নিজস্ব প্রতিবেদক:
কুমিল্লার মুরাদনগরে অবস্থিত শ্রীকাইল গ্যাস ফিল্ডে “ওয়েলহেড গ্যাস কম্প্রেসর ক্রয় ও স্থাপন” প্রকল্পের চুক্তি বাতিল করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) । প্ল্যান্টে গ্যাসের ইনলেট চাপ বৃদ্ধি, অপারেটিং চাপ বজায় রাখা এবং বিদ্যমান কূপ থেকে সর্বোচ্চ গ্যাস উত্তোলন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২৪ সালের মার্চে রোমানিয়ার কোম্পানি এসসি ইউরো গ্যাস সিস্টেমস এসআরএল-কে এই প্রকল্পের টেন্ডার প্রদান করা হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ১৫ দশমিক ৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে ৮ জানুয়ারি ২০২৬ বাপেক্স কোনো সুস্পষ্ট কারিগরি বা আর্থিক ব্যাখ্যা ছাড়াই চুক্তি বাতিল করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কাজ সম্পন্নের শেষ মুহুর্তে এসে এই প্রকল্প বাতিলের ফলে উৎপাদন ও রাজস্বসহ বহুমাত্রিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কম্প্রেসর স্থাপন করা হলে গ্যাস ফিল্ডটি থেকে দৈনিক প্রায় ২০ এমএমএসসিএফডি অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন সম্ভব হতো।
দীর্ঘদিন ধরে শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্রের চারটি কূপ ২, ৩, ৪ এবং ইস্ট–১ থেকে গ্যাস উত্তোলনের ফলে কূপমুখের চাপ কমে আসে। ফলে প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট ও ট্রান্সমিশন লাইনে প্রয়োজনীয় ইনলেট চাপ বজায় রাখার জন্য প্রকল্পটির আওতায় ১০ এমএমএসসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি ন্যাচারাল গ্যাস ওয়েলহেড কম্প্রেসর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয় ২০২৩ সালের মার্চে এবং ২০২৪ সালের মার্চে পারচেজ অর্ডার দেওয়া হয়।
প্রকল্পটি বাতিল হওয়ায় বিদ্যমান চারটি উৎপাদনশীল কূপ অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব হারানো এবং আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর চাপ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, প্রকল্পটির জন্য নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হলে ব্যয় ৩৫০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে, যা আগের ব্যয়ের তুলনায় দ্বিগুনেরও বেশি। পাশাপাশি বাস্তবায়নে অতিরিক্ত অন্তত আড়াই বছর সময় লাগতে পারে। বিকল্প হিসেবে নতুন কূপ খননের পথ আরও দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল, যা সম্পন্ন করতে ৩–৪ বছর সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে বর্তমান চুক্তিটি ফাস্ট-ট্র্যাক ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হলে এক বছরের মধ্যেই দেশীয় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সরকারের শত শত কোটি টাকা সাশ্রয় এবং আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতো।
স্থানীয় দৌলতপুর পূর্ব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইদুর রহমানের সাথে গ্যাসক্ষেত্রের বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি এখানে গ্যাসের যে ফ্লো সেটা কমে গেছে। এটা বৃদ্ধি করার জন্য খনন কাজ শুরু হয়েছিলো, স্থানীয়রাও কাজ করতো। তবে সাম্প্রতিক নাকি বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে যেন দ্রুত গ্যাস উত্তোলন বাড়ায়। এছাড়াও তিনি তাদের এলাকায় এই গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস সুবিধা প্রদানের দাবি তুলে বলেন, আমাদের এখান থেকে প্রায় ১০ বছর ধরে গ্যাস তোলা হচ্ছে। আমাদের এলাকার গ্যাস হলেও আমরা কোন গ্যাস পাচ্ছিনা। এর কোন সুবিধা পাচ্ছিনা।
মোখলেসপুর গ্রামের বাসিন্দা কবির বলেন, প্রথমত গ্যাস ফিল্ডের একটা কাজ হয়েছিলো। এরপর আরেকটু কূপ খননের কথা শুনেছি। আমরা আগেও গ্যাস পাইনি, এখনো বঞ্চিত। আমরা চাই চলমান কাজটি দ্রুত সম্পন্ন হোক এবং আমরা এই গ্রামের মানুষ যেন গ্যাসের সুবিধা পাই।
বিশ্লেষকদের মতে, শ্রীকাইল গ্যাস ফিল্ডের ওয়েলহেড গ্যাস কম্প্রেসর প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। প্রয়োজনে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা যাচাই করে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক হাসান জামান বলেন, বর্তমান কোম্পানিকে নোটিশ দেয়া হয়েছিলো কোন উত্তর পায়নি। এই অবস্থায় টার্মিনেশন হয়ে যায়। একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে তারা যোগাযোগ না করলে টার্মিনেশন করে দেয়া হবে। এই অনুযায়ী তাদের জানানো হয়েছে কিন্তু তারা কোন সাড়া দেয়নি। মি. হাসান বলেন, এখনো আগের কোম্পানির সুযোগ আছে যদি তারা কাজ করতে চায়, সেভাবে আরবিট্রেশন করে আসতে পারে। তিনি বলেন, আমি যতটুকো জানি ফরেন কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করে ভালো রেজাল্ট পাচ্ছেনা, কাজও আগাতে চাচ্ছেনা বলে তারা কাজ বন্ধ রেখে চলে গেছে। তাদের মূল কোম্পানিও কোন সাড়া দিচ্ছেনা আমরা চিঠি দেয়ার পরও। তবে তারা যদি এখনো কাজ করতে চায়, চুক্তির বিভিন্ন শর্তানুযায়ী তাদের ফিরে আসার সুয়োগ আছে।
নতুন কাউকে টেন্ডার দেয়া হবে কিনা এ বিষয়ে হাসান জামান বলেন, এটা ডিসিশনের ব্যাপার। এটা পেট্রোবাংলা, মন্ত্রণালয় যে ডিসিশন নিবে সেটা হবে। একটা প্রজেক্ট আবার নতুন কাউকে দিতে গেলে অনেকগুলো কমিটির মাধ্যমে যেতে হয় যাচাই বাচাই করে। ওগুলো হওয়ার পর বলা যাবে নতুন কোন কোম্পানিকে দেয়া হবে কিনা, প্রজেক্ট কন্টিনিউ করা হবেনা। এগুলো এনালাইসিসের বিষয়, সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এটা সময়ের ব্যাপার ইমিডিয়েট কিছু হবেনা।
নতুন টেন্ডারে খচর এবং সময় বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নতুন টেন্ডারে সময় কিছুটা তো লাগবেই। আর যদি ইনফ্লুয়েশন ধরেন তাহলে খরচ বাড়তেও পারে, কমতেও পারে। যেমন, এর আগে খরচ অনেক হয়েছিলো আবার দ্বিতীয় টেন্ডারে কম হয়েছিলো। আবার কোন দেশ বা কোন কোম্পানি পায় এর ওপর নির্ভর করে খরচ বাড়বে নাকি কমবে। এগুলো করতে আমাদের কমিটি আছে তারা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিবে।
এমআই