ সিদ্দিক মাষ্টার, নোয়াদিয়া গ্রামের মিয়াচাঁন, সোনাকুড়া (বর্তমান সৈয়দের গাঁও) গ্রামের মোঃ হাছেন আলী।

এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন মারাত্মকভাবে আহত হয়। রাত দুইটার দিকে পাটের গুদাম থেকে আমাদের ৪ জনকে মনোহরদী থানা হাজতে নেয়া হয়। ইতিমধ্যে শিবপুর থেকে মোক্তার খান ও শরিফ হোসেনকে আটক করে একই জেলহাজতে পাঠানো হয়। আমাদের ৬ জন সহ মোট ১৮ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়। প্রায় দেরবছর মামলা চলার পর এক রায়ে আমাদের বেকসুর খালাস প্রদান করা হয়।

আমাদের জনপদে হাতিরদিয়া বাজারে সংঘটিত এই রক্তাক্ত ঘটনাকে চির জাগরুক করে রাখার লক্ষে স্থানীয় জনগণ হাতিরদিয়া বাজারের গরুর হাটে একটি শহীদ মিনার স্থাপন করে যা কালের স্বাক্ষী হিসাবে দাড়িঁয়ে আছে। ১৯৬৮ সনের ২৯ ডিসেম্বর নরসিংদী তথা পূর্ব পাকিস্থানের সবচেয়ে আলোড়িত ঘটনা মনোহরদী থানার হাতিরদিয়া বাজারে সংঘটিত হাট হরতাল। যেখান থেকে বিস্ফোরিত হতে থাকে আগুনের দাবানল। যে পথ ধরে উনসত্তরের গনঅভ্যুত্থান।

লেখক : সমাজসেবক

সময় জার্নাল/রায়হান তন্ময়

লকডাউন পরিস্থিতিতে পাঠকদের অবস্থা, সমস্যায় পড়া মানুষদের কথা সরকার, প্রশাসন এবং সকল খবরাখবর আমাদের সব পাঠকের সামনে তুলে ধরতে আমরা মনোনীত লেখাগুলি প্রকাশ করছি। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের পাঠাতে ক্লিক করুন

স্থান, তারিখ ও কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই লিখে পাঠাবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।