মোঃ সাজ্জাদুর রহমান সজীব, বুটেক্স প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) সনাতনী শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে বিদ্যার দেবী শ্রী শ্রী সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভক্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয় এই পূজা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও শিক্ষাভিত্তিক উৎসব।
অনুষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০টায় মন্ত্রোচ্চারণ, পুষ্পার্ঘ্য ও ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে বিদ্যার দেবীকে মাতৃবরণের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সাদা ও হলুদ বসনে পূজার আনুষ্ঠানিকতায় অংশগ্রহণ করে। দেবীর চরণে পুস্তক, খাতা, কলম ও বাদ্যযন্ত্র অর্পণের মাধ্যমে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতার কামনায় প্রার্থনা করেন আগত ভক্তরা। অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় বেলা ১২টায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অঞ্জলি প্রদান করা হয়। এরপর আরতি ও প্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে পূজার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. অনুপ কুমার দত্ত, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক অদ্রি দাশ ও একই বিভাগের প্রভাষক পলাশ দাশ। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত ভক্তদের অংশগ্রহণে পূজা মণ্ডপজুড়ে উৎসবের আনন্দ ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রভাষক অদ্রি দাশ বীণাপানি ও বাগদেবীর আরাধনায় সবাইকে বসন্তপঞ্চমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “বুটেক্সে একজন শিক্ষক হিসেবে এটি আমার প্রথম সরস্বতী পূজা। ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণ, উদ্যোগ এবং শ্রদ্ধা স্পষ্টভাবে এখানে দৃশ্যমান। ছাত্র-ছাত্রীসহ তাদের অভিভাবক, শিক্ষক এবং আশেপাশের এলাকার মানুষের একত্রিত উপস্থিতি এক অনন্য ভ্রাতৃত্বের প্রকাশ ঘটিয়েছে। প্রশাসনকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই তাদের সহায়তার জন্য। অনুষ্ঠানে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সঙ্গে গীতাপাঠ বা ধর্মীয় গুরুর আলোচনার আয়োজন করলে আরও বেশি সবার মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রত হবে। আমি নিজেও অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং ধন্যবাদ জানাই সনাতনী শিক্ষার্থীদের, যাঁরা এত সুন্দরভাবে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন।”
ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সপ্তক বড়ুয়া অনুষ্ঠান সম্পর্কে বলেন, ''আমি একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ছোটবেলা থেকেই সকল ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সাথে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। যখনই আমার মুসলিম, হিন্দু অথবা অন্য সম্প্রদায়ের কোনো বন্ধু আমাকে তাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়, আমি সবসময় আমার দিক থেকে সর্বোচ্চভাবে অংশগ্রহণের চেষ্টা করি। সরস্বতী পূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বিদ্যার দেবীর কৃপায় সকলের জীবন আলোকিত হোক, এটাই কামনা। বিদ্যা শুধু পড়াশোনার মধ্যেই আবদ্ধ নয় বরং শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ, সচ্চরিত্র ও সততার সমষ্টি।''
ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী উৎস করণ বলেন, ''প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরও সনাতনী শিক্ষার্থীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সাড়ম্বরে আয়োজন করা হয় বিদ্যাদেবীর আরাধনা। এ আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতনী শিক্ষকবৃন্দ, প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। সার্বিকভাবে অনুষ্ঠানটি বুটেক্স সনাতনী পরিবারের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এই পবিত্র তিথিতে সকলের সম্মিলিত প্রার্থনা—দেবী সরস্বতী যেন আমাদের সমস্ত অজ্ঞানতা ও অন্তর্গত অন্ধকার দূর করে আলোকিত, মানবিক ও জ্ঞাননির্ভর সত্তার উন্মোচন ঘটান।''
উল্লেখ্য, বাংলা মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরে উদযাপন করেন সরস্বতী পূজা। জ্ঞান, বিদ্যা, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী হিসেবে মা সরস্বতী শিক্ষার্থীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বাস অনুযায়ী, তাঁর আশীর্বাদে মানুষ জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার পথে অগ্রসর হয়। তাই এই দিনটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং জ্ঞানের আলোয় জীবন আলোকিত করার এক পবিত্র উপলক্ষ্য।
এমআই